খেলারদেশ

আজ এমবাপ্পে বনাম হালান্ড

এমবাপ্পে এবং হালান্ড—বিশ্ব ফুটবলে প্রজন্মসেরা দুই স্ট্রাইকার। গোলের বুটের দৌড়ে সমানে সমান। ফ্রান্স ও নরওয়ে নক-আউট রাউন্ড নিশ্চিত করায়, ম্যাচটি শীর্ষস্থান দখলের লড়াই হলেও, দর্শকের নজর থাকবে নতুন প্রজন্মের দুই প্রতিদ্বন্দ্বী খেলোয়াড়ের উপর।

আজ এমবাপ্পে বনাম হালান্ড
খেলার দেশ ডেস্ক
By খেলার দেশ ডেস্ক

যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টনে ২০২৬ বিশ্বকাপের গ্রুপ ‘আই’-এর শেষ ম্যাচে মুখোমুখি হবে নরওয়ে ও ফ্রান্স। এই ম্যাচের ফলই ঠিক করবে গ্রুপের শীর্ষস্থান কার দখলে যাবে। ম্যাচটি শুরু হবে বাংলাদেশ সময় ২৭ জুন রাত ১টায়।

দুই দলের শীর্ষস্থান দখলের লড়াই হলেও, দর্শকদের চোখ থাকবে ম্যাচটির সবচেয়ে বড় আকর্ষণ—বিশ্বের সেরা দুই স্ট্রাইকার—আর্লিং হালান্ড ও কিলিয়ান এমবাপ্পের দিকে। উত্তর আমেরিকার মাটিতে চলতি বিশ্বকাপে দুজনই দুর্দান্ত সূচনা করেছেন।

হালান্ড যেন নিজের প্রথম বিশ্বকাপেই নিজেকে মেলে ধরেছেন পূর্ণরূপে। নরওয়ের এই গোলমেশিন প্রথম দুই গ্রুপ ম্যাচে চারটি গোল করেছেন। ইরাক ও সেনেগাল—দুই দলের বিপক্ষেই তিনি জোড়া গোল করেন।

Image

অন্যদিকে এমবাপ্পেও দুই ম্যাচে চারবার জালের দেখা পেয়েছেন। সেনেগালের বিপক্ষে দুটি এবং ইরাকের বিপক্ষে আরও দুটি গোল করেন তিনি। তবে বিশ্বকাপ তাঁর জন্য নতুন কোনো মঞ্চ নয়। ফ্রান্সের হয়ে এটা এমবাপ্পের তৃতীয় বিশ্বকাপ। ২০১৮ সালে তিনি বিশ্বকাপ জিতেছেন, ২০২২ সালে হয়েছেন রানার-আপ। বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত ১৬ ম্যাচে তাঁর গোলসংখ্যা ১৬। সর্বকালের বিশ্বকাপ গোলদাতাদের তালিকায় তিনি জার্মানির মিরোস্লাভ ক্লোসের সমান অবস্থানে আছেন। তাঁর সামনে রয়েছেন শুধু লিওনেল মেসি, যার গোল ১৮টি।

আন্তর্জাতিক ফুটবলে এই প্রথম মুখোমুখি হতে যাচ্ছেন হালান্ড ও এমবাপ্পে। তবে চ্যাম্পিয়ন্স লিগে তাদের দেখা হয়েছে চারবার। সেখানে এমবাপ্পের দল তিনবার জয় পেয়েছে। চলতি বিশ্বকাপে দুজনই সমান চার গোল নিয়ে মাঠে নামলেও আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের গল্প দুটি একেবারেই ভিন্ন।

Image

ইরাকের বিপক্ষে জোড়া গোল করে এমবাপ্পে ফ্রান্সের হয়ে নিজের ১০০তম আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছেন। সেই ম্যাচের পর তাঁর আন্তর্জাতিক গোলসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬০, সঙ্গে রয়েছে ৪০টি অ্যাসিস্ট।

Image

অন্যদিকে হালান্ডের পরিসংখ্যান যেন আরও বিস্ময়কর। ম্যানচেস্টার সিটির এই স্ট্রাইকার মাত্র ৫২ আন্তর্জাতিক ম্যাচে করেছেন ৫৯ গোল। এর মধ্যে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের মাত্র আট ম্যাচেই তাঁর গোল ১৬টি।

