খেলারদেশ

ফুটবল, রোনালদো, মেসি, পর্তুগাল, আর্জেন্টিনা

বিশ্বকাপে রোনালদোর যে রেকর্ড মেসিও ভাঙতে পারবে না

৪১ বছরেও শেষ নন রোনালদো, ইতিহাস যেন এখনো তাঁর পায়ের নিচেই। গড়ে চলেছেন এমন সব কীর্তি যা মেসির পক্ষে ভাঙাও প্রায় অসম্ভব।

বিশ্বকাপে রোনালদোর যে রেকর্ড মেসিও ভাঙতে পারবে না

৪১ বছরেও শেষ নন রোনালদো, ইতিহাস যেন এখনো তাঁর পায়ের নিচেই!

খেলার দেশ ডেস্ক
By খেলার দেশ ডেস্ক

২০২৬ বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে আবারও পর্তুগালের ত্রাণকর্তা হলেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে গোল করলেন, দলকে জেতালেন এবং ম্যাচসেরার পুরস্কারও নিজের করে নিলেন। যেন আরেকবার প্রমাণ করলেন—চাপের মুহূর্তই তাঁর সবচেয়ে প্রিয় মঞ্চ।

Image

কেউ কেউ বয়সের কাছে হার মানেন। কেউ কিংবদন্তি হয়ে স্মৃতিতে বেঁচে থাকেন। আর ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো? যেন বয়সকেই নিজের ক্যারিয়ারের আরেকটি প্রতিপক্ষ বানিয়ে বারবার হারিয়ে দিচ্ছেন তিনি। ৪১ বছর বয়সে এসেও যেন রোনালদো এক অফুরন্ত প্রাণশক্তির নাম।

Image

○ নতুন রেকর্ড

আজ ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে গোলের মাধ্যমে রোনালদো গড়লেন নতুন ইতিহাস। বিশ্বকাপের নকআউট পর্বের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি বয়সী গোলদাতা এখন তিনিই।

যদিও বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে ডিআর কঙ্গোর বিপক্ষে গোলশূন্য থাকার পর সমালোচনার ঝড় বইছিল ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোকে ঘিরে।

কিন্তু পর্তুগিজ মহাতারকা জানিয়ে দিয়েছিলেন, “এখনো কিছুই শেষ না। অনেক বাকি।” আর কয়েকদিন পরই উজবেকিস্তানের বিপক্ষে সেই কথার প্রমাণ দিলেন মাঠে। ৪১ বছর বয়সী রোনালদো জোড়া গোল করে পর্তুগালকে সহজ জয় এনে দেওয়ার পাশাপাশি ফুটবল ইতিহাসে এমন এক রেকর্ড গড়লেন, যা হয়তো দীর্ঘদিন অক্ষত থাকবে।

○ ছয় বিশ্বকাপে গোল, ইতিহাসের একমাত্র ফুটবলার

উজবেকিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচের শুরুতেই গোল করে রোনালদো হয়ে যান বিশ্বকাপ ইতিহাসের প্রথম ফুটবলার—যিনি ছয়টি ভিন্ন বিশ্বকাপে গোল করেছেন। তাঁর গোলের তালিকা ছড়িয়ে আছে—২০০৬, ২০১০, ২০১৪, ২০১৮, ২০২২, ২০২৬ বিশ্বকাপজুড়ে।

এক সপ্তাহ আগেই আর্জেন্টিনার অধিনায়ক লিওনেল মেসি আলজেরিয়ার বিপক্ষে হ্যাটট্রিক করে পাঁচটি ভিন্ন বিশ্বকাপে গোল করার রেকর্ডে রোনালদোর পাশে পৌঁছেছিলেন। কিন্তু উজবেকিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচের ষষ্ঠ মিনিটে ডান পায়ের নিখুঁত শটে আবারও এককভাবে শীর্ষে উঠে যান রোনালদো।

