জন্মদিন ট্রিবিউট : রজার ফেদেরার
বলবয় ফেদেরার থেকে টেনিস কিংবদন্তি

রজার ফেদেরার
কোর্টের এক পাশে দাঁড়িয়ে ছোট্ট ছেলেটি বল কুড়িয়ে দিচ্ছে। চোখ তার অবশ্য বলের দিকে না। খেলোয়াড়দের দিকে। প্রতিটা সার্ভ, প্রতিটা র্যালি, প্রতিটা নিখুঁত শট যেন মুগ্ধ করে রাখছে তাকে। তখনও সে জানত না, কয়েক বছর পর এই কোর্টই তার নিজের হয়ে উঠবে। জানত না, একদিন পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ তার খেলা দেখবে মুগ্ধ হয়ে। জানত না, টেনিস ইতিহাসের সবচেয়ে সুন্দর অধ্যায়গুলোর একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ লিখতে চলেছে সে।
ছেলেটির নাম রজার ফেদেরার। ১৯৯৩-৯৪ সালে নিজের শহর বাসেলের সুইস ইন্ডোরস টুর্নামেন্টে বলবয়ের দায়িত্ব পালন করতেন ফেদেরার। অন্যদের জন্য বল কুড়িয়ে দেওয়া সেই কিশোরের চোখে তখন ছিল বড় স্বপ্ন। হয়তো তখনই টেনিসের সঙ্গে তার সম্পর্কটা অন্য রকম হয়ে গিয়েছিল।
আজ সেই পুরোনো ভিডিগুলোতে তাকে বলবয় হিসেবে দেখলে বিস্ময় জাগে। কে জানত, যে ছেলে একসময় কোর্টের বাইরে দাঁড়িয়ে তারকাদের খেলা দেখত, একদিন তাকেই দেখতে কোর্টে ভিড় করবে পৃথিবী?

বলবয় ফেদেরার
স্বপ্ন ছিল, ছিল প্রতিভাও
ফেদেরারের প্রতিভা খুব অল্প বয়সেই প্রকাশ পায়। জুনিয়র পর্যায়ে দ্রুতই হয়ে ওঠেন বিশ্বের অন্যতম সেরা খেলোয়াড়। ১৯৯৭ সালের সেপ্টেম্বরে, ১৬ বছর বয়সে পেশাদার র্যাঙ্কিংয়ে প্রথম পয়েন্ট পান তিনি। সুইজারল্যান্ডের বসোনেন্সের এক স্যাটেলাইট টুর্নামেন্টে ম্যানুয়েল জোরকেরাকে হারিয়েই শুরু।

১৯৯৮, উইম্বলডন
তারপর আর থামেনি যাত্রা। ১৯৯৮ সালে উইম্বলডন বয়েজ সিঙ্গেলসে ১৫তম বাছাই হয়ে নেমেছিলেন ফেদেরার। শেষ পর্যন্ত ট্রফি হাতে নিয়েই ফিরলেন। শুধু সিঙ্গেলস না। অলিভিয়ের রোশুর সঙ্গে ডাবলস শিরোপাও জিতলেন। সেই মুহূর্তে হয়তো টেনিস বিশ্ব বুঝতে শুরু করেছিল, এই সুইস কিশোরের গল্পটা অন্য রকম হতে যাচ্ছে।
১৯ বছরের ফেদেরারের হাতে প্রথম ট্রফি

২০০১, মিলান
২০০১ সালে মিলানে এল প্রথম এটিপি শিরোপা। ফাইনালে জুলিয়েন বুতেকে হারালেন ১৯ বছরের ফেদেরার। এর আগে অবশ্য পথটা সহজ ছিল না। ফাইনালে ওঠার পথে হারিয়েছিলেন গোরান ইভানিসেভিচ ও ইয়েভগেনি কাফেলনিকভের মতো দুই কিংবদন্তিকে।
এক বছর পর হামবুর্গে জিতলেন প্রথম মাস্টার্স ১০০০ শিরোপা। ফাইনালে হারালেন সাবেক বিশ্বসেরা মারাত সাফিনকে। সেই জয় তাকে প্রথমবারের মতো নিয়ে গেল বিশ্ব র্যাঙ্কিংয়ের সেরা দশে। কিন্তু আসল গল্প তখনও শুরু হয়নি।
উইম্বলডন বদলে দিল সব

