উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ
দেউলিয়া থেকে চ্যাম্পিয়নস লিগের স্বপ্ন
দেউলিয়ার দ্বারপ্রান্ত থেকে চ্যাম্পিয়নস লিগে খেলার জন্য কোয়ালিফাইং রাউন্ডে প্রতিযোগিতা করছিল এবার সুইডিশ ক্লাবটি। যদিও শেষ পর্যন্ত চ্যাম্পিয়নস লিগের ৩৬ দলে জায়গা করে নিতে পারেনি। তবে তাদের উত্থানের গল্পটা হয়ে থাকবে ফুটবলে বিরল ঘটনা।

মিয়েলবি এআইএফ, লিগে রেকর্ড সংখ্যক পয়েন্ট নিয়ে অলসভেনস্কান শিরোপা জয়
সুইডেনের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের ছোট্ট এক মাছধরা গ্রাম। জনসংখ্যা মাত্র ১ হাজার ৫০০। সেই গ্রামের ক্লাবই ইউরোপের সবচেয়ে বড় মঞ্চে খেলার স্বপ্ন দেখে। ক্লাবটির নাম মিয়েলবি এআইএফ।
যদিও এই মৌসুমে স্বপ্নটা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ কোয়ালিফাইং রাউন্ডেই থেমে যায়। তবে ভবিষ্যতের জন্য আত্মবিশ্বাস ও তাকে সফল করার সব রসদই পেয়েছে এই মিরাকল ঘটানো ক্লাবের।
এর আগে, ২০২৫ সালে সুইডিশ ফুটবলে রীতিমতো ইতিহাস গড়ে অলসভেনস্কান শিরোপা জেতে মিয়েলবি এআইএফ। সেও ৩ ম্যাচ বাকি থাকতেই। আর তারা শুধু চ্যাম্পিয়নই হয়নি, ৭৫ পয়েন্ট নিয়ে গড়ে লিগের রেকর্ড। দ্বিতীয় স্থানে থাকা দলের চেয়ে ব্যবধান ছিল ১৩ পয়েন্ট। পুরো মৌসুমে হার মাত্র এক ম্যাচ।
বাইরের ফুটবল দুনিয়ার চোখে এটা ছিল অলৌকিক সাফল্য। কিন্তু মিয়েলবির কাছে বিষয়টা মোটেও অলৌকিক না। বরং দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা, কঠোর পরিশ্রম এবং প্রতিদিন নিজেদের উন্নত করার শ্রমের ফসল এই সাফল্য।

ফুটবল প্রধান হিসেবে অলসভেনস্কান জিতে হ্যাসে লারসন মিয়েলবি ক্লাবের সাথে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক অটুট রাখেন
ক্লাবের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ইয়াকব লেনার্টসন বলেন, ‘অনেক প্রতিদ্বন্দ্বীর মতো আর্থিক সামর্থ্য নেই আমাদের। তাই আমাদের জন্য কাজের ধারার সংস্কৃতিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আমরা প্রতিদিন কীভাবে উন্নতি করতে পারি, সেটাই দেখি। ফলাফলের চেয়ে পারফরম্যান্সের দিকে মনোযোগ দিই।’
তবে এই সাফল্যের পথ মোটেও মসৃণ ছিল না। ১৯৩৯ সালে প্রতিষ্ঠিত মিয়েলবি কয়েক দশক সুইডেনের আঞ্চলিক লিগগুলোতেই খেলেছে। ১৯৮০ সালে প্রথমবার শীর্ষ বিভাগে ওঠে তারা। কিন্তু এক মৌসুম পরই অবনমন। এরপরও একই গল্প। ১৯৮০-এর দশকে আরও দুবার শীর্ষ বিভাগে উঠে আবার নেমে যায়।
২০১০ সালে ২৫ বছর পর আবার শীর্ষ লিগে ফেরে মিয়েলবি। পাঁচ বছর টিকে থাকার পর শুরু হয় আরও কঠিন সময়। টানা দুইবার অবনমনের পর ২০১৬ সালে তারা নেমে যায় তৃতীয় স্তরে। তখন ক্লাবটি প্রায় দেউলিয়ার পথে। সেই কঠিন সময়েই ফুটবল বিভাগের দায়িত্ব নেন হাসে লারসন। মিয়েলবির সঙ্গে তার সম্পর্কও দীর্ঘদিনের। ১৯৭৯ সালে মাত্র ১৭ বছর বয়সে ক্লাবটিতে যোগ দিয়েছিলেন তিনি।
লারসনের দর্শন ছিল পরিষ্কার, পা মাটিতে রাখতে হবে। কারণ ভুল সিদ্ধান্ত নিলে পরিস্থিতি খুব দ্রুত বদলে যেতে পারে। ‘আমরা সবসময় মাটিতে পা রেখেই চলি। কারণ প্রতিদিন সঠিক কাজ না করলে পরিস্থিতি খুব দ্রুত খারাপ দিকে যেতে পারে। একই সঙ্গে এখন আমরা বিশ্বাস করি, যে কোনো প্রতিপক্ষকে হারানোর সামর্থ্য আমাদের আছে,’ বলেন লারসন।
মিয়েলবির সাফল্যের অন্যতম রহস্য তাদের পুরোনো ও নতুন পদ্ধতির সমন্বয়। লারসন এখনও অনেক কাজ করেন কাগজ-কলমে। অন্যদিকে ক্লাবটির প্রধান স্কাউট আরভিড ফ্রানসেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা ওয়েস্কাউট প্ল্যাটফর্মে ম্যাচ ও খেলোয়াড় বিশ্লেষণ করেন। একসময় তিনি মিয়েলবিতে খণ্ডকালীন কাজের পাশাপাশি ডাকপিয়নের চাকরিও করতেন। এখন তিনি ক্লাবটির পূর্ণকালীন কর্মী।
‘আরভিড কম্পিউটারে অবিশ্বাস্য পরিমাণ কাজ করে। আমি মূলত নিজের চোখ ব্যবহার করি। আমরা একে অপরকে পরিপূরক হিসেবে কাজ করি। নিজের কথা বলতে গেলে, প্রযুক্তির প্রতি আমার কোনো আগ্রহ নেই। কিন্তু সে এই ব্যাপারে এতই দক্ষ, আমি প্রযুক্তিগত দায়িত্ব তার ওপরই ছেড়ে দিই,’ বলেন লারসন।

