খেলারদেশ

‘আমার মা এখনও আমাকে এটা-ওটা কিনে আনতে পাঠান’

২০২৪ সালে স্পেনের হয়ে ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ জেতার পর ফ্রান্সের পত্রিকা ফ্রান্স ফুটবল তার এই সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছিলো। তখন কিছুটা প্রকাশের পর সম্প্রতি আবারও পূর্ণাঙ্গ আকারে প্রকাশ করে তারা। খেলার দেশের জন্য তা অনুবাদ করে প্রকাশ করা হলো।

‘আমার মা এখনও আমাকে এটা-ওটা কিনে আনতে পাঠান’
খেলার দেশ ডেস্ক
By খেলার দেশ ডেস্ক

আপনার বাড়ির লোকজন বলেছেন, ছোটবেলায় আপনি কখনো ফুটবল ছাড়তেন না। খাওয়া বা ঘুমানোর জন্য যদি কেউ ফুটবল নিয়ে যেতো, তখন আপনি কাঁদতে শুরু করতেন...

ঠিকই বলছেন! (হেসে।) আমার মনে পড়ে, যখন স্কুলে যেতাম, একটা ব্যাগে করে বল নিয়ে যেতাম। ক্লাসে ঢোকার আগে আমি সেটা ব্যাকপ্যাকে লুকিয়ে রাখতাম, কারণ টিচার চাইতেন না আমি ফুটবলটা টেবিলে রাখি। বাড়িতে আমি আমার কুকুরদের সঙ্গে ফুটবল খেলতে পছন্দ করতাম। আমার বাবা বলতেন ভয় পাওয়ার কিছু নেই, তারা আমাকে কামড়াবে না, তাই আমি মজা করতাম। একটা কুকুরকে ড্রিবল করা সবচেয়ে কঠিন কাজ! (হাসতে হাসতে।) এটা ছিল আমার শেখার প্রক্রিয়ার অংশ, অনেকটা ট্রেনিংয়ের মতো।

আপনার প্রথম ফুটবল-সম্পর্কিত স্মৃতি কী?

‘আমি বলব বিশ্বকাপ আর চ্যাম্পিয়নস লিগ, তবে আমি বেছে নিতে পারি না... আর তারপর ব্যালন ডি’অর, তার পরে।’

— লামিন ইয়ামাল

তিন বছর বয়সে সিএফ লা টরেটায় আমার প্রথম অনুশীলন সেশন হয়। আমি আসলে জানতাম না কী করতে হবে: সবাই ওয়ার্ম-আপ শুরু করল... আমি আগে কখনো এটা করিনি, আমি বাড়ি যেতে চাইছিলাম। আমার বাবা বললেন ভয় পেয়ো না, সব ঠিক হয়ে যাবে এবং অনুশীলন শুরু হলে তোমার ভালো লাগবে। আর দ্বিতীয় সেশনেই তারা আমাকে পরের বয়স-গ্রুপে তুলে দিল। লা টরেটা থেকে কীভাবে দলীয়ভাবে খেলতে হয়, কীভাবে স্থান পরিবর্তন করতে হয়, কীভাবে সতীর্থদের সঙ্গে মিশতে হয় তা শিখিয়েছে।

কোন কোন খেলোয়াড় আপনাকে অনুপ্রাণিত করেছে?

নেইমার তখনও সান্তোসে ছিল এবং আমি তার ভিডিও দেখতে খুব ভালোবাসতাম। আমি এক বন্ধুর বাড়িতে যেতাম, যার কম্পিউটার ছিল, আর আমরা পুরো বিকেল ইন্টারনেটে ভিডিও দেখতাম। তারপর আমি বাড়ি গিয়ে ঘুমানোর আগে একই জিনিসগুলো বাসায় চেষ্টা করতাম। অবশ্যই লিওনেল মেসিকেও ভালোবাসতাম! আর (ডেভিড) ভিয়া, পেদ্রো, আর পুরো বার্সা দলকেও, যাদের আমি টিভিতে দেখতাম।

রোকাফোন্ডার কংক্রিট কোর্টে ছোট ছোট ম্যাচগুলো কি আপনার খেলার ধরণকে প্রভাবিত করেছে?

