জুম্মন লুসাইয়ের গল্প
পেনাল্টি কর্নারের রাজা
মৌলভীবাজারের মাগুরছড়া খাসিয়া পুঞ্জি ঘেঁষা গ্রামটাই তার শেকড়। পাহাড়, চা-বাগান আর সবুজের মধ্যে বেড়ে ওঠা এক তরুণ, যার হাতে পরে উঠবে হকি স্টিক। ১৯৭৮ সাল। বাংলাদেশ পুলিশের জার্সি গায়ে চড়িয়ে খেলা শুরু করলেন জুম্মন। তখনও কেউ জানত না, এই ছেলেই একদিন উপমহাদেশের হকিতে নিজের নাম খোদাই করে ফেলবে।

জুম্মন লুসাই
সিলেটের পাহাড়ি টিলার কোল ঘেঁষে যে জনপদ, সেখানেই ১৯৫৫ সালের ১২ আগস্ট জন্ম নিয়েছিলেন একজন মানুষ, যিনি পরে বাংলাদেশের হকি ইতিহাসের সবচেয়ে উজ্জ্বল নাম হয়ে উঠবেন। লুসাই পরিবারের সন্তান জুম্মন। নামটা শুনতে সাধারণ, কিন্তু এই নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক অসাধারণ ক্রীড়াজীবনের গল্প।
মৌলভীবাজারের মাগুরছড়া খাসিয়া পুঞ্জি ঘেঁষা গ্রামটাই তার শেকড়। পাহাড়, চা-বাগান আর সবুজের মধ্যে বেড়ে ওঠা এক তরুণ, যার হাতে পরে উঠবে হকি স্টিক। ১৯৭৮ সাল। বাংলাদেশ পুলিশের জার্সি গায়ে চড়িয়ে খেলা শুরু করলেন জুম্মন। তখনও কেউ জানত না, এই ছেলেই একদিন উপমহাদেশের হকিতে নিজের নাম খোদাই করে ফেলবে।
আবাহনীর সঙ্গে চার দশক
জুম্মনের জীবনের সবচেয়ে বড় অধ্যায় লেখা হয়েছে আবাহনী লিমিটেডের জার্সিতে। ৫৯ বছরের জীবনের ৩৪টা বছর কেটেছে এই ক্লাবের সঙ্গে। এটা শুধু একটা সংখ্যা নয়, এক ধরনের আনুগত্যের প্রমাণ। আজকালকার খেলোয়াড়েরা যেভাবে ক্লাব বদলান, সেই যুগে জুম্মন ছিলেন ভিন্ন এক মানুষ। আবাহনীর মাঠে ঘাম ঝরিয়েছেন, আবাহনীর ড্রেসিংরুমেই কেটেছে জীবনের সবচেয়ে বড় সময়টা।
রক্ষণভাগের খেলোয়াড় হিসেবে তার পরিচিতি জাতীয় দলে গিয়ে আরও পোক্ত হয়। ১৯৮২ থেকে ১৯৮৯, টানা প্রায় দশ বছর বাংলাদেশ জাতীয় হকি দলের ডিফেন্স সামলেছেন তিনি একাই যেন। প্রতিপক্ষের আক্রমণ ভাঙার কাজটা যত কঠিন, জুম্মন সেটা করতেন অদ্ভুত এক স্থিরতায়। মাঠের বাইরে থেকে দেখলে মনে হতো, তার কাছে সময়টা যেন একটু বেশিই ধীর।
পেনাল্টি কর্নার স্পেশালিস্ট
জুম্মনের নামের পাশে যে বিশেষণটা সবচেয়ে বেশি বসেছে, সেটা হলো 'পেনাল্টি কর্নার স্পেশালিস্ট'। হকিতে পেনাল্টি কর্নার মানেই গোলের সবচেয়ে বড় সুযোগ, আর সেই সুযোগ কাজে লাগানোর কারিগর হিসেবে জুম্মনের নাম উচ্চারিত হতো শ্রদ্ধার সঙ্গে। তার স্ট্রাইক, তার পজিশনিং, বল ধরে রাখার ভঙ্গি— সবকিছু মিলিয়ে প্রতিপক্ষ দলের কাছে জুম্মন ছিলেন এক আতঙ্কের নাম।