২০০৩, উইম্বলডন
২০০৩ সাল। ফেদেরারের জন্য উইম্বলডন সবসময়ই বিশেষ তীর্থ। এই মাঠেই একসময় জুনিয়র চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলেন। ২০০১ সালে এখানেই হারিয়েছিলেন কিংবদন্তি পিট সাম্প্রাসকে। দুই বছর পর সেই একই ঘাসে তিনি নিজেই হয়ে উঠলেন রাজা। ফাইনালে মার্ক ফিলিপুসিসকে হারিয়ে জিতলেন প্রথম গ্র্যান্ড স্ল্যাম। একজন সম্ভাবনাময় তরুণ তখন ধীরে ধীরে রূপ নিচ্ছেন বিশ্বসেরায়।
চার বছর নয়, চার যুগের রাজত্ব
২০০৪ সালের অস্ট্রেলিয়ান ওপেন জেতার পর ২ ফেব্রুয়ারি প্রথমবার বিশ্বের এক নম্বর হলেন ফেদেরার। তারপর শুরু হলো এমন এক আধিপত্য, যা টেনিসে আজও কিংবদন্তি। টানা ২৩৭ সপ্তাহ তিনি ছিলেন র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষে। প্রতিপক্ষ বদলেছে। প্রজন্ম বদলেছে। কিন্তু শীর্ষে ফেদেরারের নামটা যেন স্থির ছিল। তার খেলার মধ্যে ছিল এমন এক সৌন্দর্য, যা শুধু জয় দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। এক হাতে ব্যাকহ্যান্ড, নিখুঁত সার্ভ, কোর্টজুড়ে অবিশ্বাস্য মুভমেন্ট—সব মিলিয়ে ফেদেরারের টেনিস ছিল যেন শিল্প।
তারপর এলেন নাদাল

২০০৪, মিয়ামি; ফেদেরার ও নাদাল
২০০৪ সালের মিয়ামি। ২২ বছরের বিশ্বসেরা ফেদেরারের সামনে দাঁড়ালেন ১৭ বছরের এক বাঁহাতি কিশোর। নাম, রাফায়েল নাদাল। ফেদেরার হয়তো জানতেন না, এই কিশোরই পরবর্তী সময়ে তার সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী এবং সবচেয়ে কাছের বন্ধুদের একজন হয়ে উঠবেন। প্রথম দেখাতেই নাদালের জয়। ৬-৩, ৬-৩। তারপর শুরু হলো টেনিস ইতিহাসের অন্যতম সেরা দ্বৈরথ। ফেদেরার-নাদাল মুখোমুখি হয়েছেন ৪০ বার। ২৪ বার জিতেছেন নাদাল। কিন্তু তাদের লড়াইয়ের সৌন্দর্য শুধু জয়-পরাজয়ে ছিল না। ছিল পারস্পরিক শ্রদ্ধায়।
এরপর এলেন জোকোভিচ
২০০৬ সালে মন্টে কার্লোতে আরেক তরুণের সঙ্গে দেখা। ১৮ বছরের সার্বিয়ান, নোভাক জোকোভিচ। ফেদেরার সেই ম্যাচ জিতেছিলেন। কিন্তু কয়েক বছর পর জোকোভিচও হয়ে উঠবেন তার সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বীদের একজন। ফেদেরারের সঙ্গে জোকোভিচের দেখা হয়েছে ৪৯ বার। তার ক্যারিয়ারে আর কোনো প্রতিপক্ষের সঙ্গে এত বেশি ম্যাচ খেলেননি তিনি। নাদাল ও জোকোভিচ, দুই প্রজন্মের দুই মহাতারকার সঙ্গে লড়াই করেও ফেদেরার নিজের জায়গাটা ধরে রেখেছিলেন।
প্যারিসে অপূর্ণতা পূরণ

