খেলারদেশ

ফ্যাক্ট চেক

মেসি কি সত্যিই মায়ের দিক থেকে ব্রাজিলীয়?

নতুন গবেষণায় উঠে এলো চমকপ্রদ পারিবারিক ইতিহাস। মেসি কি সত্যিই মায়ের দিক থেকে ব্রাজিলীয়? ব্রাজিলের হয়ে খেলতে পারতেন তিনি? স্পেনের হয়ে খেলার সুযোগ ছিল। কিন্তু ব্রাজিলের চাইতে মেসির আদিপুরুষের শেকড় ও সম্পর্ক অন্য মহাদেশে।

মেসি কি সত্যিই মায়ের দিক থেকে ব্রাজিলীয়?
খেলার দেশ ডেস্ক
By খেলার দেশ ডেস্ক

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সম্প্রতি একটা দাবি বা খবর ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে—আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক লিওনেল মেসি নাকি মায়ের দিক থেকে ব্রাজিলিয়ান। অনেক খবর ইতোমধ্যে চোখে পড়বে যে, মেসি ব্রাজিলের হয়ে খেলতে পারতেন। এই তথ্য, সম্ভাবনা কতটা সঠিক?

খবরে ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই এমনকি দাবি করছেন যে, মেসির মা 'সেলিয়া মারিয়া কুচ্চিত্তিনি' ব্রাজিলে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তবে তথ্য-প্রমাণ বলছে, এই দাবি পুরোপুরি সঠিক নয়। সঠিক তথ্যটি হচ্ছে, মেসির মা ব্রাজিলিয়ান নন।

মায়ের সঙ্গে মেসি

মায়ের সঙ্গে মেসি

মেসির মা 'সেলিয়া মারিয়া কুচ্চিত্তিনি' জন্মগ্রহণ করেছেন আর্জেন্টিনার রোজারিও অঞ্চলে। অর্থাৎ জন্মসূত্রেই তিনি আর্জেন্টিনার নাগরিক। বেড়েও উঠেছেন সেখানেই। তাঁর ব্রাজিলিয়ান নাগরিকত্ব বা ব্রাজিলে জন্মগ্রহণের কোনো তথ্য বা জন্ম-নিবন্ধনের/সনদের কোনো প্রকার তথ্য-প্রমাণও নেই ব্রাজিলে।

এছাড়া ব্রাজিলে নাগরিকত্ব পাবার মতো মেসির দীর্ঘ বংশক্রম নেই। মেসির মায়ের পূর্বজ কেউ ব্রাজিলে থাকলেও, তার বা তাদের বসবাসকাল নাগরিকত্বের জন্য যথেষ্ট নয়। আসল তথ্য হচ্ছে, মেসির মায়ের পূর্বপুরুষ ব্রাজিলে স্রেফ একজন অভিবাসী হিসেবে ছিলেন। সেও মাত্র এক বছরের জন্য। এরপরও ব্রাজিলে সেই সময়কার নাগরিকত্ব আইনের কোনো সীমাবদ্ধতার ফাঁক ফোঁকর বের করে যদি মেসি ব্রাজিলের নাগরিকত্ব পেয়েও যেতেন, ব্রাজিল জাতীয় দলের হয়ে খেলতে পারতেন না। কারণ, ফিফা।

বাবা-মার সঙ্গে মেসি

বাবা-মার সঙ্গে মেসি

ফিফার কড়া নিয়মের কারণে প্রপিতামহের সূত্রের উপর ভিত্তি করে কোনো ফুটবলার সরাসরি জাতীয় দল পরিবর্তন করতে পারেন না। ফিফা ফুটবলারদের আন্তর্জাতিক দল নির্বাচনের ক্ষেত্রে বংশানুক্রমিক সংযোগের একটি নির্দিষ্ট সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছে। ফিফার 'জেনুইন লিংক' বা 'প্রকৃত সম্পর্কের নীতি' (ধারা-৭) অনুযায়ী, কোনো খেলোয়াড় যদি তার নিজের জন্মভূমির বাইরে অন্য কোনো দেশের জাতীয় দলের হয়ে খেলতে চান, তবে তাকে নিচের ৪টি শর্তের অন্তত একটি পূরণ করতে হবে—

