নিজেকে কিনে নেওয়া রোনাল্ডোর গল্প
১৯৯৬ সালের জুলাইয়ে বার্সেলোনা পিএসভি আইন্দহোফেনকে দিয়েছিল প্রায় ১৫০ কোটি পেসেতা। সব মিলিয়ে খরচ দাঁড়িয়েছিল প্রায় দুই কোটি ডলার, তখনকার বিশ্বরেকর্ড। ছেলেটার বয়স তখন ১৯ বছর। মাত্রই নেদারল্যাণ্ডস এরেদিভিসিতে ভালো সিজন কাটিয়ে এসেছে, সাথে সন্দেহজনক হাঁটুর ইঞ্জুরি। ঐ একই কন্ট্রাক্টে রিলিজ ক্লজ লেখা হলো ৪০০ কোটি পেসেতা।

রোনাল্ডো নাজারিও
১৯৯৭ সালের ৫ জুন ইন্টার মিলান ৪০০ কোটি পেসেতা (২০০২ সালে ইউরো চালুর আগে পেসেতাই ছিলো স্প্যানিশ মুদ্রা) দিয়ে রোনাল্ডোকে নিয়ে গেল। অদ্ভুত ব্যাপার হলো, বার্সেলোনা তাকে বিক্রিই করেনি। টাকাটা জমা পড়েছিল লিগা দে ফুতবল প্রফেশনালের অ্যাকাউন্টে, রোনাল্ডোর নিজের নামে। বার্সেলোনার অনুমতি লাগেনি। তাদের সইও নয়। কারণ রোনাল্ডোকে বিক্রি করার অধিকার তখন আর বার্সেলোনার হাতে ছিল না।
১৯৮৫ সালের আগে স্পেনে ক্লাবগুলোর হাতে একটা বিশেষ অধিকার ছিল। সেটার নাম ছিল দেরেচো দে রেতেনসিওন, অর্থাৎ খেলোয়াড় ধরে রাখার অধিকার। কন্ট্রাক্টের মেয়াদ ফুরিয়ে গেলেও ক্লাব সামান্য বেতন বাড়িয়ে একতরফা কন্ট্রাক্ট নবায়ন করে দিতে পারত। প্লেয়ারের মতামত লাগত না। ফলে একজন ফুটবলার ইচ্ছার বিরুদ্ধে পুরো ক্যারিয়ার এক ক্লাবেই আটকে যেতেন, যতদিন ক্লাব চায়।
১৯৮৫ সালের ২৬ জুন স্প্যানিশ সরকার রেয়াল দেক্রেতো ১০০৬ পাশ করে, পেশাদার খেলোয়াড়দের চাকরির সম্পর্ক নিয়ে আলাদা আইন। ঐ আইনের ১৩ নম্বর ধারা, ধরে রাখার অধিকার মুছে দেয়। ওখানে লেখা আছে, খেলোয়াড় নিজের ইচ্ছায় কন্ট্রাক্ট শেষ করে দিতে পারবেন। কোনো কারণ দেখাতে হবে না। ক্লাবের সম্মতি লাগবে না। আর ১৬ নম্বর ধারা বলে, এভাবে চলে গেলে ক্লাব ক্ষতিপূরণ পাবে, আর দুই পক্ষ আগে থেকে ক্ষতিপূরণের অঙ্ক ঠিক না করে রাখলে ঐ অঙ্ক ঠিক করবে শ্রম আদালত।
আদালতের বিচারে নিজের সেরা প্লেয়ারের দাম ঠিক হোক, কোনো ক্লাবই এটা চায় না। তাই ক্লাবগুলো কন্ট্রাক্টেই অঙ্কটা লিখে রাখতে শুরু করল। ঐটার নাম ক্লাউসুলা দে রেসিসিওন। রিলিজ ক্লজ! স্পেনে প্রতিটা প্লেয়ারের কন্ট্রাক্টে রিলিজ ক্লজ থাকে। ক্লাব চাইলেও বাদ দিতে পারে না, কারণ এটা আইনের শর্ত। কেবল টাকার অঙ্ক কত হবে, ওটা ক্লাব ঠিক করে।
