চ্যাম্পিয়নস লিগ ২০২৬-২৭
চ্যাম্পিয়নস লিগে রিয়ালের প্রতিপক্ষ কেচ্ছা
চ্যাম্পিয়নস লিগ ২০২৬-২৭, রিয়াল মাদ্রিদের আট প্রতিপক্ষ। ঘরে চার, বাইরে চার। শক্ত প্রতিপক্ষ ওরা আর্সেনাল, ইন্টার মিলান (পিএসভি, রোমা, লাইপজিগ?) এবং চার এওয়ে ভেন্যু। এবং এই আট প্রতিপক্ষের যত কেচ্ছা।

চ্যাম্পিয়নস লিগে রিয়ালের প্রতিপক্ষ যারা
২০২৬-২৭ চ্যাম্পিয়নস লিগের লিগ পর্বে রিয়াল মাদ্রিদের আট প্রতিপক্ষ চূড়ান্ত হয়েছে। মোনাকোয় বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত ড্রয়ে ইউরোপের সবচেয়ে সফল ক্লাবটির সামনে এসেছে চারটি ঘরের ম্যাচ ও চারটি অ্যাওয়ে ম্যাচ।

(বাঁ দিকে নিচে) পট-১, (ডান দিকে উপরে) রিয়াল মাদ্রিদের প্রতিপক্ষ আট
রিয়াল মাদ্রিদ পট-১ এর দল হওয়ায় প্রতিটি পট থেকে দুটি করে প্রতিপক্ষ পেয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী একই দেশের দলের বিপক্ষে খেলতে হয়নি তাদের। এর মধ্যে চার ম্যাচ রিয়াল মাদ্রিদের নিজের মাটিতে। বার্নাব্যুতে রিয়ালের প্রতিপক্ষ হবে ইন্টার মিলান (পট ১), পিএসভি আইন্দহোভেন (পট ২), আরবি লাইপজিগ (পট ৩) লাস্ক (পট ৪)। অর্থাৎ নিজেদের মাঠে পট-১ থেকেই রিয়াল মাদ্রিদ পেয়েছে ইন্টার মিলানকে। পট-২ থেকে পিএসভি, পট-৩ থেকে লাইপজিগ এবং পট-৪ থেকে লাস্ক।
অন্যদিকে, অ্যাওয়েতেই রিয়ালের কঠিন পরীক্ষা। অ্যাওয়ে ম্যাচ খেলতে হবে আর্সেনাল (পট ১), রোমা (পট ২), শাখতার দোনেৎস্ক (পট ৩), এইকে এথেন্স (পট ৪)।
অ্যাওয়ে সূচিতে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ নিঃসন্দেহে আর্সেনালের মাঠে ম্যাচটি।

রিয়াল মাদ্রিদের হোম ও এওয়ে ম্যাচ
অপরাজেয় আর্সেনাল
পট-১ এর সবচেয়ে হাই-ভোল্টেজ ম্যাচ হতে পারে আর্সেনালের বিপক্ষে লড়াইটি। এবং তাতে মাদ্রিদিস্তাদের জন্য দুঃসংবাদ হিসেবে আছে ইতিহাস। একবারের জন্যও চ্যাম্পিয়ন্স লিগ শিরোপার ছোঁয়া না পাওয়া লন্ডনের এই ক্লাবটির বিপক্ষে চ্যাম্পিয়ন্স লিগে ‘একমেবাদ্বিতীয়ম্’ ক্লাব, ১৫টি ট্রফির জন্য ক্যাবিনেট বড় করতে নিয়মিত ব্যস্ত যে ‘ইনকোম্পারাব্লে’ ক্লাব, তার মাঠের ইতিহাস অস্বস্তিকর। কেমন অস্বস্তিকর?—‘ইনকোম্পারাব্লে’ বা ‘একমেবাদ্বিতীয়ম্’।
খাস বাংলায়, উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ইতিহাসে রিয়াল মাদ্রিদ কখনোই আর্সেনালকে হারাতে পারে নাই।

উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগে আর্সেনালের বিপক্ষে রিয়াল মাদ্রিদের পরিসংখ্যান
যদিও আর্সেনাল ২০১৭-২৩, টানা ৬ মৌসুম চ্যাম্পিয়ন্স লিগে অংশ নিতে পারেনি। আধুনিক সংস্করণে সব মিলিয়ে ৮ বার তারা সু্যোগ পায়নি তারা (বাকি দুই ১৯৯২-৯৩ ও ৯৩-৯৪।)
অন্যদিকে, “ইউরোপিয়ান কাপ” সংস্করণে রিয়াল মাদ্রিদ ১৪ বার এবং “উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ” সংস্করণে ৪ বার, মোট ১৮ বার অংশ নিতে পারেনি। এখানে একটা জিনিস গুরুত্বপূর্ণ, ১৯৯২ সালের আগে যখন এই টুর্নামেন্টটি যখন “ইউরোপিয়ান কাপ” ছিল, তখন লিগ চ্যাম্পিয়ন ছাড়া আর কেউ সুযোগ পেত না।
“ইউরোপিয়ান কাপ” যুগে ১৯৭১-৭২ ও ৯১-৯২ দুই মৌসুমে আর্সেনাল লিগ চ্যাম্পিয়ন হয়ে অংশ নেয়। তবে ১৯৮৮-৮৯ ও ৮৯-৯০-তে তারা লিগ চ্যাম্পিয়ন হয়েও অংশ নিতে পারেনি। কারণ ১৯৮৫ সালের সেই ‘হেইসেল স্টেডিয়াম ট্র্যাজেডি’র কারণে সব ইংলিশ ক্লাবের উপর উয়েফা ৫ বছরের নিষেধাজ্ঞা জারি করে। ফলে ইংল্যান্ডের লিগ চ্যাম্পিয়ন কেউই ৫ বছর ইউরোপের এই শীর্ষ মঞ্চে যোগ দিতে পারেনি।

ফুটবলে কলঙ্কিত 'হেইসেল স্টেডিয়াম বিপর্যয়'
যাই হোক, সাম্প্রতিক দেখায় (২০২৪-২৫) ডেক্লান রাইসের দুই ফ্রি-কিক গোল কোর্তোয়াকে স্তব্ধ করে দেয়। বিনিময়ে এমিরেটস স্টেডিয়ামের গ্যালারির ৫৭ হাজার দর্শকের মাঠ কাঁপানো উল্লাস শুরু হয়, আর ‘অ্যাশবার্টন আর্মি’র গর্জন।
পরের লেগে সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতেও ১-২ গোলে হারে লস ব্লাঙ্কোস। দুই লেগ মিলিয়ে ৫-১ ব্যবধানের লজ্জাজনক বিদায় নিতে হয় রিয়ালকে। এছাড়া গত মৌসুমে প্রিমিয়ার লিগ জয় ও চ্যাম্পিয়ন্স লিগে টাইব্রেকারে গিয়ে হেরে রানার-আপ হয় আর্সেনাল। ফলে, এবার গ্রুপপর্বে রিয়ালের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ আর্সেনাল ম্যাচ। বিশেষ করে এমিরেটস স্টেডিয়ামের গ্যালারির প্রায় ৫৮ হাজার গানারদের তীব্র হুঙ্কার।
আর ফর্মে থাকা আর্তেতার দলের মাঠের ১১ জন। এবং নতুন ফরম্যাট শুরু হবার পর ‘সুইস মডেল’ নিয়মে, গ্রুপপর্বে এক লেগের ম্যাচ হওয়াতে ভেন্যু নির্ধারিত হয় সুপারকম্পিউটারের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে (৪টা হোম, ৪টা এওয়ে ম্যাচ)। ফলে আর্সেনালকে বার্নাব্যুতেও খেলতে আসতে হচ্ছে না। বিশেষত, গ্রুপপর্বে।
ইন্টার মিলান