১। খেলোয়াড় নিজে যদি সেই দেশের ভূখণ্ডে জন্মগ্রহণ করে থাকেন।

২। খেলোয়াড়ের আপন বাবা অথবা মা বা দুজনই যদি সেই দেশে জন্মগ্রহণ করে থাকেন।

৩। খেলোয়াড়ের দাদা, দাদি অথবা নানা, নানির কেউ যদি সেই দেশে জন্মে থাকেন (এটাই বিখ্যাত 'গ্র্যান্ডফাদার রুল')।

৪। খেলোয়াড় ১৮ বছর বয়স হওয়ার পর সেই দেশে টানা অন্তত ৫ বছর স্থায়ীভাবে বসবাস করেছেন।

মেসির ব্রাজিল দলের হয়ে খেলার সম্ভাবনা সংক্রান্ত ছড়ানো সংবাদগুলো মূলত অপতথ্য। ব্যাখ্যায় আসি। প্রথমত, মেসির বংশক্রমের সীমা। মেসির সঙ্গে ব্রাজিলের সংযোগটি ছিল তার প্রপিতামহ (মায়ের দাদার বাবা) ফেদেরিকো কুচ্চিত্তিনির মাধ্যমে। ফিফার নিয়ম যেহেতু সর্বোচ্চ দাদা-দাদি বা নানা-নানি পর্যন্ত সীমাবদ্ধ। ফলে এত দূরবর্তী সম্পর্কের সূত্রে মেসি কখনোই ব্রাজিলের হয়ে খেলার যোগ্য হতেন না।

তবে স্পেনের হয়ে খেলতে পারতেন। মেসি মাত্র ১৩ বছর বয়সে স্পেনে চলে যান এবং সেখানে দীর্ঘ সময় বসবাস করার পর ২০০৫ সালে স্পেনের নাগরিকত্ব ও পাসপোর্ট পান। তিনি স্পেনের ৫ বছরের বসবাসের শর্তও পূরণ করেছিলেন। ফলে স্প্যানিশ ফুটবল ফেডারেশন তাকে স্পেন অনূর্ধ্ব-১৭ ও মূল জাতীয় দলে খেলার আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দিতে পেরেছিল। স্পষ্ট করে বললে, মেসি স্পেনের হয়ে খেলতে পারতেন কারণ তিনি সেখানে সশরীরে বসবাস করে নাগরিকত্ব পেয়েছিলেন। কিন্তু ব্রাজিলের ক্ষেত্রে শুধু রক্তের দূরবর্তী সম্পর্কের কারণে সেটি কখনোই সম্ভব ছিল না।

এই সংবাদের উৎস কী? মেসির মায়ের সঙ্গে ব্রাজিলের সঙ্গে সম্পর্ক কোথায় জোড়ালো বলে দাবি করা হচ্ছে? সম্প্রতি ইতালীয় বংশতালিকা গবেষক 'ফিওরেঞ্জো সান্তিনি'র দীর্ঘ এক গবেষণাপত্রে নতুন এক তথ্য সামনে এসেছে। তাঁর গবেষণা অনুযায়ী, মেসির মায়ের দিকের প্রপিতামহ 'ফেদেরিকো কুচ্চিত্তিনি' ১৯০৪ সালের ২৭ জানুয়ারি ব্রাজিলের সাও পাওলো অঙ্গরাজ্যের রিবেইরাঁও প্রেতো শহরে জন্মগ্রহণ করেছিলেন।