পলিডেপোর্তিভো (মিউনিসিপালের করা কংক্রিট পিচের মাঠ)-এ খেলা আমাকে সেই ‘স্ট্রিট স্মার্ট’ টেকনিক দিয়েছে যা আমার খেলায় আছে, ওয়ান ভার্সেস ওয়ান পরিস্থিতিতে উন্নতি করতে সাহায্য করেছে, আর ম্যাচে যেসব পরিস্থিতি আসে সেগুলো থেকে বের হতে শিখিয়েছে। সেখানেই বড়দের সঙ্গে খেলতে ভয় না পেতে এবং উপভোগ করতে শিখেছি। শেষ পর্যন্ত আমি সবসময় এমন প্রতিপক্ষের সঙ্গে খেলতাম যারা আমার থেকে সাত-আট বছর বড় ছিল। খেলার সময় তাদের কাছ থেকে যেন আঘাত না পাই সে জন্য আমাকে তাদের এড়িয়ে যাওয়ার উপায় খুঁজতে হতো।

ইউনিসেফের এক আয়োজনে লামিন ইয়ামালকে গোসল করিয়েছিলেন লিওনেল মেসি

ইউনিসেফের এক আয়োজনে লামিন ইয়ামালকে গোসল করিয়েছিলেন লিওনেল মেসি

ফুটবলের এই প্রতিভা কোথা থেকে এসেছে: আপনার বাবা, যিনি নাকি বেশ প্রতিভাবান ছিলেন, নাকি লিও মেসি যিনি আপনাকে শিশুকালে একটি চ্যারিটি ইভেন্টে আশীর্বাদ করেছিলেন?

আমার বাবা ভয়ানক! (হাসতে হাসতে) তিনি সবাইকে বলেন তিনি ভালো খেলতেন, কিন্তু এটা সত্য নয়! যদিও তিনিই আমাকে পার্কে নিয়ে যেতেন ফুটবল খেলতে এবং আমার মা-সহ আমাকে La Torreta-তে ভর্তি করিয়েছিলেন। সত্যি বলতে, আমি মেসির সঙ্গে ছবিটা মনে করতে পারি না, কারণ তখন খুব ছোট ছিলাম। আমার মা আমাকে এই গল্প বলেছিলেন। আমি তখন ৭ বা ৮ বছর বয়সি। এটা অবিশ্বাস্য, যে বিশ্বের সেরা খেলোয়াড় আমাকে গোসল করিয়েছিলেন, কিন্তু আমি মনে করি এটা কেবলই একটা কাকতালীয় ঘটনা।

আপনি কি মনে করেন, মেসির কাছ থেকেই আপনি ফুটবলের জাদুটা পেয়েছিলেন?

আমি আশা করি! (হাসতে হাসতে) মেসি ম্যাজিকের একটুও যদি আমার থাকে, আমি তাহলে একজন অবিশ্বাস্য ফুটবল খেলোয়াড় হতে পারি, তাই না? কিন্তু এটা কেবলই কাকতালীয়, আর কিছু নয়।

বার্সা এবং জাতীয় দলে আপনি কি মেসির সম্মানে ১৯ নম্বর জার্সি বেছে নিয়েছেন (মেসি ২০০৫ থেকে ২০০৮ পর্যন্ত এই নম্বর পরতেন)?

