হ্যারি কেইনের গল্প
হ্যারি কেইন: গোলরক্ষক থেকে গোলমেশিন
গোলকিপার হওয়ার স্বপ্ন থেকে ইংল্যান্ডের ইতিহাসের সর্বকালের সেরা গোলস্কোরার; ২০২৫-২৬ মৌসুম ও ২০২৬ বিশ্বকাপে ক্যারিয়ারের সর্বোচ্চ শিখরে হ্যারি কেইন।

হ্যারি কেইন: গোলরক্ষক থেকে গোলমেশিন
হ্যারি এডওয়ার্ড কেইন। লন্ডনের লেটনস্টোনে ১৯৯৩ সালের আজকের এই দিনে (২৮ জুলাই) জন্মগ্রহণ করেন।
মাত্র ছয় বছর বয়সী কেইনকে দেখে যদি কেউ বলতেন, এই ছেলে একদিন ইংল্যান্ড ফুটবল ইতিহাসের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা হবে, বিশ্বকাপে দেশের সবচেয়ে সফল স্ট্রাইকার হবে, বায়ার্ন মিউনিখকে ট্রেবল জেতাবে এবং ব্যালন ডি’অরের অন্যতম দাবিদার হবে—তাহলে হয়তো কেউই বিশ্বাস করতেন না। কারণ ছোট্ট হ্যারি কেইন একসময় স্ট্রাইকার নয়, বরং গোলকিপার হওয়ার কথাই ভাবছিলেন।

রিজওয়ে রোভার্স ক্লাবে ৭ বছর বয়সী হ্যারি কেইন
গোলপোস্ট থেকেই শুরু যে গল্প

২০১৪ সালের ইউরোপা লিগে অ্যাস্টেরাস ট্রিপোলিসের বিপক্ষে হুগো লরিস লাল কার্ড দেখলে কেইন তখন গ্লাভস পরে নিজেই গোলপোস্টে দাঁড়িয়ে যান
কেইনের প্রথম ক্লাব রিজওয়ে রোভার্স। প্রথম দিন কোচ ডেভ ব্রিকনেল জানতে চেয়েছিলেন, কে গোলপোস্টে দাঁড়াতে চায়? সবাই যখন চুপ, তখন ছয় বছরের হ্যারি হাত তুলেছিল। ব্রিকনেল বলেন, ‘আমি ভেবেছিলাম, দুর্দান্ত এক গোলরক্ষক পেয়েছি। কারণ ওই বয়সে খুব কম বাচ্চাই গোলপোস্টের সামনে দাঁড়াতে চায়।’
পরে অবশ্য কেইনের অভিভাবকেরা জানালেন, নিজেদের গোলপোস্টে নয়, প্রতিপক্ষের গোলপোস্টের সামনেই তার প্রকৃত জায়গা। তবু আর্সেনালে যোগ দেওয়ার পরও গোলকিপিং কোচের অধীনে আলাদাভাবে অনুশীলন করতেন তিনি। অর্থাৎ গোলরক্ষক হওয়ার সম্ভাবনাও একসময় বাস্তব ছিল।
মজার ব্যাপার হলো, ২০১৪ সালের ইউরোপা লিগে অ্যাস্টেরাস ট্রিপোলিসের বিপক্ষে হুগো লরিস লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন, স্পার্সেরও খেলোয়াড় বদলির কোটা শেষ, হ্যাটট্রিক করে দলকে ৫-০ গোলে এগিয়ে দেওয়া কেইন তখন গ্লাভস পরে নিজেই গোলপোস্টে দাঁড়িয়ে যান।


গ্লাভস পরার কয়েক মিনিট পরেই তিনি জেরোনিমো বার্লেসের নেওয়া একটি দুর্বল ফ্রিকিক ধরতে ব্যর্থ হন
প্রতিভার চেয়ে বড় ছিল আত্মবিশ্বাস
শৈশবে কেইনকে দেখে খুব বেশি মানুষ ভবিষ্যতের সুপারস্টার ভাবেননি। তার গতি না ছিল অসাধারণ, ড্রিবলিংও ছিল না নজরকাড়া। শারীরিক গঠনও সাধারণ। কিন্তু একটা জিনিস ছিল অন্য সবার চেয়ে আলাদা—নিজের ওপর অটুট বিশ্বাস। ডেভ ব্রিকনেল বলেন, ‘সে গোলের সুযোগ নষ্ট করলে ভেঙে পড়ত না। সে জানত, আরেকটা সুযোগ আসবেই।’ আজ সেই মানসিকতাই তাকে বিশ্বের অন্যতম সেরা ফিনিশারে পরিণত করেছে।
প্রত্যাখ্যানই যার সবচেয়ে বড় শিক্ষক