আর টাকা দেওয়ার নিয়ম আরও অদ্ভুত। ইংল্যান্ডে ক্লাব ক্লাবকে টাকা দেয়। স্পেনে দেয় প্লেয়ার নিজে। কেনার ক্লাব প্লেয়ারকে অগ্রিম টাকা ধরিয়ে দেয়, প্লেয়ার ঐ টাকা লিগ কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দিয়ে নিজেকে কন্ট্রাক্ট থেকে মুক্ত করেন, তারপর লিগ টাকা পুরনো ক্লাবের হাতে তুলে দেয়। কাগজে-কলমে ইন্টার রোনাল্ডোকে কেনেনি। রোনাল্ডো নিজেই নিজেকে কিনে নিয়েছিলেন।
এখানে একটা ফাঁদ ছিল, যেটা এখন আর নেই। ২০১৬ সাল পর্যন্ত স্প্যানিশ কর দপ্তর ঐ অগ্রিম টাকাকে প্লেয়ারের আয় ধরত। মানে কেনার ক্লাবকে ক্লজের পুরো অঙ্ক দিতে হতো, তারপর ঐ অঙ্কের উপর পঞ্চাশ শতাংশ পর্যন্ত আয়কর দিতে হতো। কার্যত দাম প্রায় দ্বিগুণ। রোনাল্ডোর এজেন্ট জোভান্নি ব্রানকিনি পরে বলেছেন, ঐ ক্লজ তখনকার দিনে নতুন ছিল, আর অনেক ক্লাবকে ভয় পাইয়ে দিয়েছিল।
এবার সংখ্যায় আসি। ১৯৯৬ সালের জুলাইয়ে বার্সেলোনা পিএসভি আইন্দহোফেনকে দিয়েছিল প্রায় ১৫০ কোটি পেসেতা। সব মিলিয়ে খরচ দাঁড়িয়েছিল প্রায় দুই কোটি ডলার, তখনকার বিশ্বরেকর্ড। ছেলেটার বয়স তখন ১৯ বছর। মাত্রই নেদারল্যাণ্ডস এরেদিভিসিতে ভালো সিজন কাটিয়ে এসেছে, সাথে সন্দেহজনক হাঁটুর ইঞ্জুরি। ঐ একই কন্ট্রাক্টে রিলিজ ক্লজ লেখা হলো ৪০০ কোটি পেসেতা।
১৯৯৬ সালের জুলাইয়ে ৪০০ কোটি পেসেতা মানে অবিশ্বাস্য একটা অঙ্ক। পৃথিবীর কোনো ক্লাব তখনো একজন ফুটবলারের পেছনে অতো খরচ করেনি। বার্সেলোনার হিসাব ছিল সোজা: টাকার অঙ্ক এত উঁচুতে রাখো যে কেউ ছুঁতে পারবে না। এরপর ১০ মাস কেটে গেলো।

৪৯ ম্যাচে ৪৭ গোল। লিগে ৩৭ ম্যাচে ৩৪ গোল, ক্লাব রেকর্ড, যেটা টিকে ছিল ২০০৯-১০ মৌসুমে মেসি ভাঙার আগ পর্যন্ত। চারটা হ্যাটট্রিক। অক্টোবরে কম্পোস্তেলার বিপক্ষে মাঝমাঠ থেকে দৌড় শুরু করে চারজনকে কাটিয়ে করা সেই গোলটা আজও ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত গোল। রটারডামে কাপ উইনার্স কাপ ফাইনালে পিএসজির বিপক্ষে ৩৭ মিনিটে পেনাল্টি, ১-০, ট্রফি। কোপা দেল রে, স্প্যানিশ সুপার কাপ। পিচিচি, ইউরোপিয়ান গোল্ডেন শু, আর ফিফা বর্ষসেরা খেলোয়াড়ের সবচেয়ে কম বয়সী বিজয়ী।
রিলিজ ক্লজের অঙ্ক ঠিক করা হয়েছিল এমন সময়ে, যখন বার্সেলোনা রোনাল্ডোকে নিয়ে খুব বেশি কিছু জানত না। কন্ট্রাক্টে সই করার দিনই তারা ঠিক করে দিয়েছিল, ভবিষ্যতে রোনাল্ডোকে ছাড়তে হলে সর্বোচ্চ কতো টাকা দিতে হবে। সেই অঙ্ক লেখা হয়েছিল ১৯৯৬ সালের জুলাইয়ে। তখন রোনাল্ডো মাত্র ১৯ বছরের এক তরুণ, বার্সেলোনার হয়ে এক মিনিটও খেলেননি।