লামিন ইয়ামাল

লামিন ইয়ামাল

যখন আমাকে জাতীয় দলে ডাক পেয়েছিলাম (৮ সেপ্টেম্বর ২০২৩, জর্জিয়ার বিপক্ষে ৭-১ জয়ে একটি গোলসহ), আমি ১৯ নম্বর নিয়েছিলাম কারণ এটাই তখন ফাঁকা ছিল, আর আমি একদমই নতুন ছিলাম তখন। অবশ্য ওই নম্বরেই আমি আমার ক্যারিয়ারের প্রথম বড় শিরোপা জিতেছি (ইউরো)। আপনি হয়তো জেনে থাকবেন যে বার্সার হয়ে প্রথম মৌসুমে আমি মাত্র সাত মিনিট খেলেছিলাম। সে মৌসুমেও (২০২২-২০২৩ মৌসুমে তিনি ৪১ নম্বর জার্সি পরেছিলেন) আমরা লা লিগা জিতেছিলাম (২০২৩-২৪ মৌসুমে ২৭ নম্বর জার্সি পরে খেলেছিলেন লামিন এবং ২০২৪-২৫ মৌসুমে পরছেন ১৯ নাম্বার জার্সি)। পরে আমি দেখলাম মানুষ বলতে শুরু করেছে এটা সেই নম্বর যা লিও একসময় বার্সা এবং জাতীয় দলে পরতেন। তখন আমি এর সঙ্গে আরও বেশি কানেক্টেড হয়ে পড়লাম। এটা আমার জন্য খুব বিশেষ একটি নম্বর, যা আমি সারাজীবন পরব (পরে অবশ্য বার্সেলোনায় তিনি মেসির রেখে যাওয়া দশ নাম্বার জার্সি পরছেন)। তবে আমি তুলনা নিয়ে বেশি ভাবি না, সবসময় নিজের মতো হতে চাই। বন্ধুদের বলি, আমার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ফুটবলে নিজের ছাপ রেখে যাওয়া, একটা দুর্দান্ত ক্যারিয়ার গড়া। পরে নিজেকেই বলেছি, যদি মানুষ আমাকে ইতিহাসের সেরা খেলোয়াড়ের সঙ্গে তুলনা করে, তার মানে আমি ঠিক কাজ করছি। এটা আমাকে বিরক্ত করে না, তবে আমি নিজের দিকেই মনোযোগ ধরে রাখার চেষ্টা করি।

আপনি কি ইনিয়েস্তা-ধাঁচের একটি অসাধারণ অ্যাসিস্ট করতে চাইবেন, নাকি মেসির মতো মিডফিল্ড থেকে একার চেষ্টায় গোল করতে চাইবেন?

একটা লিও-স্টাইল মুভ! (একটুও দ্বিধা না করে।) আমি মনে করি তিনি অ্যাথলেটিক বিলবাওয়ের বিপক্ষে যে গোল করেছিলেন (২০১৫ কোপা দেল রে ফাইনালে একক প্রচেষ্টায় বিখ্যাত গোলটি করেছিলেন মেসি)। আমি তখন শাওয়ার থেকে বের হচ্ছিলাম আর মাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘স্কোর কী?’ ঠিক তখনই আমি দেখলাম লিও বেঞ্চের কাছে বল পেলেন এবং প্রতিটি ডিফেন্ডারকে ড্রিবল করে গোল করলেন। আমি জাস্ট মুগ্ধ অভিভূত হয়ে গিয়েছিলাম!

‘যদি তারা আমাকে লিও মেসির সঙ্গে তুলনা করে, ইতিহাসের সেরা খেলোয়াড়ের সঙ্গে, তার মানে আমি ঠিক কাজ করছি।’

— লামিন ইয়ামাল

আপনার কি মনে পড়ে বার্সেলোনা যেদিন আপনাকে স্কাউট করতে এসেছিল?

আমি আর এক বন্ধু স্কুল থেকে বাড়ি ফিরছিলাম। সেই বন্ধু আমার মাকে বার্সেলোনার প্রতিনিধিদের সাথে কথা বলতে শুনেছিলেন। সে দৌড়ে এসে আমাকে বলল, ‘তুই বার্সায় যাচ্ছিস!’ আমার বিশ্বাস হয়নি। বাড়ি গিয়ে মাকে জিজ্ঞেস করলাম, সত্যি কিনা। তিনি স্বীকার করলেন। তবে তিনিও আমাকে বলতে চাননি, কারণ এটা পুরোপুরি নিশ্চিত ছিলো না তখনো। আমি অনেকটা শকের মতো খেয়েছিলাম। ভাবছিলাম নাস্তা করব আর বন্ধুদের সঙ্গে পার্কে যাব, আর হঠাৎ আমাকে বলা হলো আমি বার্সায় সাইন করতে যাচ্ছি! যখন আমি লা টরেটায় ছিলাম, তখন আমার ওয়ান ভার্সেস ওয়ান, সরাসরি খেলা, আর আমার খেলার ধরণ কোনো কিছুতেই আমি নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছিলাম না। তখন আমি একটু ‘অগোছালো’ খেলোয়াড় ছিলাম; বল পেতাম আর সরাসরি প্রতিপক্ষকে ড্রিবল করতে যেতাম। লা মাসিয়াতে আমি শান্ত থাকতে শিখেছি, কখন দ্রুত খেলতে হবে, কখন ধীরে খেলতে হবে, কখন টিম হিসেবে খেলতে হবে—সবকিছু যা বার্সার অনন্য খেলার ধরণ তৈরি করে।

