খেলারদেশ

বিশ্বকাপ মঞ্চে সেরা অভাগা যারা

সর্বকালের সেরা: যেসব ফুটবলার বিশ্বকাপ জিততে না পারলেও বিশ্বমঞ্চে রেখে গেছেন অমর ছাপ

বিশ্বকাপ মঞ্চে সেরা অভাগা যারা
রনক জামান
By রনক জামান

সর্বকালের সেরা: যেসব ফুটবলার বিশ্বকাপ জিততে না পারলেও বিশ্বমঞ্চে রেখে গেছেন অমর ছাপ...

তুলে ধরছি সেইসব ফুটবলারের সেরা বিশ্বকাপ পারফরম্যান্স, যারা কখনোই বিশ্বকাপ জিততে পারেননি। এখানে এমন খেলোয়াড়দের অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি, যারা আগে বা পরে বিশ্বকাপ জিতেছেন—যেমন ১৯৯৮ সালের রোনালদো নাজারিও, ২০০২ সালের জিনেদিন জিদান বা ২০১৪ সালের লিওনেল মেসি। এখানে শুধু এমন ফুটবলারদের কথা বলা হয়েছে যারা সর্বকালের সেরাদের কাতারে থেকেও বিশ্বকাপ ফুটবলের সবচেয়ে বড় ট্রফিটি স্পর্শ করতে পারেননি।

○ মাইকেল বালাক (জার্মানি, ২০০২)

মাইকেল বালাক (জার্মানি, ২০০২)

মাইকেল বালাক (জার্মানি, ২০০২)

শতাব্দীর শুরুতে জার্মানি ছিল দুর্বল দল। ২০০০ ইউরোতে তাদের ব্যর্থতা এতটাই হতাশাজনক ছিল যে, জার্মান ফুটবল ফেডারেশন পুরো যুব উন্নয়ন কাঠামো নতুন করে সাজাতে বাধ্য হয়। সেই দীর্ঘ পরিকল্পনার সফল পরিণতি আসে ২০১৪ বিশ্বকাপ জয়ের মাধ্যমে।

কিন্তু ২০০২ সালে জার্মানির সেই দলটিতে সৃজনশীলতা, উদ্ভাবনী ক্ষমতা কিংবা ব্যক্তিগত জাদু বলতে প্রায় কিছুই ছিল না—একজনকে বাদ দিলে। তিনি হচ্ছেন মাইকেল বালাক।

বালাক ছিলেন আদর্শ জার্মান ফুটবলারের প্রতিচ্ছবি—শারীরিকভাবে শক্তিশালী, ধারাবাহিক এবং আধিপত্য বিস্তারকারী, যদিও ততটা চোখ-ধাঁধানো ছিলেন না। তিনি এমন মিডফিল্ডার ছিলেন না, যিনি পুরো ম্যাচের গতি নিয়ন্ত্রণ করতেন। বরং বক্সে দারুণ সময়ে ঢুকে পড়ে ম্যাচ নির্ধারণী অবদান রাখার অসাধারণ ক্ষমতা রাখতেন।

বিশ্বকাপের আগের মৌসুমেই তিনি ইউরোপের সেরা খেলোয়াড় হওয়ার খুব কাছাকাছি পৌঁছেছিলেন। মিডফিল্ডার হয়েও জার্মান লিগে সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকায় মাত্র এক গোল পিছিয়ে ছিলেন। একই মৌসুমে তাঁর ক্লাব বায়ার লেভারকুসেন ট্রেবল জয়ের খুব কাছে গিয়েও তিনটি প্রতিযোগিতাতেই রানার্সআপ হয়। ২০০২ বিশ্বকাপেও শেষ পর্যন্ত সেই ভাগ্যই বরণ করতে হয় তাঁকে।

