খেলারদেশ

মেসির গল্প

যদি মেসি স্পেনের হয়ে খেলতেন?

আর্জেন্টিনা স্পেনের সাবেক উপনিবেশ হওয়ায় মেসির জন্য দ্বৈত নাগরিকত্ব পাওয়ার পথ খুলে যায়। নাগরিকত্ব পেলে তিনি চাইলে আর্জেন্টিনা কিংবা স্পেন—যে কোনো দেশের হয়ে খেলতে পারতেন।

যদি মেসি স্পেনের হয়ে খেলতেন?
খেলার দেশ ডেস্ক
By খেলার দেশ ডেস্ক

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬: বাংলাদেশ সময় সোমবার (২০ জুলাই) রাত ১টায় বিশ্বকাপ ফাইনালে আর্জেন্টিনা ও স্পেন মুখোমুখি হওয়ার পর আন্তর্জাতিক ফুটবলের সবচেয়ে আকর্ষণীয় ‘হতে পারত’ গল্পগুলোর একটি আবারও আলোচনায় এসেছে।

প্রশ্নটি সহজ, কিন্তু উত্তরটি অবিশ্বাস্য—লিওনেল মেসি কি সত্যিই আর্জেন্টিনার বদলে স্পেনের হয়ে খেলতে পারতেন? অন্য এক বাস্তবতায় কি মেসিকে মেটলাইফ স্টেডিয়ামে আকাশি-সাদা জার্সির বদলে স্পেনের লাল জার্সিতে দেখা যেত?

Image

রোজারিও থেকে বার্সেলোনা

আর্জেন্টিনার সান্তা ফে প্রদেশের রোজারিও শহরের এক সাধারণ শ্রমজীবী পরিবারে বেড়ে ওঠেন মেসি। পাথুরে খোলা মাঠ আর কাঁচা রাস্তায় বড় ভাই ও পাড়ার বন্ধুদের সঙ্গে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফুটবল খেলেই গড়ে ওঠে তার অসাধারণ দক্ষতা। শৈশবেই তার গ্রোথ হরমোন ডেফিসিয়েন্সি ধরা পড়ে। চিকিৎসার ব্যয় বহন করা পরিবারের পক্ষে সম্ভব ছিল না। তখনই এগিয়ে আসে বার্সেলোনা। ক্লাবটি শুধু মেসিকে দলে নেওয়ার প্রস্তাবই দেয়নি, তার গ্রোথ হরমোন চিকিৎসার খরচও বহন করতে রাজি হয়। মাত্র ১৩ বছর বয়সে মেসি পরিবার ছেড়ে স্পেনে পাড়ি জমান এবং যোগ দেন বার্সেলোনার বিখ্যাত যুব একাডেমি লা মাসিয়ায়।

স্পেনের হয়ে খেলার সুযোগ

স্পেনের নাগরিকত্ব আইনে একটি বিশেষ বিধান রয়েছে। স্পেনের সাবেক উপনিবেশভুক্ত দেশগুলোর নাগরিকরা টানা দুই বছর বৈধভাবে স্পেনে বসবাসের পর স্প্যানিশ নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করতে পারেন। সাধারণ বিদেশিদের ক্ষেত্রে এই সময়সীমা ১০ বছর। আর্জেন্টিনা স্পেনের সাবেক উপনিবেশ হওয়ায় মেসির জন্য দ্বৈত নাগরিকত্ব পাওয়ার পথ খুলে যায়। নাগরিকত্ব পেলে তিনি চাইলে আর্জেন্টিনা কিংবা স্পেন—যে কোনো দেশের হয়ে খেলতে পারতেন।