২০০৯, গ্র্যান্ড স্ল্যাম হাতে ফেদেরার
২০০৯ সালে রোলাঁ গারোঁ। একটা গ্র্যান্ড স্ল্যাম তখনও ফেদেরারের সংগ্রহে ছিল না : ফ্রেঞ্চ ওপেন। নাদাল ছিলেন অপ্রতিরোধ্য। কিন্তু চতুর্থ রাউন্ডে তাকে হারিয়ে দিলেন রবিন সোডারলিং। সুযোগটা আর হাতছাড়া করেননি ফেদেরার। ফাইনালে সোডারলিংকে হারিয়ে জিতলেন ফ্রেঞ্চ ওপেন। পূর্ণ হলো ক্যারিয়ার গ্র্যান্ড স্ল্যাম। সেই মুহূর্তে তিনি শুধু একজন চ্যাম্পিয়ন ছিলেন না। তিনি হয়ে গেলেন ইতিহাসের অংশ।
ফ্রেঞ্চ ওপেনের পর যেন আরও ক্ষুধার্ত হয়ে উঠলেন ফেদেরার। কয়েক সপ্তাহ পর উইম্বলডন ফাইনাল। প্রতিপক্ষ অ্যান্ডি রডিক। পাঁচ সেটের সেই মহাকাব্যিক ম্যাচে শেষ পর্যন্ত জিতলেন ফেদেরার। স্কোরলাইন ১৬-১৪। এটা ছিল তার ১৫তম গ্র্যান্ড স্ল্যাম। পিট সাম্প্রাসের রেকর্ড ভেঙে গেল। টেনিসের রাজা তখন নিজের সিংহাসন আরও শক্ত করে ফেলেছেন।

২০১৫, ব্রিসবেন
বয়স ৩৫, সবাই যখন ভাবছিল...
২০১৬ সালের শেষটা ছিল কঠিন। হাঁটুর চোটে দীর্ঘ সময় কোর্টের বাইরে থাকতে হলো। ২০১৭ অস্ট্রেলিয়ান ওপেনে ফিরলেন ৩৫ বছর বয়সে। র্যাঙ্কিংয়ে ১৭তম। অনেকেই ভাবছিলেন, ফেদেরারের সেরা সময় হয়তো শেষ। কিন্তু ফেদেরার আবারও প্রমাণ করলেন, তাকে কখনো হিসাবের বাইরে রাখা যায় না। ফাইনালে রাফায়েল নাদাল। পুরোনো দুই প্রতিদ্বন্দ্বীর যুদ্ধ। শেষ হাসি ফেদেরারের। জিতলেন ১৮তম গ্র্যান্ড স্ল্যাম। সেই বছরই উইম্বলডনে জিতলেন ১৯তম। হারানো ক্যারিয়ার যেন আবার নতুন করে জন্ম নিল।
২০-এর গল্প