১৯৮৫ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয় নবম এশিয়ান গেমস, সেখানেও অংশ নেন জুম্মন। উপমহাদেশের হকি অঙ্গনে তখন তার নাম বেশ পরিচিত। তবে ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় অর্জনটা বোধহয় আরও একধাপ এগিয়ে। তিনিই বাংলাদেশের একমাত্র হকি খেলোয়াড়, যিনি বিশ্ব একাদশের হয়ে খেলার গৌরব অর্জন করেছেন। দেশের হকি ইতিহাসে এমন কীর্তি আর কারও নেই। একজন পাহাড়ি ছেলে, যিনি নিজের সময়ে বিশ্বমানের খেলোয়াড়দের কাতারে ঠাঁই পেয়েছিলেন।
পরিবার, শেকড় আর লুসাই ঐতিহ্য
জুম্মনের ব্যক্তিজীবনও কম আকর্ষণীয় নয়। স্ত্রী থানপুই লুসাই, তিন সন্তান রিচার্ড, কেলভিন আর ডেভিড। বড় ভাই ধনধন লুসাই, ছোট ভাই জুবেল লুসাই। লুসাই পরিবার নিজেই সিলেট অঞ্চলের ক্রীড়াঙ্গনে একটা পরিচিত নাম, আর জুম্মন সেই পরিবারের সবচেয়ে উজ্জ্বল তারকা। তার প্রভাব পরের প্রজন্মেও ছড়িয়ে পড়ে। ভাতিজা বিয়াকা লুসাই চাচাকে দেখেই হকিতে আসেন, পরে জাতীয় পর্যায়ে খেলেছেন, এমনকি ইলেভেন স্টারের হয়ে ফুটবলেও নাম লিখিয়েছিলেন। এক পরিবার থেকে একের পর এক ক্রীড়াবিদ উঠে আসার এই ধারা সিলেট অঞ্চলের ক্রীড়া ইতিহাসেও বিরল।
শেষ বিদায়
জুম্মন লুসাই যখন পৃথিবী ছেড়ে চলে যান, তখন তার বয়স ৫৯। মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই ক্রীড়াঙ্গনে নেমে আসে শোকের ছায়া। সোমবার সকালে তার মরদেহ প্রথমে নিয়ে যাওয়া হয় প্রিয় ক্লাব আবাহনী লিমিটেডে। সকাল দশটায় সেখানে শেষ শ্রদ্ধা জানানো হয় তাকে। এরপর দুপুর ১২টার দিকে মরদেহ আনা হয় মাওলানা ভাসানী হকি স্টেডিয়ামে, যেখানে তার জীবন আর কর্মের মিলন ঘটেছিল বহুবার।
সেদিন উপস্থিত ছিলেন ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আরিফ খান জয়, অ্যাথলেটিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ইব্রাহিম চেঙ্গিস, ফুটবল ফেডারেশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট কাজী নাবিল আহমেদ, হকি ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক খাজা রহমতউল্লাহ, আর আবাহনীতে তার একসময়ের সতীর্থ সাবেক জাতীয় ফুটবলার আশরাফুদ্দিন চুন্নু। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও তার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেন।