গ্রুপ পর্বে বালাক ছিলেন দারুণ সৃজনশীল। সৌদি আরবকে ৮-০ গোলে বিধ্বস্ত করার ম্যাচে তিনি অসাধারণ খেলেন। আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে ১-১ ড্রয়ের ম্যাচে বাঁ পায়ের নিখুঁত লব পাসে মিরোস্লাভ ক্লোসাকে দিয়ে গোল করান। এরপর ক্যামেরুনের বিপক্ষে ২-০ জয়ের ম্যাচে প্যাট্রিক সুফোর ফাউলে ক্যামেরুন ১০ জনের দলে পরিণত হয়। পরে বালাকের ক্রস থেকেই ক্লোসা আরেকটি হেডে গোল করেন।

নকআউট পর্বে তাঁর সৃজনশীলতা কিছুটা কমে এলেও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদানগুলো এসেছে তাঁর কাছ থেকেই। কোয়ার্টার ফাইনালে যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে একমাত্র গোলটি হেডে করেন তিনি। এরপর সেমিফাইনালে স্বাগতিক দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষেও জার্মানির জয়সূচক একমাত্র গোলটি করেন বালাকই।

তবে এই অসাধারণ অভিযানের সবচেয়ে করুণ মুহূর্তটি আসে সেই ম্যাচেই। এর আগেই তিনি একটি হলুদ কার্ড দেখেছিলেন, যার ফলে ফাইনালে খেলার সুযোগ হারান।

ম্যাচ শেষে জার্মান কোচ রুডি ফোলার বলেছিলেন, ‘সে কৌশলগত ফাউল করেছিল একটা। এর মধ্য দিয়ে নিজেকে—শুধু দল বা কোচের জন্য নয়, পুরো দেশের জন্য উৎসর্গ করেছিল। নিজেকে বিসর্জন দিয়েছিল। তাঁর প্রতি আমাদের সর্বোচ্চ সম্মান দেখানো উচিত।’

ফাইনালে বালাককে ছাড়া মাঠে নেমে ব্রাজিলের কাছে হেরে যায় জার্মানি। সত্যিটা হলো—বালাক না থাকলে তারা হয়তো ফাইনালেই উঠতে পারত না।

○ ইউসেবিও (পর্তুগাল, ১৯৬৬)

ইউসেবিও (পর্তুগাল, ১৯৬৬)

ইউসেবিও (পর্তুগাল, ১৯৬৬)

বর্তমান সময়ে পর্তুগাল সাধারণত বিশ্বকাপে শিরোপার সম্ভাব্য দাবিদার হিসেবেই অংশ নেয়। কিন্তু বিশ্বকাপের প্রথম ১২টি আসরের মধ্যে তারা খেলতে পেরেছিল মাত্র একটিতে—১৯৬৬ সালে ইংল্যান্ডে অনুষ্ঠিত সেই টুর্নামেন্টে। সেবার তারা ছিল এক রকম চমক—বলতে গেলে। আর সেই আসরে তৃতীয় স্থান অর্জনের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকাটা ছিল ইউসেবিওর।

ইউসেবিওকে বিংশ শতাব্দীর পর্তুগালের সর্বকালের সেরা ফুটবলার হিসেবে ধরা হয়। তবে অনেকের মতে, তিনি ইতিহাসের সর্বকালের সেরা আফ্রিকান ফুটবলারও। মোজাম্বিকে জন্ম নেওয়া ইউসেবিও তখনকার পর্তুগিজ উপনিবেশেই বেড়ে ওঠেন। ১৮ বছর বয়সে লিসবনে যান এবং শহরের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী স্পোর্টিং সিপির সঙ্গে দীর্ঘ টানাপোড়েনের পর বেনফিকায় যোগ দেন। জাতীয় দলের হয়ে অভিষেক হয় প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই, কিন্তু বিশ্বকাপ খেলতে তাঁকে অপেক্ষা করতে হয় আরও পাঁচ বছর।

বিশ্বকাপে, হাঙ্গেরির বিপক্ষে ৩-১ গোলের জয়ে কর্নার থেকে দুটি গোলে সহায়তা করেন তিনি। এরপর বুলগেরিয়ার বিপক্ষে ৩-০ জয়ের ম্যাচে করেন দ্বিতীয় গোলটি।

