খেলারদেশ

হাসান মাহমুদ বোলিং বিশ্লেষণ

হাসান মাহমুদের বল যে ভাষায় সফল

ডারউইনের মারারা স্টেডিয়ামে অস্ট্রেলিয়াকে কাঁপিয়ে বাংলাদেশের স্বপ্নের সূচনা, নাহিদ রানার অভাব পুষিয়ে দিলেন হাসান মাহমুদ

হাসান মাহমুদের বল যে ভাষায় সফল

হাসান মাহমুদ

রনক জামান
By রনক জামান

‘ওই যে বোলারটা উইকেট নেওয়ার পর সেলিব্রেশন করে না?’—এভাবেই ক্রিকেটভক্তদের কাছে যে হাসান মাহমুদ নাম্নী ক্রিকেটারের পরিচয়।

আউট হওয়া ব্যাটার যেন অপমানবোধ না করেন, সেদিকে সতর্ক থাকা ‘অমায়িক’ বোলার হিসেবে পরিচিত হাসান মাহমুদ ২২ গজ সামনের ব্যাটারদের প্রতি কতটা নির্মম তা প্রতিপক্ষ ব্যাটারই বলতে পারবেন ভালো। আর বলতে পারে তার বোলিং পরিসংখ্যান। ধীরে ধীরে এই 'বিনয়ী' পরিচয় মাঠের নৈপুণ্যের পরিচয়ে বদলাতে থাকে। তবে ধীরে ধীরেই ছিল এতকাল। আজ ১৭ ওভারে ক্রিকেটবিশ্বের কাছে ‘চমক’ ও ‘তারকা’ বনে যাওয়ার আশা কেউ করেননি হয়ত।

Image

বিশেষ করে প্রথম বলেই ট্র্যাভিস হেডের কাছে বাউন্ডারি খেয়ে বসেন যিনি। এমনকি ট্র্যাভিস হেডকে বোল্ড আউট করার পরও কেউ ভাবেনি হাসান আজ অস্ট্রেলিয়ার মাটিতেই বিশেষ কিছু করতে যাচ্ছেন।

মুস্তাফিজ-রুবেল অভিষেকেই রাতারাতি বিখ্যাত হয়েছিলেন। নাহিদ রানা গতির ঝড়ে আর উইকেটের রেকর্ডে যত দ্রুত বিখ্যাত হয়েছেন, হাসান মাহমুদের ক্ষেত্রে সেরকম সুযোগ কম ছিল। দলের তারকা বোলারদের আড়ালে হাসান মাহমুদের নৈপুণ্য অতটা আলোচিত হয় না। কারণ, তিনি ১৫০+ বেগে বল করতে পারেন না। শারীরিক গঠনেও এবাদত, তাসকিন বা নাহিদের মতো না। দেখে মনেও হয় না ম্যাচের পাঁচদিন মাঠের রোদে জানে টিকবে। কিন্তু তারপরও হাসান মাহমুদ বিশেষ। নীরবে মাঠে নিজের দায়িত্ব পালন করে যান। উইকেট তুলে নেন দলের জন্য, স্ট্যাম্প ভেঙে থাকেন নির্মোহ-চুপচাপ, বিনয়ের অবতার।

ট্র্যাভিস হেডকে ইনসুইং ফাঁদে ফেলে ইনসাইড এজে বোল্ড আউট করার পর

ট্র্যাভিস হেডকে ইনসুইং ফাঁদে ফেলে ইনসাইড এজে বোল্ড আউট করার পর

নাহিদ রানার ছায়ায় পড়ার সুযোগ ছিল না অস্ট্রেলিয়া ট্যুরে। আর সেই সুযোগেই বাজিমাত করে বসলেন হাসান মাহমুদ। ডারউইনে টসে জিতে ব্যাটিং করতে নামার সিদ্ধান্ত নেন অজি অধিনায়ক প্যাট কামিন্স। নিজেদের মাটিতে স্বাগতিকরা পূর্ণ শক্তি নিয়ে মাঠে নামে। কিন্তু ২০০ রান পার করার আগেই অলআউট হয়ে যাওয়ায় টাইগারদের বিপক্ষে লজ্জার রেকর্ড গড়ল। এর পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান যিনি রেখেছেন, তার নাম হাসান মাহমুদ। ৩.০৫ ইকোনমি রেটে ৩ ওভার মেডেন দিয়ে খরচ করেন ৫৫ রান। বদলে নেন অস্ট্রেলিয়ার ছয় উইকেট। এই ৬ উইকেটের ৫টাই ক্যাচ আউট (*)।