২০১৮ অস্ট্রেলিয়ান ওপেন
২০১৮ অস্ট্রেলিয়ান ওপেন। ফাইনালে মারিন চিলিচ। ফেদেরারের বয়স তখন ৩৬। কিন্তু বয়স যেন তার কাছে সংখ্যামাত্র। চিলিচকে হারিয়ে জিতলেন ২০তম গ্র্যান্ড স্ল্যাম। এরপর রটারডামে আবার বিশ্বের এক নম্বর হলেন। ৩৬ বছর বয়সে তিনি হয়ে গেলেন এটিপি ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি বয়সী বিশ্বসেরা।
১০০, আরেকটি অসম্ভব সংখ্যা
২০১৯ সালে দুবাই। ফাইনালে স্টেফানোস সিতসিপাস। আর একটা জয় ফেদেরারকে নিয়ে যাবে ১০০ এটিপি শিরোপার মাইলফলকে। তিনি জিতলেন। কনর্সের পর মাত্র দ্বিতীয় পুরুষ খেলোয়াড় হিসেবে ১০০টি ট্যুর-লেভেল শিরোপা স্পর্শ করলেন ফেদেরার। ক্যারিয়ার থামল ১০৩টি শিরোপায়।
শেষবার উইম্বলডন
২০২১ সালে আবার উইম্বলডন। তখন বয়স ৩৯। হাঁটুর সমস্যা ছিল। তবু প্রিয় কোর্টে ফিরেছিলেন। কোয়ার্টার ফাইনালে হুবার্ট হুরকাচের কাছে হেরে গেলেন। তখনও কেউ হয়তো ভাবেনি, এটাই তার শেষ গ্র্যান্ড স্ল্যাম ম্যাচ।
শেষ দৃশ্যে পাশে নাদাল
২০২২ সালে অবশেষে এলো সেই দিন। ফেদেরার ঘোষণা দিলেন, লেভার কাপ হবে তার শেষ এটিপি ইভেন্ট। শেষ ম্যাচটি সিঙ্গেলস নয়। ডাবলস। সঙ্গী সেই মানুষটা, যার সঙ্গে বছরের পর বছর কোর্টে যুদ্ধ করেছেন। রাফায়েল নাদাল। ফেদেরার-নাদাল জুটি খেললেন জ্যাক সক ও ফ্রান্সেস তিয়াফোর বিপক্ষে। যদিও ম্যাচটি তারা হেরে গেলেন। কিন্তু সেদিন কেউ স্কোর মনে রাখেনি। মনে রেখেছে অন্য কিছু। ম্যাচ শেষে ফেদেরারের চোখে পানি। নাদালও কাঁদছেন। পাশে জোকোভিচ, মারে। সামনে পুরো টেনিস বিশ্ব। একজন কিংবদন্তি বিদায় নিচ্ছেন।

২০১১ এটিপি ফাইনাল
ফেদেরারের ক্যারিয়ারের পরিসংখ্যান অবিশ্বাস্য। ২০ গ্র্যান্ড স্ল্যাম। ১০৩ এটিপি শিরোপা। ১,০০০ এর বেশি ম্যাচ জয়। ২৩৭ সপ্তাহ বিশ্ব র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষে। ক্যারিয়ার গ্র্যান্ড স্ল্যাম। ডেভিস কাপ জয়। কিন্তু সংখ্যাগুলো দিয়ে ফেদেরারকে পুরোপুরি বোঝা যায় না। কারণ ফেদেরারের সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার হয়তো ট্রফির ঘরে নেই। তা আছে মানুষের স্মৃতিতে; একটা ব্যাকহ্যান্ডে, একটা নিখুঁত সার্ভে, এক শান্ত হাসিতে, পরাজয়ের পর প্রতিপক্ষকে জড়িয়ে ধরায়। আর আছে সেই পুরোনো ভিডিওতে, যেখানে এক কিশোর কোর্টের পাশে দাঁড়িয়ে বল কুড়িয়ে দিচ্ছে। যে জানত না, একদিন পৃথিবী তাকে বল কুড়িয়ে দেওয়া ছেলে হিসেবে না, টেনিসের সবচেয়ে সুন্দর শিল্পীদের একজন হিসেবে মনে রাখবে।
রজার ফেদেরার শুধু টেনিস খেলেননি। তিনি টেনিসকে সুন্দর করেছেন, পূর্ণতা দিয়েছেন।

রনক জামান
খেলাধুলার সব খবর ও বিশ্লেষণ সবার আগে পেতে চোখ রাখুন খেলারদেশে।
সম্পর্কিত আরও খবর
খেলার দেশ বিশেষ‘দ্য গ্রেটেস্ট’ মোহাম্মদ আলি
খেলার দেশ বিশেষফুটবল ইতিহাসে বিতর্কিত যত দলবদল
খেলার দেশ বিশেষযে গল্পের নাম ‘নেইমার’
খেলার দেশ বিশেষহ্যারি কেইন: গোলরক্ষক থেকে গোলমেশিন
খেলার দেশ বিশেষগ্র্যান্ডফাদার রুল: দাদার দেশ, নাতির জার্সি
খেলার দেশ বিশেষ
মন্তব্যসমূহ (0)
মন্তব্য করতে এবং আলোচনায় অংশ নিতে আপনার গুগল অ্যাকাউন্ট দিয়ে লগইন করুন।