কিন্তু মেসির স্বপ্ন ছিল একটাই। স্পেনে যাওয়ার আগেই মেসি নিজের স্বপ্ন স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন। ২০০০ সালের সেপ্টেম্বরে রোজারিওর সংবাদপত্র ডাইরিও লা ক্যাপিতাল-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ১৩ বছর বয়সী মেসিকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, তার সবচেয়ে বড় স্বপ্ন কী। মেসির উত্তর ছিল সংক্ষিপ্ত: "আর্জেন্টিনার হয়ে খেলতে চাই।" আর্জেন্টিনার যুব দলে সুযোগ পাওয়ার প্রসঙ্গে তিনি বলেছিলেন, "ওদের হয়ে খেলতে পারলে খুবই ভালো লাগবে।"

তবু আর্জেন্টিনা তাকে ডাকেনি। অদ্ভুত হলেও সত্যি। বার্সেলোনার অন্যতম সেরা প্রতিভা হয়ে ওঠার পরও দীর্ঘ সময় আর্জেন্টিনার যুব দলের ডাক পাননি মেসি। তিনি বার্সেলোনার সেই বিখ্যাত প্রজন্মের অংশ ছিলেন, যেখানে বড় হয়েছেন—সেস্‌ ফাব্রেগাস, জেরার্ড পিকে, মার্ক ভালিয়েন্তে ও ভিক্টর ভাসকেস। এদের সবাই স্পেনের অনূর্ধ্ব-১৫ ও অনূর্ধ্ব-১৭ দলে খেলছিলেন।

কিন্তু বার্সেলোনায় থাকায় মেসি যেন আর্জেন্টিনার নির্বাচকদের নজরের বাইরে চলে যান। বার্সেলোনার সাবেক যুব কোচ অ্যালেক্স গার্সিয়া পরে ESPN-কে বলেন, "লিওর মতো একজন খেলোয়াড় কোনো জাতীয় দলের অংশ নয়—এটা স্বাভাবিক ছিল না।"

স্পেন নিজেই মেসিকে দলে টানতে চেয়েছিল

অবশেষে গার্সিয়াই স্পেনের অনূর্ধ্ব-১৭ দলের কোচ গিনেস মেলেন্দেস-কে বিষয়টি জানান। তিনি বলেন, "এখানে একজন আর্জেন্টাইন ছেলে আছে। তাকে কেউ ডাকছে না। হয়তো সে স্পেনের হয়ে খেলতে আগ্রহী হতে পারে।" মেলেন্দেস পরে স্বীকার করেন, ২০০৩ সালের অনূর্ধ্ব-১৭ বিশ্বকাপের আগে স্পেন সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছিল মেসিকে নিজেদের দলে আনতে। ESPN যখন তাকে জিজ্ঞেস করেছিল, মেসির মতো প্রতিভা পাওয়ার সম্ভাবনা শুনে তার প্রথম প্রতিক্রিয়া কী ছিল, হাসতে হাসতে তিনি বলেন, "জানি না... অপহরণ করে ফেলতে ইচ্ছে হচ্ছিল!" অবশ্য এটা নিছক রসিকতাই ছিল। স্পেন শুধু নিজেরা যোগাযোগই করেনি, মেসির বার্সেলোনা সতীর্থদেরও তাকে স্পেনের হয়ে খেলতে রাজি করানোর চেষ্টা করতে বলেছিল।

নড়েচড়ে বসে আর্জেন্টিনা। ঠিক সেই সময় আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের সহকারী কোচ ক্লদিও ভিভাস বার্সেলোনায় যান। সুযোগটি কাজে লাগিয়ে মেসির বাবা হোর্হে মেসি তার ছেলের ১২ মিনিটের একটি হাইলাইটস ভিডিও ভিভাসকে দেখান। সাংবাদিক গিয়েম বালাগের ‘মেসি’ বই অনুযায়ী, ভিডিওটিতে দেখা যায়—দুই বছর বড় প্রতিপক্ষদের বিপক্ষে সহজেই আধিপত্য বিস্তার করছেন কিশোর মেসি। ভিডিওটি দেখে মুগ্ধ হয়ে ভিভাস সঙ্গে সঙ্গেই আর্জেন্টিনার অনূর্ধ্ব-১৭ দলের কোচ হুগো তোকাল্লিকে ফোন করেন। তার সতর্কবার্তা ছিল,