কিন্তু পরের দশ মাসে রোনাল্ডো এমন একটা মৌসুম খেললেন, যা বার্সেলোনার হিসাব পুরো বদলে দেওয়ার কথা। জুলাইয়ে যে ৪০০ কোটি পেসেতা তাদের কাছে অসম্ভব মনে হয়েছিল, মে মাসে এসে সেটাই হয়ে গেল বাস্তবসম্মত দাম। অথচ কন্ট্রাক্টের সেই অঙ্ক আর বদলানো হয়নি। বার্সেলোনা তখন বুঝতে পারল, তারা যে সংখ্যা দিয়ে রোনাল্ডোকে আটকে রাখার কথা ভেবেছিল, সেটাই আসলে তাকে ছেড়ে দেওয়ার দরজা খুলে রেখেছে।

সিজন শুরুর দুই মাসের মাথায় বার্সেলোনা পুরনো কন্ট্রাক্ট ছিঁড়ে বেতন দ্বিগুণ করার প্রস্তাব দেয়। ৬ নভেম্বর প্রেসিডেন্ট ইয়োসেপ লুইস নুনিয়েসের সঙ্গে এজেন্টদের মৌখিক সমঝোতা হয়, কাগজে সই হওয়ার কথা ফেব্রুয়ারি শেষ হওয়ার আগে। ফেব্রুয়ারি এল, চলেও গেল। নতুন সময়সীমা পড়ল মে মাসে।
প্রতি সপ্তাহে রোনাল্ডো গোল করছিলেন। আর প্রতি সপ্তাহে এজেন্টদের হাত শক্ত হচ্ছিল। নতুন কন্ট্রাক্টে সই তখনো হয়নি। অর্থাৎ ১৯৯৬ সালের জুলাইয়ে লেখা ৪০০ কোটির ক্লজ পুরো সিজন জুড়ে বহাল ছিল। ব্রানকিনি পরে সরাসরি বলেছেন, বার্সেলোনার আইনজীবী আর ভাইস প্রেসিডেন্ট জোয়ান গাসপার্তের সাথে দিনের পর দিন আলোচনা হয়েছে, আর ওরা যেটার গুরুত্ব বুঝতে পারেনি সেটা ঐ রিলিজ ক্লজ।
এ নিয়ে দুইটা আলাদা বয়ান আছে।
নুনিয়েসের পক্ষের গল্পটা অবশ্য অন্যরকম। তাঁর দাবি ছিল, শুরু থেকেই রোনাল্ডোর এজেন্টরা আলোচনাটা সহজ হতে দেয়নি। একটা বিষয়ে সমঝোতায় পৌঁছালেই নতুন আরেকটা দাবি সামনে আসত। পাঁচটা বিষয় মিটলে ষষ্ঠটা, ষষ্ঠটা মিটলে আবার সপ্তমটা। এভাবে আলোচনা বারবার পিছিয়ে যাচ্ছিল। শেষ পর্যন্ত একদিন রোনাল্ডো নিজেই কাঁদতে কাঁদতে নুনিয়েসের কাছে এসে জানান, তাঁর উপদেষ্টারা নাকি আরও ভালো একটা প্রস্তাব পেয়েছেন।
রোনাল্ডোর বক্তব্য ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাঁর দাবি, আলোচনার শেষ দিকে দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতা হয়ে গিয়েছিল। এমনকি বার্সেলোনা থেকেই ফোন করে জানানো হয়েছিল, চুক্তি চূড়ান্ত, সবাই এতে সন্তুষ্ট। কিন্তু তিন দিন পর আবার ফোন আসে। এবার জানানো হয়, ক্লাবের আইনজীবী আর প্রেসিডেন্ট চুক্তিটা নতুন করে দেখে মনে করেছেন, শর্তগুলো ঠিকঠাক নয়। ফলে রোনাল্ডো চাইলে সেই ক্লাবেই যেতে পারবেন, যে তাঁর রিলিজ ক্লজের পুরো টাকা দিতে রাজি।
২৯ মে রোনাল্ডো জানিয়ে দেন, তিনি আর বার্সেলোনার হয়ে খেলবেন না। মাত্র এক সপ্তাহ পর, ৫ জুন, ইন্টার রিলিজ ক্লজের টাকা লিগ কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দিয়ে দেয়।