তবে গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে ব্রাজিলের বিপক্ষেই তিনি নিজের আসল রূপ দেখান। প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে জয়ের বিকল্প ছিল না ব্রাজিলের সামনে। ব্রাজিল ভরসা করেছিল পুরোপুরি ফিট না থাকা পেলের ওপর। কিন্তু পর্তুগালের ডিফেন্ডারদের কঠোর ট্যাকলে তিনি কার্যত নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েন।

অন্যদিকে ইউসেবিও ছিলেন দুর্দান্ত। তিনি পর্তুগালের প্রথম গোলটি তৈরি করেন। দ্বিতীয় গোলটি হেডে করেন এবং দ্বিতীয়ার্ধে পুরো ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে তুলে নেন। শেষ পর্যন্ত জোরালো শটে তৃতীয় গোলটিও করেন তিনি।

পেলে বিদায় নেন। আর ইউসেবিও হয়ে ওঠেন সেই বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় তারকা।

কোয়ার্টার ফাইনালে উত্তর কোরিয়ার বিপক্ষে পর্তুগাল অবিশ্বাস্যভাবে ৩-০ গোলে পিছিয়ে পড়েছিল। কিন্তু এরপর ইউসেবিও এমন এক পারফরম্যান্স উপহার দেন, যাকে অনেকেই বিশ্বকাপ ইতিহাসের সেরা কামব্যাকের অন্যতম উদাহরণ হিসেবে মনে করেন। তিনি একাই পর্তুগালের পাঁচ গোলের মধ্যে চারটি করেন।

ডান দিক থেকে নেওয়া তাঁর শক্তিশালী শটটি ছিল চার গোলের মধ্যে সবচেয়ে আকর্ষণীয়। তবে দুটি পেনাল্টির একটির আগে বাম প্রান্ত দিয়ে তাঁর দুর্দান্ত একক দৌড় এবং ড্রিবলিংই প্রতিপক্ষকে ফাউল করতে বাধ্য করেছিল।

ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেমিফাইনাল ছিল যেন সেই বিশ্বকাপের দুই সেরা খেলোয়াড়ের দ্বৈরথ—ববি চার্লটন বনাম ইউসেবিও।

ম্যাচের ফলও যেন সেই গল্পই বলেছিল। ইংল্যান্ড জেতে ২-১ ব্যবধানে। চার্লটন করেন দুটি গোল, আর ইউসেবিও করেন একটি—পেনাল্টি থেকে। সেই পরাজয়ের মধ্য দিয়েই শেষ হয় পর্তুগালের ফাইনালে ওঠার স্বপ্ন।

তবে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে সোভিয়েত ইউনিয়নকে ২-১ গোলে হারায় পর্তুগাল। সেই ম্যাচেও পেনাল্টি থেকে গোল করেন ইউসেবিও।

ছয় ম্যাচে তাঁর মোট গোলসংখ্যা ছিল নয়টি। এর মধ্যে চারটিই এসেছিল পেনাল্টি থেকে, যা অবশ্য তাঁর গোলসংখ্যাকে কিছুটা বাড়িয়ে দিয়েছিল। তবু বাস্তবতা হলো, সেই বিশ্বকাপে পর্তুগালের পুরো খেলার কেন্দ্রবিন্দুই ছিলেন ইউসেবিও। দলের প্রায় প্রতিটি আক্রমণ, সাফল্য এবং সেরা মুহূর্ত তার চারপাশেই আবর্তিত হয়েছে।

○ স্যান্ডর কোসিস (হাঙ্গেরি, ১৯৫৪)

স্যান্ডর কোসিস (হাঙ্গেরি, ১৯৫৪)

স্যান্ডর কোসিস (হাঙ্গেরি, ১৯৫৪)

