বাংলাদেশে ফুটবল বিশ্বকাপ উন্মাদনা
বিশ্বকাপের কারণে এক মাসের জন্য বদলে যাওয়া শহর
একটা বাড়িতে বাবা ব্রাজিলের সমর্থক, ছেলে আর্জেন্টিনার— রোজ রাতে খেলা দেখার সময় টেনশন লেগেই থাকে দুজনের মধ্যে। হারলে একজন মুখ ভার করে সারাদিন, কথা বলে না প্রায়। পরদিন আবার একসাথেই বসে দেখে, রাগ বেশিক্ষণ টেকে না অবশ্য।

বাংলাদেশে ফুটবল বিশ্বকাপ উন্মাদনা
রাত পৌনে একটা। গলিটা তখনও জেগে, যেটা সাধারণত দশটার মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়ে। রিকশার টুংটাং নেই আজ, কুকুরগুলোও কেমন চুপ মেরে গেছে অকারণে। বদলে শোনা যাচ্ছে টিভির চিৎকার, কেউ একজন গালি দিল রেফারিকে, পাশের ছাদ থেকে ভেসে এলো পটকার গন্ধ, একটা বাচ্চা কাঁদছে হয়তো ঘুম ভেঙে। জুলাই মাসের এই শহরটা আসলে অন্য কোনো শহর, নাম একই শুধু।
জুনের শুরুতে যেটা চেনা ছিল সেই শহর জুলাইয়ের মাঝামাঝি এসে আর নেই। ছাদে ছাদে পতাকা, কোথাও আকাশি-সাদা কোথাও হলুদ-সবুজ, একই বাড়িতে দুটোই দেখা যায় মাঝেমধ্যে— ভাইবোনের দল আলাদা হলে যা হয়। দেয়ালে আঁকা মুখ কারো মেসি কারো নেইমার, বৃষ্টিতে রং কিছুটা গলে গেছে, তবু চেনা যায় এখনও। মোড়ের চায়ের দোকানে যেখানে তিনটা টুল থাকত সবসময়, সেখানে এখন বেঞ্চ, একটা পুরনো টিভি ঝুলছে দেয়ালে বাঁকা হয়ে, নিচে ছেঁড়া একটা সামিয়ানা। দোকানদার হিসেব দিলেন না ঠিকঠাক, শুধু বললেন বিক্রি বেড়েছে অনেক।
হাবিব নামের একজনকে পাওয়া গেল ফুটপাতে, পতাকা বিক্রি করছেন। বছরের বাকি সময়টা রিকশা চালান, কখনো রঙের কাজ। জুন-জুলাই এলেই তার হাতে কাপড়ের পতাকা, কাগজের ব্যাজ, মাথায় বাঁধার ফিতা। দিনে হাজার টাকার মতো লাভ, কোনোদিন বারোশোও হয়ে যায়— সেটাই আসলে বছরের বাকি মাসের ঘাটতি কিছুটা পুষিয়ে দেয়। জিজ্ঞেস করলাম পরের বিশ্বকাপ পর্যন্ত কী করবেন, একটু হাসলেন শুধু, উত্তর দিলেন না।
খেলা শুরু হয় রাত একটায়, কখনো বারোটায়, শেষ হতে হতে ভোর তিনটে-চারটে বেজে যায়। অথচ রাস্তায় লোক কমে না। চায়ের দোকান, মুদি দোকান, ভাজাপোড়ার দোকান, সবাই এই একমাস দোকান খোলা রাখে সারারাত। একজন বললেন সারা বছর এগারোটায় বন্ধ হয়, এই মাসে ভোর পাঁচটা অবধি খোলা, লাভ প্রায় দ্বিগুণ। ঘুম নিয়ে হাসাহাসি হয় একটু, কিন্তু আফসোস কারো মধ্যে দেখা গেল না তেমন।