ইন্টার মিলানের প্রথম ইউরোপ চ্যাম্পিয়নের মুকুট
এই গ্রুপে ইন্টার মিলানের বিপক্ষে ম্যাচ হতে পারে লিগ পর্বের অন্যতম আকর্ষণীয় লড়াই। ইউরোপীয় ফুটবলে দুই ঐতিহ্যবাহী ক্লাবের মুখোমুখি হওয়া বাড়তি উত্তেজনা তৈরি করবে। যদিও চ্যাম্পিয়ন্স লিগ শিরোপা জয়ের সংখ্যায় রিয়াল মাদ্রিদ এগিয়ে।
রিয়ালের ১৫টি শিরোপার মধ্যে রেকর্ড হিসেবে ১৯৫৬ থেকে ১৯৬০ পর্যন্ত টুর্নামেন্টের প্রথম ৫টি আসরে টানা চ্যাম্পিয়ন হয়। টুর্নামেন্টটি সে সময় ইউরোপিয়ান কাপ হিসেবে পরিচিত ছিল। তাই ১৯৫৫ থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত আসরটিকে ইউরোপিয়ান কাপ যুগ বা ইউরোপীয় ক্লাব ফুটবলের টুর্নামেন্টের ইতিহাসের প্রথম অধ্যায় হিসেবে দেখা হয়। এরপর ১৯৯২-৯৩ মৌসুমে এই টুর্নামেন্টের নাম এবং ফরম্যাট পরিবর্তন করে বর্তমানের উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ করা হয়। মোট ১৮ বার এই টুর্নামেন্টের ফাইনাল খেলেছে রিয়াল মাদ্রিদ। রানার-আপ হয়েছে ৩ বার। কাকতালীয় বিষয় হলো ইন্টারও ৩ বার ফাইনাল হেরেছে।

আধুনিক উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগেও রিয়াল মাদ্রিদ টানা ৩ বার চ্যাম্পিয়ন (২০১৬–২০১৮) চ্যাম্পিয়ন হয়। এতে আরেকটি রেকর্ড হয় ১৯৯২ সালে টুর্নামেন্টের নাম "উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ" হওয়ার পর কোনো দলই টানা দুইবার ট্রফি জিততে পারছিল না। জিনেদিন জিদানের অধীনে রিয়াল মাদ্রিদ সেই বৃত্ত ভেঙে টানা হ্যাটট্রিক শিরোপা জেতার রেকর্ড গড়ে। যে রেকর্ডে ভাগ বসানোর সুযোগ রয়েছে টানা দুইবার চ্যাম্পিয়ন্স লিগজয়ী লুইস এনরিকের পিএসজি।
অন্যদিকে, ইতালিয়ীয় ক্লাব ইন্টার মিলানও আসরটির ইতিহাসে অন্যতম সফল এবং ঐতিহ্যবাহী দল। তারা এ পর্যন্ত ৭ বার ফাইনাল খেলে ৩ বার চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করেছে। মজার ব্যাপার হলো, ১৯৬৩-৬৪ মৌসুমে ইন্টার মিলান তাদের প্রথম শিরোপা জয় করে স্প্যানিশ পরাশক্তি রিয়াল মাদ্রিদকে হারিয়ে।
আরো মজার ব্যাপার হলো, আসরটিতে ছিল ইন্টারের অভিষেক মৌসুম, অর্থাৎ প্রথমবারের মতো অংশগ্রহণ করতে এসেই পুস্কাস, আলফ্রেডো ডি স্টেফানোর মতো কিংবদন্তী ফুটবলারদের ক্লাবকে, তৎকালীন ৫ বারের ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়ন ক্লাবকে, ফাইনালে ৩-১ গোলে হারিয়ে অবিশ্বাস্য কীর্তি গড়ে প্রথমবারের মতো শিরোপা জয়ের স্বাদ পায়।

