খেলারদেশ

ফিফার ‘গ্র্যান্ডফাদার রুল’ সম্পর্কে যা জানা দরকার

গ্র্যান্ডফাদার রুল: দাদার দেশ, নাতির জার্সি

ফিফার 'গ্র্যান্ডফাদার রুল' : মেসি-ব্রাজিল সম্পর্কের ভাইরাল খবরে আলোচনায় এসেছে যে নিয়মটি, গ্র্যান্ডফাদার রুল—যে নিয়মে বদলে গেছে আন্তর্জাতিক ফুটবলের ইতিহাস। অথচ এই নিয়মের নাম 'গ্র্যান্ডফাদার রুল' নয়, স্রেফ এক পরিভাষা। যার বিখ্যাত সব উদাহরণ রয়েছে চমকে দেবার মতো। ২০২৬ বিশ্বকাপেও রয়েছে গ্র্যান্ডফাদার রুল-এর ব্যাপক প্রভাব। শুধু কি বিশ্বকাপের মতো আসরেই? আমাদের বাংলাদেশেও... জামাল ভূঁইয়া থেকে শুরু। বাংলাদেশ নারী ফুটবলেও রয়েছে এর উদাহরণ।

গ্র্যান্ডফাদার রুল: দাদার দেশ, নাতির জার্সি

গ্র্যান্ডফাদার রুল: দাদার দেশ, নাতির জার্সি

রনক জামান
By রনক জামান

এক সময় আন্তর্জাতিক ফুটবলে একটা দেশের হয়ে খেলার যোগ্যতা নির্ধারণের মাপকাঠি ছিল মূলত তার জন্মস্থান। কিন্তু আধুনিক বিশ্বের অভিবাসন, দ্বৈত নাগরিকত্ব এবং বহুজাতিক পরিবারের কারণে সেই ধারণা অনেকটাই বদলে গেছে। আজকের ফুটবলে এমন অসংখ্য তারকা রয়েছেন, যারা জন্মেছেন এক দেশে, বেড়ে উঠেছেন আরেক দেশে, আবার খেলছেন সম্পূর্ণ ভিন্ন এক দেশের হয়ে।

এই বাস্তবতাকে সম্ভব করে তুলেছে ফিফার যোগ্যতার নিয়ম এবং বিভিন্ন দেশের নাগরিকত্ব আইন। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত একটি আইনটি হলো ‘গ্র্যান্ডফাদার রুল’—অর্থাৎ দাদা, দাদী বা নানা, নানীর জন্মস্থান বা তাদের নাগরিকত্বের সূত্র ধরে জাতীয় দলের হয়ে খেলার সুযোগ। সম্প্রতি লিওনেল মেসির মাতৃবংশ নিয়ে প্রকাশিত নতুন গবেষণার পর এই নিয়মটি আবারও আলোচনায় এসেছে।

'গ্র্যান্ডফাদার রুল' কী?

সহজ ভাষায়, কোনো ফুটবলারের দাদা, দাদী বা নানা, নানীরর জন্মস্থান অথবা বংশগত নাগরিকত্বের সূত্রে তিনি একটি দেশের নাগরিকত্ব পাওয়ার যোগ্য হলে, এবং ফিফার নির্ধারিত শর্ত পূরণ করতে পারলে, সেই দেশের জাতীয় দলের প্রতিনিধিত্ব করতে পারেন।

তবে এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি—‘গ্র্যান্ডফাদার রুল’ নামে ফিফার আলাদা কোনো আইন নেই। এটি মূলত প্রচলিত একটা পরিভাষা। বাস্তবে একজন খেলোয়াড়কে দুটি বিষয় পূরণ করতে হয়—সংশ্লিষ্ট দেশের নাগরিকত্ব অর্জন, এবং ফিফার আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিত্বের যোগ্যতার শর্ত পূরণ।

অর্থাৎ শুধু দাদা বা নানার জন্মস্থান থাকলেই কোনো ফুটবলার স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেই দেশের হয়ে খেলতে পারেন না।

কেন এই নিয়ম এত গুরুত্বপূর্ণ?

