রেকর্ড
স্পেন: ৫ বছরে ১৬টি শিরোপা
স্পেন যেভাবে বিশ্ব ফুটবলের অপ্রতিরোধ্য শক্তিতে পরিণত হলো

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬ চ্যাম্পিয়ন স্পেন
২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের ফাইনালে অতিরিক্ত সময়ে আর্জেন্টিনাকে ১-০ গোলে হারিয়ে আবারও বিশ্বসেরা হয়েছে স্পেন। দুই বছর আগে ইউরো ২০২৪ জয়ের পর এবার বিশ্বকাপ—ফুটবল বিশ্বের ওপর স্পেনের আধিপত্যকে আরও দৃঢ় করেছে এই সাফল্য।
তবে এটি শুধু একটি বিশ্বকাপ জয়ের গল্প নয়। এটি এমন একটি ফুটবল সংস্কৃতির গল্প, যা গত পাঁচ বছরে ইউরোপ ও বিশ্ব ফুটবলে নজিরবিহীন সাফল্য এনে দিয়েছে। পুরুষ ও নারী—দুই বিভাগ মিলিয়ে অনূর্ধ্ব-১৭ থেকে সিনিয়র পর্যায় পর্যন্ত মাত্র পাঁচ বছরে ১৬টি আন্তর্জাতিক শিরোপা জিতেছে স্পেন।

ইতিহাসের প্রথম দেশ হিসেবে স্পেনই ইতিহাসের প্রথম, যারা একই সময়ে পুরুষ ও নারী—উভয় বিভাগের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন। নারী বিশ্বকাপ জয় লাভ করে ২০২৩ সালে। পুরুষ বিশ্বকাপ জয় লাভ করে ২০২৬ সালে। এর পাশাপাশি স্পেন জিতেছে—
পুরুষ ফুটবল (২০২২–২০২৬): বিশ্বকাপ (২০২৬), ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপ (২০২৪), উয়েফা নেশনস লিগ (২০২৩), অলিম্পিক স্বর্ণপদক (২০২৪), অনূর্ধ্ব-১৯ ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ (২০২৬)
নারী ফুটবল (২০২২–২০২৬): বিশ্বকাপ (২০২৩), নেশনস লিগ (২০২৪ ও ২০২৫), অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপ (২০২২), অনূর্ধ্ব-১৯ ইউরো (২০২২, ২০২৩, ২০২৪, ২০২৫ ও ২০২৬), অনূর্ধ্ব-১৭ বিশ্বকাপ (২০২২), অনূর্ধ্ব-১৭ ইউরো (২০২৪)
অর্থাৎ মাত্র পাঁচ বছরে মোট ১৬টি আন্তর্জাতিক শিরোপা।

২০২২ বিশ্বকাপে মরক্কোর কাছে শেষ ষোলোতে বিদায় নেওয়ার পর লুইস এনরিকের স্থলাভিষিক্ত হন লুইস দে লা ফুয়েন্তে। ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত হলেও ফলাফল হয় ঐতিহাসিক। সেই সময় সিদ্ধান্তটি নিয়ে ব্যাপক সংশয় ছিল। কারণ বড় কোনো ক্লাব কোচিংয়ের অভিজ্ঞতা ছাড়াই তিনি স্পেনের দায়িত্ব পান। কিন্তু সেই ঝুঁকিই আজ স্পেনের সবচেয়ে বড় সাফল্যের গল্প। তার অধীনে স্পেন জিতেছে—নেশনস লিগ ২০২৩, ইউরো ২০২৪, বিশ্বকাপ ২০২৬
দে লা ফুয়েন্তে মূলত স্পেনের অনূর্ধ্ব-১৯, অনূর্ধ্ব-২১ ও অলিম্পিক দলের কোচ ছিলেন। ফলে জাতীয় দলে আসা অধিকাংশ খেলোয়াড়ের সঙ্গে তার বহু বছরের সম্পর্ক ছিল। সাবেক স্প্যানিশ মিডফিল্ডার হুয়ান মাতার ভাষায়,
স্পেনের সাফল্যের ভিত্তি—একটি ফুটবল দর্শন। কেননা, স্পেনের এই আধিপত্য কোনো একক তারকার ওপর নির্ভরশীল নয়। স্প্যানিশ ফুটবল এমন এক কাঠামো, যেখানে অনূর্ধ্ব-১৭ থেকে সিনিয়র দল পর্যন্ত সবাই একই ধরনের ফুটবল দর্শনে বেড়ে ওঠে। বল দখলে রাখা, দ্রুত পাসিং, পজিশনাল ফুটবল, প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং ধৈর্য—সবকিছুই ছোটবেলা থেকেই শেখানো হয়। দে লা ফুয়েন্তেও খেলোয়াড়দের মধ্যে গড়ে তুলেছেন পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ধৈর্য এবং দলগত সংস্কৃতি। বিশ্বকাপ ফাইনালের আগে তিনি বলেছিলেন,

৩৮ ম্যাচ ধরে অপরাজিত
বিশ্বকাপ জয়ের মাধ্যমে স্পেন সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে টানা ৩৮ ম্যাচ অপরাজিত রইল। এটা ইউরোপ বা দক্ষিণ আমেরিকার কোনো জাতীয় দলের ইতিহাসে দীর্ঘতম অপরাজিত থাকার রেকর্ড। পুরো বিশ্বকাপে তাদের বিপক্ষে লক্ষ্যে ছিল মাত্র ১০টি শট, যা তাদের রক্ষণাত্মক দৃঢ়তারও প্রমাণ। এবং স্পেনের আধিপত্য যে শিগগিরই শেষ হচ্ছে না, সেটাও স্পষ্ট।
মাত্র ১৯ বছর বয়সেই লামিন ইয়ামাল ও পাউ কুবার্সি বিশ্বকাপ জিতেছেন। দুজনেই ফাইনালের একাদশে ছিলেন। বিশ্বকাপ ফাইনালের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একই দলে দুই কিশোরকে শুরুর একাদশে খেলানোর নজিরও গড়েছে স্পেন। সাবেক ইংল্যান্ড গোলরক্ষক জো হার্ট বলেন,
অন্যদিকে ফ্রান্সের কিংবদন্তি থিয়েরি অঁরি মনে করেন,
যুগের সূচনা
২০১০ সালে বিশ্বকাপ জয়ের আগে স্পেন ইউরো ২০০৮ জিতেছিল। ১৬ বছর পর ইতিহাস যেন আবারও নিজেকে পুনরাবৃত্তি করল। ইউরো ২০২৪-এর পর এবার বিশ্বকাপ ২০২৬। তবে এবার পার্থক্য একটাই—এটি আর কেবল একটি সফল জাতীয় দল নয়। এটি এমন একটি ফুটবল সাম্রাজ্য, যা পুরুষ, নারী ও যুব—সব স্তরেই বিশ্বের মানদণ্ড হয়ে উঠেছে। পাঁচ বছরে ১৬টি আন্তর্জাতিক শিরোপা জিতে স্পেন শুধু বিশ্বচ্যাম্পিয়নই নয়, বর্তমানে বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে প্রভাবশালী শক্তি—এ কথা বলাই যায়।

রনক জামান
খেলাধুলার সব খবর ও বিশ্লেষণ সবার আগে পেতে চোখ রাখুন খেলারদেশে।

মন্তব্যসমূহ (0)
মন্তব্য করতে এবং আলোচনায় অংশ নিতে আপনার গুগল অ্যাকাউন্ট দিয়ে লগইন করুন।