২৫ বছর বয়সী হালান্ড, এমবাপ্পের চেয়ে দুই বছরের ছোট। আন্তর্জাতিক ফুটবলে ম্যাচপ্রতি গোলেরও বেশি গড়ে তিনি এগিয়ে চলেছেন—যা আধুনিক ফুটবলে সত্যিই বিরল। ফলে আজকের ম্যাচটি হতে যাচ্ছে দুজনের মানসিক এবং গোল্ডেন বুটের দৌড়ের লড়াই। এই লড়াইয়ে দুজনের সামনে এক গোল বেশি করে বর্তমানে এগিয়ে আছেন লিওনেল মেসি।

নরওয়ে ও ফ্রান্স—দুই দলই শেষ ৩২ নিশ্চিত করেছে। তাই ম্যাচের আগে মানসিক দ্বৈরথই আকর্ষণের কেন্দ্রে।

Image

সেনেগালকে হারানোর পর, সাক্ষাৎকারে হালান্ড নির্ভার ভঙ্গিতে বলেন, ফ্রান্স ম্যাচ নিয়ে তিনি খুব একটা ভাবছেন না। বরং সব চাপ তিনি প্রতিপক্ষের ওপরই ছেড়ে দিয়েছেন। তিনি বলেন, "সত্যি বলতে, আমি এটা নিয়ে খুব একটা ভাবছি না। আমরা পরের রাউন্ডে উঠেছি, সেটাই অসাধারণ। ফ্রান্স ম্যাচ নিয়ে এখন মাথা ঘামাচ্ছি না। ওরাই সম্ভবত আমাদের হারাবে, এমনকি পুরো টুর্নামেন্টও জিততে পারে।"

অন্যদিকে এমবাপ্পেও অদম্য। এমবাপ্পের ভাবনায় হালান্ড নেই। সেনেগাল ম্যাচের আগে তিনি বলেছিলেন, "এই মুহূর্তে আমি হালান্ডকে নিয়ে ভাবছি না। হয়তো ওরা আমাদের নিয়ে ভাবছে। কিন্তু আমি পুরো মনোযোগ দিচ্ছি ইরাক ম্যাচে।"

উল্লেখ্য, নরওয়ে দুই ম্যাচে তিনটি গোল হজম করেছে। তাই তাদের দুর্বল রক্ষণভাগের বিপক্ষে বড় কিছু করতে পারলে এমবাপ্পে শুধু এবারের গোলদাতাঁর তালিকাতেই নয়, বিশ্বকাপের ইতিহাসেও আরও ওপরে উঠে যেতে পারেন।

ফ্রান্সের শক্তি ভারসাম্যময় শক্তি বনাম নরওয়ের লক্ষ্যভিত্তিক আক্রমণ। যদিও এই ম্যাচে ফ্রান্সকেই ফেবারিট ধরা হচ্ছে। তবে দুই দলের আক্রমণভাগের ধরন একেবারেই আলাদা। দিদিয়ে দেশমের অধীনে ফ্রান্সের স্কোয়াডের গভীরতা অসাধারণ। অনেকের মতে, এবারের বিশ্বকাপের সবচেয়ে শক্তিশালী দলও তারাই। এমবাপ্পেকে একাই পুরো আক্রমণের দায় টানতে হয় না। তাঁকে সহায়তা করতে আছেন মাইকেল ওলিসে, উসমান দেম্বেলে, দেজিরে দুয়ে ও ব্র্যাডলি বারকোলার মতো গতিময় ও সৃজনশীল ফুটবলাররা।

অন্যদিকে নরওয়ের আক্রমণের কেন্দ্রবিন্দু একজনই—আর্লিং হালান্ড। মার্টিন ওডেগার্ড মিডফিল্ডে দলের প্রধান কারিগর। তাঁর সৃজনশীল পাস থেকেই শুরু হয় নরওয়ের অধিকাংশ আক্রমণ, আর সেই আক্রমণের শেষ গন্তব্য প্রায় সব সময়ই হালান্ড। সতীর্থদের প্রথম লক্ষ্য থাকে তাঁকে বল পৌঁছে দেওয়া।

ফ্রান্স বনাম নরওয়ে ম্যাচটি হতে পারে নতুন যুগের কেন্দ্রবিন্দু। রেফারির প্রথম বাঁশি বাজতেই গ্রুপের হিসাব-নিকাশ হয়তো দ্বিতীয় সারিতে চলে যাবে।