উনিশ ও বিশ শতকে ইতালি, স্পেন, পর্তুগাল, আয়ারল্যান্ডসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে লাখ লাখ মানুষ দক্ষিণ আমেরিকা, উত্তর আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়ায় অভিবাসন করেন। তাদের পরবর্তী প্রজন্মের অনেকেই পরে ফুটবলার হন। ফলে জন্ম হয় এক দেশে, কিন্তু পারিবারিক শেকড় থাকে অন্য দেশে। এই কারণেই আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল ও উরুগুয়ের বহু ফুটবলার ইতালির নাগরিকত্ব নিয়ে আজ্জুরিদের হয়ে খেলেছেন।

বিখ্যাত কিছু উদাহরণ

প্যাট্রিক ভিয়েরা

প্যাট্রিক ভিয়েরা

(১) প্যাট্রিক ভিয়েরা—সেনেগালে জন্ম নেওয়া আর্সেনালের এই কিংবদন্তি মিডফিল্ডার ফ্রান্সের হয়ে ১৯৯৮ বিশ্বকাপ ও ২০০০ ইউরো জিতেন। তাঁর ফরাসি নাগরিকত্ব পাওয়ার আইনি ভিত্তি ছিল তাঁর দাদা, যিনি ফরাসি সেনাবাহিনীতে কাজ করতেন।

মাউরো কামোরানেসি

মাউরো কামোরানেসি

(২) মাউরো কামোরানেসি—আর্জেন্টিনায় জন্ম। কিন্তু বিশ্বকাপ জিতেছেন ইতালির হয়ে। মাউরো কামোরানেসি সম্ভবত গ্র্যান্ডফাদার রুলের সবচেয়ে সফল উদাহরণ। আর্জেন্টিনার তান্দিলে জন্ম নেওয়া এই উইঙ্গারের পরিবার ছিল ইতালীয় বংশোদ্ভূত। পূর্বপুরুষদের সূত্রে তিনি ইতালির নাগরিকত্ব পান। এবং ২০০৩ সালে ইতালির জাতীয় দলে অভিষেক করেন। মাত্র ৩ বছর পরেই ২০০৬ জার্মানি বিশ্বকাপে ইতালির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় হয়ে ওঠেন এবং ইতালির হয়ে বিশ্বকাপ জয় করেন।

দিয়েগো কস্তা

দিয়েগো কস্তা

(৩) দিয়েগো কস্তা—ব্যতিক্রমী উদাহরণ, ব্রাজিল ছেড়ে স্পেনে? তার ঘটনা অনেকেই গ্র্যান্ডফাদার রুলের সঙ্গে মিলিয়ে ফেলেন। বাস্তবে তিনি ব্রাজিলে জন্মেছিলেন। পরে স্পেনে দীর্ঘদিন খেলার মাধ্যমে নাগরিকত্ব অর্জন করেন। অর্থাৎ তাঁর ক্ষেত্রে দাদা বা নানার সূত্র নয়, বরং ন্যাচারালাইজেশন-এর মাধ্যমে স্পেনের হয়ে খেলার সুযোগ তৈরি হয়। আর তারকাবহুল ব্রাজিলের কোচ দুঙ্গার কাছ থেকে দলে ডাক না পাবার ক্ষোভ ও অভিমানে তিনি স্পেনের হয়ে খেলার সিদ্ধান্ত নেন। যদিও জাতীয় দলের হয়ে তার পরিসংখ্যান উল্লেখযোগ্য নয়। শুধু ২০১৮ বিশ্বকাপে স্পেনের হয়ে ৩ গোল করেন এই স্ট্রাইকার। সব মিলিয়ে স্পেনের হয়ে ২৪ ম্যাচে করেছেন ১০ গোল।

(৪) মাতেও রেতেগি—স্কালোনি ছেড়ে স্পালেত্তির দলে যিনি যোগ দেন। জন্ম আর্জেন্টিনায়। তবে তার দাদা ইতালীয় হওয়ায় তিনি ইতালির নাগরিকত্ব পাওয়ার যোগ্য হন। ২০২৩ সালে ইতালির কোচ রবার্তো মানচিনি তাকে জাতীয় দলে ডাকেন। রেতেগি আর্জেন্টিনার কোনো অফিসিয়াল সিনিয়র ম্যাচ না খেলায়, সহজেই ইতালির হয়ে আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার শুরু করেন।

ডেকলান রাইস (ডানে), জ্যাক গ্রিলিশ (বাঁয়ে)

ডেকলান রাইস (ডানে), জ্যাক গ্রিলিশ (বাঁয়ে)