আপনার মতে কোন কোন ক্ষেত্রে উন্নতির সুযোগ আছে?

মূলত ডিফেন্সিভ দিকেই। বার্সেলোনা বা রিয়াল মাদ্রিদের মতো বড় ক্লাবের ফরোয়ার্ডরা খুব বেশি ডিফেন্ড করে না, তবে আমি মনে করি এখানে উন্নতি করতে হবে। এদিকে মনোযোগ দিতে চাই।

মাত্র ১৬ বছর বয়সে বার্সেলোনার মূল দলে অভিষেক হয়েছিলো লামিন ইয়ামালের।

মাত্র ১৬ বছর বয়সে বার্সেলোনার মূল দলে অভিষেক হয়েছিলো লামিন ইয়ামালের।

বার্সার মূল দলের সঙ্গে আপনার প্রথম দিনের প্রশিক্ষণের স্মৃতি কী মনে আছে?

চ্যাম্পিয়নস লিগে ভিক্টোরিয়া প্লজেনের বিপক্ষে ম্যাচের (৭ সেপ্টেম্বর ২০২২, ৫-১ জয়) দুই দিন আগে, জাভি সেই খেলোয়াড়দের ডাকলেন যারা লিগে খুব বেশি খেলেনি বা একেবারেই খেলেনি, আর আমাকে অংশ নিতে বলা হলো। আমি সাহস করে ড্রেসিং রুমে ঢুকতে পারিনি; কিছুক্ষণ জিমে সাইকেলে বসে কিছু না করেই ছিলাম... আনসু (ফাতি), তার সাথে পরিচয় ছিলো, আমাকে ভেতরে নিয়ে গেল। জর্দি আলবা, জেরার্ড পিকে, মিরালেম পিয়ানিচ ছিলেন সেখানে। আমি খুব নার্ভাস ছিলাম। কারণ, এখানে যারা আছেন, তাদেরকে তখন টিভিতেই দেখে অভ্যস্ত আমি। আর হঠাৎ তাদের সঙ্গে খেলতে হচ্ছে। ধীরে ধীরে অস্বস্তি কেটে গেল। যখন অভিষেক হলো (২৯ এপ্রিল ২০২৩, লা লিগায় বেতিসের বিপক্ষে), ভালোই লাগছিলো, কোনো চাপ ছিল না।

আপনি কি অন্য অনেক তরুণদের মতো তাড়াহুড়ো করেন?

না, না, আমি তাড়াহুড়ো করি না। তবে আমি এমন একজন এমন পছন্দ করে না... (থেমে গিয়ে।) ধরুন, আমি সর্বোচ্চ পর্যায়ে বা মানে খেলতে পারি, তখন একই রকম থাকতে ভালো লাগে না। আমি চ্যালেঞ্জ পছন্দ করি। আমি চাই কম খেলতে পছন্দ করি, কিন্তু সেরাদের সঙ্গে খেলতে চাই। বলা যায় সবসময় খেলতে গিয়ে যদি সেটা খুব সহজ হয়ে যায় এমনটা চাই না, ইয়ুথ টিমে থাকতে অনেকটাই এমন হয়েছিলো। আমি তাড়াহুড়ো করি না। সব সময়ই আরও বেশি চাই।

নিকো উইলিয়ামসের সঙ্গে আপনি ইউরোতে আপনি একজন তারকার হয়ে উঠেছিলেন। লক্ষ্যে স্থিরতা ও একাগ্রতা দেখিয়েছেন। এই চাপ কীভাবে সামলান?