টানা ২য় বার ইউরোপ সেরা ইন্টার মিলান (১৯৬৪-৬৫)
শুধু তাই না, ১৯৬৪-৬৫ মৌসুমেই টানা দ্বিতীয়বার চ্যাম্পিয়ন্স লিগ বা তৎকালীন ইউরোপিয়ান কাপ জয়ী হয়। পর্তুগিজ ক্লাব বেনফিকাকে ১-০ হারিয়ে বেনফিকার রেকর্ডেই ভাগ বসিয়ে ফেলে। কারণ, ১৯৬০-৬১ ও ১৯৬১-৬২ মৌসুমে বেনফিকা টানা দুইবার শিরোপা জয় করে নিজদেরকে ইউরোপের অন্যতম পরাশক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে নিয়েছিল। ইন্টার মিলানের এই প্রথম দুই শিরোপাই আসে ইউরোপের জায়ান্ট ক্লাব দুটোকে হারিয়ে। হেলেনিও হেরেরার অধীনে রক্ষণাত্মক ফুটবল কৌশলের এই যুগটিকে ক্লাবের ইতিহাসে ‘গ্রান্দে ইন্টার’ বলা হয়।

২০০৯-১০ মৌসুমে ট্রেবলজয়ী ইন্টার মিলান
শুধু তাই না, ইন্টারের সর্বশেষ শিরোপাটিও আসে ইউরোপের জার্মান জায়ান্ট বায়ার্ন মিউনিখকে হারিয়ে। দীর্ঘ ৪৫ বছরের খরা কাটিয়ে জোসে মরিনিওর ইন্টার মিলান ফাইনালে বায়ার্ন মিউনিখকে ২-০ গোলে হারিয়ে তাদের তৃতীয় শিরোপা জেতে। এবার জোসে মরিনিওর রিয়াল মাদ্রিদের বিপক্ষে প্রথম রাউন্ডের ম্যাচ তাই বিশেষভাবে গুরুত্ব পাবে। উল্লেখ্য যে, ইন্টার মিলান সেই ২০০৯-১০ মৌসুমেই ‘ট্রেবল’ জয়ের মতো বিরল গৌরব অর্জন করে। যা আজও স্প্যানিশ জায়ান্ট রিয়াল মাদ্রিদের অধরা স্বপ্ন। আজতক রেকর্ড হিসেবে ইন্টার মিলান একমাত্র ইতালীয় ট্রেবল জয়ী ক্লাব (চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, সিরি আ এবং কোপ্পা ইতালিয়া)।
আরেকটি রেকর্ড, ২০০৯-১০ মৌসুম শুধু ইন্টার মিলানের না, ইতালীয় লিগেরই সর্বশেষ উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ শিরোপা জয় ছিল। এরপর আর কোনো ইতালীয় ক্লাব এই ট্রফি ছুঁয়ে দেখতে পারেনি। ইউভেন্টাস গত দশকে দাপট দেখালেও, দুইবার ফাইনালে উঠলেও বার্সেলোনা (২০১৫, সেমিফাইনালে রিয়াল মাদ্রিদকে হারিয়েছিল) এবং রিয়াল মাদ্রিদের (২০১৭, কোয়ার্টার ফাইনালে বার্সেলোনাকে হারিয়েছিল) কাছে হেরে যায়।
ইন্টার মিলানের প্রসঙ্গে আসি, ২০২৩ সালে আবার ফাইনালে উঠলেও পেপ গার্দিওলার শক্তিশালী ম্যানচেস্টার সিটির কাছে হেরে রানার-আপ হয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয়। আর ২০০৯/১০ এর পর ইতালীয় লিগের দুই দল শুধু দুইবার সেমিফাইনাল খেলেছিল। আইরনিক্যালি ২০২৩ সালে সেমিফাইনালে এসি মিলান ও ইন্টার মিলানের খেলা পড়ে যায়। চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীর কাছে হেরে সেমিতেই থেমে যায় এসি মিলাম। আর ইন্টার ১৩ বছর পর আবার ফাইনালে ওঠে।
রোমা, ২০১৭-১৮ স্মৃতির উদ্যমে