ইতালীয় বংশতালিকা গবেষক, ফিওরেঞ্জো সান্তিনি

ইতালীয় বংশতালিকা গবেষক, ফিওরেঞ্জো সান্তিনি

গবেষণায় দাবি করা হয়, মেসির মাতৃবংশের পূর্বপুরুষরা মূলত ইতালির সান সেভেরিনো মার্কে অঞ্চলের বাসিন্দা ছিলেন। উনিশ শতকের শেষ দিকে পরিবারটি ইতালি থেকে ব্রাজিলে অভিবাসন করেন। এরপর সাও পাওলোর কফি বাগানে কাজ শুরু করেন। ব্রাজিলে অবস্থানকালে পরিবারে জন্ম নেন আরদেরিগো কোকেত্তিনি। পরবর্তীতে সরকারি নথিভুক্তির সময় তাঁর নাম পরিবর্তিত হয়ে ফেদেরিকো কুচ্চিত্তিনি হয়ে যায়। একই সঙ্গে পারিবারিক পদবিও কোকেত্তিনি থেকে পরিবর্তিত হয়ে কুচ্চিত্তিনি রূপ নেয়। এই পদবিই পরবর্তীতে মেসির মায়ের পরিবার বহন করে।

গবেষণা অনুযায়ী, ফেদেরিকোর জন্মের প্রায় এক বছর পর পুরো পরিবার ব্রাজিল ছেড়ে আর্জেন্টিনায় চলে যায়। ১৯০৫ সালে তারা রোজারিও অঞ্চলে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে। সেখানেই পরে জন্ম নেন মেসির মাতামহ আন্তোনিও কুচ্চিত্তিনি। এরপর জন্মগ্রহণ করেন সেলিয়া মারিয়া কুচ্চিত্তিনি। এবং বহু বছর পরে ১৯৮৭ সালের ২৪ জুন জন্ম নেন লিওনেল আন্দ্রেস মেসি।

এই তথ্য এতদিন কেন জানা যায়নি?

গবেষক সান্তিনির ভাষ্য অনুযায়ী, কুচ্চিত্তিনি পদবির কোনো রেকর্ড ইতালিতে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। পরে মেসির মায়ের এক আত্মীয়ের দেওয়া নথি থেকে জানা যায়, ব্রাজিলে আসার পরই পরিবারের নাম ও পদবিতে পরিবর্তন আনা হয়েছিল। এই তথ্যের ভিত্তিতেই পুরো মাতৃবংশের ইতিহাস পুনর্গঠন করা সম্ভব হয়।

তাহলে কি মেসিকে ব্রাজিলিয়ান বংশোদ্ভূত বলা যায়?

এর উত্তর কিছুটা সূক্ষ্ম। মেসির মা ব্রাজিলিয়ান নন এবং তাঁর জন্মও আর্জেন্টিনায়। তবে নতুন গবেষণা অনুযায়ী, তাঁর মাতৃবংশের যিনি সম্পর্কে প্রপিতামহ লাগেন, তিনি ব্রাজিলে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। অর্থাৎ মেসির পারিবারিক ইতিহাসে ব্রাজিলের একটি অধ্যায় রয়েছে এটা সত্য। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে তিনি বা তাঁর মা ব্রাজিলিয়ান।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত "মেসি মায়ের দিক থেকে ব্রাজিলিয়ান"—এই বক্তব্যটি তাই পুরোপুরি সঠিক নয়। সঠিক তথ্য হলো, মেসির মা আর্জেন্টিনার নাগরিক। কিন্তু তাঁর মাতৃবংশের এক প্রপিতামহের জন্ম হয়েছিল ব্রাজিলে। ইতালি থেকে স্রেফ অভিবাসী হওয়া একটি পরিবারের সন্তান হিসেবে জন্ম সেই প্রপিতামহের। ফলে মেসির পারিবারিক শেকড়ে ইতালি, ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা—তিন দেশেরই ঐতিহাসিক সংযোগ রয়েছে, এটা সত্য।

তবে মেসি ব্রাজিলিয়ান বংশোদ্ভূত—এটা দাবি করা অমূলক। অর্থাৎ মেসির মাতৃবংশে ব্রাজিলের একটি ঐতিহাসিক যোগসূত্র রয়েছে। কিন্তু তাঁর মা বা তিনি নিজে ব্রাজিলীয় নন; না মেসির দাদা-দাদি-নানা-নানি ব্রাজিলীয়।

Image

শেষ কথা, মেসি কি ব্রাজিলের হয়ে খেলতে পারতেন?

