চ্যাম্পিয়ন্স লিগ- যে কারণে ফেয়ার প্লে পুরস্কার জিতলেন মারকিনিওস
মারকিনিওস: ট্রফির আগে প্রতিপক্ষের পাশে
ট্রফির আগে প্রতিপক্ষের পাশে: যে কারণে উয়েফার নতুন ফেয়ার প্লে পুরস্কার মারকিনিওসের

মারকিনিওস (পিএসজি), গাব্রিয়েল (আর্সেনাল), পেনাল্টি মিসের পর জাতীয় দলের সতীর্থকে জড়িয়ে ধরেন
চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনাল জিতে যখন পুরো পিএসজি দল আনন্দে মেতে উঠেছিল, তখন একজন খেলোয়াড় ছুটেছিলেন অন্যদিকে। সতীর্থদের সঙ্গে শিরোপা উদযাপন না করে তিনি গিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন হতাশায় ভেঙে পড়া প্রতিপক্ষের পাশে। তিনি পিএসজির অধিনায়ক মারকিনিওস।

আর্সেনালের বিপক্ষে চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনালের সেই মানবিক মুহূর্তের স্বীকৃতি এবার পেলেন ব্রাজিলিয়ান ডিফেন্ডার। উয়েফা তাকে দিয়েছে তাদের নতুন ‘রেসপেক্ট: বিয়ন্ড দ্য গেম অ্যাওয়ার্ড’—ফুটবলের মাঠে সহমর্মিতা, সম্মান, সংহতি ও মানবিক মূল্যবোধের অসাধারণ উদাহরণকে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য চালু করা নতুন পুরস্কার।
ঘটনাটি ঘটেছিল চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনালে। নির্ধারিত সময়ের ম্যাচ ১-১ গোলে শেষ হওয়ার পর টাইব্রেকারে গড়ায় পিএসজি-আর্সেনালের লড়াই। সেখানে আর্সেনালের হয়ে গুরুত্বপূর্ণ পেনাল্টি নিতে এগিয়ে আসেন গাব্রিয়েল মাগালহায়েস। কিন্তু তার শট লক্ষ্যে পৌঁছায়নি। সেই ব্যর্থতাই পিএসজির দ্বিতীয় চ্যাম্পিয়নস লিগ শিরোপা নিশ্চিত করে।
মুহূর্তের মধ্যে পিএসজির খেলোয়াড়রা আনন্দে ছুটে যান সমর্থকদের দিকে। কিন্তু মারকিনিওস থেমে যান। তিনি দেখেছিলেন গাব্রিয়েলকে। প্রতিপক্ষের জার্সিতে থাকা একজন খেলোয়াড় নয়, একজন ব্রাজিলিয়ান সতীর্থকে। তাই উদযাপনের আগে তিনি ছুটে যান তাকে জড়িয়ে ধরতে। সেই দৃশ্যই হয়ে ওঠে পুরো ফাইনালের অন্যতম স্মরণীয় মুহূর্ত।
কেন গাব্রিয়েলের কাছে ছুটেছিলেন মারকিনিওস? নিজের সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যাও দিয়েছেন মারকিনিওস। গাব্রিয়েলকে দেখে তার নিজের পুরোনো কষ্টের কথা মনে পড়ে গিয়েছিল। ২০২২ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে টাইব্রেকারে পেনাল্টি মিস করেছিলেন মারকিনিওস নিজেও। তাই গাব্রিয়েলের সেই মুহূর্তের চাপ তিনি খুব ভালোভাবেই বুঝতে পারছিলেন।
“আমি উদযাপনের জন্য প্রস্তুত ছিলাম। কিন্তু দৌড় শুরু করার পর তাকে সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম। ২০২২ সালে আমার পেনাল্টি মিসের পরের দৃশ্যটা মনে পড়ে গেল,” নিজের সেই অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে জানান মারকিনিওস। তিনি এরপর গাব্রিয়েলকে মাথা উঁচু রাখতে বলেন, “আমি তাকে শক্ত থাকতে এবং মাথা উঁচু করে রাখতে বলেছিলাম। কারণ তার মৌসুমটা অসাধারণ ছিল এবং ফাইনালেও সে দুর্দান্ত খেলেছে।”