২০১৭-১৮ মৌসুমের চমক এএস রোমা
চ্যাম্পিয়ন্স লিগে ২০০৯-১০ ইতালীয় লিগ থেকে সেমিফাইনাল পর্যন্ত সাফল্য বললে, রিয়াল মাদ্রিদের এবারের ইতালীয় প্রতিপক্ষ এএস রোমা। যারা ২০১৭-১৮ মৌসুমটাকেই জমজমাট করে তুলেছিল। কোয়ার্টার ফাইনালে বার্সেলোনার বিপক্ষে ফিরতি লেগে দুর্দান্ত কামব্যাক দিয়ে দর্শকদের মুগ্ধ করতে সফল হয়। অথচ ক্যাম্প ন্যু-তে প্রথম লেগে ৪-১ গোলের বড় ব্যবধানে হেরে ভক্তদের হতাশই করেছিল।
কিন্তু দ্বিতীয় লেগে রোমা নিজেদের মাঠ স্তাদিও অলিম্পিকোতে রূপকথার মতো খেলে তারা বার্সেলোনাকে ৩-০ ব্যবধানে হারিয়ে দেয়। আর দুই লেগ মিলিয়ে মোট স্কোরলাইন হয় ৪-৪। রোমা এওয়ে গোলে এগিয়ে থাকার সুবিধায় (নিয়মটি ২০২১/২২ মৌসুম থেকে বাদ দেয়া হয়) সেমিফাইনালে উঠে যায়। আর ইনিয়েস্তা, মেসি, সুয়ারেজদের শিরোপার অন্যতম দাবিদার বার্সেলোনাকে টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে দেয়।
রোমার রোমাঞ্চকর চমক দেখানো সেখানেই শেষ হয় না। সেমিফাইনালে লিভারপুলের কাছে হেরে যায় বটে, তবে দুই লেগ মিলিয়ে স্কোরলাইন ৭-৬। রোমা ও রোমার সমর্থক ও ফুটবল দর্শকদের জন্য সেই মৌসুমে রোমার কীর্তি স্মরণীয় হয়ে আছে।

সেমিফাইনালে লিভারপুলের কাছে হেরে যায় বটে, তবে দুই লেগ মিলিয়ে স্কোরলাইন ৭-৬
এওয়ে ম্যাচ হিসেবে, ইতালিতে রোমার মাঠেও খেলতে হবে রিয়ালকে। স্টাডিও অলিম্পিকো গ্যালারিজুড়ে যেন রোমান সাম্রাজ্যের মুহুর্মুহু হুঙ্কার। ইতালির রোম শহরের এই ঐতিহাসিক স্টেডিয়ামটি বড় ম্যাচের রাতে প্রতিপক্ষের জন্য এক বিশাল পরীক্ষা।
আর্সেনালের ‘অ্যাশবার্টন আর্মি’র মতো স্টেডিয়ামের দক্ষিণ দিকের এই ‘কার্ভা সুদ’ গ্যালারিতে রোমার সবচেয়ে কট্টর সমর্থকরা বসেন। ম্যাচ শুরুর আগে যখন পুরো স্টেডিয়াম একসঙ্গে ক্লাবের অ্যান্থেম গায়, তখন যেকোনো বড় দলের খেলোয়াড়দের মধ্যেও কাঁপন ধরে যায়।

‘কার্ভা সুদ’ গ্যালারি
দীর্ঘ ৭ বছর পর রোমা আবারও উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগে খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছে। একবার রানার-আপ, একবার সেমিফাইনালিস্ট ও দুবার কোয়ার্টার ফাইনাল খেলা রোমা চ্যাম্পিয়ন্স লিগে এবার জায়গা করে নিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছে, আবার তারা যে কোনো অঘটন ঘটানোর মতো যথেষ্ট শক্তিশালী ও প্রস্তুত।
এইকে এথেন্স: ট্রোজান ঘোড়া

রিয়াল মাদ্রিদের সামনে এইকে এথেন্সকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। যদিও চ্যাম্পিয়নস লিগে এইকে এথেন্সের সবচেয়ে বড় সাফল্য ১৯৬৮-৬৯ মৌসুমে কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত পৌঁছানো। তাই বলে ১৫ বারের চ্যাম্পিয়নকে তারা নিজের মাটিতে সহজে ছেড়ে দেবে, এমন কথা ইতিহাস বলে না।
চ্যাম্পিয়ন্স লিগে এইকে এথেন্স রিয়াল মাদ্রিদের মুখোমুখি হয়েছে দুবার। দুই ম্যাচই ড্র, গোলসংখ্যা ৫-৫। ২০০২-০৩ মৌসুমের এই ঐতিহাসিক লড়াইতে এইকে এথেন্স সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে ২-২ গোলে এবং নিজেদের মাঠে ৩-৩ গোলে ড্র করে বিশ্বকে চমকে দেয়।

