খেলারদেশ

ইতালি ফুটবল

আবারও ইতালির কোচ মানচিনি

গার্দিওলা থেকে পিরলো, শেষে আবার মানচিনি—ইতালির কোচ নিয়োগের নাটকীয় গল্প

আবারও ইতালির কোচ মানচিনি

শেষমেশ ইতালির কোচ মানচিনি

খেলার দেশ ডেস্ক
By খেলার দেশ ডেস্ক

২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালে ফুটবল বিশ্বের প্রায় সব কিংবদন্তিই উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু সেখানে ছিলেন না ইতালির কিংবদন্তি অধিনায়ক পাওলো মালদিনি। কারণ, তিনি তখন বার্সেলোনায়—একটি বিশেষ মিশনে। লক্ষ্য ছিল, পেপ গার্দিওলাকে ইতালি জাতীয় দলের কোচ হিসেবে রাজি করানো।

টানা তিনটি বিশ্বকাপে খেলতে ব্যর্থ হওয়ার পর ইতালিয়ান ফুটবল ফেডারেশন (এফআইজিসি) জাতীয় দলকে নতুনভাবে গড়ে তুলতে চেয়েছিল। সেই দায়িত্বই দেওয়া হয় মালদিনির কাঁধে। কিন্তু গার্দিওলা, কার্লো আনচেলত্তি ও আন্দ্রেয়া পিরলো—সব চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর শেষ পর্যন্ত নাটকীয়ভাবে আবার ইতালির কোচ হন রবার্তো মানচিনি।

২০২৬ বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার কাছে ১-০ গোলে হেরে ইতালি টানা তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ হারায়। ক্ষুব্ধ সমর্থকদের চাপের মুখে ইতালিয়ান ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি গাব্রিয়েলে গ্রাভিনা পদত্যাগ করেন। তার জায়গায় নির্বাচিত হন ইতালির অলিম্পিক কমিটির সাবেক সভাপতি জিওভান্নি মালাগো। দায়িত্ব নিয়েই তিনি জাতীয় দল পুনর্গঠনের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে পাওলো মালদিনিকে টেকনিক্যাল ডিরেক্টর নিয়োগ দেন। মালদিনির উপদেষ্টা হিসেবে যোগ দেন তার সাবেক এসি মিলান সতীর্থ লিওনার্দো।

মালদিনির প্রথম ফোনটি যায় তার সাবেক কোচ কার্লো আনচেলত্তির কাছে। বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ব্রাজিল নরওয়ের কাছে বিদায় নেওয়ার পর আনচেলত্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে জল্পনা তৈরি হয়েছিল। মালদিনি ভেবেছিলেন, এই সুযোগে হয়তো ইতালিতে ফিরবেন কিংবদন্তি কোচ। কিন্তু আনচেলত্তি সেই প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়ে ব্রাজিলের সঙ্গেই থাকার সিদ্ধান্ত নেন।

আনচেলত্তির পর মালদিনির লক্ষ্য হন পেপ গার্দিওলা। ম্যানচেস্টার সিটি ছাড়ার পর গার্দিওলাকে ইতালির ইতিহাসের সর্বোচ্চ বেতনের জাতীয় দলের কোচ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়। এমনকি তাকে বার্সেলোনায় বসবাস চালিয়ে যাওয়া এবং শুধু আন্তর্জাতিক বিরতির সময় কাজ করার স্বাধীনতাও দেওয়ার প্রস্তাব ছিল। তবুও গার্দিওলা রাজি হননি।

দুই বড় নামকে না পেয়ে মালদিনি যোগাযোগ করেন তার সাবেক সতীর্থ আন্দ্রেয়া পিরলোর সঙ্গে। বর্তমানে দুবাই ইউনাইটেডের কোচ পিরলো ইতালির হয়ে বিশ্বকাপ জিতেছেন এবং কোচ হিসেবেও অভিজ্ঞতা রয়েছে। ২৬ জুলাই পর্যন্ত পরিস্থিতি এমন ছিল যে, তার নিয়োগ প্রায় নিশ্চিত বলেই ধরা হচ্ছিল। কিন্তু শেষ মুহূর্তে সবকিছু বদলে যায়।