মাঠে যারা খেলে তাদের ভঙ্গিও পাল্টে গেছে হঠাৎ, নিজেদের মেসি বা এমবাপে ভাবছে বোধহয় মনে মনে। স্কুলে জার্সি পরে যাওয়া নিয়ে বকা খেতে হয়, কিন্তু ছুটির দিনে পাড়ার প্রায় প্রতিটা ছেলের গায়েই নীল-সাদা বা হলুদ-সবুজ। মেয়েরাও কম যায় না, একজন তো রীতিমতো খাতায় টুকে রাখে কোন দল কয় গোল দিল, কে অফসাইডে ছিল সেদিন।
একটা বাড়িতে বাবা ব্রাজিলের সমর্থক, ছেলে আর্জেন্টিনার— রোজ রাতে খেলা দেখার সময় টেনশন লেগেই থাকে দুজনের মধ্যে। হারলে একজন মুখ ভার করে সারাদিন, কথা বলে না প্রায়। পরদিন আবার একসাথেই বসে দেখে, রাগ বেশিক্ষণ টেকে না অবশ্য।
জার্সি ছাপানোর দোকানে লাইন, দাম বেড়ে গেছে দ্বিগুণ-তিনগুণ, তাও মানুষ দাঁড়িয়ে থাকে। কেউ কেউ চাঁদা তুলে প্রজেক্টর ভাড়া করেছে, পাড়ার সবাই মিলে বড় পর্দায় দেখার ব্যবস্থা। এক পাড়ায় সাতাশ হাজার টাকা উঠেছিল শুধু প্রজেক্টর আর সাউন্ডের জন্য, বাকিটা নাস্তায় খরচ হয়ে গেছে। রাত জাগার একটা দাম অবশ্য আছে। রিকশাচালকরা বললেন দিনের বেলা শরীর টানে না, ঘুম ঘুম লাগে সারাক্ষণ। কিছু অভিভাবক বিরক্ত, ছেলেমেয়ের পড়াশোনা মাথায় উঠেছে বলে অভিযোগ। এসব কথা অবশ্য বেশিদূর যায় না, গোলের চিৎকারের নিচে চাপা পড়ে যায় সহজেই।
ফাইনালের রাতে শহরটা একদম স্তব্ধ হয়ে গেল। রাস্তায় প্রায় কেউ নেই, অথচ প্রতিটা ঘর থেকে শব্দ ভেসে আসছে, কখনো চিৎকার কখনো দীর্ঘশ্বাস। খেলা শেষে জয়ী দলের সমর্থকরা রাস্তায় নেমে এলো, পটকা ফুটল, কেউ কেউ কাঁদল আনন্দে। হেরে যাওয়া দলের সমর্থকরা চুপচাপ ফিরে গেল ঘরে। পরদিন সকালে অবশ্য সবাই আবার একসাথে বসল চায়ের দোকানে, রেফারির সিদ্ধান্ত নিয়ে তর্ক, পরের বিশ্বকাপ কবে সেই হিসেব।
তারপর পতাকা নামতে শুরু করল ছাদ থেকে, একটা একটা করে, তাড়াহুড়ো নেই কোনো। দেয়ালের আঁকা মুখগুলো রোদে-বৃষ্টিতে মলিন হতে লাগল, আর কেউ রং করল না নতুন করে। চায়ের দোকানের বেঞ্চ সরে গেল, টিভি নেমে গেল দেয়াল থেকে, সামিয়ানাও গুটিয়ে রাখা হলো। হাবিব ফিরে গেলেন রিকশার প্যাডেলে।
রাত দশটার পর রাস্তা আবার ফাঁকা হয়ে গেল আগের মতো, কুকুরগুলোও ডাকতে লাগল যথাসময়ে। শুধু কোথাও দেয়ালে লেগে আছে মেসির অর্ধেক মুছে যাওয়া একটা মুখ, কারো ঘরের কোণে ভাঁজ করা একটা পতাকা, ধুলো জমছে তাতে ধীরে ধীরে।
অতিথি লেখক: মাহমুদ নেওয়াজ জয়; একজন ফ্রিল্যান্স ফিচার লেখক ও বিশ্লেষক

মাহমুদ নেওয়াজ জয়
খেলাধুলার সব খবর ও বিশ্লেষণ সবার আগে পেতে চোখ রাখুন খেলারদেশে।

মন্তব্যসমূহ (0)
মন্তব্য করতে এবং আলোচনায় অংশ নিতে আপনার গুগল অ্যাকাউন্ট দিয়ে লগইন করুন।