আলোচনার শেষ মুহূর্তে আসলে কার কথা ঠিক ছিল, সেটা নিয়ে বিতর্ক আজও আছে। নুনিয়েসের বয়ান সত্যি, নাকি রোনাল্ডোর, সেই প্রশ্নের নিশ্চিত উত্তর হয়তো আর পাওয়া যাবে না। তবে একটা বিষয় নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই। শেষ পর্যন্ত কী ঘটেছিল, সেটা বোঝার জন্যও এই বিতর্ক খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ নয়।
কারণ বার্সেলোনার হাতে রোনাল্ডোকে আটকে রাখার ক্ষমতা আসলে শেষ হয়ে গিয়েছিল ১৯৯৬ সালের জুলাইয়েই, যেদিন সেই কন্ট্রাক্টে সই হয়েছিল। তখন তারা বুঝতে পারেনি, ৪০০ কোটি পেসেতার সেই অঙ্কটা ভবিষ্যতে রোনাল্ডোকে ধরে রাখার নিশ্চয়তা নয়, বরং তাকে ছেড়ে দেওয়ার মূল্য। ১৯৯৭ সালের মে মাসে এসে তারা শুধু বুঝতে পেরেছিল, নিজেদের হাতে লেখা সেই শর্তটাই আর তাদের পক্ষে নেই।
ঋগ্বেদের দশম মণ্ডলে উর্বশী আর পুরুরবার একটা সংলাপ আছে। শতপথ ব্রাহ্মণে সেই গল্পটা আরও বিস্তারিতভাবে এসেছে। উর্বশী রাজা পুরুরবার সঙ্গে থাকতে রাজি হয়েছিলেন কয়েকটা শর্তে। শর্তগুলো শুরুতেই ঠিক করা ছিল। তাঁর পাশে থাকা দুই ভেড়ার কোনো ক্ষতি করা যাবে না, আর পুরুরবা কখনো তাঁর সামনে বিবস্ত্র হতে পারবেন না। কিছুদিন পর গন্ধর্বরা রাতের অন্ধকারে সেই ভেড়া দুটো চুরি করে নিয়ে যায়। পুরুরবা ভেড়া বাঁচাতে ঘর থেকে বেরিয়ে ছুটলেন, তখনই আকাশে বিদ্যুৎ চমকাল। সেই আলোয় উর্বশীর চোখে পড়ে গেল পুরুরবার নগ্ন শরীর। শর্ত ভেঙে গেল। উর্বশী আর এক মুহূর্তও থাকলেন না, সেখান থেকে চলে গেলেন। গন্ধর্বরা উর্বশীকে ফিরিয়ে নিতে চেয়েছিল। কিন্তু তার জন্য নতুন কোনো শর্ত তৈরি করার দরকার হয়নি। শুরুতেই যে শর্তগুলো ঠিক করা ছিল, তার একটাকেই কাজে লাগানো হয়েছিল।
রোনাল্ডোর ঘটনাটাও কিছুটা এমনই। বার্সেলোনা নতুন করে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি। তারা নিজেরাই এক বছর আগে যে শর্তে সই করেছিল, শেষ পর্যন্ত সেই শর্তের কারণেই রোনাল্ডোকে হারাতে হয়েছিল।
ইন্টার কিন্তু রোনাল্ডোকে নজরে রেখেছিল আরও আগে থেকেই। ব্রাজিলের যুব দলের হয়ে খেলার সময় থেকেই তাদের স্কাউটরা তাকে দেখছিল। পরে ইন্টার প্রেসিডেন্ট মাসিমো মোরাত্তি নিজেই সেই সময়ের একটা ঘটনা বলেছিলেন। এক বসন্তের দিনে ট্যাক্সির পেছনের সিটে বসে তিনি ফিওরেন্তিনার সঙ্গে ব্রাজিলিয়ানের গোলশূন্য ম্যাচ দেখছিলেন। ম্যাচ শেষ হওয়ার আগেই তাঁর সিদ্ধান্ত হয়ে গিয়েছিল, এই ছেলেটাকে ইন্টারে আনতে হবে।