ফুটবলটা শেষ পর্যন্ত খেলে আনন্দ পাওয়াই ব্যাপার। আমরা দুই বন্ধু একসঙ্গে খেলি। কল্পনা করুন, আপনি আর আপনার সেরা বন্ধু দুজনেই জাতীয় দলে আছেন; আপনারাও সম্ভবত আমাদের মতোই করতেন। আমরা শুধু উপভোগ করার কথা ভাবি, মজা করার কথা ভাবি। আমাদের যোগাযোগ একদমই ঠিকঠাক; আমরা গোল করি আর নাচি, কারণ এটাই আমাদের ফুটবল দেখার ধরণ, ভালো সময় কাটানোর উপায়। এটা আমাদের আরও স্বস্তি দেয়, নিজেদের মতো থাকতে সাহায্য করে, আর সর্বোচ্চটা দিতে সাহায্য করে।

আপনি কি ভেবেছিলেন ইউরো জিতবেন?

আমরা সবাই একে অপরের ওপর আস্থা রেখেছিলাম। পুরো সংবাদমাধ্যম বলেছিল আমরা কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছাতে পারব না—এটাই আমাদের আরও অনুপ্রাণিত করেছিল। আমরা জানতাম শেষ পর্যন্ত যেতে কী করতে হবে। আমরা দেখিয়েছি, আমরা সেরা দল। যখন আপনি দানি কারভাহাল, রদ্রি, নিকো (উইলিয়ামস), দানি ওলমো, পেদ্রির মতো খেলোয়াড়দের সঙ্গে খেলেন... তখন জানেন আপনি উচ্চ স্তরে খেলার ক্ষমতা রাখেন। আমাদের দল খুব ভালো, আর আমরা ইতিমধ্যেই পরবর্তী প্রতিযোগিতার (বিশ্বকাপ) কথা ভাবছি।

ফ্রান্সের বিপক্ষে সেমিফাইনালে, নবম মিনিটে গোল খাওয়ার পরও আপনি স্থির ছিলেন এবং নিজের মতো করে খেলে ম্যাচ ঘুরিয়ে দিলেন।

প্রথমবার বিশ্বকাপ খেলতে এসেই চমক দেখিয়েছেন লামিন ইয়ামাল।

প্রথমবার বিশ্বকাপ খেলতে এসেই চমক দেখিয়েছেন লামিন ইয়ামাল।

আমরা জর্জিয়ার বিপক্ষে শেষ ষোলোতে (৪-১) পিছিয়ে পড়েছিলাম, আর সেটা আমাদের জন্য শিক্ষা ছিল। একটু টেনশন হচ্ছিলো, বল হারাচ্ছিলাম। তাই নিজেদের বলেছিলাম, যদি গোল খাই—যেমন ফ্রান্সের বিপক্ষে হলো যদিও আমরা ভালো খেলছিলাম—তাহলে শান্ত থাকতে হবে। ভাগ্যক্রমে আমি দ্রুত গোল করে দলকে সমতায় ফেরালাম (২১তম মিনিটে), যা আমাদের আবার পথে স্বাভাবিক খেলায় ফিরিয়ে দিল। ফ্রান্স বিশ্বের অন্যতম সেরা দল। ম্যাচটা খুব ফিসিক্যাল ছিল, আমরা আমাদের খেলার ধরণ ও ব্যক্তিগত ধরনের কারণে জিতেছি।

আপনার অবিশ্বাস্য গোলটা নিয়ে বলুন...

প্রথম পনেরো মিনিটে আমি বুঝেছিলাম ফ্রান্সের ডিফেন্স ও মিডফিল্ডের মধ্যে ফাঁকা জায়গা আছে। আমাদের কাছে যখন বল ছিলো তখন সেই জায়গায় আমি একা ছিলাম। সেই মুহূর্তে আমি সামনে জায়গা দেখলাম শট নেওয়ার জন্য, আর চেষ্টা করলাম।

এমন শট নেওয়ার সাহস লাগে...

