কঙ্গো স্ট্রাইকার উইসার উপর অ্যাসিড হামলা
বিশ্বকাপের শেষ ৩২-এর ম্যাচে ইংল্যান্ডের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারেন ডিআর কঙ্গোর স্ট্রাইকার ইয়োয়ানে উইসা। এবারের আসরে দুর্দান্ত ফর্মে থাকা ২৯ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ডের গল্প শুধু ফুটবলের না—মৃত্যুঝুঁকি, নিষ্ঠুর হামলা এবং অবিশ্বাস্য কামব্যাকের গল্প।

বিশ্বকাপ ফুটবলে ইতিহাস গড়া ডিআর কঙ্গো
বিশ্বকাপের শেষ ৩২-এর ম্যাচে ইংল্যান্ডের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারেন ডিআর কঙ্গোর স্ট্রাইকার ইয়োয়ানে উইসা। এবারের আসরে দুর্দান্ত ফর্মে থাকা ২৯ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ডের গল্প শুধু ফুটবলের না—মৃত্যুঝুঁকি, নিষ্ঠুর হামলা এবং অবিশ্বাস্য কামব্যাকের গল্প।
এবার, ২০২৬ বিশ্বকাপে ইতিহাস গড়েছে ডিআর কঙ্গো। কঠিন গ্রুপ 'কে' থেকে চার পয়েন্ট নিয়ে নকআউট পর্বে জায়গা করে নিয়েছে দলটি। প্রথম ম্যাচে পর্তুগালের বিপক্ষে ১-১ ড্রয়ে সমতা ফেরানো গোলটি করেছিলেন উইসা।
এরপর কলম্বিয়ার কাছে ১-০ গোলে হারলেও শেষ ম্যাচে উজবেকিস্তানের বিপক্ষে ৩-১ জয়ে জোড়া গোল করে দলকে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে তুলেছেন তিনিই।

ডিআর কঙ্গোর স্ট্রাইকার ইয়োয়ানে উইসা, গোল সেলিব্রেশন
এর আগে ১৯৭৪ সালে, কঙ্গোর পূর্বনাম ছিল, 'জায়ার।' সেই নামে মাত্র একবার বিশ্বকাপে খেলেছিল দেশটি। তাই এবারের অর্জন ডিআর কঙ্গোর ফুটবল ইতিহাসে নতুন এক অধ্যায়।
কিন্তু আজ যে উইসা বিশ্বকাপে দেশের নায়ক, পাঁচ বছর আগে তাঁর ফুটবল ক্যারিয়ারই প্রায় শেষ হয়ে যেতে বসেছিল।
অটোগ্রাফ চাওয়ার অজুহাতে ভয়াবহ হামলা:
২০২১ সালের ১ জুলাই ফ্রান্সের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে নিজের বাড়িতে ছিলেন তখনকার এফসি লরিয়ঁর খেলোয়াড় উইসা। ৩৬ বছর বয়সী এক নারী তাঁর বাড়িতে এসে অটোগ্রাফ চান। উইসা স্বাভাবিকভাবেই অনুরোধ রাখেন।
কিন্তু সেদিন সন্ধ্যায় ওই নারী আবার ফিরে আসেন। দরজা খুলতেই তিনি উইসার মুখ ও চোখ লক্ষ্য করে প্রচণ্ড ক্ষতিকর অ্যাসিডজাতীয় তরল ছুড়ে মারেন। শুধু তাই নয়, উইসার সদ্যোজাত কন্যাশিশুকে অপহরণেরও চেষ্টা করেন।
প্রচণ্ড যন্ত্রণার মধ্যেও উইসা নিজের মেয়েকে অপহরণ হতে দেননি। তবে তাঁর মুখ ও চোখে মারাত্মক রাসায়নিক দাহ হয়। দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকেরা জরুরি ভিত্তিতে দুই চোখেই অস্ত্রোপচার করেন। সৌভাগ্যবশত, চিকিৎসকদের প্রচেষ্টায় তিনি স্থায়ীভাবে দৃষ্টিশক্তি হারানো থেকে রক্ষা পান।