একটা পেনাল্টি যেন পুরো মৌসুমের পারফরম্যান্সকে ঢেকে না দেয়, এটাই ছিল মারকিনিওসের মূল বার্তা। এমনকি তিনি গাব্রিয়েলকে বলেছিলেন, তার চোখে ওই মৌসুমে ব্রাজিলিয়ান ডিফেন্ডারই ছিলেন বিশ্বের সেরা সেন্টার-ব্যাকদের একজন। মারকিনিওস বলেন, “এই মুহূর্তটা তার অসাধারণ মৌসুমকে মুছে দিতে পারে না। আমাদের তাকে খুব শিগগিরই প্রয়োজন হবে।”

সেই মুহূর্তের স্বীকৃতি উয়েফার। মারকিনিওসের এই আচরণকেই সামনে রেখে উয়েফা চালু করেছে রেসপেক্ট: বিয়ন্ড দ্য গেম অ্যাওয়ার্ড। উয়েফার ভাষায়, পুরস্কারটি ফুটবলে দয়া, মর্যাদা, সংহতি ও সহমর্মিতার মতো মূল্যবোধকে তুলে ধরা কর্মকাণ্ডকে সম্মান জানাবে। উয়েফা সভাপতি আলেক্সান্ডার চেফেরিনও মারকিনিওসের সেই মুহূর্তের প্রশংসা করেছেন।
তার বক্তব্যের সারকথা, ইউরোপের সবচেয়ে বড় ক্লাব ট্রফি জেতার পর মারকিনিওসের প্রথম প্রতিক্রিয়া ছিল না উদযাপন। বরং মাঠ পেরিয়ে গিয়ে প্রতিপক্ষকে সান্ত্বনা দেওয়া। চেফেরিনের মতে, সেই মুহূর্তটি ফুটবলের মানবিক দিককে অসাধারণভাবে তুলে ধরেছে।

যদিও পুরস্কার নিতে উপস্থিত ছিলেন না মারকিনিওস। তার হয়ে পুরস্কার গ্রহণ করেন পিএসজির সভাপতি নাসের আল-খেলাইফি। খেলাইফির উপস্থিতিও ঘটনাটির গুরুত্বকে আরও বাড়িয়ে দেয়। কারণ এটা শুধু একজন খেলোয়াড়ের ব্যক্তিগত আচরণের পুরস্কার না। পিএসজির অধিনায়ক হিসেবে মারকিনিওস যে মূল্যবোধের প্রতিনিধিত্ব করেছেন, সেটিরও স্বীকৃতি। পুরস্কারটি হাতে নিয়ে পিএসজির পক্ষ থেকে মারকিনিওসের নেতৃত্ব ও ব্যক্তিত্বের প্রশংসা করা হয়।

পুরস্কার পাওয়ার পর মারকিনিওস কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। বলেন, “এই ট্রফির জন্য অনেক ধন্যবাদ। এটি আমাকে খুব গর্বিত করে।” তার বক্তব্যে ফুটবলের বাইরের মানবিক মূল্যবোধও উঠে আসে। তার কাছে ফেয়ার প্লে শুধু নিয়ম মেনে খেলা নয়; প্রতিপক্ষের প্রতিও সম্মান দেখানো।

মারকিনিওস জানান, ফুটবল ও জীবনে ফেয়ার প্লে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সতীর্থ, প্রতিপক্ষ, রেফারি এবং ফুটবলের সঙ্গে জড়িত সবার প্রতি সম্মান বজায় রাখার প্রতিশ্রুতিও দেন তিনি।
সেই রাতে মারকিনিওসের হাতে ছিল চ্যাম্পিয়নস লিগের ট্রফি। তার দল পেয়েছিল ইউরোপের শ্রেষ্ঠত্বের স্বীকৃতি। আর কয়েক মিটার দূরে দাঁড়িয়ে ছিলেন গাব্রিয়েল, পেনাল্টি মিসের ভারে বিধ্বস্ত। মারকিনিওস চাইলে সতীর্থদের সঙ্গে ছুটে গিয়ে উদযাপন করতে পারতেন। সেটাই ছিল স্বাভাবিক। কিন্তু তিনি কয়েক সেকেন্ডের জন্য নিজের আনন্দ থামিয়ে দিয়েছিলেন। সেই কয়েক সেকেন্ডই এখন পুরস্কারের গল্প।
ফুটবলে যেখানে জয়-পরাজয়ের হিসাবই অনেক সময় সবকিছু হয়ে দাঁড়ায়, সেখানে মারকিনিওস মনে করিয়ে দিলেন—প্রতিপক্ষকে হারানোই ফুটবলের শেষ কথা নয়; প্রতিপক্ষের কষ্ট বুঝতে পারাও এই খেলাটির সৌন্দর্যের অংশ।