৮ বছর বয়সে কেইনকে প্রত্যাখ্যান করে আর্সেনাল
অতিরিক্ত ওজনের কারণে ৮ বছর বয়সেই কেইনকে প্রথমে ছেড়ে দেয় আর্সেনাল। পরে টটেনহ্যামও একবার ছেড়ে দেয়। ওয়াটফোর্ডে লোনে খেলতে গিয়ে স্পার্সের বিপক্ষেই গোল করে বসেন। সেই ম্যাচই তার ভাগ্য বদলে দেয়। টটেনহ্যাম আবার ফিরিয়ে আনে তাকে। এরপরও সহজ ছিল না পথ। লেটন ওরিয়েন্ট, মিলওয়াল, নরউইচ, লেস্টার—একটার পর একটা লোন স্পেল।

২০১৩ সালের অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপে কেইন
২০১৩ সালের অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপের ইংল্যান্ডের কোচ পিটার টেইলর বলেন, ‘যদি তখন আমাকে জিজ্ঞেস করা হতো, সে এই পর্যায়ে পৌঁছাবে কোনোদিন? আমি বলতাম—আশা করি, পৌঁছাবে। কিন্তু সত্যি বলতে আমি তা কল্পনাও করিনি তখন।’
কারণ, অনেকে তখনই বলেছিলেন, ‘এই ছেলে কখনোই টটেনহ্যামের প্রথম একাদশের নিয়মিত খেলোয়াড় হতে পারবে না।’ কেইন কাউকে মুখে উত্তর দেননি। উত্তর দিয়েছেন মাঠে, গোল করে। যদিও এরজন্য দীর্ঘ সংগ্রাম করতে হয় তাকে। চারটি লোন স্পেল কাটান। সেখানেও মাত্র ১৬ গোল করেন ৬৫ ম্যাচে। তবে তার ভাগ্য খুলতে থাকে ২০১৪/১৫ মৌসুম থেকে। সেই মৌসুমে টটেনহ্যামের হয়ে ৫১ ম্যাচে করেন ৩১ গোল ও ৮ এসিস্ট। যার ২১ গোলই প্রিমিয়ার লিগে করা।

্টটেনহ্যাম হটস্পারের কিংবদন্তি
যদিও ২০১৪ সালে মরিসিও পচেত্তিনো টটেনহ্যামের দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথমে কেইনের খেলায় সন্তুষ্ট ছিলেন না। তিনি চেয়েছিলেন সামনে থেকে প্রেসিং, বেশি দৌড়, দ্রুত ট্রানজিশন, আধুনিক স্ট্রাইকারের ভূমিকা। কেইন সবকিছুই মেনে নেন। অনুশীলনের সুবিধার জন্য ট্রেনিং গ্রাউন্ডের কাছেই দ্বিতীয় বাড়ি কিনে ফেলেন। প্রতিদিন সবার আগে আসতেন। সবার শেষে ফিরতেন। পচেত্তিনো পরে লিখেছিলেন, ‘মানসিক দৃঢ়তা ও পরিশ্রমের দিক থেকে হ্যারি কেইন বিশ্বের সেরা খেলোয়াড়।’
এরপর কেইন হয়ে ওঠেন টটেনহ্যামের কিংবদন্তি। ২০১১–২০২৩ সাল পর্যন্ত টটেনহ্যামের হয়ে ৪৩৫ ম্যাচে ২৮০ গোল ও ৬৪ অ্যাসিস্ট করেন। হয়ে ওঠেন টটেনহ্যামের ইতিহাসের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা। প্রিমিয়ার লিগে ৩ বার গোল্ডেন বুট জেতেন। ২০১৮ বিশ্বকাপে গোল্ডেন বুট জেতেন। তবু এরপরও তার ক্যারিয়ারের সংগ্রাম শেষ হয়নি।

