খেলারদেশ

বিশ্লেষণ

দুইবার এগিয়েও জয় বঞ্চিত, ইউনাইটেডের সমস্যা কি?

দুইবার এগিয়েও জয় বঞ্চিত, ইউনাইটেডের সমস্যা কি?
খেলার দেশ ডেস্ক
By খেলার দেশ ডেস্ক

রবিবার এভারটনের বিপক্ষে শেষ মুহূর্তের গোল বদলে দিল ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের পুরো গল্প। এভারটনের বিপক্ষে ২–২ ড্রকে রেড ডেভিলদের জন্য দুর্ভাগ্য বলা সহজ। ৮৮ মিনিটে বেঞ্জামিন সেসকোর হেডে ২–১ ব্যবধানে এগিয়ে যাওয়ার পর মনে হচ্ছিল, অ্যাওয়ে ম্যাচ থেকে পূর্ণ তিন পয়েন্ট নিয়েই ফিরবে মাইকেল ক্যারিকের দল। অতিরিক্ত সময়ের ষষ্ঠ মিনিটে আইন্সলি মেইটল্যান্ড-নাইলসের দুর্দান্ত দূরপাল্লার শটে সব হিসাব বদলে যায়। এই ড্রয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো-ইউনাইটেডের আক্রমণভাগ যতটা আশাবাদ জাগিয়েছে, রক্ষণভাগ ততটাই প্রশ্ন তুলেছে ততটাই।

আক্রমণে উন্নতি, কিন্তু ম্যাচ নিয়ন্ত্রণে ঘাটতি

ম্যাচের প্রথমার্ধ ছিল তুলনামূলক স্লো, এই সময়ে সুযোগও তৈরি হয়েছে কম। তবে বিরতির পর ইউনাইটেড দ্রুত ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নেয়। দ্বিতীয়ার্ধ শুরুর এক মিনিটের মধ্যেই ব্রায়ান এমবুমো দুই ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে ভেতরে ঢুকে নিচু শটে গোল করেন। যা পুরোটাই ব্যক্তিগত দক্ষতা ও আক্রমণাত্মক ভাবের চমৎকার উদাহরণ।

ম্যাচের আগে থেকেই ইউনাইটেডের আক্রমণভাগ নিয়ে পরিসংখ্যানগুলো আশাবাদীই করেছে। মৌসুমের প্রথম দুই লিগ ম্যাচে তারা ৫৪টি শট নিয়েছিল, প্রতিপক্ষের বক্সে বল স্পর্শ করেছিল ৮৫ বার এবং তৈরি করেছিল ৩৯টি সুযোগ—তিনটিই লিগের শীর্ষস্থানীয় সংখ্যা। একই সময়ে তাদের প্রত্যাশিত গোল ছিল ৫.৭৩। অর্থাৎ সমস্যা যে শুধু সুযোগ তৈরি করতে না পারা—তা নয়। বরং ইউনাইটেড এখন নিয়মিত প্রতিপক্ষের ডিফেন্সিভ জোনে বল নিয়ে যেতে পারছে নিয়মিত। প্রশ্ন হচ্ছে, সেই আক্রমণাত্মক আধিপত্যকে কীভাবে ৯০ মিনিটের নিয়ন্ত্রিত পারফরম্যান্সে পরিণত করা যায়?