ইতালিয়ান ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি মালাগো পিরলোর নিয়োগে ভেটো দেন। কারণ, ২০২৫ সাল থেকে পিরলো রাশিয়ান বেটিং কোম্পানি ফনবেটের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর ছিলেন। এছাড়া সাবেক রুশ ফুটবলার আর্তেম জিউবার বিদায়ী ম্যাচেও অংশ নিয়েছিলেন, যেখানে ফনবেট ছিল অন্যতম অংশীদার। মালাগোর মতে, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইতালি সরকারের অবস্থানের সঙ্গে এমন বাণিজ্যিক সম্পর্ক সাংঘর্ষিক হতে পারে। তাই তিনি নিয়োগ প্রক্রিয়া থামিয়ে দেন।

অন্যদিকে পিরলো দাবি করেন, এটি ছিল শুধুই একটি বাণিজ্যিক চুক্তি, এর সঙ্গে কোনো রাজনৈতিক অবস্থানের সম্পর্ক নেই। পিরলোর নিয়োগ বাতিল হওয়ায় নিজের কর্তৃত্ব ক্ষুণ্ণ হয়েছে বলে মনে করেন পাওলো মালদিনি। তিনি টেকনিক্যাল ডিরেক্টরের পদ থেকে পদত্যাগ করেন। এরপর মালাগো নিজেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ইতালির কোচ হিসেবে নিয়োগ দেন রোবের্তো মানচিনিকে।

এটি মানচিনির দ্বিতীয় অধ্যায়। ২০১৮ সালে বিশ্বকাপে ব্যর্থতার পর ইতালির দায়িত্ব নিয়ে তিনি দলকে ২০২০ ইউরো (২০২১ সালে অনুষ্ঠিত) শিরোপা জিতিয়েছিলেন। তবে ২০২৩ সালে ফেডারেশনের সঙ্গে মতবিরোধের জেরে পদত্যাগ করেন। মাত্র দুই সপ্তাহের নাটকীয় ঘটনাপ্রবাহ শেষে ইতালি আবার ফিরে যায় পরিচিত এক মুখের কাছেই।

ঘটনাপঞ্জি— ৩১ মার্চ: বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার কাছে হেরে টানা তৃতীয়বার বিশ্বকাপে উঠতে ব্যর্থ হয় ইতালি। ২ এপ্রিল: সভাপতি গাব্রিয়েলে গ্রাভিনা পদত্যাগ করেন। ২২ জুন: জিওভান্নি মালাগো নতুন সভাপতি নির্বাচিত হন। ১১ জুলাই: পাওলো মালদিনি টেকনিক্যাল ডিরেক্টর নিযুক্ত হন। জুলাইয়ের মাঝামাঝি: কার্লো আনচেলত্তিকে প্রস্তাব দেওয়া হলেও তিনি ব্রাজিলেই থেকে যান। ২০ জুলাই: বার্সেলোনায় পেপ গার্দিওলার সঙ্গে বৈঠক করেন মালদিনি। ২১–২৪ জুলাই: গার্দিওলা প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। ২৫–২৬ জুলাই: আন্দ্রেয়া পিরলোর সঙ্গে সমঝোতা হয়। ২৭ জুলাই: রুশ বেটিং প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পর্কের কারণে মালাগো পিরলোর নিয়োগ আটকে দেন। মালদিনি পদত্যাগ করেন। ২৮ জুলাই: রোবের্তো মানচিনিকে ইতালির নতুন প্রধান কোচ হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।

ইতালিয়ান ফুটবলের এই অধ্যায় দেখিয়ে দিল, জাতীয় দলের কোচ নিয়োগ শুধু ফুটবলীয় সিদ্ধান্ত নয়; অনেক সময় রাজনীতি, প্রশাসনিক ক্ষমতার লড়াই এবং আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিও বড় ভূমিকা রাখে। শেষ পর্যন্ত গার্দিওলা বা পিরলো নন, ইতালির আস্থার প্রতীক হয়ে আবারও ফিরলেন মানচিনি।

খেলার দেশ ডেস্ক

খেলার দেশ ডেস্ক

খেলাধুলার সব খবর ও বিশ্লেষণ সবার আগে পেতে চোখ রাখুন খেলারদেশে।

মন্তব্যসমূহ (0)

মন্তব্য করতে এবং আলোচনায় অংশ নিতে আপনার গুগল অ্যাকাউন্ট দিয়ে লগইন করুন।