ফেরেঙ্ক পুসকাস ছিলেন নিঃসন্দেহে আরও বড় মাপের ফুটবলার। ১৯৫৪ সালের বিশ্বকাপের গল্প বলতে গেলেও মূলত তাঁর কথাই বেশি উঠে আসে। গ্রুপ পর্বে পশ্চিম জার্মানির বিপক্ষে ম্যাচে প্রতিপক্ষের কঠিন ট্যাকলে আহত হয়ে তিনি কার্যত বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে যান। ফাইনালে একই প্রতিপক্ষের বিপক্ষে মাঠে ফিরলেও পুরোপুরি ফিট ছিলেন না। ফলে ম্যাচে নিজের স্বাভাবিক প্রভাব রাখতে পারেননি।

কিন্তু পুরো টুর্নামেন্ট বিবেচনায় কোসিসের বিশ্বকাপ ছিল আরও উজ্জ্বল।

দক্ষিণ কোরিয়াকে ৯-০ গোলে বিধ্বস্ত করার ম্যাচে তিনি হ্যাটট্রিক করেন। এটি এখনো বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ব্যবধানে জয়।

এরপর পশ্চিম জার্মানির বিপক্ষে অবিশ্বাস্য ৮-৩ জয়ে করেন চারটি গোল। তার প্রতিটি ফিনিশিং ছিল অসাধারণ শান্ত, নিখুঁত ও আত্মবিশ্বাসী।

কোয়ার্টার ফাইনালে ব্রাজিলকে ৪-২ গোলে হারানোর ম্যাচে আবারও দুটি গোল করেন, দুটিই হেড থেকে। মাটিতে বল নিয়ন্ত্রণ ও ফিনিশিংয়ে তিনি যেমন দক্ষ ছিলেন, তেমনি হাওয়ায় ভাসা বলেও ছিলেন ভয়ংকর। বিশেষ করে হেডে গোল করার ক্ষমতার জন্যই তিনি কিংবদন্তি হয়ে ওঠেন।

এ ধরনের পরিসংখ্যান পুরো ইতিহাসজুড়ে নির্ভুলভাবে সংরক্ষণ করা কঠিন। তবে এমন দাবিও করা হয় যে, শীর্ষ পর্যায়ের ফুটবলে কোসিস হয়তো ইতিহাসের অন্য যেকোনো খেলোয়াড়ের চেয়ে বেশি হেডে গোল করেছেন।

উরুগুয়ের বিপক্ষে ৪-২ গোলের সেমিফাইনাল জয়ে তাঁর প্রথম গুরুত্বপূর্ণ হেডটি অবশ্য গোল নয়, ছিল অ্যাসিস্ট। সেই হেড থেকেই জোলতান চিবোর ম্যাচের প্রথম গোলটি করেন।

এরপর অতিরিক্ত সময়ে, প্রত্যাশামতোই, আরও দুটি হেডে গোল করে ম্যাচের নিষ্পত্তি করেন কোসিস।

ফাইনালে পুসকাস দলে ফেরায় কোচিসকে কিছুটা সহায়ক ভূমিকায় খেলতে হয়। পরে ফিরে তাকালে মনে হয়, হাঙ্গেরির উচিত ছিল আগের কৌশলেই অটল থাকা। ফাইনালে তিনি আর গোল করতে পারেননি। তবুও নিজের একমাত্র বিশ্বকাপেই কোসিস করেছিলেন ১১টি গোল।

আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সেই ১১ গোলের মধ্যে আটটিই এসেছিল বিশ্ব ফুটবলের তিন পরাশক্তি—ব্রাজিল, পশ্চিম জার্মানি ও উরুগুয়ের বিপক্ষে।

এই কারণেই ১৯৫৮ বিশ্বকাপে ১৩ গোল করা জাস্ট ফন্টেইনের চেয়েও এই তালিকায় কোসিসকে এগিয়ে রাখা হয়েছে।

○ জিকো (ব্রাজিল, ১৯৮২)

জিকো (ব্রাজিল, ১৯৮২)

জিকো (ব্রাজিল, ১৯৮২)

ড্রিবলিং, নিখুঁত থ্রু-পাস এবং শীর্ষস্থানীয় স্ট্রাইকারদের মতো ধারাবাহিকভাবে গোল করার ক্ষমতা—একজন আক্রমণাত্মক মিডফিল্ডারের জন্য প্রয়োজনীয় প্রায় সব গুণই ছিল জিকোর মধ্যে।