শ্রদ্ধা জানানোর পর্ব শেষ হওয়ার পর মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় সিলেটে। সেখানে সিলেট জেলা স্টেডিয়ামে সিলেটবাসী তাকে ফুলেল শ্রদ্ধা জানায়। শেষ যাত্রায় জাতীয় পতাকা, হকি ফেডারেশনের পতাকা, এমনকি আবাহনী আর মোহামেডান ক্লাবের পতাকা দিয়েও মোড়ানো ছিল তার কফিন। তার লাশবাহী গাড়ির সঙ্গে ছিলেন খাজা রহমতউল্লাহ, আবাহনী ক্রীড়াচক্রের কোচ মাহবুব হারুন, স্ত্রী থানপুই লুসাই, তিন সন্তান, দুই ভাই এবং নিকট আত্মীয়স্বজন। শুধু ক্রীড়াঙ্গনের মানুষ নন, সাধারণ ক্রীড়ানুরাগীরাও ভিড় করেছিলেন প্রিয় তারকার শেষ মুখ একনজর দেখার জন্য।
শেষমেশ তাকে সমাহিত করা হয় নিজের গ্রামের বাড়ি, মাগুরছড়া খাসিয়া পুঞ্জিতে। যে মাটিতে বেড়ে উঠেছিলেন, সেই মাটিতেই ফিরে গেলেন চিরদিনের জন্য।
একটা নাম, যা এখনও প্রাসঙ্গিক
আজকের বাংলাদেশে হকি খেলাটা যতটা আলোচনায় থাকে ক্রিকেট বা ফুটবলের তুলনায়, তার চেয়ে অনেক কম। অথচ একটা সময় ছিল, যখন জুম্মন লুসাইয়ের মতো খেলোয়াড়রা মাঠে নামলে গ্যালারি ভরে উঠত। তার পেনাল্টি কর্নারের স্ট্রাইক দেখতে মানুষ ভিড় করত স্টেডিয়ামে। রক্ষণভাগে তার উপস্থিতি মানেই প্রতিপক্ষের জন্য বাড়তি চাপ।
বাংলাদেশের হকি ইতিহাস ঘাঁটলে জুম্মনের নাম আসবেই, আসতে বাধ্য। বিশ্ব একাদশে খেলার গৌরব যার একার, তার তুলনা খুঁজে পাওয়া কঠিন এই দেশের ক্রীড়া ইতিহাসে। সিলেটের এক পাহাড়ি টিলার ছেলে, যে নিজের স্টিকের জোরে পৌঁছে গিয়েছিল বিশ্বমঞ্চে— এই গল্পটা শুধু একটা মানুষের নয়, এটা গোটা একটা প্রজন্মের গর্বের গল্প।
লুসাই পরিবারের ধারা অবশ্য থেমে থাকেনি। ভাতিজা বিয়াকা যখন হকি স্টিক হাতে নেন, তখন চোখের সামনে ভাসত চাচার সেই খেলা, সেই পেনাল্টি কর্নারের নিখুঁত স্ট্রাইক। এক প্রজন্মের অনুপ্রেরণা কীভাবে পরের প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়ে, জুম্মন লুসাইয়ের গল্প তার এক জলজ্যান্ত উদাহরণ।

মাহমুদ নেওয়াজ জয়
খেলাধুলার সব খবর ও বিশ্লেষণ সবার আগে পেতে চোখ রাখুন খেলারদেশে।
সম্পর্কিত আরও খবর
অতিথি কলামমোনেম মুন্না : ‘ভুল করে’ বাংলাদেশে জন্মানো এক ফুটবলার
অতিথি কলামনিজেকে কিনে নেওয়া রোনাল্ডোর গল্প
অতিথি কলামওয়াকা, ওয়াকা, কে পাঠিয়েছে তোমাকে?
অতিথি কলামশাহ আলমকে মনে পড়ে?
অতিথি কলামজাদুকর সামাদ: যে পায়ের জাদুতে থমকে যেত ইতিহাস
অতিথি কলাম
মন্তব্যসমূহ (0)
মন্তব্য করতে এবং আলোচনায় অংশ নিতে আপনার গুগল অ্যাকাউন্ট দিয়ে লগইন করুন।