এই আলোচনার বাইরে নাইকিও একটা ভূমিকা নিতে চেয়েছিল। ব্রাজিল দল তখন ফ্রান্সে, আর নাইকি প্রস্তাব দিয়েছিল তাদের একজন প্রতিনিধি সেখানে গিয়ে রোনাল্ডোর সঙ্গে কথা বলবেন। উদ্দেশ্য ছিল, বার্সেলোনা আর রোনাল্ডোর মধ্যে চলতে থাকা আলোচনায় তারা মধ্যস্থতা করবে।
বিষয়টা আরও অদ্ভুত হয়ে যায় অন্য একটা কারণে। একই সময়ে নাইকি বার্সেলোনার সঙ্গে ক্লাবের কিট বানানোর চুক্তি নিয়ে আলোচনা করছিল। প্রস্তাব ছিল ১০ বছরের জন্য প্রায় ১৮০০ কোটি পেসেতা।
কিন্তু নুনিয়েস এতে রাজি ছিলেন না। তিনি পরিষ্কার করে দেন, নাইকি বার্সেলোনার জার্সি বানাতে পারে, কিন্তু রোনাল্ডোর সঙ্গে চুক্তির আলোচনায় তাদের কোনো ভূমিকা থাকবে না। ব্রানকিনির হাতে একটা ছোট ফাইল ছিল। তিনটা নাম: ইন্টার, লাৎসিও, গ্লাসগো রেঞ্জার্স। রেঞ্জার্সের প্রস্তাব ছিল সবচেয়ে অদ্ভুত। ওরা বলেছিল, স্কটিশ লিগে শনিবারের ম্যাচ খেলতে হবে না। শুধু ইউরোপের রাতগুলোতে খেললেই চলবে।
বার্সেলোনা অবশ্য বিষয়টা মেনে চুপ করে বসে থাকেনি। তারা জুরিখে ফিফার কাছে ইন্টারের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে। এরপর বিষয়টি যায় আর্বিট্রেশন কমিটির সামনে। সেখানে রোনাল্ডো ইন্টারে যেতে পারবেন কি না, সেটা আর মূল প্রশ্ন ছিল না। তিনি যে বার্সেলোনা ছেড়ে চলে গেছেন, সেটা তখন পরিষ্কার। আসল প্রশ্ন ছিল, ইন্টারকে বার্সেলোনাকে কত টাকা দিতে হবে। শেষ পর্যন্ত কমিটি বার্সেলোনার পক্ষেই রায় দেয়। নির্ধারিত ৪০০ কোটি পেসেতার বাইরে ইন্টারকে আরও ৪০ কোটি পেসেতা দিতে হয়।
রোনাল্ডোর ঘটনা নুনিয়েসের জন্য একেবারে নতুন অভিজ্ঞতা ছিল না। ১৯৭৮ সালে সোসিওদের ভোটে বার্সেলোনার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়ে তিনি টানা ২২ বছর ক্লাবটি চালিয়েছেন। ১৯৮৪ সালে ম্যারাডোনাকে নাপোলিতে বিক্রি করার সিদ্ধান্তও তাঁর সময়েই হয়েছিল। নুনিয়েস বরাবরই মনে করতেন, বার্সেলোনার খেলোয়াড়দের শুধু মাঠে ভালো খেললেই হবে না, ক্লাবের প্রতিনিধিত্ব করার মতো একটা পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তিও থাকতে হবে। ঝামেলায় জড়িয়ে পড়া বা ক্লাবের সঙ্গে সংঘাতে যাওয়া খেলোয়াড় তিনি পছন্দ করতেন না।
মজার ব্যাপার হলো, ম্যারাডোনা পরে বহুবার নুনিয়েসের সমালোচনা করেছেন। এ নিয়ে নুনিয়েসের নিজের ব্যাখ্যাও ছিল। তাঁর যুক্তি ছিল, একজন খেলোয়াড় ভালো একটা কন্ট্রাক্ট পেয়ে ক্লাব ছেড়ে চলে যাবে, তারপর সেই সিদ্ধান্তের দায়ও যদি প্রেসিডেন্টের ওপর চাপায়, সেটা তিনি বুঝতে পারেন না।