এই রেকর্ড ভাঙা মেসির জন্য প্রায় অসম্ভব বলেই মনে করছেন অনেকেই। কারণ ২০২৬ বিশ্বকাপেই ৩৯ পেরোনো আর্জেন্টাইন কিংবদন্তিকে ২০৩০ বিশ্বকাপে খেলতে হবে, তারপর ২০৩৪ সাল পর্যন্ত ক্যারিয়ার টেনে নিয়ে গিয়ে গোল করতে হবে রোনালদোকে ছাড়িয়ে যেতে। বাস্তবতার বিচারে সেটি কল্পনামাত্র।

ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসরের সবচেয়ে কঠিন মঞ্চে, যেখানে এক মুহূর্তের ভুলেই স্বপ্ন শেষ হয়ে যায়, সেখানে ৪১ বছর বয়সেও তিনি গোল করে লিখলেন নতুন অধ্যায়।

Image

○ সবচেয়ে বয়সী খেলোয়াড় হিসেবে দুই বিশ্বকাপে ম্যান অব দ্য ম্যাচ

বিশ্বকাপে দুইবার ম্যাচসেরার পুরস্কার জেতার কীর্তিও গড়লেন এই বয়সে। অধিকাংশ ফুটবলার যখন অবসর নিয়ে কোচিং বা বিশ্লেষকের ভূমিকায় চলে যান, তখন রোনালদো এখনো মাঠে নেমে ম্যাচের ভাগ্য বদলে দিচ্ছেন।

○ গোলসংখ্যা

সংখ্যাগুলোও তাঁর অসাধারণ ধারাবাহিকতার সাক্ষী। ক্লাব ও জাতীয় দল মিলিয়ে ক্যারিয়ারে তাঁর গোলসংখ্যা এখন ৯৭৬। এত বছরের ক্যারিয়ার, এত অর্জন, এত ট্রফি—তবুও গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে দায়িত্ব নেওয়ার ক্ষুধা একটুও কমেনি। বরং চাপ যত বাড়ে, রোনালদো যেন ততই উজ্জ্বল হয়ে ওঠেন।

○ বিশ্বকাপের সবচেয়ে ধারাবাহিক গোলদাতা

বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক ভিন্ন আসরে গোল করার তালিকায় এখন এককভাবে শীর্ষে রোনালদো।

১. ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো — ৬ বিশ্বকাপ (২০০৬, ২০১০, ২০১৪, ২০১৮, ২০২২, ২০২৬)

২. লিওনেল মেসি — ৫ বিশ্বকাপ

৩. উভে জেলার — ৪ বিশ্বকাপ

৪. পেলে — ৪ বিশ্বকাপ

৫. মিরোশ্লাভ ক্লোসা — ৪ বিশ্বকাপ

রোনালদো হয়তো বিশ্বকাপে মোট গোলসংখ্যার বিচারে মেসির চেয়ে পিছিয়ে আছেন, কিন্তু প্রতি চার বছর অন্তর অন্তত একবার করে গোল করে যাওয়ার এই ধারাবাহিকতা সত্যিই অবিশ্বাস্য।

○ ইউসেবিওকেও ছাড়িয়ে গেলেন

উজবেকিস্তানের বিপক্ষে জোড়া গোলের আরেকটি বিশেষ তাৎপর্য ছিল। এই দুই গোলের মাধ্যমে বিশ্বকাপে রোনালদোর মোট গোলসংখ্যা দাঁড়ায় ১০। ফলে তিনি ছাড়িয়ে যান পর্তুগালের কিংবদন্তি ইউসেবিওকে, যিনি বিশ্বকাপে করেছিলেন ৯ গোল।

সবচেয়ে বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, ইউসেবিওর ৯টি গোলই এসেছিল ১৯৬৬ সালের এক বিশ্বকাপে। সেই আসরে তিনি ব্রাজিলকে বিদায় করার পাশাপাশি উত্তর কোরিয়ার বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে ০-৩ পিছিয়ে থাকা দলকে একাই টেনে তুলেছিলেন।