তাত্ত্বিকভাবে উত্তর, হ্যাঁ;—তবে জটিল শর্তসাপেক্ষের বাস্তবতায়, না। যেহেতু নতুন গবেষণা অনুযায়ী মেসির মাতৃবংশের এক প্রপিতামহ ব্রাজিলে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তাই ব্রাজিলের নাগরিকত্ব আইনের আওতায় তিনি বংশসূত্রে নাগরিকত্বের জন্য যোগ্য হতে পারেন কি না, তা নির্ভর করে প্রজন্মভিত্তিক নাগরিকত্বের ধারাবাহিকতা এবং সংশ্লিষ্ট সময়ের আইনের ওপর।

আইন অনুযায়ী, ১৮৯১ সালের সংবিধানের ৬৯ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ব্রাজিলের মাটিতে জন্মগ্রহণকারী যেকোনো ব্যক্তি ব্রাজিলের নাগরিক হিসেবে গণ্য হতেন, যদি না তার পিতা বিদেশী এবং অন্য দেশের সরকারি দায়িত্বে নিয়োজিত থাকতেন। অর্থাৎ, ১৯০০ সালেও ব্রাজিলে জন্ম নেওয়া যেকোনো শিশু সরাসরি নাগরিকত্ব পেত।

তবে আইন এও বলছে, শুধু একজন প্রপিতামহ ব্রাজিলে জন্মগ্রহণ করলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে ব্রাজিলের হয়ে খেলার অধিকার তৈরি হয় না। প্রথমে বৈধভাবে ব্রাজিলের নাগরিকত্ব অর্জন করতে হতো। তারপরই ফিফার যোগ্যতার শর্ত পূরণ করা সম্ভব হতো।

Image

মেসির বরং ইতালির হয়ে খেলার সম্ভাবনা আরও বেশি ছিল। এ নিয়ে গবেষণা ও খবর অনেকেই হয়ত জানেন। মেসির মাতৃবংশের শেকড় ইতালিতে। ইতালির নাগরিকত্ব আইন (রক্তসূত্রে নাগরিকত্ব)-এর ওপর ভিত্তি করে তৈরি বলে, অনেক ইতালীয় বংশোদ্ভূত ব্যক্তি প্রজন্ম পেরিয়েও ইতালির নাগরিকত্ব দাবি করতে পারেন, যদি বংশধারায় নাগরিকত্বের অধিকার হারিয়ে না যায়। অর্থাৎ ইতালিতে মেসির পূর্বপুরুষদের নাগরিকত্ব এখনো আছে কিনা—তার উপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হতে পারত মেসি ইতালির নাগরিকত্ব নিতে পারবেন কিনা।

মেসির ইতালির হয়ে খেলার সুযোগই বেশি ছিল, কীভাবে? কারণ এরকম উদাহরণ অনেক পাবেন—'পূর্বপুরুষদের নাগরিকত্ব এখনো আছে কিনা'র তথ্য যাচাইয়ের ইতিবাচক ফলাফলের উপর ভিত্তি করেই আর্জেন্টিনা, উরুগুয়ে ও ব্রাজিলের বহু ফুটবলার ইতালির নাগরিকত্ব পেয়েছেন, পাচ্ছেন।

Image

পরের পোস্টে বিখ্যাত 'গ্র্যান্ডফাদার রুল' নিয়ে আলোচনা করা হবে...

খেলার দেশ ডেস্ক

খেলার দেশ ডেস্ক

খেলাধুলার সব খবর ও বিশ্লেষণ সবার আগে পেতে চোখ রাখুন খেলারদেশে।

মন্তব্যসমূহ (0)

মন্তব্য করতে এবং আলোচনায় অংশ নিতে আপনার গুগল অ্যাকাউন্ট দিয়ে লগইন করুন।