এটা আত্মবিশ্বাসের ব্যাপার। আমার সতীর্থরা সেই আত্মবিশ্বাস আমাকে দিয়েছে, বলেছে আমি যেন নিজের মতো খেলি। আমাদের অধিনায়ক (আলভারো) মোরাতা ট্রেনিং ক্যাম্পে আমাকে বলেছিলেন, তিনি জানেন আমি বড় কিছু করার ক্ষমতা রাখি। সেই আত্মবিশ্বাসে আপনি মাঠের যেকোনো জায়গা থেকে শট নিতে পারেন।

ম্যাচের আগে আদ্রিয়ান রাবিও আপনার প্রশংসা করার পর বলেছিলেন: "ইউরো ফাইনালে খেলতে হলে তাকে এখন পর্যন্ত যা করেছে তার চেয়ে অনেক বেশি করতে হবে।" সেই গোল কি আপনার উত্তর ছিল?

পরে বুঝলাম তিনিই আমার সামনে ডিফেন্ড করছিলেন। আমার তখন সেটা খেয়াল ছিলো না। শেষ পর্যন্ত, এটা হয়তো ভুল বোঝাবুঝি ছিল, তবে আমাকে ভালো খেলতে অনুপ্রাণিত করেছে। আমি তার প্রতি কোনো রাগ-ক্ষোভ রাখিনি। তিনি একজন অসাধারণ খেলোয়াড়, আবার তার বিপক্ষে খেলতে পারা দারুন ব্যাপার হবে।

ওই টুর্নামেন্টে আপনি পেলেকে ছাড়িয়ে সবচেয়ে কম বয়সে আন্তর্জাতিক ট্রফি জিতে নতুন রেকর্ড গড়েছেন। এটা কি বড় চাপ?

পেলে ইতিহাসের অন্যতম সেরা খেলোয়াড়; তিনি নিঃসন্দেহে শীর্ষ তিনজন খেলোয়াড়ের একজন। এমন এক অবিশ্বাস্য খেলোয়াড়ের রেকর্ড ভাঙা সারাজীবন মনে থাকবে। এটাই আমি বলেছিলাম, যখন ফুটবলে নিজের ছাপ রাখা গুরুত্বপূর্ণ।

২০২১ সালে আপনি বন্ধুদের সঙ্গে মাতারোর এক শপিং মলে ইউরো দেখেছিলেন। সময় কত দ্রুত যায়, তাই না?

সত্যি যে আমি প্রতিযোগিতা টিভিতে দেখতাম, তখন আমি পেশাদারও ছিলাম না, আর এখন আমি সেই প্রধান খেলোয়াড়দের একজন যাদের বাচ্চারা দেখতে ভালোবাসে। তার ওপর আমরা জিতেছি, যা ছিল স্বপ্ন! অবিশ্বাস্য, তাই না?

এই বিজয় (ইউরো) আপনার জন্য কী পরিবর্তন এনেছে? এই গ্রীষ্মে এক ধরনের "ইয়ামালম্যানিয়া" হয়েছিল...

টুর্নামেন্টের সময় আমি সেটা বুঝিনি. কারণ আমরা কিছুটা আর সবকিছু থেকে বাইরে ছিলাম; আমরা এর পরিধিটা ধরতে পারিনি। সত্যিকার অর্থে সেটা বুঝেছি বিমানবন্দরে। মানুষ আমাদের দেখতে পাগল হয়ে যাচ্ছিল, আমাদের সঙ্গে উদযাপন করতে চাইছিল। আমি এখন আরও বিখ্যাত। আগে মানুষ ছবি চাইত, কিন্তু আমি সহজেই বাইরে যেতে পারতাম। এখন অসম্ভব। গাড়িতে থাকলেও মানুষ জানালা দিয়ে আমাকে চিনে ফেলে। তবে স্বীকার করি, ইউরো না জেতার চেয়ে এটা ভালো!