এই ইনিংস শেষে বাংলাদেশের জন্য আরেকটি রেকর্ড যোগ হয়। যেখানে দ্বিতীয়বারের মতো এক ইনিংসের সব উইকেটই পেসাররা তুলে নিয়েছেন। হাসান মাহমুদের উইকেট সংখ্যাটা মূলত হতে পারত ৭—যদি গালিতে দাঁড়ানো শাদমান আরেকটু সতর্কতায় স্মিথের (১৩) ক্যাচটি তুলে নিতে পারতেন।

শাদমান যে ক্যাচ লুফে নিয়ে ১৩ রানেই স্টিভ স্মিথকে আউট করতে পারেননি, বলটা চলে যায় সীমানার বাইরে

শাদমান যে ক্যাচ লুফে নিয়ে ১৩ রানেই স্টিভ স্মিথকে আউট করতে পারেননি, বলটা চলে যায় সীমানার বাইরে

যদিও স্টিভ স্মিথ ব্যক্তিগত ২ রানেই থেমে যেতে পারতেন। এবাদত হোসেনের বলে থার্ড স্লিপে ক্যাচ তুলে দেন তানজিদ তামিমের হাতে। ক্যাচ ফসকায়, বেঁচে যান স্মিথ। স্মিথের কতগুলো বাউন্ডারিও আসে ভুল ব্যাটে-বলে (‘কী-নাম-জানি-না-শট’?)। এবাদতের ওভারে ক্যাচআউটও হন স্মিথ (৭)। ফিল্ড আম্পায়ার আউট না দিলে রিভিউ নেয় বাংলাদেশ। রিভিউ যখন টিভি আম্পায়ারের রুমে, স্মিথ তখন সাজঘরের দিকে হাঁটতে শুরু করেছেন। টিভি আম্পায়ার নট আউট রায় দিলেই তিনি আবার ক্রিজে ফেরেন।

ব্যক্তিগত ২ রানে স্মিথ, তখন স্লিপে ক্যাচ মিস করেন তানজিদ তামিম

ব্যক্তিগত ২ রানে স্মিথ, তখন স্লিপে ক্যাচ মিস করেন তানজিদ তামিম

স্নিকোমিটারে স্পাইক না আসার বিষয়ে স্মিথ স্বীকার করেন, ‘আমার মনে হয়, হ্যাঁ! নিশ্চিতভাবেই বলটা ব্যাটের কানায় স্পর্শ করেছে বলেই অনুভব করেছি। আউট দিলে আমি সোজা মাঠ থেকে বের হয়ে যেতাম। কিন্তু প্রযুক্তি আমাকে বাঁচিয়ে দিয়েছে আজ। সাধারণত এই প্রযুক্তি খুবই নিখুঁত হয়। হয়ত বল ব্যাটে লাগেনি, ঠিক জানি না।’

স্নিকোমিটারে স্টিভ স্মিথের স্পাইক না আসার ছবি

স্নিকোমিটারে স্টিভ স্মিথের স্পাইক না আসার ছবি

১০৪, ২১২, ১৩২ এবং ১৯৮—মজার ব্যাপার হচ্ছে, সংখ্যাগুলো অজিদের শেষ চার টেস্ট ম্যাচের প্রথম ইনিংসের স্কোর। তবু ম্যাচ নিয়ে স্মিথ আত্মবিশ্বাসী, ‘আজকের দিনটা আমাদের জন্য মোটেও ফলপ্রসূ ছিল না। তবে এখনও ম্যাচের অনেক বাকি আছে।’ কিন্তু আজকের ইনিংস শেষে ধারাভাষ্যকারের মুখে, ‘দলীয় রান থেকে এতবার লাইফ পাওয়া স্মিথের ৭১ রান বিয়োগ করলে কী অবস্থা হতো?!’