(৫) ডেকলান রাইস—আয়ারল্যান্ড থেকে ইংল্যান্ড। ডেকলান রাইসের দাদা-দাদি ছিলেন আইরিশ। বংশসূত্রে তিনি আয়ারল্যান্ডের হয়ে যুব ও সিনিয়র পর্যায়ে কয়েকটি আন্তর্জাতিক ম্যাচও খেলেন। কিন্তু যেহেতু তখনও তিনি বড় কোনো প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে ফেলেননি, তাই নিজের ক্যারিয়ারের সম্ভাবনা বিবেচনা করে পরবর্তীতে ফিফার নিয়ম অনুযায়ী ইংল্যান্ডের নাগরিকত্ব নেন। সিদ্ধান্তটি আজ নিজেই কথা বলছে। আজ তিনি ইংল্যান্ডের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মিডফিল্ডার। আর্সেনালের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়দের একজন।

(৬) জ্যাক গ্রিলিশ—তারও সুযোগ ছিল আয়ারল্যান্ডের হয়ে খেলার। দাদা-দাদি ছিলেন আয়ারল্যান্ডের। গ্রিলিশ আয়ারল্যান্ডের যুব দলের হয়েও খেলেছিলেন। পরে ইংল্যান্ডের হয়ে আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার গড়ার সিদ্ধান্ত নেন। বর্তমানে ইংল্যান্ডের অন্যতম পরিচিত তারকা তিনি।

থিয়াগো আলকান্তারা

থিয়াগো আলকান্তারা

(৭) থিয়াগো আলকান্তারা—আলফ্রেডো ডি স্টেফানো নন, তবু তার ঝুলিতে তিন দেশ। থিয়াগো আলকান্তারার জন্ম ইতালিতে। তার বাবা ব্রাজিলের কিংবদন্তি ফুটবলার মাজিনিও—যিনি ব্রাজিলের হয়ে ১৯৯৪ বিশ্বকাপ জিতেছেন। থিয়াগো ছোটবেলা থেকে স্পেনে বেড়ে ওঠায় এবং স্প্যানিশ নাগরিকত্ব পাওয়ায় স্পেনের হয়ে খেলার সিদ্ধান্তই নেন। এরকম আরেকটি উদাহরণ আছে: ব্রাজিলের সাবেক লেফটব্যাক ও রিয়াল মাদ্রিদ কিংবদন্তি মার্সেলো ভিয়েইরার ছেলে—এনজো আলভেস ভিয়েইরা। খেলেছেন স্পেনের অনুর্ধ্ব-১৫ ও ১৬ দলের হয়ে। বর্তমানে অনুর্ধ্ব-১৭ দলের স্ট্রাইকার। জাতীয় দলের হয়ে অভিষেক করার আগ পর্যন্ত অবশ্য দল বদলের সুযোগ তার আছে।

জর্জিনহো

জর্জিনহো

(৮) জর্জিনহো—ব্রাজিল থেকে ইতালি। ব্রাজিলে জন্ম। তবে পরিবার ইতালীয় বংশোদ্ভূত হওয়ায় অল্প বয়সেই ইতালিতে চলে যান এবং নাগরিকত্ব পান। ইতালির হয়ে ইউরো ২০২০ জেতেন। একই বছরে ব্যালন ডি'অরের শীর্ষ তিনেও ছিলেন। কেন ব্রাজিল ছেড়ে ইতালি বেছে নিলেন তিনি? কারণ, ইতালিতে বেড়ে ওঠেন তিনি, আর ওটাই তার চেনা পরিবেশ; ইতালির একাডেমি ফুটবল ব্যবস্থায় বিকশিত হন; ইতালির নাগরিকত্ব অর্জন করেন, দলে ডাক পান, গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় হয়ে ওঠেন।

(৯) গনজালো হিগুয়েইন—ফ্রান্স ছেড়ে আর্জেন্টিনা। যদিও ফ্রান্সে জন্মেছিলেন। তাঁর বাবা তখন ফ্রান্সে খেলতেন। জন্মসূত্রে তিনি ফ্রান্সের হয়ে খেলতে পারতেন। কিন্তু পারিবারিক পরিচয় ও আর্জেন্টিনার প্রতি আগ্রহের কারণে আর্জেন্টিনাকেই বেছে নেন।