২০১৮ বিশ্বকাপে গোল্ডেন বুটজয়ী কেইন
ব্যক্তিগতভাবে অসাধারণ খেললেও টটেনহ্যামে দীর্ঘ সময় কোনো বড় শিরোপা জিততে পারেননি। ২০১৫ ও ২০১৭ সালে লিগ কাপ ফাইনালে হারেন। ২০১৮-১৯ চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনালে লিভারপুলের কাছে পরাজয় বরণ করেন। প্রিমিয়ার লিগে একাধিকবার শিরোপার কাছাকাছি গিয়েও ব্যর্থতা। এ কারণে অনেক সমালোচক তাকে "ট্রফিহীন সুপারস্টার" বলেও আখ্যা দিয়েছিলেন।

ইউরো ফাইনালে দুইবার পরাজিত হন
এছাড়াও জাতীয় দলের হয়েও ইউরো ২০২০ ফাইনালে ইতালির কাছে টাইব্রেকারে হারেন। ইউরো ২০২৪ ফাইনালে স্পেনের কাছে ২-১ ব্যবধানে হারেন। তবু তিনি ইংল্যান্ড দলের প্রাণভোমরা ছিলেন। ২০১৮ থেকে ২০২৬—প্রায় এক দশক ধরে ইংল্যান্ডের আক্রমণের কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন হ্যারি কেইন। স্ট্রাইকার কোচ অ্যালান রাসেল বলেন, ‘হ্যারির সবচেয়ে বড় শক্তি তার মানসিকতা। তাকে কোনো কিছুই লক্ষ্য থেকে সরাতে পারে না। সে ভালো মানুষ, কিন্তু মাঠে ভীষণ নির্মম। গোল করার মুহূর্তে তার মধ্যে কোনো দয়ামায়া নেই।’
২০২৫-২৬: জীবনের সেরা মৌসুম

বায়ার্ন মিউনিখের হয়ে শিরোপার খরা কাটাতে শুরু করেন কেইন
২০২৫-২৬ মৌসুমটি হ্যারি কেইনের ক্যারিয়ারের সেরা মৌসুমগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। দলীয় সাফল্য হিসেবে—বুন্দেসলিগা চ্যাম্পিয়ন, ডিএফবি-পোকাল চ্যাম্পিয়ন, ফ্রানৎস বেকেনবাওয়ার সুপারকাপ চ্যাম্পিয়ন (জার্মান সুপার কাপ)। বায়ার্নের আক্রমণের প্রধান ভরসা হয়ে উঠলেন তিনি। ২০২৫-২৬ মৌসুমের পরিসংখ্যান যাচাই করলে বায়ার্ন মিউনিখের হয়ে ৫৫ গোল (সব প্রতিযোগিতা) করেন। বুন্দেসলিগায় ৩৩টি, চ্যাম্পিয়ন্স লিগে ১৪টি, ডিএফবি-পোকালে ৭টি, সুপারকাপে ১ গোল। ক্লাব ও দেশ মিলিয়ে ৬৪ ম্যাচে করেন ৭৩ গোল ও ৮টা অ্যাসিস্ট। প্রতি ৭৩ মিনিটে একটি গোলে সরাসরি অবদান রাখেন।
২০২৬ বিশ্বকাপ: ৩২ বছরেও সেরা স্ট্রাইকার