হ্যাঁ, অবশেষে ৭১ রানে আউট হন স্মিথ। হাসান মাহমুদের বাউন্সার সজোরে হাঁকাতে গিয়ে লিটন দাসের গ্লাভসে বলটা জমা দেন। হাসান মাহমুদ ইনিংসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উইকেটই শুধু তোলেননি, স্মিথের উইকেট দিয়েই নিজের ফাইফার (৫ উইকেট) তুলেছেন আর অনন্য রেকর্ড গড়ে বসেছেন : অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে যে কোনো ফরম্যাটে বাংলাদেশের হয়ে প্রথম ফাইফার শিকারি ‘হাসান মাহমুদ’।

স্মিথকে আউট করেই অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে প্রথম বাংলাদেশি ক্রিকেটার হিসেবে ফাইফার তুলে নেয়া

স্মিথকে আউট করেই অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে প্রথম বাংলাদেশি ক্রিকেটার হিসেবে ফাইফার তুলে নেয়া

ছয় উইকেট সম্পর্কে বলতে গিয়ে হাসান জানান যে, স্মিথের উইকেটটা বেশি স্পেশাল ছিল। স্মিথ তার বল প্রেডিক্ট করতে পারছিল না। কিন্তু হাসান স্মিথকে প্রেডিক্ট করেন ঠিকই, ‘আমার ইন্সটিংক্ট বলছিল ও কিছু একটা করতে যাচ্ছে, তাই আমিও বাউন্সার দিলাম...পরে মিস করছে।’ ইনিংস শেষে ট্রাভিস হেড ‘ভালো বল করেছ’ বলে প্রশংসা করেন আর নাথান লায়ন আগ্রহ নিয়ে হাসানকে জিজ্ঞেস করেন, ‘তোমার কয়টা ফাইফার হলো?’

‘তোমার কয়টা ফাইফার হলো?’

পাকিস্তানের বিপক্ষে হাসান মাহমুদের প্রথম ফাইফার

পাকিস্তানের বিপক্ষে হাসান মাহমুদের প্রথম ফাইফার

হাসান মাহমুদের এই নিয়ে ৩টি ফাইফার হলো। ১৫ টেস্টে ৩৬ উইকেট, ৩ ফাইফার। সবগুলো ফাইফার বিদেশের মাটিতে। প্রথমটা ছিল ২০২৪ সালে পাকিস্তানের বিপক্ষে, রাওয়ালপিন্ডিতে। সেই টেস্ট সিরিজের দুই ম্যাচেই পাকিস্তানকে হারিয়ে হোয়াইটওয়াশ করে টাইগাররা। এতে দুর্দান্ত ভূমিকা রেখেছিলেন হাসান মাহমুদ এবং নাহিদ রানা।

তার মেধা চিনতে ভুল করেনি ইংল্যান্ডের কাউন্টি ক্রিকেট। সাকিব আল হাসানের পর তিনি দ্বিতীয় খেলোয়াড় হিসেবে যোগ দেন। আর কাউন্টি চ্যাম্পিয়নশিপে প্রথম ২ ম্যাচেই বাজিমাত করে বসেন। শিকার করেন মোট ১২ উইকেট। এর মধ্যে ল্যাঙ্কাশায়ারের বিপক্ষে অভিষেকেই তিনি ম্যাচে ৯ উইকেট (১ম ইনিংসে ৩, ২য় ইনিংসে ৬ উইকেট) নিয়ে ম্যাচসেরা হন।

শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে, ২০২৪

শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে, ২০২৪

হাসান মাহমুদের টেস্ট অভিষেক হয় ২০২৪ সালের মার্চে, শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে। অভিষেক ম্যাচে শিকার করেন ৬ উইকেট (প্রথম ইনিংসে ২, দ্বিতীয় ইনিংসে ৪)—দুই ক্যাচ মিস না হলে সংখ্যাটা হতে পারত ৮।

২০২৪ সালেই তিনি ভারতের বিপক্ষে প্রথম ইনিংসে ৫ উইকেট তুলে নিয়ে অনন্য রেকর্ড গড়েন : ভারতের মাটিতে টেস্টে ফাইফার তুলে নেওয়া ইতিহাসের প্রথম বাংলাদেশি বোলার। কাকে কাকে শিকার করেন হাসান? রোহিত শর্মা (৬), শুভমান গিল (০), বিরাট কোহলি (৬), ঋষভ পন্থ (৩৯), জাসপ্রিত বুমরাহ (৭)। মজার ব্যাপার হলো, এই ৫ উইকেটই ছিল ক্যাচ আউট (*)। হাসান মাহমুদের বোলিং কৌশলের সঙ্গে ক্যাচ আউট কেন এত জড়িত—সেই প্রসঙ্গ থাকছে তার বোলিং কৌশলের আলোচনায়।