টিম কাহিল

টিম কাহিল

(১০) টিম কাহিল—অস্ট্রেলিয়ার ইতিহাসের সেরা এই ফুটবলার সিডনিতে জন্ম নিলেও তাঁর নানার দেশের সূত্রে, প্রথমে সামোয়া অনূর্ধ্ব-২০ দলের হয়ে খেলেছিলেন। পরবর্তীতে ফিফার নিয়ম শিথিল হলে তিনি অস্ট্রেলিয়ার মূল দলে ফেরেন, এবং বিশ্বকাপে একাধিক বিখ্যাত গোল করেন।

(১১) আয়মেরিক লাপোর্তে—ফ্রান্স ছেড়ে স্পেন ও বিশ্বকাপ জয়। তিনিও জন্মেছিলেন ফ্রান্সে। তবে তাঁর ক্ষেত্রে গ্র্যান্ডফাদার রুল নয়; স্পেনে দীর্ঘদিন বসবাসের পর নাগরিকত্ব পেয়ে স্পেনের হয়ে খেলেন।

আয়মেরিক লাপোর্তে

আয়মেরিক লাপোর্তে

ফিফা ২০২৬ বিশ্বকাপে 'গ্র্যান্ডফাদার রুল'

এবারের আসরের ৪৮টি দলের মধ্যে মাত্র ৮টি দলে কোনো বিদেশি বা প্রবাসী ফুটবলার ছিল না। বাকি সব দলে ডায়াস্পোরা খেলোয়াড় ছিলেন। সংখ্যায় ২৯২ জন। তবে এই তালিকায় বরাবরের মতো শীর্ষে রয়েছে ফ্রান্স। ২০২৬ বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া ৪৮টি দলের মোট খেলোয়াড়দের মধ্যে ৯৯ জন খেলোয়াড়ের জন্ম ফ্রান্সে। অর্থাৎ ফ্রান্সে জন্ম নিয়ে অন্য দেশের জাতীয় দলের হয়ে খেলছেন তারা। এর মধ্যে তিউনিসিয়া ও আলজেরিয়ায় ফরাসি খেলোয়াড় বেশি।

ফ্রান্স

ফ্রান্স

ফ্রান্স দলেও অদ্ভুত অবস্থা। আদ্রিয়েন রাবিও ছাড়া আর কোনো খেলোয়াড়েরই বংশগত শেকড় ফ্রান্সে নয়। ফ্রান্সকে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ এনে দেয়া কিংবদন্তি জিদানের শেকড় আলজেরিয়ায়। দ্বিতীয় বিশ্বকাপ এনে দেয়া এমবাপ্পের—ক্যামেরুন ও আলজেরিয়া।

কুরাসাও দলটির ২৬ জনের মধ্যে ২৫ জনই নেদারল্যান্ডসে জন্মগ্রহণকারী

কুরাসাও দলটির ২৬ জনের মধ্যে ২৫ জনই নেদারল্যান্ডসে জন্মগ্রহণকারী

এবারের আসরের ক্যারিবীয় দ্বীপরাষ্ট্র কুরাসাও দলটির ২৬ জনের মধ্যে ২৫ জনই নেদারল্যান্ডসে জন্মগ্রহণকারী। ডিআর কঙ্গোর ২২ জন এবং মরক্কোর ১৯ জন খেলোয়াড়ই প্রবাসী। মরক্কো দলের কথা আলাদা করে উল্লেখ না করলেই নয়। ২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপ দলে মরক্কোর ২৬ জন খেলোয়াড়ের মধ্যে মাত্র ৭ জন মরক্কোয় জন্মগ্রহণ করেছেন। বাকি ১৯ জনই ইউরোপ বা আমেরিকার বিভিন্ন দেশে জন্ম নিয়েছেন। মরক্কো ফুটবল ফেডারেশন ফিফার "গ্র্যান্ডফাদার রুল" এবং বাবা-মায়ের বংশোদ্ভূত নীতিকে অত্যন্ত কার্যকরভাবে ব্যবহার করে ইউরোপের সেরা একাডেমিগুলো থেকে প্রতিভাদের নিজ দলে টেনেছে।

