বাংলাদেশ ফুটবল, মোনেম মুন্না
মোনেম মুন্না : ‘ভুল করে’ বাংলাদেশে জন্মানো এক ফুটবলার
অতিথি কলাম লিখেছেন ফ্রিল্যান্স ফিচার লেখক ও বিশ্লেষক মাহমুদ নেওয়াজ জয়।

মোনেম মুন্না : ‘ভুল করে’ বাংলাদেশে জন্মানো এক ফুটবলার
মাঠের বাইরে থেকে দেখলে ব্যাপারটা কেমন যেন উল্টো লাগে—যে মানুষটা সারা জীবন অন্যদের গোল ঠেকিয়ে গেছেন, তাঁকে ঠেকানোর কেউ ছিল না শেষ পর্যন্ত।
জার্মান কোচ অটো ফিস্টার একবার তাঁকে নিয়ে বলেছিলেন, ভুল করে বাংলাদেশে জন্ম নিয়েছিলেন এই ছেলেটা। শুনতে বাড়াবাড়ি লাগতে পারে, কিন্তু ফিস্টার এমন কেউ নন যিনি এমনি এমনি বড় কথা বলেন—ঘানাকে যুব বিশ্বকাপ জিতিয়েছেন তিনি, আফ্রিকার দরিদ্র দেশ টোগোকে নিয়ে গেছেন বিশ্বকাপের মূলপর্বে। সেই মানুষ যখন এক বাংলাদেশি ডিফেন্ডারকে নিয়ে এমন কথা বলেন, সেটা একরকম সার্টিফিকেট।

১৯৬৬ সালের ৯ জুন নারায়ণগঞ্জে জন্ম মোহাম্মদ মোনেম মুন্নার। নয় ভাইবোনের সংসারে বড় হয়েছেন বেশ কষ্ট করেই। ফুটবলে নাম লেখান আশির দশকের মাঝামাঝি, যখন মাঠ কাঁপাচ্ছেন আশরাফ উদ্দিন চুন্নু, গোলাম রাব্বানী হেলাল, আসলামের মতো সিনিয়ররা। ১৯৮৪ সালে মুক্তিযোদ্ধায় শুরু, এক মৌসুম ব্রাদার্স ইউনিয়নে, তারপর ১৯৮৭ সালে আকাশি-নীল জার্সি গায়ে জড়ান, ঢাকা আবাহনীতে। এরপর আর দল বদলাননি। প্রায় দেড় দশকের ক্যারিয়ারের পুরোটাই আবাহনীর হয়ে, মৃত্যু পর্যন্ত সেই দলের সঙ্গেই ছিল তাঁর নাড়ির টান।
খেলতেন সেন্টার ব্যাকে, অথচ পরিচিতি পেয়েছিলেন যেন আক্রমণভাগের কোনো তারকার মতো। ভক্তরা ডাকতেন ‘কিংব্যাক’ নামে। ফ্রি-কিক থেকে গোল করার একটা আলাদা ক্ষমতা ছিল তাঁর হাতে-পায়ে, যা রক্ষণভাগের একজন খেলোয়াড়ের জন্য রীতিমতো বিরল ব্যাপার। ১৯৮৬ সালে সিউল এশিয়ান গেমস দিয়ে জাতীয় দলের জার্সি গায়ে ওঠে, খেলে গেছেন প্রায় বিরতিহীনভাবে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত। ১৯৯০ সালে বেইজিং এশিয়ান গেমসে প্রথমবার অধিনায়কের আর্মব্যান্ড পরেন, পরে আরও কয়েকবার নেতৃত্ব দিয়েছেন দলকে। ১৯৯৫ সালে তাঁর অধিনায়কত্বেই মিয়ানমারে চার-জাতি প্রতিযোগিতা জেতে বাংলাদেশ। এটাই ছিল আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের প্রথম শিরোপা।

খ্যাতিটা মাঠ ছাড়িয়ে গিয়েছিল অনেক আগেই। ১৯৯১ সালের দলবদলে আবাহনীর সঙ্গে যে চুক্তি করেন, তখনকার হিসেবে সেই পারিশ্রমিক বিশ লাখ টাকা—রীতিমতো অবিশ্বাস্য শোনাত। শুধু বাংলাদেশে নয়, গোটা উপমহাদেশেই দীর্ঘদিন এটা একরকম রেকর্ড হয়ে ছিল। ক্রিকেট তখনো এদেশে সেই উচ্চতায় ওঠেনি, তাই নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত বিজ্ঞাপনী দুনিয়ায় মুন্নার মুখটাই ছিল অন্যতম চেনা মুখ। ১৯৯৬ সালে ইউনিলিভারের মতো প্রতিষ্ঠান তাঁকে ব্র্যান্ড প্রতিনিধি করেছিল। সীমানা পেরিয়ে খ্যাতি পৌঁছে গিয়েছিল কলকাতাতেও—১৯৯১ ও ১৯৯৩ মৌসুমে ইস্টবেঙ্গলের জার্সিতে লিগ আর ফেডারেশন কাপ জিততে বড় ভূমিকা রাখেন, জিতে নেন ওপার বাংলার সমর্থকদেরও মন।
তবু এত নাম-ডাকের মধ্যেও মানুষটা নাকি ছিলেন অদ্ভুত রকম সাদাসিধে। ছেলে আজমান সালিদের একটা লেখায় পড়েছিলাম, বাবা কখনো নিজের নাম ব্যবহার করে সন্তানদের বাড়তি সুবিধা নিতে দিতেন না—উল্টো শেখাতেন, নিজের পরিচয়ে বড় হও। এমনকি বিয়ের পরও নাকি বেশ কিছুদিন স্ত্রী সুরভী মোনেম জানতেনই না, স্বামী দেশের এত বড় তারকা। ১৯৯৩ সালে অমর একুশে বইমেলায় একটা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হয়ে যাওয়ার পর অটোগ্রাফের জন্য এমন ভিড় জমে যে পুলিশকে এসে সামাল দিতে হয়েছিল—সেদিনই প্রথম স্ত্রী আন্দাজ করতে পারেন, স্বামীর নামের আসল ওজনটা।