২০২৬ বিশ্বকাপে ৬ গোল করে অনেকগুলো রেকর্ড গড়েন
বিশ্বকাপের আগে অনেকেই প্রশ্ন তুলেছিলেন—৩২ বছর বয়সী হ্যারি কেইন কি আগের মতোই কার্যকর? তিনি উত্তর দেন মাঠে। বিশ্বকাপ ২০২৬-এ ৬ গোল করে ইংল্যান্ডকে তৃতীয় স্থান অর্জনে নেতৃত্ব দেন, সেমিফাইনাল পর্যন্ত দলের অধিনায়ক ছিলেন। নকআউট পর্বে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ গোল করেন। মেক্সিকোর বিপক্ষে রাউন্ড অব ১৬-তে, নরওয়ের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে এবং পুরো টুর্নামেন্টজুড়েই তিনি ছিলেন ইংল্যান্ডের প্রধান ভরসা। ২০২৬ বিশ্বকাপে কেইন—ইংল্যান্ডের ইতিহাসে বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ গোলদাতা হন। বিশ্বকাপে ১৪ গোলের মালিক হয়ে তিনি কিংবদন্তি গ্যারি লিনেকারকে ছাড়িয়ে যান। বিশ্বকাপে মোট গোলসংখ্যায় পেলের রেকর্ডও অতিক্রম করেন।
২০২৬ বিশ্বকাপ শেষে ইংল্যান্ডের হয়ে ১২১ আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলে ৮৫টি গোল করে ইংল্যান্ডের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়ে ওঠেন। আর মাত্র পাঁচ ম্যাচ খেললেই পিটার শিলটনের সর্বোচ্চ আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার রেকর্ড স্পর্শ/ভাঙার পথে। অ্যালান রাসেল একবার প্রীতি ম্যাচে বিশ্রামের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কেইনের উত্তর ছিল—‘উঁহু, আমি খেলব। সব ম্যাচে গোল করে রেকর্ড ভাঙতে চাই।’ এই বাক্যই তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় সংজ্ঞা।
ব্যালন ডি'অরের লড়াইয়েও অন্যতম নাম
২০২৫-২৬ মৌসুমে ক্লাব ও দেশের হয়ে তার অসাধারণ গোলসংখ্যা তাকে ব্যালন ডি'অরের অন্যতম আলোচিত প্রার্থীতে পরিণত করেছে। যদিও ইংল্যান্ড বিশ্বকাপ জিততে না পারায় পুরস্কারের দৌড়ে প্রতিযোগিতা আরও কঠিন হয়েছে।
তবে হ্যারি কেইনের গল্প শুধু গোলের গল্প নয়। ২০২৫-২৬ মৌসুম এবং ২০২৬ বিশ্বকাপ প্রমাণ করেছে, ৩২ বছর বয়সেও হ্যারি কেইন কেবল একজন দুর্দান্ত গোলদাতা নন—তিনি আধুনিক ফুটবলের অন্যতম পরিপূর্ণ স্ট্রাইকার এবং ইংল্যান্ডের ইতিহাসের অন্যতম সেরা কিংবদন্তি।

ডেভিড বেকহ্যামের সঙ্গে কেইন
হ্যারি কেইনের জন্মদিনে লেখাটি শেষ করছি তার সম্পর্কে কিছু অজানা তথ্য দিয়ে :
কেইন এবং ডেভিড বেকহ্যাম—দুজনই এক স্কুলের ছাত্র ছিলেন। তার প্রিয় টিভি সিরিজ ডেক্সটার। কেইনের শরীরে কোনো ট্যাটু নেই এবং ফুটবল মৌসুম চলাকালে তিনি এলকোহল ফ্রি থাকেন, এমনকি অবসরে কোনো নাইটক্লাবেও সময় কাটান না। কেইনের স্ত্রী ক্যাটি কেইন (পূর্বনাম ক্যাটি গুডল্যান্ড) তার স্কুলজীবনের বান্ধবী ছিলেন। বহু বছর সম্পর্কের পর তারা বিয়ে করেন। কেইনকে অনেক সতীর্থই ‘সবচেয়ে সাদাসিধে সুপারস্টার’ বলে বর্ণনা করেন। পার্টি বা বিলাসী জীবন নয়—পরিবার, বারবিকিউ, বাড়িতে বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানো এবং অনুশীলন, বড় জয় বা বড় হারের পরও বাড়িতে ফিরে সন্তানদের সঙ্গে সময় কাটানো—এগুলোই তার পছন্দের জীবনধারা।
আর ফুটবলার না হলে কী হতেন তিনি? নিজেই একাধিকবার বলেছেন, অবসরের পর সুযোগ পেলে এনএফএল-এ প্লেসকিকার হিসেবে খেলতে চান। একজন বিশ্বসেরা স্ট্রাইকারের এমন স্বপ্ন খুবই বিরল।

রনক জামান
খেলাধুলার সব খবর ও বিশ্লেষণ সবার আগে পেতে চোখ রাখুন খেলারদেশে।

মন্তব্যসমূহ (0)
মন্তব্য করতে এবং আলোচনায় অংশ নিতে আপনার গুগল অ্যাকাউন্ট দিয়ে লগইন করুন।