নকআউট পর্বের কথা মাথায় রেখে দুই কোচই দলে কিছু পরিবর্তন আনতে পারেন। কিন্তু আলোটা থাকবে দুই প্রজন্মসেরা তাঁরকার ওপর, যারা বর্তমান ও ভবিষ্যতের বিশ্ব ফুটবলের মুখ।

এমবাপ্পের জন্য এই ম্যাচ বিশ্বকাপের কিংবদন্তি হিসেবে নিজের অবস্থান আরও শক্ত করার সুযোগ। একই সঙ্গে তিনি এগিয়ে যেতে চান মেসির বিশ্বকাপ গোলের রেকর্ডের দিকে।

আর হালান্ডের জন্য এটি সবচেয়ে বড় মঞ্চে প্রমাণ করার সুযোগ—প্রতিপক্ষের সীমানায় তাঁর নির্মমতা, কার্যকর ভূমিকা ও গোল করার অসাধারণ ক্ষমতা দিয়ে বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম পরাশক্তিকে হারানো সম্ভব হলে, তা কি একেবারেই অঘটন বলে গণ্য হবে?

তবে এটুকু নিশ্চিত, ম্যাচটি হয়ে উঠবে কৌশলনির্ভর রুদ্ধশ্বাস লড়াই বা গোলবন্যায় ভেসে যাওয়া এক মহারণ। উল্লেখ্য, গত ১০৩ বছরে নরওয়ে ও ফ্রান্স মোট ১৫ বার মুখোমুখি হয়েছে। এর মধ্যে ফ্রান্স জিতেছে ৭টি ম্যাচ, নরওয়ে জিতেছে ৪টি, আর বাকি ৪টি ম্যাচ ড্র হয়েছে।

তবে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, কোনো বড় আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে—যেমন বিশ্বকাপ বা ইউরো—এই দুই দলের কখনোই দেখা হয়নি। দুই দলের সর্বশেষ সাক্ষাৎ হয় ২০১৪ সালে একটি প্রীতি ম্যাচে। সেই ম্যাচে ফ্রান্স ৪-০ গোলে নরওয়েকে হারিয়েছিল। ফরাসি স্ট্রাইকার অলিভিয়ে জিরু সেদিন জোড়া গোল করেছিলেন।

লিওনেল মেসি ও ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো এখনও উত্তর আমেরিকার মাটিতে সময়কে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে খেলছেন। কিন্তু বিশ্ব ফুটবলের পরবর্তী রাইভাল জুটির দ্বৈরথ যে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়ে গেছে, আজ তাঁর সাক্ষী হতে যাচ্ছে জিলেট স্টেডিয়াম।

ভবিষ্যৎ সেখানেই নিজের উপস্থিতি জানাবে।

নরওয়ের সম্ভাব্য একাদশ (৪-৩-৩): অরইয়ান নিয়ল্যান্ড (গোলরক্ষক); মার্কুস পেডারসেন, ক্রিস্টোফার আয়ের, টরবিয়র্ন লাইসাকার হেগেম, ডেভিড মোলার উলফে; ফ্রেডরিক আউর্সনেস, সান্দের বের্গে, মার্টিন ওডেগার্ড; আন্তোনিও নুসা, আর্লিং হালান্ড, আলেকজান্ডার সোরলথ।

ফ্রান্সের সম্ভাব্য একাদশ (৪-৩-৩): মাইক মেনিয়াঁ (গোলরক্ষক); জুল কুন্দে, উইলিয়াম সালিবা, দায়ো উপামেকানো, থিও হার্নান্দেজ; অরেলিয়েন চুয়ামেনি, এনগোলো কান্তে, আদ্রিয়ান রাবিও; উসমান দেম্বেলে, কিলিয়ান এমবাপ্পে, ব্র্যাডলি বারকোলা।

খেলার দেশ ডেস্ক

খেলার দেশ ডেস্ক

খেলাধুলার সব খবর ও বিশ্লেষণ সবার আগে পেতে চোখ রাখুন খেলারদেশে।

মন্তব্যসমূহ (0)

মন্তব্য করতে এবং আলোচনায় অংশ নিতে আপনার গুগল অ্যাকাউন্ট দিয়ে লগইন করুন।