এই সুযোগ হাতছাড়া করবেন না। স্পেন যে চাপ দিচ্ছে, তাতে দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে আমরা অসাধারণ একজন খেলোয়াড়কে হারাতে পারি।

তবু দেরি করেছিলেন তোকাল্লি। মেসিকে ২০০৩ অনূর্ধ্ব-১৭ বিশ্বকাপের দলে নেননি। পরে তিনি ব্যাখ্যা দেন, মেসির প্রতিভা নিয়ে তার কোনো সন্দেহ ছিল না। তবে তিনি আগে থেকেই গড়ে ওঠা দল ভাঙতে চাননি এবং যাদের দলে রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তাদের বাদ দেওয়াও ঠিক মনে করেননি।

তারপর, যা ঘটার তাই ঘটল। সেই অনূর্ধ্ব-১৭ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে স্পেন ৩-২ ব্যবধানে আর্জেন্টিনাকে হারায়। অতিরিক্ত সময়ের ১১৯তম মিনিটে জয়সূচক গোল করেন মেসির বার্সেলোনা সতীর্থ সেস্ ফাব্রেগাস।

ম্যাচ শেষে মেসিকে নিয়েই আলোচনা শুরু হয়। আর্জেন্টিনার কিংবদন্তি কোচ হোসে পেকারম্যান ২০২৫ সালে এক অনুষ্ঠানে স্মৃতিচারণ করে বলেন,

স্পেনের খেলোয়াড়রা করমর্দনের সময় আমাদের বলেছিল, 'এই ছেলেটা যদি তোমাদের দলে থাকত, তাহলে তোমরাই চ্যাম্পিয়ন হতে।'

২০০৫ সালে আর্জেন্টিনার অনূর্ধ্ব-২০ জাতীয় দলের হয়ে অবশেষে অভিষেক হওয়ার পর একটি ব্যক্তিগত ফটোসেশনে পোজ দিচ্ছেন লিওনেল মেসি

২০০৫ সালে আর্জেন্টিনার অনূর্ধ্ব-২০ জাতীয় দলের হয়ে অবশেষে অভিষেক হওয়ার পর একটি ব্যক্তিগত ফটোসেশনে পোজ দিচ্ছেন লিওনেল মেসি

শেষ পর্যন্ত আর্জেন্টিনা

এরপর আর দেরি করেনি আর্জেন্টিনা। ২০০৪ সালে মেসিকে অনূর্ধ্ব-২০ দলে ডাকা হয়। ২০০৫ সালে তিনি ফিফা অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপ জেতান এবং টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় ও সর্বোচ্চ গোলদাতা হন। একই বছর সিনিয়র জাতীয় দলেও অভিষেক হয় তার। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। মেসি আর্জেন্টিনার ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা ও সর্বাধিক ম্যাচ খেলা ফুটবলার হন। ২০২১ সালে কোপা আমেরিকা, ২০২২ সালে ফিনালিসিমা এবং ২০২২ বিশ্বকাপে দেশকে শিরোপা এনে দিয়ে আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারকে পূর্ণতা দেন।

অর্থাৎ, একসময় স্পেনের হয়ে খেলার সম্ভাবনা বাস্তব হলেও, মেসির হৃদয়ে সবসময় ছিল একটিই দেশ—আর্জেন্টিনা। আর শেষ পর্যন্ত ফুটবল ইতিহাসও সেই পথেই লেখা হয়েছে।

খেলার দেশ ডেস্ক

খেলার দেশ ডেস্ক

খেলাধুলার সব খবর ও বিশ্লেষণ সবার আগে পেতে চোখ রাখুন খেলারদেশে।

মন্তব্যসমূহ (0)

মন্তব্য করতে এবং আলোচনায় অংশ নিতে আপনার গুগল অ্যাকাউন্ট দিয়ে লগইন করুন।