আপনি এত বড় তারকা তবুও আপনার মাকে ঘরের কাজে সহযোগিতা করে থাকেন, এমন শুনেছি আমরা।

ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ জিতে আমি নিজেকে বিশ্বের রাজা ভাবতে পারি, কিন্তু আদতে তা নই। আমার মা এখনও আমাকে এটা-ওটা কিনে আনতে পাঠান। স্যান্ডেল পরতে বলেন, এটা ওটা করতে বলেন (হাসি)। এটা আমাকে বাস্তবতা বুঝতে সহযোগিতা করে। প্রতিদিন আরও উন্নতি করতে অনুপ্রাণিত করে।

আপনি কি বার্সায় দীর্ঘদিনের ক্যারিয়ার হিসেবে দেখেন নাকি অন্য কোথাও যাওয়ার চিন্তা করেন?

আমি এই মুহূর্তটা উপভোগ করতে চাই, বিশ্বের সেরা ক্লাবের অংশ হতে চাই। আমি বার্সায় ইতিহাস গড়তে চাই; এটাই আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

সবচেয়ে বেশি কী স্বপ্ন দেখেন: চ্যাম্পিয়নস লিগ, বিশ্বকাপ, নাকি ব্যালন ডি’অর?

আমি বলব বিশ্বকাপ আর চ্যাম্পিয়নস লিগ, তবে আমি বেছে নিতে পারি না... আর তারপর ব্যালন ডি’অর, তার পরে।

আপনি স্পষ্ট ফেভারিট কোপা ট্রফির জন্য, যা ২১ বছরের নিচে সেরা তরুণ খেলোয়াড়কে দেওয়া হয় এবং আগামী ২৮ ফেব্রুয়ারি ব্যালন ডি’অর অনুষ্ঠানে ফ্রান্স ফুটবল এটি প্রদান করবে। এটা কি আপনার জন্য সন্তোষজনক অর্জন হবে, নাকি আপনি ইতিমধ্যেই আরও উঁচুতে তাকিয়ে আছেন?

আমি আশা করি এই কোপা ট্রফি জিতব, আমাকে দিন এটা! (হাসে।) যেমন আমি আপনাকে বলেছি, আমি সবসময় আরও চাই। আমি চ্যাম্পিয়নস লিগ, ব্যালন ডি’অর জিততে চাই। যদি আমি জিততে পারি, দারুণ, তবে আসলে এটা নিয়ে খুব ভাবি না। আমি মূলত মনোযোগ দিচ্ছি বার্সার সঙ্গে মৌসুমটা ভালোভাবে শুরু করার দিকে। আমি মনে করি না এটা আমার বছর, আমি তাড়াহুড়ো করছি না। এই মৌসুমে আমি সর্বোচ্চ চেষ্টা করব, বার্সার সঙ্গে শিরোপা জিতব, যাতে এটা জিততে পারি। যদি আমি এই বছর সেরা তরুণ খেলোয়াড়ের ট্রফি জিতি, আমি আনন্দের সঙ্গে সেটা নেব এবং তারপর আরও উঁচুতে তাকাব, যেমন আমি সবসময় করেছি।

  • লামিন ইয়ামালের জীবনী
  • জন্ম: ১৩ জুলাই ২০০৭, এসপ্লুগেস দে ল্লোব্রেগাত, স্পেন। উচ্চতা: ১.৮০ মিটার (৫'১১"); ওজন: ৭২ কেজি (১৫৯ পাউন্ড)। পজিশন: ফরোয়ার্ড। স্প্যানিশ আন্তর্জাতিক: ১৪ ম্যাচ, ৩ গোল। ক্যারিয়ার: FC Barcelona (২০১৪ থেকে, পেশাদার অভিষেক ২০২৩)। অর্জন: ইউরো ২০২৪; লা লিগা ২০২৩ ও ২০২৫, স্প্যানিশ কাপ ২০২৫, স্প্যানিশ সুপার কাপ ২০২৫ ও ২০২৬।
খেলার দেশ ডেস্ক

খেলার দেশ ডেস্ক

খেলাধুলার সব খবর ও বিশ্লেষণ সবার আগে পেতে চোখ রাখুন খেলারদেশে।

মন্তব্যসমূহ (0)

মন্তব্য করতে এবং আলোচনায় অংশ নিতে আপনার গুগল অ্যাকাউন্ট দিয়ে লগইন করুন।