অন্যদিকে রোনালদোকে এই মাইলফলকে পৌঁছাতে খেলতে হয়েছে একাধিক বিশ্বকাপ জুড়ে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনিই এখন পর্তুগালের সর্বকালের সর্বোচ্চ বিশ্বকাপ গোলদাতা।

○ যে সিদ্ধান্তটি গোলের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ

তবে উজবেকিস্তানের বিপক্ষে রোনালদোর সবচেয়ে বড় অবদান হয়তো গোল নয়। ম্যাচের ১৬ মিনিটে পর্তুগাল বক্সের ঠিক বাইরে একটি বিপজ্জনক ফ্রি-কিক পায়। সবাই ধরে নিয়েছিল, বরাবরের মতো শট নেবেন রোনালদো। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে তিনি বল ছেড়ে দেন নুনো মেন্ডেসের জন্য। মেন্ডেস নিচু শটে গোল করে ব্যবধান দ্বিগুণ করেন।

এটি ছিল রোনালদোর এক ভিন্ন রূপ। কারণ আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে ফ্রি-কিক নেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর পরিসংখ্যান খুব একটা ভালো নয়। বিশ্বকাপ ও ইউরো মিলিয়ে তিনি ৬১টি সরাসরি ফ্রি-কিক নিয়েছেন, যার মধ্যে গোল এসেছে মাত্র একটিতে।

ম্যাচের দ্বিতীয়ার্ধে আরেকটি ফ্রি-কিকের সময়ও রোনালদো নিজে শট না নিয়ে বুদ্ধিদীপ্ত মুভমেন্ট করেন। ব্রুনো ফার্নান্দেসের পাস থেকে সুযোগ তৈরি হলেও গোলরক্ষক সেটি ঠেকিয়ে দেন।

○ নতুন এক রোনালদো?

বছরের পর বছর ধরে রোনালদোকে দেখা গেছে প্রতিটি মুহূর্ত নিজের কাঁধে তুলে নিতে। কিন্তু ২০২৬ বিশ্বকাপে যেন দেখা যাচ্ছে আরও পরিণত এক সংস্করণ—যিনি গোল করছেন, আবার প্রয়োজন হলে সতীর্থকেও আলোয় তুলে দিচ্ছেন।

যদি এই নিঃস্বার্থ মানসিকতা এবং গোলের ক্ষুধা একইসঙ্গে ধরে রাখতে পারেন, তাহলে পর্তুগাল শুধু একজন কিংবদন্তির বিদায়ী বিশ্বকাপই দেখবে না; দেখতে পারে শিরোপার সবচেয়ে শক্তিশালী দাবিদারদের একজনকেও।

অথচ অনেকেই ভেবেছিলেন, সময় হয়তো শেষ পর্যন্ত তাঁকে থামিয়ে দেবে। কিন্তু রোনালদো বারবার দেখিয়েছেন, তাঁর গল্প সাধারণ কোনো ফুটবলারের গল্প নয়। এটি এমন এক মানুষের গল্প, যিনি প্রতিটি মৌসুমে, প্রতিটি টুর্নামেন্টে এবং প্রতিটি সমালোচনার জবাব দিয়েছেন মাঠের পারফরম্যান্স দিয়ে। হয়তো এ কারণেই তাঁকে নিয়ে বারবার বলা হয়—"The Never Ending Story."

কারণ কিংবদন্তিরা শুধু ইতিহাস লেখেন না, তারা সময়কেও নতুন করে সংজ্ঞায়িত করেন। আর ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো এখনো—২০২৬ বিশ্বকাপেও সেই অসমাপ্ত গল্পের সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায় লিখে চলেছেন।

খেলার দেশ ডেস্ক

খেলার দেশ ডেস্ক

খেলাধুলার সব খবর ও বিশ্লেষণ সবার আগে পেতে চোখ রাখুন খেলারদেশে।

মন্তব্যসমূহ (0)

মন্তব্য করতে এবং আলোচনায় অংশ নিতে আপনার গুগল অ্যাকাউন্ট দিয়ে লগইন করুন।