রিয়াল মাদ্রিদ বনাম এইকে এথেন্স
এছাড়া, ১৯৮৫-৮৬ মৌসুমের উয়েফা কাপের (বর্তমান ইউরোপা লিগ) প্রথম রাউন্ডে দুই দল প্রথমবার মুখোমুখি হয়েছিল। প্রথম লেগে এইকে এথেন্স নিজেদের মাঠে রিয়াল মাদ্রিদকে ১-০ গোলে হারিয়ে চমক দেখিয়েছিল।
উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ইতিহাসে আরো এক বিরল ও অবিশ্বাস্য রেকর্ডের অধিকারী এই গ্রিক ক্লাব, যা আজ পর্যন্ত ফুটবল বিশ্বের আর কোনো ক্লাব গড়তে পারেনি—চ্যাম্পিয়ন্স লিগের গ্রুপ পর্বে এক ম্যাচও না হেরে, অপরাজিত থেকে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নেয় ২০০২-০৩ মৌসুমে। সেই আসরে এথেন্স গ্রুপ সি-তে প্রতিপক্ষ পায় ইউরোপের দুই পরাশক্তি রিয়াল মাদ্রিদ ও এএস রোমা এবং বেলজিয়ামের ক্লাব গেঙ্ক। গ্রুপ পর্বের ৬ ম্যাচের সবগুলো ড্র করে।

২০০২-০৩ চ্যাম্পিয়ন্স লিগ আসরে এথেন্সের রেকর্ড
ইউরোপিয়ান প্রতিযোগিতায় অপরাজিত থাকার এই ভূত এথেন্সের পিছু ছাড়েনি। ২০১৭-১৮ মৌসুমের উয়েফা ইউরোপা লিগেও তারা গ্রুপ পর্বের ৬ ম্যাচের ১টি জিতে, ৫টি ড্র করে অপরাজিত থেকে পরের রাউন্ডে উঠেছিল। এরপর শেষ ৩২-এর রাউন্ডে ডায়নামো কিয়েভের সাথে দুই লেগই ড্র করে (১-১ এবং ০-০) অ্যাওয়ে গোলের নিয়মে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নেয়। অর্থাৎ সেবারও পুরো আসরে এক ম্যাচও না হেরে বিদায় নিয়েছিল।
কিন্তু রিয়ালের জন্য এইকে এথেন্সের মাঠই হতে পারে বিপদের কারণ।

ওপাপ এরেনা
ওপাপ এরেনা—সফরকারী দলের জন্য সবচেয়ে ভয়ংকর ও প্রতিকূল পরিবেশ। গ্রিসের ফুটবল আল্ট্রাস (সমর্থকরা) পুরো ইউরোপেই তাদের উগ্র ও উন্মাদনায় ভরা সমর্থনের জন্য পরিচিত। স্টেডিয়ামটির গ্যালারি মাঠের খুব কাছাকাছি হওয়ায় দর্শকদের গগনবিদারী চিৎকার, ড্রামের আওয়াজ এবং আতশবাজিতে পুরো মাঠ নরককুণ্ডে পরিণত করে।
এমনকি এই স্টেডিয়ামে প্রতিপক্ষ দলের ড্রেসিংরুমও এমন পাশে রাখা হয়েছে যেটা এইকে এথেন্সের সবচেয়ে কোলাহলপূর্ণ আল্ট্রাস স্ট্যান্ডের কাছাকাছি। যেন ম্যাচের আগেই প্রতিপক্ষকে মানসিকভাবে দুর্বল করা যায়।
শাখতার: ২০২০-২১ এর উদ্দীপনায়