Image

লেফট উইংয়ে ইউনাইটেডের সবচেয়ে বড় সুবিধা

ম্যাচের খুব গুরুত্বপূর্ণ ট্যাটকিক্যাল দিক ছিল ইউনাইটেডের লেফট উইং দিয়ে আক্রমণ তৈরি করা। এভারটনের রক্ষণে পরিবর্তিত রাইট-ব্যাক হিসেবে খেলতে থাকা মার্লিন রোহলের দিক দিয়ে ইউনাইটেড বেশ কয়েকবার জায়গা তৈরি করে। লুক শ ও মার্কাস রাশফোর্ড সেই জায়গাকে কাজে লাগিয়ে আক্রমণ তৈরি করেন। একটি আক্রমণে শয়ের ক্রস থেকে এমবুমোর হেডে বল আসে ব্রুনো ফার্নান্দেসের কাছে; তার ভলি ক্রসবারে লাগে। আরেকটি আক্রমণে রাশফোর্ড নিচু বল পাঠালেও মাতেউস কুনহা সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পারেননি। এখানে ইউনাইটেডের আক্রমণের একটি ইতিবাচক ছবি স্পষ্ট—তারা এখন শুধু ব্রুনোর ওপর নির্ভর করছে না। এমবুমোর ডান দিক থেকে ভেতরে ঢোকা, রাশফোর্ডের বাম প্রান্তের গতি এবং শয়ের ওভারল্যাপ মিলিয়ে আক্রমণের একাধিক রাস্তা তৈরি হচ্ছে। কিন্তু সুযোগ তৈরি করা এবং ম্যাচ শেষ করে আসা—দুটি ভিন্ন বিষয়।

সেসকোর ফেরাতেই গোল

ম্যাচের সবচেয়ে পজেটিভ ইন্ডিভিজ্যুয়াল ঘটনা সম্ভবত বেঞ্জামিন সেসকোর গোল। চোট ও ফিটনেস সমস্যার কারণে প্রি-মৌসুমের বড় অংশ বসে থাকার পর ধীরে ধীরে ম্যাচের ছন্দে ফিরছেন। এভারটনের বিপক্ষে বদলি হিসেবে নেমে ৮৮ মিনিটে লুক শয়ের নিখুঁত ক্রস থেকে হেডে গোল করেন তিনি। সেসকোর জন্য গোলটি গুরুত্বপূর্ণ ছিল শুধু স্কোরলাইনের জন্যে নয়। এটি দেখিয়েছে, বক্সের ভেতরে একজন প্রকৃত ফিনিশারের উপস্থিতি ইউনাইটেডের আক্রমণকে কতটা কার্যকর করতে পারে।

Image

তার নিজের মতে অবশ্য হতাশার পাশাপাশি ভালো কিছুও ছিল। ম্যাচ শেষে তিনি স্বীকার করেছেন, শেষ মুহূর্তে গোল হজম করা খুবই যন্ত্রণাদায়ক ছিলো; তবে একই সঙ্গে তিনি নিজের গোল এবং দলের পারফরম্যান্সের ইতিবাচক দিকগুলো ধরে রাখার ওপর জোর দিয়েছেন।

এখন প্রশ্ন হলো—সেসকো কি পরবর্তী ম্যাচে শুরু থেকেই খেলবেন? তার ফিটনেস যদি পুরোপুরি ফিরে আসে, তাহলে কুনহাকে একা স্ট্রাইকার হিসেবে খেলানোর তুলনায় ইউনাইটেডের আক্রমণে আরও বেশি গভীরতা ও বক্স-প্রেজেন্স পাওয়া যেতে পারে।

ক্যারিকের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ রক্ষণ

ইউনাইটেডের জন্য সবচেয়ে অস্বস্তিকর পরিসংখ্যান হলো—লিগ মৌসুমের প্রথম তিন ম্যাচেই তারা অন্তত দুই গোল করে হজম করেছে। গত ৫০ বছরে এমন ঘটনা মাত্র দ্বিতীয়বার ঘটল; এর আগে ২০২০–২১ মৌসুমে এমন হয়েছিল। এটি অস্বাভাবিক কোনো ঘটনা নয়, যেন নিয়মিত চিত্র-আর তাই সবচেয়ে বাজে দিক।

এভারটনের প্রথম গোলটির দিকে তাকালেই বিষয়টি বোঝা যায়। ৮৩ মিনিটে হেইডেন হ্যাকনির পাস থেকে টাইরিক জর্জ ডানদিকের বক্সে প্রায় অরক্ষিত অবস্থায় বল পান এবং শক্তিশালী ফিনিশে গোল করেন।