১৯৮২ সালের ব্রাজিল দলকে, ১৯৭৪ সালের নেদারল্যান্ডসের পাশাপাশি—বিশ্বকাপ না জেতা সর্বকালের সেরা দলগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আর সেই দলের প্রাণভোমরা ছিলেন জিকো।

সেট-পিস নেওয়ার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন অসাধারণ দক্ষ। স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে দুর্দান্ত এক ফ্রি-কিকে গোল করেন। এরপর নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে করেন জোড়া গোল, যার একটি ছিল দৃষ্টিনন্দন সিজর-কিক থেকে।

তবে ওই দুটি দল ছিল তুলনামূলক দুর্বল প্রতিপক্ষ। জিকো তার সেরা পারফরম্যান্সটি তুলে রাখেন আর্জেন্টিনার বিপক্ষে সেই বহুল প্রতীক্ষিত লড়াইয়ের জন্য—জিকো বনাম দিয়েগো ম্যারাডোনা।

৩-১ গোলের সেই জয়ে প্রথম গোলটি করেন জিকো নিজেই। বাকি দুটি গোলের ক্ষেত্রেও তাঁর দারুণ পাসটি ছিল ম্যাচের গুরুত্বপূর্ণ এক মোমেন্টাম। অন্যদিকে ম্যারাডোনা, যেন তাঁর স্বভাবসুলভভাবেই, প্রতিপক্ষকে লাথি মারার কারণে ম্যাচের শেষ দিকে লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে, জিকো ও ব্রাজিল ইতালির বাধা আর পেরোতে পারেনি। ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা ম্যাচ হিসেবে বিবেচিত সেই লড়াইয়ে তারা ৩-২ গোলে হেরে যায়।

জিকো অসাধারণ খেলেছিলেন ঠিকই, কিন্তু ইতালির কিংবদন্তি ম্যান-মার্কার ক্লদিও জেন্তিলে তাঁকে দারুণভাবে নিয়ন্ত্রণে রেখেছিলেন।

তবু পরাজয়ের পরও ১৯৮২ বিশ্বকাপের সবচেয়ে কিংবদন্তি দল হিসেবেই স্মরণীয় হয়ে আছে ব্রাজিল। এমনকি পেপ গার্দিওলা সেই দলটিকে ইতিহাসের সর্বকালের সেরা জাতীয় দল বলেও অভিহিত করেছেন।

আজও জিকোকে সেই বিশ্বকাপের কথা নিয়মিত মনে করিয়ে দেওয়া হয়। চলতি মাসের শুরুতে তিনি বলেছিলেন, ‘১৯৮২ সালে ব্রাজিল দারুণ এক দল ছিল, যে দলকে সারা বিশ্ব স্বীকৃতি ও ভালোবাসা দিয়েছিল। আমরা পৃথিবীর যেখানেই যাই, মানুষ এখনো সেই দলের কথা মনে করিয়ে দেয়। যদি আমরা ইতালির বিপক্ষে সেই ম্যাচটি জিততাম, তাহলে ফুটবল হয়তো অন্য রকম হতো। কিন্তু সেই হারের পর থেকে যে কোনো মূল্যে ফল পাওয়ার ফুটবল জনপ্রিয় হতে শুরু করে—প্রতিপক্ষের খেলা ভেঙে দেওয়া, ফাউল করে খেলার গতি নষ্ট করা—এসবই যেন বেশি গুরুত্ব পেতে থাকে। ব্রাজিলের সেই পরাজয় বিশ্ব ফুটবলের জন্য মোটেও ভালো কিছু ছিল না।’

○ ইয়োহান ক্রুইফ (নেদারল্যান্ডস, ১৯৭৪)

ইয়োহান ক্রুইফ (নেদারল্যান্ডস, ১৯৭৪)

ইয়োহান ক্রুইফ (নেদারল্যান্ডস, ১৯৭৪)