এর সবচেয়ে বিখ্যাত উদাহরণ—আশরাফ হাকিমি। গ্র্যান্ডফাদার সংযোগ—মাদ্রিদে জন্ম নেওয়া রিয়াল মাদ্রিদের সাবেক এবং পিএসজির এই বর্তমান তারকা উইংব্যাক মূলত তাঁর বাবা-মায়ের অভিবাসী পরিচয় এবং পারিবারিক ও দাদাবাড়ির গভীর মরক্কান সংযোগের কারণে স্পেনের অনূর্ধ্ব-১৯ দলের প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়ে মরক্কোকে বেছে নেন।

মরক্কো

মরক্কো

ব্রাহিম দিয়াজ—হাকিমির পথের পথিক। জন্ম: স্পেন (মাদ্রিদ)। গ্র্যান্ডফাদার সংযোগ—ব্রাহিমের মা স্প্যানিশ এবং বাবা মেলিলায় জন্ম নেওয়া মরক্কান। তবে আন্তর্জাতিক ফুটবলে তাঁর মরক্কোকে বেছে নেওয়ার আইনি ভিত্তি তৈরি হয় মূলত তাঁর দাদার সূত্রে, যিনি মরক্কো থেকে স্পেনে অভিবাসী হিসেবে এসেছিলেন। ২০২৪ সালে তিনি স্পেন দল ত্যাগ করে মরক্কোকে বেছে নেন।

রোমাইন সাইস—মরক্কোর সাবেক অধিনায়ক। গ্র্যান্ডফাদার সংযোগ—ফ্রান্সের এক মরক্কান পরিবারে জন্ম নেওয়া এই ডিফেন্ডারের দাদা ছিলেন মরক্কো দল নির্বাচনের সবচেয়ে বড় প্রভাবক। শৈশবে দাদার সঙ্গে মরক্কোর ফুটবল ও সংস্কৃতির প্রতি তৈরি হওয়া ভালোবাসার কারণেই তিনি ফ্রান্সের পরিবর্তে মরক্কো জাতীয় দলকে বেছে নেন।

থিয়াগো পিটার্চ পিনার—রিয়াল মাদ্রিদের ভবিষ্যৎ তারকা। জন্ম: স্পেন। গ্র্যান্ডফাদার সংযোগ: রিয়াল মাদ্রিদের বিখ্যাত একাডেমি লা ফ্যাব্রিকার ১৮ বছর বয়সী এই সেন্ট্রাল মিডফিল্ডারের মা স্প্যানিশ এবং বাবা মরক্কান। তবে মরক্কো ফুটবল ফেডারেশন তাকে দলে টানার জন্য মূলত তাঁর দাদার মরক্কান জন্মসূত্র—অর্থাৎ ‘গ্র্যান্ডফাদার রুল’ আইনের সুবিধা নিতে চাইছে। ব্রাহিম দিয়াজ নিজেই বর্তমানে তাকে মরক্কো দলে যোগ দেওয়ার জন্য উৎসাহিত করছেন।

হাকিম জিয়েশ। জন্ম: নেদারল্যান্ডস। গ্র্যান্ডফাদার সংযোগ: ডাচ ফুটবল পদ্ধতিতে বড় হওয়া জিয়েশ নেদারল্যান্ডসের যুব দলগুলোর হয়ে খেলেছেন। তবে তাঁর বাবা-মা এবং দাদা-দাদির মরক্কান বংশোদ্ভূত পরিচয়ের সূত্র ধরে ২০১৫ সালে তিনি ডাচ মূল দলের ডাক প্রত্যাখ্যান করেন। এবং পূর্বপুরুষের দেশ মরক্কোর হয়ে খেলা শুরু করেন।

সোফিয়ান আমরাবাত ও নুসাইর মাজরাউই। জন্ম: নেদারল্যান্ডস। গ্র্যান্ডফাদার সংযোগ: এই দুই—মিডফিল্ডার ও ডিফেন্ডার ডাচ একাডেমিতে বড় হয়েছেন। নেদারল্যান্ডসের নাগরিক হওয়া সত্ত্বেও ফিফার আইনের সুবিধা নিয়ে তাঁরা মরক্কোকে ২০২২ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে তুলতে অনন্য ভূমিকা রাখেন।

আইয়ুব বুয়াদ্দি—মরক্কোর ভবিষ্যৎ। জন্ম: ফ্রান্স। গ্র্যান্ডফাদার সংযোগ: ফ্রান্সের বয়সভিত্তিক দলে খেলা এই তরুণ ফরাসি মিডফিল্ডারকে মরক্কো ফেডারেশন ২০২৬ বিশ্বকাপের ঠিক আগে তাদের দলে ভেড়াতে সক্ষম হয়। তাঁর বাবা-মা এবং পূর্বপুরুষদের মরক্কান শেকড়ের সুবাদেই এই নাগরিকত্ব পরিবর্তন সম্ভব হয়েছে।

বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দল

বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দল

বাংলাদেশেও...

বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনও (বাফুফে) ফিফার এই বংশোদ্ভূত ও গ্র্যান্ডফাদার রুলের সুবিধা নিয়ে প্রবাসী বা ডায়াসপোরা ফুটবল তারকাদের জাতীয় দলে অন্তর্ভুক্ত করছে। বাংলাদেশে এই নিয়মের সবচেয়ে বড় প্রভাবক মূলত বাবা-মা এবং দাদা-দাদি/নানা-নানির জন্মসূত্র। বাংলাদেশের ফুটবলে এই নিয়মের বিখ্যাত উদাহরণ—

১. জামাল ভূঁইয়া—বাংলাদেশ ফুটবলে ডায়াস্পোরা বিপ্লবের পথিকৃৎ। পারিবারিক সংযোগ: জামাল ভূঁইয়া ডেনমার্কে জন্মগ্রহণ করেন এবং সেখানেই ফুটবলে বড় হন। তবে তাঁর বাবা-মা এবং দাদাবাড়ির শেকড় বাংলাদেশে হওয়ায় ২০১৩ সালে তিনি প্রথম প্রবাসী খেলোয়াড় হিসেবে বাংলাদেশ দলে যোগ দেন এবং দীর্ঘদিন সফলভাবে জাতীয় দলের অধিনায়কের দায়িত্ব পালন করেন।

২. হামজা চৌধুরী—সবচেয়ে হাই-প্রোফাইল উদাহরণ। জন্ম: ইংল্যান্ড। পারিবারিক ও গ্র্যান্ডফাদার সংযোগ: ইংল্যান্ডের লেস্টার সিটির এই মিডফিল্ডার (বর্তমানে শেফিল্ড ইউনাইটেডে লোনে খেলছেন) ফুটবল বিশ্বে দক্ষিণ এশীয় বংশোদ্ভূত সবচেয়ে বড় তারকা। তাঁর বাবা গ্রেনাডিয়ান হলেও তাঁর মা এবং নানা-নানি বাংলাদেশের সিলেট জেলার বাসিন্দা। ফিফার দ্বৈত নাগরিকত্ব ও পূর্বপুরুষের দেশের হয়ে খেলার নিয়ম ব্যবহার করেই তিনি সমস্ত আইনি প্রক্রিয়া শেষ করে বাংলাদেশের লাল-সবুজ জার্সি গায়ে জড়িয়েছেন।

৩. তারিক কাজী—লাল-সবুজের রক্ষণ দেয়াল ও দারুণ হেডার। জন্ম: ফিনল্যান্ড। পারিবারিক সংযোগ: তারিক কাজী ফিনল্যান্ডের অনূর্ধ্ব-১৭, ১৮ ও ১৯ জাতীয় দলের হয়ে খেলেছেন। তবে তাঁর বাবা এবং পূর্বপুরুষদের বাংলাদেশি নাগরিকত্ব থাকার কারণে ফিফার নিয়ম মেনে তিনি বাংলাদেশের হয়ে খেলার সবুজ সংকেত পান, এবং বর্তমানে বাংলাদেশ জাতীয় দলের একজন অন্যতম নির্ভরযোগ্য ডিফেন্ডার।