ভারতের মাটিতে হাসান মাহমুদের ২য় ফাইফার

ভারতের মাটিতে হাসান মাহমুদের ২য় ফাইফার

নিঃসন্দেহে, নাহিদ রানা বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্য আশির্বাদ ও বড় সম্পদ। অস্ট্রেলিয়ার মতো দলের বিপক্ষে তার না থাকা নিয়ে আফসোস করা স্বাভাবিক। কিন্তু সেই আফসোস দূর করে আলো কেড়ে নিলেন হাসান মাহমুদ। এমনকি ৩য় ইনিংসের প্রস্তুতির জন্য বারবার যার বোলিং একশন দেখা হচ্ছে, এনালাইসিস চলছে, হাসান মাহমুদের সরল ও খাঁটি বাঙালি চেহারা ভিডিও রিপ্লেতে বারবার দেখতে হচ্ছে, কাদের? ক্রিকেট বিশ্বের অদ্বিতীয় দলের খেলোয়াড়, কোচ ও স্টাফদের। হাসান মাহমুদ যদি প্যাট কামিন্সের জন্য ‘দুর্ভাগ্য’ হয়ে থাকেন, তবে নাহিদ রানাকে না চেনা কামিন্সের জন্য ‘সৌভাগ্য’ বলা যায়, আপাতত। কেননা, ম্যাচ সত্যিই আরো অনেক বাকি।

১৯৮ রানে অলআউট অস্ট্রেলিয়া

১৯৮ রানে অলআউট অস্ট্রেলিয়া

তবে প্রথম দিনেই বাংলাদেশের বিপক্ষে অস্ট্রেলিয়ার এক ইনিংসে সর্বনিম্ন রানের রেকর্ড হলো। মাত্র ৫৩ ওভার খেলতেই ১০ উইকেট হারায়, বাংলায় যাকে বলে ‘প্যাকেট’ হয় ১৯৮ রানে। টেস্টে বাংলাদেশের মতো দলের বিপক্ষে ২০১৭ এর পর সর্বনিম্ন। ২০১৭ সালে মিরপুরে বাংলাদেশের বিপক্ষে অজিদের সর্বনিম্ম ইনিংসের রেকর্ড ছিল ২১৭/১০ ও ২৪৪/১০। ৫ম দিন পর্যন্তও গড়াতে পারেনি ম্যাচটি। ২০ রানের জয় তুলে নিয়ে অজিদের বিপক্ষে প্রথমবারের মতো টেস্ট জয়ের স্বাদ পেয়েছিল টাইগাররা। ম্যাচে ১০ উইকেট তুলে নিয়েছিলেন ম্যাচসেরা সাকিব আল হাসান। ২০১৭ সালে ম্যাচ আম্পায়ার মিরপুরের সেই পিচকে ‘বিলো অ্যাভারেজ’ রেটিং দিয়েছিলেন।

কিন্তু ডারউইনের উইকেটকে দোষ দেওয়ার সুযোগ নেই। পিচের ৪ মিলিমিটার উঁচু ঘাস সচরাচর ফাস্ট ও পেস বোলারদের জন্য বাউন্স, সুইং ও গতি নিয়ন্ত্রণের জন্য সহায়ক হয়। তবে ডারউইনের রোদে পোড়া শুকনো ঘাসে ব্যাটে বল পেতেও সমস্যা হয় না। সহজ শটের সুযোগও থাকে, বাংলাদেশের ১ উইকেটে ৯৬ রানে দিন শেষ করা তারই প্রমাণ। প্যাট কামিন্সের টসে জিতে ব্যাট করার সিদ্ধান্তও তারই প্রমাণ। মাঠের বাতাস ও ঘাসের সুবিধা নিয়ে বোলাররা পরিকল্পনা মতো বল না করলে ব্যাটাররা টেস্ট ম্যাচেও মুহুর্মুহু শাস্তি দিতে ছাড় দেবে না এরকম উইকেটে।

সামান্য সিম মুভমেন্ট ছিল, তবে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটারদেরই ব্যর্থতা চোখে পড়ার মতো। কারণ আজকের পিচ খারাপ ছিল না। আমার ধারণা, দ্বিতীয় ও তৃতীয় দিনে পিচ আরো ব্যাটিং সহায়ক হবে।