চ্যাম্পিয়নস লিগের ট্রফি জিতেছিল পিএসজি। কিন্তু সেই রাতের আরেকটি বড় জয় ছিল মানবিকতার, আর সেই জয়ের প্রতীক হয়ে উঠেছেন মারকিনিওস। “আমি তাকে বলেছি, আমি এই পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গিয়েছি এবং জানি এটি কতটা কঠিন। কিন্তু সে এখান থেকে ঘুরে দাঁড়াতে পারবে।”
এরপর গাব্রিয়েলের পারফরম্যান্সের কথা তুলে ধরে মারকিনিওস বলেন, “গাব্রিয়েল আর্সেনালের হয়ে অসাধারণ একটি মৌসুম খেলেছে। সে প্রমাণ করেছে যে সে বিশ্বের অন্যতম সেরা ডিফেন্ডার এবং সবাইকে দেখিয়েছে, সে কতটা ভালো খেলোয়াড়।” মারকিনিওসের মতে, ফাইনালের সেই মুহূর্তের ব্যর্থতার পুরো ভার গাব্রিয়েলের কাঁধে থাকা উচিত নয়, “ওই পরাজয়ের মুহূর্তের পুরো ভার তার কাঁধে থাকা উচিত ছিল না।”
তাই নিজের উদযাপন থেকে কয়েক মিনিট সময় বের করে গাব্রিয়েলের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি, “আমি শুধু চেয়েছিলাম, আমার উদযাপন থেকে কয়েক মিনিট তার জন্য রাখব, তাকে জড়িয়ে ধরব এবং তার জন্য শুভকামনা জানাব।”
ব্রাজিলের ২০২৬ বিশ্বকাপ মাথায় রেখে গাব্রিয়েলকে দ্রুত মানসিকভাবে ঘুরে দাঁড়ানো প্রয়োজন বলে মনে করেছিলেন মারকিনিওস, “ব্রাজিলের হয়ে বিশ্বকাপে আমাদের তাকে প্রয়োজন।” তিনি আরও বলেন, “আমি শুধু তাকে জড়িয়ে ধরতে চেয়েছিলাম, তাকে বোঝাতে চেয়েছিলাম যে আমরা তাকে কতটা মূল্য দিই এবং এই মৌসুমে সে যা করেছে, তার জন্য তাকে অভিনন্দন জানাতে চেয়েছিলাম।”
চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনালে পিএসজির জয়ের সবচেয়ে আবেগঘন দৃশ্যগুলোর একটা হয়ে উঠেছিল মারকিনিওস ও গাব্রিয়েলের সেই আলিঙ্গন। একজন তখন ইউরোপসেরা হওয়ার আনন্দে মাতোয়ারা। অন্যজন একটি পেনাল্টি মিসের কারণে ভেঙে পড়েছেন। মারকিনিওস নিজের আনন্দ কয়েক মুহূর্তের জন্য থামিয়ে প্রতিপক্ষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। আর এর মধ্য দিয়েই ফুটবলের প্রতিদ্বন্দ্বিতার বাইরে মানবিকতার এক অসাধারণ উদাহরণ তৈরি হয়েছে।
আর্সেনালের অধিনায়ক মার্টিন ওডেগার্ডও সেই আচরণের প্রশংসা করেছিলেন। তার ভাষায়, মারকিনিওস “একজন সত্যিকারের ভদ্রলোক” এবং এমন মুহূর্তের দুই দিক থেকেই অভিজ্ঞ একজন খেলোয়াড়।

খেলার দেশ ডেস্ক
খেলাধুলার সব খবর ও বিশ্লেষণ সবার আগে পেতে চোখ রাখুন খেলারদেশে।
সম্পর্কিত আরও খবর
ফুটবলমেসির সম্মানে আর্জেন্টিনার সব ম্যাচ থামবে ১০ মিনিটে
ফুটবলফুটবলে হাই প্রেস কী, কীভাবে কাজ করে, ভাঙার উপায়
ফুটবলমেসির অবসরে আবেগঘন বিদায় সতীর্থদের
ফুটবলঅবসরের ঘোষণা দিলেন মেসি
ফুটবলএমি মার্তিনেজকে কেন ‘দিবু’ বলা হয়?
ফুটবল



মন্তব্যসমূহ (0)
মন্তব্য করতে এবং আলোচনায় অংশ নিতে আপনার গুগল অ্যাকাউন্ট দিয়ে লগইন করুন।