খুব কম ফুটবলারের ক্ষেত্রেই এমন দেখা গেছে যে, একটি নির্দিষ্ট মুহূর্তই তাঁর পুরো বিশ্বকাপ কিংবা গোটা ক্যারিয়ারের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। ১৯৭৪ বিশ্বকাপে সুইডেনের বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের ম্যাচে ইয়ান ওলসনকে পরাস্ত করতে ইয়োহান ক্রুইফ যে কিংবদন্তি টার্নটি করেছিলেন, সেটিই ছিল আদি ও আসল ‘ক্রুইফ’। সেই মুভটা যেমন ছিল নান্দনিক আর অসাধারণ, তেমনি ছিল কার্যকরী—দর্শকদের মুগ্ধ করার জন্য শো-বোটিং না, বরং প্রতিপক্ষকে হারিয়ে এগিয়ে যাওয়াই ছিল উদ্দেশ্য।

১৯৭৪ সালের পুরো বিশ্বকাপজুড়ে নিরপেক্ষ সমর্থকদের প্রিয় দল ছিল নেদারল্যান্ডস। তাদের ‘টোটাল ফুটবল’ খেলার ধরণ ফুটবলকে যেন নতুন এক উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল। সহজাত ভঙ্গিতে পজিশন বদলের সাবলীলতা, উঁচু ডিফেন্সিভ লাইন আর অবিরাম আক্রমণাত্মক মানসিকতা দিয়ে তাঁরা সারা বিশ্বের সমর্থকদের মুগ্ধ করেছিল।

এই দলের মধ্যে ক্রুইফ ছিলেন কিছুটা ব্যতিক্রম। নেদারল্যান্ডসের দর্শন ছিল ব্যক্তির চেয়ে দলগত ফুটবলকে প্রাধান্য দেওয়া, কিন্তু ক্রুইফকে যেন ইচ্ছেমতো খেলার স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছিল। আবার এক অর্থে, তিনি নিজেই ছিলেন সেই টোটাল ফুটবলের প্রতিচ্ছবি। আক্রমণভাগে শুরু করলেও প্রায়ই নিচে নেমে এসে দীর্ঘ পাসের খেলার গতি তৈরি করতেন বিল্ডআপের দায়িত্ব নিয়ে। কেবল মাঝমাঠেই না, প্রয়োজন অনুযায়ী দুই ফ্ল্যাংকেও সরে যেতেন। গ্রুপ পর্বে দুটি দুর্দান্ত ক্রস থেকে দুটি গোলও বানিয়ে দেন তিনি।

দ্বিতীয় গ্রুপ পর্বে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ৪-০ গোলের জয়ে ক্রুইফ ছিলেন আরও বেশি উজ্জ্বল। কৌশলে কঠিন এক বল নিজের নিয়ন্ত্রণে এনে গোলরক্ষক দানিয়েল কার্নেভালিকে কাটিয়ে প্রথম গোলটি করেন তিনি। কার্নেভালি প্রায়ই গোললাইন ছেড়ে অনেকটা সামনে উঠে আসতেন, ক্রুইফও এর পূর্ণ সুযোগ নেন।

ক্রুইফের গতি নিয়ে অনেক সময় যথেষ্ট আলোচনা হয় না। ওই ম্যাচেই দুরন্ত গতিতে রক্ষণ ভেঙে একাই সুযোগ তৈরি করেছিলেন, যদিও গোলে পরিণত করতে পারেননি। এরপর আরেকটি নিখুঁত ক্রস থেকে জনি রেব হেডে গোল করেন। ম্যাচের শেষ গোলটিও আসে ক্রুইফের পা থেকে—কার্নেভালি আবারও পোস্ট ছেড়ে বেরিয়ে আসায় সংকীর্ণ কোণ থেকে নিয়ন্ত্রিত এক দুর্দান্ত ভলিতে বল জালে জড়ান তিনি।