মার্ক ওয়াহ

অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে এটা ৭ম টেস্ট। ১ জয়ের আগে হেরে যাওয়া ৫ ম্যাচের শুরু ছিল এইখানেই, ডারউইনের স্টেডিয়ামে। গ্লেন ম্যাকগ্রা, গিলেস্পিদের দাপটে বাংলাদেশ ইনিংস ব্যবধানে হেরেছিল। প্রশ্ন হচ্ছে, ভক্তদের প্রত্যাশা বাড়ানো হাসান মাহমুদের পারফরম্যান্স ও ব্যাটিং-এ সুবিধাজনক অবস্থায় থাকা এই ম্যাচের মধ্য দিয়ে কি ২৩ বছর আগের দুঃখ ঘোচাতে পারবে টাইগাররা? উত্তরটা সময়ই বলে দেবে।

ম্যাচে টসে জিতে ব্যাটিং করতে নামা অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ৪৫ রানে প্রথম ব্রেক থ্রু এনে দেন হাসান। পরের উইকেট হারানোর আগে স্কোরবোর্ডে আরো ৭ রান যোগ করতে পারে স্বাগতিকরা। দ্বিতীয় উইকেটটাও তুলে নেন হাসান, ট্রাভিস হেডের স্টাম্প ভেঙে দিয়ে ২২ রানে সাজঘরে পাঠিয়ে দেন। এরপর নিয়মিত বিরতিতে উইকেট হারিয়ে ভেঙে পড়ে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং লাইনআপ। হাসান মাহমুদের সাফল্যের কারণ কী বা তার বোলিং কৌশল কীরকম?

Image

নতুন বলে শুরু থেকেই অস্ট্রেলিয়ার দুই ওপেনারকে চাপে রাখেন হাসান মাহমুদ ও তাসকিন আহমেদ। হাসানের পরিকল্পনা ছিল স্পষ্ট, অফ স্টাম্পের বাইরে ধারাবাহিকভাবে বল ফেলে ব্যাটারদের ভুল করতে বাধ্য করা। নতুন বলে বিপদজনক সুইং দেওয়ায় হাসান মাহমুদ অত্যন্ত দক্ষ। আউটসুইংয়ের ফাঁদে ফেলে তিনি প্রথমে ওপেনারকে ফিরিয়ে দেন। এরপর ইনসুইং ও সিম মুভমেন্টের সমন্বয়ে একের পর এক উইকেট তুলে নিয়ে অস্ট্রেলিয়াকে বড় ধাক্কা দেন। তার উইকেটের বেশিরভাগ কেন ক্যাচ আউট, তার উত্তরও স্পষ্ট: নিখুঁত লাইন-লেন্থ, অফ স্টাম্পের বাইরের ‘চ্যানেল বোলিং’ এবং উইকেটের দুই দিকে বল সুইং করানোর ক্ষমতার কারণে ব্যাটারদের উইকেটের পেছনে বা বাউন্ডারিতে ক্যাচ আউট করতে বাধ্য করেন। ক্রিকেট ধারাভাষ্যকাররা তার এই নিখুঁত লাইন-লেন্থ ও গোছালো বোলিংয়ের জন্য প্রায়ই কিংবদন্তি গ্লেন ম্যাকগ্রার সাথে তুলনা করে থাকেন।