৪. শমিত শোম—লাল-সবুজ জার্সির নতুন মিডফিল্ডার। পারিবারিক সংযোগ: কানাডায় জন্ম নেওয়া এবং কানাডা জাতীয় দলের হয়ে আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলা এই মিডফিল্ডার তার বাবা-মা ও পূর্বপুরুষদের জন্মসূত্রে বাংলাদেশ জাতীয় দলে যোগ দেন। এখানে একটা ইন্টারেস্টিং ব্যাপার আছে। কোনো দেশের জাতীয় দলের হয়ে এক ম্যাচ খেললেই নাগরিকত্ব ও দল বদলানোর সুযোগ ছিল না। কিছু ক্ষেত্রে, নেইও। তবে ২০২০ সালে ফিফার সংশোধিত নিয়ম অনুযায়ী, কোনো খেলোয়াড় নির্দিষ্ট শর্তে দলবদল করতে পারেন। শমিত শোম কানাডার হয়ে যে ২ ম্যাচ খেলেছিলেন সেগুলো ছিল অনানুষ্ঠানিক প্রীতি ম্যাচ এবং ফিফা আন্তর্জাতিক উইন্ডোর বাইরের ম্যাচ। অর্থাৎ কানাডার হয়ে তিনি অফিশিয়াল বা প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচ (যেমন, বিশ্বকাপ বা কনকাকাফ গোল্ড কাপ) খেলেননি। তাই 'ক্যাপ-টাইড' (নিয়মের ফাঁদে আটকে পড়া) হননি শমিত শোম।

৫. ফাহামিদুল ইসলাম—রক্তে ইতালীয় ফুটবল শৈলী। জন্ম: ইতালি। পারিবারিক সংযোগ: ইতালির যুব ফুটবলে বেড়ে ওঠা এই তরুণ উইংব্যাকের পরিবার ও দাদা-দাদির আদিনিবাস বাংলাদেশে। এই সংযোগের কারণে তিনিও প্রবাসী কোটায় বাংলাদেশ জাতীয় দলের ক্যাম্পে ডাক পান এবং লাল-সবুজের জার্সিতে খেলা শুরু করেন। বাংলাদেশের লেফট ফ্ল্যাংকে আধুনিক ফুটবলের ছোঁয়া নিয়ে এসেছেন।

(*ফাহামিদুল ইসলামের খেলার শৈলী ও বাংলাদেশ দলে তার অবদানের সম্ভাবনা নিয়ে একটা স্টরি আসছে দ্রুতই...)

৬. কিউবা রাউল মিচেল—ইংল্যান্ডে জন্মগ্রহণকারী পেশাদার ফুটবলার। আন্তর্জাতিক স্তরে বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের হয়ে সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার হিসেবে মাত্র ১ ম্যাচ খেলেই রহস্যজনকভাবে আর দলে ডাক পাননি। তিনিও ফিফার বংশোদ্ভূত ও গ্র্যান্ডফাদার নিয়মের এক অনন্য এবং চমৎকার উদাহরণ।

৭. কাজেম শাহ—আধুনিক এটাকিং মিডফিল্ডার। জন্ম: ঢাকায়। বেড়ে ওঠেন কানাডায়। কানাডিয়ান-বাংলাদেশি ফুটবলার এই এটাকিং ও সেন্ট্রাল মিডফিল্ডারও বাংলাদেশ জাতীয় দলের স্কোয়াড ও আন্তর্জাতিক ম্যাচে নিজের স্থান করে নিয়েছেন। চমৎকার পাসিং ও বল দখলের দক্ষতার কারণে বাংলাদেশ জাতীয় দলে তিনি নিয়মিত ডাক পাচ্ছেন।

Image

অনূর্ধ্ব-২০ ও অনূর্ধ্ব-২৩ দলে ও স্কাউটদের নজরে

১, রোনান সুলিভান—যুক্তরাষ্ট্র। সুলিভান ভাইদের মধ্যে মেজ—রোনান সুলিভান ইতোমধ্যে সরাসরি ফিফার গ্র্যান্ডফাদার রুল বা বংশোদ্ভূত নীতি ব্যবহার করে বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-২০ জাতীয় ফুটবল দলের হয়ে খেলার গৌরব অর্জন করেছেন। ২০২৬ সালের মার্চ-এপ্রিল মাসে অনুষ্ঠিত সাফ অনূর্ধ্ব-২০ চ্যাম্পিয়নশিপে বাংলাদেশ দলের হয়ে খেলার জন্য তিনি বাফুফের আনুষ্ঠানিক ডাক পান।

২. একরামুল ক্যাসপার হক—ইংল্যান্ড। মূলত সেন্টার-ব্যাক বা ডিফেন্ডার হিসেবে খেলেন। প্রয়োজনে সেন্ট্রাল ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডেও খেলতে পারেন। তিনি ৬ ফুট ২ ইঞ্চি উচ্চতার অধিকারী।

এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত খেলোয়াড়দের মধ্যে জায়ান আহমেদের নাম না বললেই নয়। স্কাউটদের রাডারে আছেন—ট্রেভর ইসলাম (যুক্তরাষ্ট্র), সমীর মিয়াহ (ওয়েলস), বীতশোক চাকমা (শ্রাবণ)—রাঙামাটিতে জন্ম। আমেরিকায় বেড়ে ওঠা। ১৮ বছর বয়সী স্ট্রাইকার (৯) খেলেন সিটি কলেজ অব নিউ ইয়র্ক বিভারস ক্লাবে।

এদের বাইরেও প্রচুর বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত খেলোয়াড়দের বাংলাদেশ দলে ভেড়ানোর জন্য চেষ্টা, পরিকল্পনা, স্কাউটিং ও ট্রায়াল দেয়া অব্যহত রেখেছে বাফুফে।

মাতসুশিমা সুমাইয়া

মাতসুশিমা সুমাইয়া

বাংলাদেশ নারী ফুটবলের প্রথম প্রবাসী

মাতসুশিমা সুমাইয়া—২০০১ সালে জাপানের টোকিওতে জন্ম। বাবা মাসুদুর রহমান বাংলাদেশি এবং মা তোমোমি মাতসুশিমা জাপানি নাগরিক। ২ বছর বয়সে তিনি সপরিবারে বাংলাদেশে চলে আসেন। পরবর্তীতে পেশা হিসেবে বেছে নেন ফুটবলকে। তবে তার ক্ষেত্রে জাপানি নাগরিকত্ব ত্যাগের নজিরবিহীন সিদ্ধান্ত আর আইনি জটিলতার কথা উল্লেখ করতেই হয়। জাপানের আইন অনুযায়ী, ২২ বছর বয়স হলে দ্বৈত নাগরিকত্ব রাখা যায় না। যে কোনো একটি দেশ বেছে নিতে হয়। কেবল লাল-সবুজের জার্সিতে খেলার স্বপ্ন পূরণের জন্যই ২০২৩ সালে সুমাইয়া জাপানের মতো উন্নত দেশের শক্তিশালী পাসপোর্ট ও নাগরিকত্ব সম্পূর্ণ ত্যাগ করেন। এবং স্থায়ীভাবে বাংলাদেশি নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন। বর্তমানে বাংলাদেশ নারী ফুটবল দল ও বসুন্ধরা কিংস মহিলা ফুটবল দলের মিডফিল্ডার হিসেবে খেলেন তিনি।

আনিকা রানিয়া সিদ্দিকী

আনিকা রানিয়া সিদ্দিকী

আনিকা রানিয়া সিদ্দিকী—ট্রায়ালে আছেন, অপেক্ষা অভিষেকের। পারিবারিক সংযোগ: বাংলাদেশের নারী ফুটবলেও এই নিয়মের হাওয়া লেগেছে। সুইডেনে জন্ম নেওয়া ২০ বছর বয়সী এই মিডফিল্ডার তাঁর পারিবারিক ও পূর্বপুরুষদের বাংলাদেশি শেকড়ের সূত্র ধরে পাসপোর্ট সংগ্রহ করেছেন এবং বাংলাদেশ নারী জাতীয় দলের ট্রায়ালে অংশ নিয়ে ইতিহাস গড়েছেন।

বাংলাদেশি অভিবাসীরা প্রধানত যুক্তরাজ্য, ইউরোপ, আমেরিকা ও কানাডায় স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। তাদের দ্বিতীয় বা তৃতীয় প্রজন্মের সন্তানরা (যাদের জন্ম বিদেশে) চমৎকার সব ফুটবল একাডেমিতে আধুনিক ফুটবলের দীক্ষা নিচ্ছেন। তাদেরকে বাংলাদেশ জাতীয় দলে আনার ক্ষেত্রে গ্র্যান্ডফাদার রুলটি আশীর্বাদ হয়ে দাঁড়িয়েছে নিঃসন্দেহে।

রনক জামান

রনক জামান

খেলাধুলার সব খবর ও বিশ্লেষণ সবার আগে পেতে চোখ রাখুন খেলারদেশে।

মন্তব্যসমূহ (0)

মন্তব্য করতে এবং আলোচনায় অংশ নিতে আপনার গুগল অ্যাকাউন্ট দিয়ে লগইন করুন।