এরপর ব্রাজিলের বিপক্ষে ২-০ গোলের জয়েও ছিলেন সমান উজ্জ্বল। একটি গোল করেন নিজে, আর অন্য গোলটি করান সতীর্থকে।

এরপর আসে ফাইনাল—পশ্চিম জার্মানির বিপক্ষে। একদিকে ইয়োহান ক্রুইফ, অন্যদিকে ফ্রানৎস বেকেনবাওয়ার; সে সময়ের দুই সেরা ফুটবলারের মুখোমুখি লড়াই।

ম্যাচের শুরুতেই ইতিহাস গড়ে নেদারল্যান্ডস। কিক-অফের পর পশ্চিম জার্মানির কোনো খেলোয়াড় বল স্পর্শ করার আগেই একের পর এক পাসে আক্রমণ গড়ে তোলে ডাচরা। ক্রুইফ মাঝমাঠে নেমে বল গ্রহণ করেন, ড্রিবল করে সরাসরি পেনাল্টি বক্সে ঢুকে পড়েন এবং ফাউলের শিকার হন। পেনাল্টি থেকে গোল করে নেদারল্যান্ডসকে এগিয়ে দেন ইয়োহান নেস্কেন্স।

এরপর বার্থি ফগ্টস ক্রুইফকে খুব ভালোভাবে মার্কিং করেন। তবুও তিনি কয়েকটি চমৎকার পাস দিয়েছিলেন, যেগুলো আরও নিখুঁত ফিনিশিং পেলে গোল হতে পারত।

শেষ পর্যন্ত অবশ্য পশ্চিম জার্মানি ২-১ ব্যবধানে ম্যাচ জিতে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়।

এরপরও ১৯৭৪ সালের বিশ্বকাপের কথা মনে পড়লেই সবার আগে যে নামটি মনে আসে, সেটি ইয়োহান ক্রুইফ।

যাই হোক, বিশ্বকাপের ইতিহাস শেষমেশ চ্যাম্পিয়নদেরই মনে রাখে। ট্রফিই একজন ফুটবলারের ক্যারিয়ারকে পরিপূর্ণতার স্বীকৃতি দেয়। কিন্তু সব মহান ফুটবলারের ভাগ্যে সেই ট্রফি জোটে না। মাইকেল বালাকের আত্মত্যাগ, ইউসেবিওর বিস্ময়কর গোলবন্যা, সান্দর কোসিসের অবিশ্বাস্য গোল-ক্ষমতা, জিকোর সাম্বা-শিল্প ফুটবল কিংবা ইয়োহান ক্রুইফের বিপ্লবী দর্শন—তাঁদের কেউই বিশ্বকাপ জিততে পারেননি। তবুও বিশ্বকাপের ইতিহাসে তাদের অবদান কোনো অংশে কম নয়।

অনেক সময় একটি ট্রফির চেয়েও বড় হয়ে ওঠে একজন ফুটবলারের প্রভাব, তাঁর খেলার সৌন্দর্য, কিংবা একটি পুরো প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করার ক্ষমতা। বিশ্বকাপের মঞ্চে এই কিংবদন্তিরা সেটিই প্রমাণ করেছেন। তাঁরা চ্যাম্পিয়ন না হয়েও ইতিহাসের অংশ, কারণ ফুটবল শুধু বিজয়ীদের নয়—মহানদেরও মনে রাখে।

ঠিক একইভাবে, লিওনেল মেসি যদি ২০২২ বিশ্বকাপ শিরোপা নাও জিততেন, তবু তাঁকে মানুষ শ্রদ্ধাভরে, সর্বকালের সেরাদের একজন হিসেবেই মনে রাখতো। ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর ক্ষেত্রেও ভক্তরা একই মনোভাব রাখেন ও রাখবেন।

রনক জামান

রনক জামান

খেলাধুলার সব খবর ও বিশ্লেষণ সবার আগে পেতে চোখ রাখুন খেলারদেশে।

মন্তব্যসমূহ (0)

মন্তব্য করতে এবং আলোচনায় অংশ নিতে আপনার গুগল অ্যাকাউন্ট দিয়ে লগইন করুন।