রোনাল্ডো চলে যাওয়ার পর নুনিয়েসও দ্রুত দলটা নতুন করে সাজাতে শুরু করেন। ববি রবসনকে সরিয়ে কোচ হিসেবে নিয়ে আসেন লুই ফন হালকে। দেপোর্তিভো থেকে রিভালদো, আর মোনাকো থেকে সনি অ্যান্ডারসনকে দলে ভেড়ান।

তারপর বার্সেলোনা ১৯৯৭-৯৮ এবং ১৯৯৮-৯৯, টানা দুই মৌসুমে লিগ জেতে। তাই শুধু রোনাল্ডোকে হারানোর দিক থেকে দেখলে গল্পটা একরকম, কিন্তু হিসাবের দিকে তাকালে ছবিটা অন্যরকম। বার্সেলোনা রোনাল্ডোকে কিনেছিল প্রায় ১৫০ কোটি পেসেতায়, আর এক বছর পর ছাড়ে প্রায় ৪৪০ কোটিতে। এর সঙ্গে যোগ হয় টানা দুইটা লিগ শিরোপা।
যে কন্ট্রাক্টে ৪০০ কোটি পেসেতার সেই রিলিজ ক্লজ লেখা ছিল, সেটাতে সই হয়েছিল ১৯৯৬ সালের জুলাইয়ে, মায়ামির একটি হোটেলে। ব্রাজিল দল তখন আটলান্টা অলিম্পিকের প্রস্তুতি নিচ্ছিল সেখানে। অন্যদিকে পিএসভি শেষ মুহূর্তে রোনাল্ডোকে ছাড়তে গড়িমসি করছিল। এমনকি ব্রাজিলিয়ান ফেডারেশনের সাহায্যে বার্সেলোনার লোকজনকে রোনাল্ডোর কাছ থেকে দূরে রাখার চেষ্টাও হচ্ছিল।
রোনাল্ডোর হোটেল রুমের সামনে তখন দুইজন নিরাপত্তারক্ষী দাঁড়িয়ে। সরাসরি ঢোকার উপায় নেই। তাই বার্সেলোনার ভাইস প্রেসিডেন্ট জোয়ান গাসপার্ত অন্য পথ নিলেন। হোটেলের এক স্প্যানিশ ওয়েটারের কাছ থেকে ইউনিফর্ম ধার করে হাতে তুলে নিলেন একটা ট্রে। ট্রের ওপর এক গ্লাস কোকা-কোলা। নিরাপত্তারক্ষীদের বললেন, ভেতরের একজন অতিথি পানীয় চেয়েছেন। তারা সরে দাঁড়াল। গাসপার্ত দরজায় গিয়ে নক করলেন। দরজা খুললেন রোনাল্ডো নিজেই। কিছুক্ষণ পর সেই ঘরের বিছানায় বসেই রোনাল্ডো কন্ট্রাক্টে সই করলেন। কাগজের ওপর লেখা ছিল ৪০০ কোটি পেসেতার রিলিজ ক্লজ। তখন হয়তো এই টাকার অঙ্ক বিশাল মনে হয়েছিল। কিন্তু এক বছর পর সেই অঙ্কই বার্সেলোনার পুরো গল্পের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিলো।

রাইসুল সোহান
খেলাধুলার সব খবর ও বিশ্লেষণ সবার আগে পেতে চোখ রাখুন খেলারদেশে।
সম্পর্কিত আরও খবর
অতিথি কলামমোনেম মুন্না : ‘ভুল করে’ বাংলাদেশে জন্মানো এক ফুটবলার
অতিথি কলামওয়াকা, ওয়াকা, কে পাঠিয়েছে তোমাকে?
অতিথি কলামশাহ আলমকে মনে পড়ে?
অতিথি কলামজাদুকর সামাদ: যে পায়ের জাদুতে থমকে যেত ইতিহাস
অতিথি কলামবিশ্বকাপের কারণে এক মাসের জন্য বদলে যাওয়া শহর
অতিথি কলাম
মন্তব্যসমূহ (0)
মন্তব্য করতে এবং আলোচনায় অংশ নিতে আপনার গুগল অ্যাকাউন্ট দিয়ে লগইন করুন।