Image
  • হাসান মাহমুদের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তিনি টানা চতুর্থ ও পঞ্চম স্টাম্পের লাইনে (করিডোর অব আনসার্টেইনিটি) ফুলার লেন্থে বল করতে পারেন। বলগুলো দেখে মনে হয় ব্যাটার খুব সহজেই কাভার ড্রাইভ খেলতে পারবেন। কিন্তু বলটি পিচে পড়ে সামান্য আউটসুইং করার কারণে ব্যাটের কানায় লেগে ক্যাচ উঠে যায়। ভারতের রোহিত শর্মা, বিরাট কোহলি এবং অস্ট্রেলিয়ার জেক ওয়েদারাল্ড হাসানের এই অফ-স্টাম্পের প্রলোভনে পড়েই স্লিপে ও উইকেটকিপারের হাতে ক্যাচ দিয়েছেন।
  • হাসান যখন বল রিলিজ করেন তখন বলের ‘সিম’ (সেলাই যেটা) একদম সোজা ও নিখুঁত থাকে। এতে পিচে পড়ার পর যে কোনদিকে আচমকা মুভ করে (ইন বা আউট সুইং)। ব্যাটাররা ফ্লিক বা ডিফেন্স করতে গেলে এই সুইং-এর কারণে ইনসাইড এজ (ট্র্যাভিস হেডের বোল্ড) বা আউটসাইড এজ হয়ে উইকেটকিপার বা স্লিপ ফিল্ডারদের কাছে সহজ ক্যাচ চলে যাওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে।
  • উইকেটের ধরন বুঝে বুদ্ধিদীপ্ততায় ব্যাক-অব-দি-হ্যান্ড স্লোয়ার বা অফ-কাটার ব্যবহার করেন। রান তোলার তাড়া থাকলে বা ব্যাটার শট খেলতে চাইছে মনে হলে, বলের গতি কম থাকায় শটের টাইমিং পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যায়। ফলে বল ব্যাটের ওপরের অংশে লেগে আকাশে ভেসে যায় এবং ৩০ গজ সার্কেলের ভেতরে বা বাউন্ডারি লাইনে ক্যাচ আউট তৈরি হয়। অথবা আচমকা বাউন্সার দেন। ডারউইন টেস্টে স্টিভ স্মিথ ৭১ রান করার পর হাসানের এই আচমকা শর্ট বলে পুল করতে গিয়েই মিড-উইকেটে ক্যাচ দিয়ে আউট হন।
  • হাসান মাহমুদের বোলিং অ্যাকশন অত্যন্ত সোজা এবং বেশ ওপর থেকে বল রিলিজ করেন (হাই-আর্ম একশন)। এর ফলে তিনি গুড লেন্থ থেকেও সাধারণ বোলারদের চেয়ে বেশি এবং খাড়া বাউন্স দিতে পারেন। ব্যাটাররা বল ডিফেন্স করতে গেলেও তাদের অনুমানের চেয়ে বেশি উঁচুতে বলটা উঠে আসে এবং টপ এজে লেগে ক্যাচ উঠে যায়। চেন্নাই টেস্টে শুভমান গিল ও ঋষভ পন্থ হাসানের এই বাড়তি বাউন্সের কারণে ডিফেন্স করতে গিয়ে উইকেটের পেছনে ক্যাচ দিয়েছিলেন।
  • হাসানের ‘লেট সুইং’ করানোর ক্ষমতা বা বল বাতাসেই দিক পরিবর্তন করানোর দক্ষতা ও মাঠের বাতাসকে ব্যবহার করার দক্ষতা কাউন্টি ক্রিকেটেও দেখিয়েছেন। বল যখন ব্যাটারের খুব কাছাকাছি এসে সুইং করে, তখন ব্যাটারের পক্ষে শট খেলার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। তারা বাধ্য হয়ে ব্যাট চালান, তবে টাইমিং নিখুঁত হয় না বলে ক্যাচ উঠে যায়।
  • আরেকটি টেকনিকের মধ্যে হাসান মাহমুদ বোলিং এঙ্গেল পরিবর্তন করেন। কখনো আম্পায়ারের একদম গা ঘেঁষে, আবার কখনো ক্রিজের একটু দূর থেকে বল ছোঁড়েন। এর ফলে বল রিলিজের এঙ্গেল পরিবর্তিত হয়। ব্যাটাররা মনে করেন বলটি সোজা আসছে, কিন্তু অ্যাঙ্গেলের কারণে বলটি ব্যাটের কোণায় লেগে স্লিপ কর্ডনে চলে যায়।
শাদমান ইসলামক ২০ রানে আউট হন

শাদমান ইসলামক ২০ রানে আউট হন

প্রথম দিন শেষে বাংলাদেশের সংগ্রহ ২৪ ওভারে ৯৬/১। মুমিনুল হক ৩৫ এবং তানজিদ তামিম ৩২ রানে অপরাজিত আছেন। বাংলাদেশ এখন অস্ট্রেলিয়ার চেয়ে মাত্র ১০২ রানে পিছিয়ে রয়েছে। প্রথম দিনের পারফরম্যান্স বিবেচনায় ম্যাচে এগিয়ে থাকার দাবিদার এখন টাইগাররাই। যদিও স্বাগতিক অস্ট্রেলিয়া নিঃসন্দেহে ম্যাচে ফেরার চেষ্টা করবে।

রনক জামান

রনক জামান

খেলাধুলার সব খবর ও বিশ্লেষণ সবার আগে পেতে চোখ রাখুন খেলারদেশে।

সম্পর্কিত আরও খবর

এই বিভাগের সব খবর →

মন্তব্যসমূহ (0)

মন্তব্য করতে এবং আলোচনায় অংশ নিতে আপনার গুগল অ্যাকাউন্ট দিয়ে লগইন করুন।