শাখতার দোনেৎসক ইউক্রেনের অন্যতম সফল ক্লাব এবং নিয়মিত চ্যাম্পিয়নস লিগে খেলা দল। ইউরোপের ক্লাব ফুটবলে তাদের সবচেয়ে বড় সাফল্য ২০০৮-০৯ মৌসুমে উয়েফা কাপ জয়। চ্যাম্পিয়নস লিগে তাদের সেরা অর্জন ২০১০-১১ মৌসুমে কোয়ার্টার ফাইনাল।
যেহেতু শাখতার তাদের নিজস্ব দেশে খেলতে পারছে না এবং লন্ডনের স্ট্যামফোর্ড ব্রিজ (চেলসির মাঠ) ধার করে খেলছে, তাই এই মাঠে তারা নিজস্ব উগ্র হোম অ্যাডভান্টেজ বা চেনা আবহ পাবে না। ফলে প্রতিপক্ষের জন্য এই মাঠে খেলা তুলনামূলক সহজ হতে পারে। কিন্তু রিয়াল মাদ্রিদকে বাড়তি সতর্ক থাকতে হবে ইউক্রেনের দলটির বিপক্ষে।

রিয়াল মাদ্রিদের বিপক্ষেও শাখতারের রয়েছে স্মরণীয় ইতিহাস
কারণ রিয়াল মাদ্রিদের বিপক্ষেও শাখতারের রয়েছে স্মরণীয় ইতিহাস। ২০২০-২১ মৌসুমে গ্রুপ পর্বের দুই ম্যাচেই রিয়ালকে হারিয়েছিল তারা; মাদ্রিদে ৩-২ এবং নিজেদের হোম ম্যাচে ২-০ গোলে। ২০২২-২৩ মৌসুমেও রিয়ালের সঙ্গে ড্র করে তারা।
এক নজরে রিয়াল মাদ্রিদের ৮ ম্যাচ

চ্যাম্পিয়নস লিগের নতুন লিগ-পর্বের নিয়ম অনুযায়ী ৩৬ দল একটি অভিন্ন লিগ টেবিলে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে। প্রতিটি দল খেলবে আটটি ম্যাচ। চারটি ঘরের মাঠে এবং চারটি অ্যাওয়েতে।
লিগ পর্ব শুরু হবে ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬। শেষ হবে ২৭ জানুয়ারি ২০২৭। শীর্ষ আট দল সরাসরি শেষ ষোলোতে উঠবে। ৯ থেকে ২৪ নম্বরে থাকা দলগুলো খেলবে নকআউট প্লে-অফ। আর ২৫ থেকে ৩৬ নম্বরে থাকা দলগুলোর ইউরোপীয় অভিযান সেখানেই শেষ হবে। রিয়ালের আট ম্যাচের নির্দিষ্ট তারিখ ও কিক-অফ সময় ২৯ আগস্টের মধ্যে প্রকাশ করার কথা জানিয়েছে উয়েফা।
এবারের চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনাল হবে ৫ জুন ২০২৭, মাদ্রিদের মেত্রোপলিতানো স্টেডিয়ামে। ফলে শেষ পর্যন্ত রিয়াল যদি ফাইনালে পৌঁছাতে পারে, তাহলে নিজেদের শহরেই ইউরোপসেরার লড়াইয়ে নামার সুযোগ থাকবে।
রিয়ালের লিগ পর্ব: ঘরে ইন্টার–পিএসভি–লাইপজিগ–লাস্ক, বাইরে আর্সেনাল–রোমা–শাখতার–এইকে এথেন্স।

রনক জামান
খেলাধুলার সব খবর ও বিশ্লেষণ সবার আগে পেতে চোখ রাখুন খেলারদেশে।
সম্পর্কিত আরও খবর
ফিচারমেসি না রোনালদো, কে আগে অবসর নেবেন?
ফিচাররোনালদো কি এই মৌসুমেই ছেলের সঙ্গে মাঠে নামবেন?
ফিচারমার্কো ফন বাস্তেন: উট্রেখটের রাজহাঁস
ফিচারহাসান মাহমুদের বল যে ভাষায় সফল
ফিচারফুটবল ইতিহাসে সেরা ১০ : লোনে পাঠিয়ে মাথায় হাত
ফিচার
মন্তব্যসমূহ (0)
মন্তব্য করতে এবং আলোচনায় অংশ নিতে আপনার গুগল অ্যাকাউন্ট দিয়ে লগইন করুন।