তারপর ধরা পড়ে কিডনির অসুখ। চিকিৎসার খরচ জোগাতে গিয়ে পরিবার প্রায় নিঃস্ব হয়ে পড়ে—ফুটবল খেলে যা আয় করেছিলেন, তার প্রায় পুরোটাই চলে যায় হাসপাতালে। ২০০৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি, মাত্র আটত্রিশ বছর বয়সে চলে যান তিনি। রেখে যান স্ত্রী আর দুই ছোট্ট সন্তান—মেয়ে দানিয়া আর ছেলে আজমান, যার বয়স তখন মোটে আট। বাবার নামের ভার বোঝার মতো বয়সও তখন তাঁর হয়নি।
মৃত্যুর পরের অংশটা আরও তেতো। তখন অনেকেই সুরভীকে নানা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন—সন্তানদের পড়াশোনার দায়িত্ব নেওয়ার কথা, পাশে থাকার কথা। সময়ের সঙ্গে সেসব কথা কারো মনে নেই আর। সুরভী নিজেই একবার বলেছিলেন, মিথ্যা প্রতিশ্রুতিটাই তাঁর সবচেয়ে অসহ্য লাগে, কারণ তাঁরা তো কারো সাহায্য চাননি কখনো। একাই দুই সন্তানকে বড় করেছেন। মেয়ে দানিয়া এখন মালয়েশিয়ায় গণিতে স্নাতক করছেন, ছেলে আজমান নিজের জীবনে থিতু হয়েছেন। পুরনো কষ্টের দিনগুলো নিয়ে এখন আর কথা বলতে চান না সুরভী—তবে অন্য একটা আক্ষেপ তাঁকে ছাড়ে না।
মুন্নার মৃত্যুর কুড়ি বছর পূর্ণ হওয়ার দিনেও বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন তাঁর স্মৃতি সংরক্ষণে চোখে পড়ার মতো কিছু করেনি। ধানমন্ডির আট নম্বর সড়কের সেতুতে একটা নামফলক আছে বটে, কিন্তু সেটাও মাঝেমধ্যে পোস্টারে ঢাকা পড়ে যায়। নারায়ণগঞ্জে তাঁর নামে একটা স্টেডিয়াম গড়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন সুরভী। ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীকে চিঠিও দিয়েছিলেন, অনুমোদনও এসেছিল—তারপর কেন যে কিছুই এগোয়নি, সেই উত্তর আজও তাঁর জানা নেই। সবচেয়ে ভয়ের যে জায়গাটা, সেটা তিনি নিজেই বলেছেন একবার—তিনি না থাকলে মুন্নাকে নিয়ে বলার মতো কেউ থাকবে না।

এই আশঙ্কাটা একেবারে অমূলক নয়। জাতীয় দলের এখনকার তরুণ ফুটবলাররা মুন্নার খেলা দেখেননি, নামটা শুনেছেন কেবল ক্লাবের সিনিয়রদের মুখে মুখে। কেউ কেউ বলেন, বই পড়ে হলেও তাঁর সম্পর্কে জানার ইচ্ছা আছে—কিন্তু জানাটা এখনো হয়ে ওঠেনি কারো। যে মানুষ একসময় বিজ্ঞাপনের সবচেয়ে বিক্রিত মুখ ছিলেন, তাঁকে আজকের প্রজন্ম চেনে না বললেই চলে।
প্রতিবছর ফেব্রুয়ারি এলে নারায়ণগঞ্জে তাঁর কবরে কিছু ফুল পড়ে, স্মৃতি সংসদে মিলাদ হয়। বাকি এগারো মাস নামটা পড়ে থাকে নীরবতায়। রক্ষণভাগের একজন খেলোয়াড় কখনো হাততালি কুড়োন না গোলদাতাদের মতো, কিন্তু তাঁকে ছাড়া দল দাঁড়াতে পারে না—এটা মুন্নার নিজের জীবনেও যেন সত্যি হয়ে রইল। আবাহনীর ভরসা ছিলেন তিনি, জাতীয় দলের নির্ভরতা ছিলেন। অথচ নিজের শেষ দিনগুলোয়, আর তার পরের বিশটা বছর ধরে, সেই ভরসার প্রতিদান দিতে তেমন কেউ এগিয়ে আসেননি।

মাহমুদ নেওয়াজ জয়
খেলাধুলার সব খবর ও বিশ্লেষণ সবার আগে পেতে চোখ রাখুন খেলারদেশে।
সম্পর্কিত আরও খবর
অতিথি কলামনিজেকে কিনে নেওয়া রোনাল্ডোর গল্প
অতিথি কলামওয়াকা, ওয়াকা, কে পাঠিয়েছে তোমাকে?
অতিথি কলামশাহ আলমকে মনে পড়ে?
অতিথি কলামজাদুকর সামাদ: যে পায়ের জাদুতে থমকে যেত ইতিহাস
অতিথি কলামবিশ্বকাপের কারণে এক মাসের জন্য বদলে যাওয়া শহর
অতিথি কলাম

মন্তব্যসমূহ (0)
মন্তব্য করতে এবং আলোচনায় অংশ নিতে আপনার গুগল অ্যাকাউন্ট দিয়ে লগইন করুন।