প্রধান কোচ কার্ল মারিয়াস আকসুম ক্লাবকে উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের বাছাইপর্বে নেতৃত্ব দেন
ক্লাবটির আধুনিক ফুটবল দর্শনের আরেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি কোচ কার্ল মারিয়ুস আকসুম। ২০২৪ সালের শুরুতে ক্লাবটিতে যোগ দেন তিনি। বলেন, “আমি মিয়েলবি ক্লাবের জন্য সহকারী কোচ নিয়োগের একটা বিজ্ঞাপন দেখেছিলাম। অন্য সব সাধারণ চাকরির মতোই আবেদন করি। আমাকে তারা ডাকে, পদের জন্য সাক্ষাৎকারও দিই। ফুটবলে এমন পদ্ধতি সচরাচর দেখা যায় না।”
মজার ব্যাপার হলো, মিয়েলবিতে যোগ দেওয়ার আগে অভিজাত পর্যায়ে কোচিংয়ের অভিজ্ঞতা ছিল না তার। তবে ছিল ভিন্ন ধরনের প্রস্তুতি। নরওয়ের এই কোচ নরওয়েজিয়ান স্কুল অব স্পোর্ট সায়েন্সেস থেকে পিএইচডি করেছেন। তার গবেষণার বিষয় ছিল এলিট ফুটবলে খেলোয়াড়দের ভিজ্যুয়াল পারসেপশন। অর্থাৎ মাঠে একজন খেলোয়াড় কীভাবে চারপাশ থেকে তথ্য সংগ্রহ করেন, কীভাবে পরিস্থিতি বুঝে সিদ্ধান্ত নেন—এসব নিয়েই ছিল তার গবেষণা।
তার প্রভাব মিয়েলবির খেলার ধরনেও স্পষ্ট। বল পায়ে রেখে ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ করতে চায় দলটি। শীর্ষ লিগে সবচেয়ে বেশি বল দখলে রাখা তিন-চারটি দলের মধ্যে তারা অন্যতম। নিজেদের রক্ষণভাগ থেকেই আক্রমণ তৈরি করা এবং বল হারানোর পর দ্রুত তা পুনরুদ্ধার করা তাদের পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
‘আমরা নিয়ন্ত্রণ ও আক্রমণভিত্তিক ফুটবল খেলি। ইউরোপেও ঠিক একইভাবে খেলব,’ বলেন আকসুম। আর এই পুরো প্রক্রিয়ার কেন্দ্রে রয়েছে জাপানি ‘কাইজেন’ দর্শন। অর্থাৎ প্রতিদিন একটু একটু করে উন্নতি করা।