এক মাস পরই প্রিমিয়ার লিগে:
এত বড় ট্র্যাজেডির পরও উইসা হার মানেননি। হামলার মাত্র এক মাস পরই প্রায় ৮.৫ মিলিয়ন পাউন্ড ট্রান্সফার ফিতে ইংল্যান্ডের ক্লাব ব্রেন্টফোর্ডে যোগ দেন। সেখান থেকে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন প্রিমিয়ার লিগের অন্যতম কার্যকর ফরোয়ার্ড হিসেবে। পরে তিনি নিউক্যাসল ইউনাইটেডেও যোগ দেন এবং ক্লাব ও দেশের হয়ে ধারাবাহিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ গোল করে চলেছেন।
⚫কেন হামলা করা হয়েছিল?
তদন্তে বেরিয়ে আসে আরও ভয়ংকর তথ্য। হামলাকারী নারী দীর্ঘদিন ধরে নিজের স্বামীর কাছে ভুয়া গর্ভধারণের গল্প বলে আসছিলেন। সেই মিথ্যা টিকিয়ে রাখতে তিনি একটি নবজাতক শিশুকে অপহরণের পরিকল্পনা করেন এবং সেই কারণেই উইসার পরিবারকে লক্ষ্যবস্তু বানান।
হামলার পরদিনও তিনি আরেক নারীর ওপর অ্যাসিড নিক্ষেপ করে একটি শিশু ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। শেষ পর্যন্ত ৩ জুলাই পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে।
⚫এবার ইংল্যান্ডের সামনে:
এখন সেই মানুষটিই বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় মঞ্চে দাঁড়িয়ে। যিনি একসময় নিজের দৃষ্টিশক্তি হারানোর শঙ্কায় ছিলেন, তিনিই আজ ডিআর কঙ্গোর আক্রমণের প্রধান অস্ত্র।
ইংল্যান্ডের রক্ষণভাগের জন্য উইসা শুধু একজন স্ট্রাইকার নন; তিনি এমন একজন ফুটবলার, যিনি জীবনের সবচেয়ে ভয়াবহ পরীক্ষায় জয়ী হয়ে বিশ্বকাপে নিজের দেশের স্বপ্ন বাঁচিয়ে রেখেছেন। তাঁর গল্প প্রমাণ করে—কখনও কখনও সবচেয়ে বড় জয়টি মাঠে নয়, জীবনের সঙ্গেই লড়াই করে অর্জন করতে হয়।
⚫ আদালতে উইসার আবেগঘন সাক্ষ্য: "যেন দুঃস্বপ্ন ছিল!"
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ফ্রান্সে হামলাকারী নারীর বিচার শুরু হয়। তখন ইংল্যান্ড থেকে নিজে আদালতে হাজির হয়ে আবেগঘন সাক্ষ্য দেন ইয়োয়ানে উইসা। আদালতে তিনি বলেন—
"এটা একটা ভয়ংকর দুঃস্বপ্ন ছিল যেন। এরপর থেকে সামান্য কোনো শব্দ শুনলেই আমি আতঙ্কিত হয়ে পড়ি। শুধু একটা বিশ্বাস আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছিল যে আমার সন্তানরা নিরাপদে আছে। আমার দুই চোখেই অস্ত্রোপচার করতে হয়েছে। চিকিৎসক জানিয়েছেন, সারা জীবন আমাকে চোখে ড্রপ ব্যবহার করতে হবে। পুরোপুরি দৃষ্টিশক্তি ফিরে পেতে আমার ছয় মাস লেগেছিল।"
উইসা জানান, সময়মতো চিকিৎসা না পেলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারত।
"যদি এত দ্রুত চিকিৎসা না পেতাম, তাহলে পরিণতি আরও অনেক খারাপ হতো। আমি এবং আমার স্ত্রী সারাজীবন এই ঘটনার মানসিক প্রভাব বয়ে বেড়াব। ঘটনার পর থেকে আমি অনেক গুটিয়ে গেছি। অপরিচিত মানুষের আশপাশে থাকতে এখন আর স্বস্তি পাই না।"
তিনি স্বীকার করেন, এই হামলা তাঁর ব্যক্তিত্বও বদলে দিয়েছে।
"আগের মতো ভালোবাসা প্রকাশ করতে পারি না। রাস্তায় হাঁটার সময় স্বাভাবিকভাবেই বারবার পেছনে তাকাই। আর রাতে একা থাকলে ঘুমাতেও পারি না।"
নিজের মুখের দাগ নিয়েও হৃদয়স্পর্শী কথা বলেন উইসা।
"আমার সন্তানরা প্রায়ই জিজ্ঞেস করে, আমার মুখে কী হয়েছে। কিন্তু তারা এখনো এত ছোট যে তাদের পুরো ঘটনা বলতে পারি না। আমাকে অস্ত্রোপচারের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু আমি তা করিনি। কারণ এই দাগ আমার ব্যক্তিগত ইতিহাসের অংশ।"
হামলার প্রভাব পড়েছিল তাঁর স্ত্রী কাহিনার জীবনেও।
"আমার স্ত্রী আর আমাকে মনোবিদের কাছে যেতে হয়। সে বিষণ্নতায় ভুগেছে। ঘটনার কিছুদিন পরই আমরা বিয়ে করি, কারণ আপনি কখনোই জানেন না ভাগ্যে কী অপেক্ষা করছে।"
বিচার শেষে আদালত হামলাকারী নারীকে দোষী সাব্যস্ত করে ১৮ বছরের কারাদণ্ড দেন।
আজ সেই বিভীষিকাময় অতীত পেছনে ফেলে উইসা ২০২৬ বিশ্বকাপে ডিআর কঙ্গোর অন্যতম নায়ক। ২০২৫ সালে ৫৫ মিলিয়ন পাউন্ডে নিউক্যাসল ইউনাইটেডে যোগ দেওয়ার পর তাঁর ক্যারিয়ার আরও উঁচুতে উঠেছে। এবার ইংল্যান্ডের বিপক্ষে বিশ্বকাপের শেষ ৩২-এর ম্যাচে দেশের ইতিহাসে আরেকটি স্মরণীয় অধ্যায় লেখার স্বপ্ন দেখছেন তিনি।

রনক জামান
খেলাধুলার সব খবর ও বিশ্লেষণ সবার আগে পেতে চোখ রাখুন খেলারদেশে।

মন্তব্যসমূহ (0)
মন্তব্য করতে এবং আলোচনায় অংশ নিতে আপনার গুগল অ্যাকাউন্ট দিয়ে লগইন করুন।