এরপরও ইউনাইটেড ম্যাচটি জিততে পারত। সেসকো গোল করে আবার এগিয়ে দেন দলকে। কিন্তু ম্যাচের শেষ মুহূর্তে নুসাইর মাজরাউইয়ের ছোট ক্লিয়ারেন্স থেকে বল পেয়ে মেইটল্যান্ড-নাইলস প্রায় ৩৫ গজ দূর থেকে অসাধারণ শটে গোল করেন। এখানে দুর্ভাগ্য বলা গেলেও সেরা কোনো ফুটবল দলের ক্ষেত্রে শেষ মুহূর্তে বল ক্লিয়ার করার সিদ্ধান্ত, দ্বিতীয় বলের জন্য অবস্থান এবং বক্সের বাইরে প্রতিপক্ষের শুটারকে নিয়ন্ত্রণ—সবকিছুই গুরুত্বপূর্ণ।

এভারটনের মানসিক শক্তিই বড় গল্প

এভারটনের পারফরম্যান্সকে শুধু ইউনাইটেডের ভুল দিয়ে ব্যাখ্যা করলেও ম্যাচটির প্রকৃত চিত্র পাওয়া যাবে না। ডেভিড ময়েসের দল দুইবার পিছিয়ে পড়েও ম্যাচে ফিরে এসেছে। মোট ১৮টি শট নিয়েছে, যার ছয়টি ছিল টার্গেটে। বিশেষ করে টাইরিক জর্জের গোলটি এভারটনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ২০ বছর ২১৪ দিন বয়সে গোল করে তিনি ২০২১ সালের পর এভারটনের সর্বকনিষ্ঠ লিগ গোলদাতা হন। আর মেইটল্যান্ড-নাইলসের গোলটি ছিল ক্লাবের হয়ে তার প্রিমিয়ার লিগ অভিষেকে গোল—এবং ৯৫:১১ মিনিটে সেটি ছিল হিল ডিকিনসন স্টেডিয়ামে এভারটনের সবচেয়ে দেরিতে করা প্রিমিয়ার লিগ গোল। অর্থাৎ এভারটন এই ম্যাচে শুধু সুযোগের জোরে নয়, চাপ সামলে শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাওয়ার মানসিকতার জোরেও এক পয়েন্ট অর্জন করেছে।

ইউনাইটেডের জন্য আসল শিক্ষা কী?

এই ম্যাচের পর ইউনাইটেডকে দুটো বিপরীত সত্য একই সঙ্গে মেনে নিতে হবে। প্রথমত, আক্রমণে তারা আগের চেয়ে অনেক বেশি প্রাণবন্ত। এমবুমো, রাশফোর্ড, ব্রুনো, শ এবং এখন সেসকো- সব মিলিয়ে আক্রমণে বৈচিত্র্য তৈরি হচ্ছে। সুযোগ সৃষ্টির পরিমাণও তার প্রমাণ। দ্বিতীয়ত, এই আক্রমণাত্মক শক্তির সঙ্গে রক্ষণাত্মক স্থিরতা এখনো তাল মেলাতে পারেনি। ক্যারিকের জন্য সবচেয়ে জরুরি কাজ তাই শুধু আরও গোল করা নয়; বরং ম্যাচের শেষ ১০ মিনিট কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়, সেটি নিশ্চিত করা। একটি দল ৮৮ মিনিটে ২–১ এগিয়ে থাকার পর ম্যাচ জিততে না পারলে সেটিকে শুধুই দুর্ভাগ্য বলা যায় না। বিশেষ করে যদি একই দল মৌসুমের প্রথম তিন ম্যাচেই ছয় গোল হজম করে।

খেলার দেশ ডেস্ক

খেলার দেশ ডেস্ক

খেলাধুলার সব খবর ও বিশ্লেষণ সবার আগে পেতে চোখ রাখুন খেলারদেশে।

সম্পর্কিত আরও খবর

এই বিভাগের সব খবর →

মন্তব্যসমূহ (0)

মন্তব্য করতে এবং আলোচনায় অংশ নিতে আপনার গুগল অ্যাকাউন্ট দিয়ে লগইন করুন।