সিইও জ্যাকব লেনার্টসন ফলাফলের চেয়ে ধারাবাহিক অগ্রগতির ওপর বেশি জোর দেন
প্রায় এক দশক আগে ক্লাবটির তৎকালীন সভাপতি ম্যাগনুস এমেউস এই দর্শনটি মিয়েলবিতে চালু করেন। লক্ষ্য নির্ধারণ, পারফরম্যান্স মূল্যায়ন এবং এরপর আরও নতুন লক্ষ্য ঠিক করা, এভাবেই এগিয়েছে ক্লাবটি। আকসুম বলেন, ‘আমরা জিতলাম নাকি হারলাম, তা দিয়ে মূল্যায়ন করি না। আমরা দেখি পারফরম্যান্স কেমন ছিল। দীর্ঘমেয়াদে সেটাই দলের উন্নতি তৈরি করে।’
২০২৫ সালের শিরোপা তাই হঠাৎ পাওয়া কোনো সাফল্য ছিল না। তার আগের মৌসুমে সুইডিশ কাপের ফাইনালে উঠেছিল মিয়েলবি। এরপর অলসভেনস্কানে পঞ্চম হয়ে নিজেদের ইতিহাসের সেরা অবস্থান স্পর্শ করে। পরের বছরই এলো আরও বড় চমক, লিগ শিরোপা।
দুইটা সাদামাটা ড্র দিয়ে শুরু করার পর ক্লাবটি একের পর এক জয় তুলে নিতে শুরু করে। লিগে গ্রীষ্মকালীন বিরতি শুরু হওয়ার আগেই মিয়েলবি টেবিলের শীর্ষে উঠে নিজেদের অবস্থান পাকা করে নেয়। লারসন স্মরণ করে বলেন, “তখনই গণমাধ্যমের নজর কাড়তে শুরু করে।”
গ্রীষ্মের শেষভাগ থেকে দক্ষিণ-পূর্বের ছোট্ট এই গ্রামের দলটি আন্তর্জাতিক খবরে পরিণত হয়। কারণ সংবাদকর্মীরা সুইডিশ অভিজাত ফুটবলের দুর্গম এক ইতিহাসের কোণে ভিড় জমাচ্ছিল। হ্যাসে লারসন বলেন, “আমি প্রায় ১৫টি দেশের গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেছি। কিন্তু আরও অনেকেই ক্লাবের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানতে চেয়েছিল লিস্টারল্যান্ডেটের এই ছোট্ট উপদ্বীপে কী ঘটছে। অবিশ্বাস্য। তারা সারা বিশ্ব থেকে এসেছিল।”

মিয়েলবির শিরোপাজয়ী দলের সাফল্য উদযাপন
এবার লক্ষ্য ছিল ইউরোপ, যা ভবিষ্যতের জন্য তোলা রইলো। এই মৌসুমে মিয়েলবি সুইডিশ কাপও জিতেছে। এরপর তাদের সামনে ছিল ইউরোপীয় প্রতিযোগিতায় লিগ পর্বে জায়গা করে নেওয়ার চ্যালেঞ্জ। লারসনের কাছে ইউরোপে মিয়েলবিকে দেখা ছিল দীর্ঘদিনের স্বপ্ন। ‘২০২০ সালের দিকে আমার মনে হতে শুরু করেছিল, ইউরোপে মিয়েলবিকে খেলতে দেখা সম্ভব। তখন থেকেই এটি আমার স্বপ্ন,’ বলেন তিনি।
তবে ইউরোপের স্বপ্নের মাঝেও নিজেদের শিকড় ভুলে যায়নি মিয়েলবি। স্থানীয় মানুষের জন্য সামাজিক কার্যক্রমও চালিয়ে যাচ্ছে ক্লাবটি। শিশুদের মধ্যে বুলিং-বিরোধী কার্যক্রম, প্যারা ফুটবল দল, বৃদ্ধাশ্রমে খেলোয়াড়দের নিয়মিত যাতায়াত—সবই তাদের সামাজিক কর্মসূচির অংশ। কারণ মিয়েলবির কাছে ফুটবল শুধু মাঠের ৯০ মিনিট না। ছোট্ট এই গ্রামের মানুষের জীবনেও ক্লাবটির বড় ভূমিকা রয়েছে।

একসময় যে ক্লাবটি দেউলিয়ার দ্বারপ্রান্তে ছিল, সেই মিয়েলবিই এখন সুইডেনের চ্যাম্পিয়ন। চ্যাম্পিয়নস লিগের পথেও হেঁটেছে। তাদের গল্পটা তাই শুধু ছোট ক্লাবের সাফল্যের গল্প নয়। তাদের সাফল্য দেখিয়ে দেয়, বড় বাজেট ছাড়াও সঠিক পরিকল্পনা, ধারাবাহিক উন্নতি এবং নিজেদের পরিচয়ের ওপর বিশ্বাস রেখে অনেক দূর যাওয়া সম্ভব।
‘আমরা পুরোপুরি প্রস্তুত। কৌতূহল আর উদ্দীপনা নিয়ে এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করব,’ বলেন লেনার্টসন।

খেলার দেশ ডেস্ক
খেলাধুলার সব খবর ও বিশ্লেষণ সবার আগে পেতে চোখ রাখুন খেলারদেশে।
সম্পর্কিত আরও খবর
খেলার দেশ বিশেষলিওনেল মেসি: একবার কান্নায়, একবার গর্বে
খেলার দেশ বিশেষ‘দ্য গ্রেটেস্ট’ মোহাম্মদ আলি
খেলার দেশ বিশেষফুটবল ইতিহাসে বিতর্কিত যত দলবদল
খেলার দেশ বিশেষবলবয় ফেদেরার থেকে টেনিস কিংবদন্তি
খেলার দেশ বিশেষযে গল্পের নাম ‘নেইমার’
খেলার দেশ বিশেষ





মন্তব্যসমূহ (0)
মন্তব্য করতে এবং আলোচনায় অংশ নিতে আপনার গুগল অ্যাকাউন্ট দিয়ে লগইন করুন।