খেলারদেশ

মরক্কো, ফুটবল, বিশ্বকাপ, বিশ্বকাপ ২০২৬

মরোক্কান বিপ্লব: পরাশক্তির উত্থানপর্ব

মরোক্কান বিপ্লব: এক নতুন পরাশক্তির উত্থানপর্ব। অতিথি কলামে লিখেছেন কলামিস্ট, ক্রীড়া-বিশ্লেষক ও সাবেক গণমাধ্যমকর্মী আহমেদ সার্জিন শরীফ

মরোক্কান বিপ্লব: পরাশক্তির উত্থানপর্ব

মরোক্কান বিপ্লব: এক নতুন পরাশক্তির উত্থানপর্ব। ছবি: শেষ ৩২ পর্বে পেনাল্টি শুটআউটে নেদারল্যান্ডসের সঙ্গে জেতার পর মরক্কোর উল্লাস

আহমেদ সার্জিন শরীফ
By আহমেদ সার্জিন শরীফ

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬: নকআউট শেষ-৩২ পর্বের আরো একটা হাই ভোল্টেজ ম্যাচ। মেক্সিকোর মন্টেরেই স্টেডিয়ামে, স্কোরবোর্ডে ১-০ গোলে এগিয়ে রয়েছে নেদারল্যান্ডস। রেফারির ঘড়িতে ঠেকে গেছে ৯০ মিনিট, রেফারির ঠোঁটের চাপে আটকে নির্মম বাঁশি;—ওতে শেষ ফুঁ-র অপেক্ষায় সমগ্র ডাচ। গ্যালারিতে কমলা রঙের হাসি। আর যোগ করা সময়ের শান্ত-অস্থিরতা এক।

কেননা, দুর্বার তখনো ছুটছে আশরাফ হাকিমিরা, সময়কে পেছনে ফেলে ছুটছিল। গোটা জাতি, কোটি আশা—এতটা ওজন পিঠে মরক্কো ছুটছিল। মুহূর্ত এমনই ভারী। তবু দুর্দম গতি আর মনোবল নিয়ে, উন্নত মাথা আর সিংহ-খিদে চোখে—চির-রক্ত-স্বভাবে কতখানিই-বা লড়ে যাওয়া চলে?

৭২ মিনিটে করা কোডি গাকপোর গোল, ডাচরা লিড ধরে রাখে ৯০ মিনিট পর্যন্ত

৭২ মিনিটে করা কোডি গাকপোর গোল, ডাচরা লিড ধরে রাখে ৯০ মিনিট পর্যন্ত

গ্যালারিতে, লাল অংশে, পিছিয়ে থাকার শেষ মুহূর্তগুলোর বাকি একেক সেকেন্ড শেষে যেন—দুর্দমনীয় আত্মবিশ্বাস ছিঁড়ে আর্তনাদের দিকে ছুটছে। মাঠে, মাথা না-নত করার সে মরিয়া মরক্কো ছুটতে ছুটতে লড়ছে—নেদারল্যান্ডস এবং সময়—দুই প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে। ভয়ের বিপক্ষে তাঁরা অনেক আগেই জিতে গেছে। গ্যালারিতে, দৃশ্যত মরক্কোভক্তদের দুহাত মাথায়। মাঠে, মরক্কো খেলোয়াড়দের হাল ছাড়তে নারাজ দু-পা। ছুটছে। নির্ধারিত ৯০ মিনিট পেরিয়ে ৯১তম মিনিটের দিকে।

Image

৯১তম মিনিট, চেমসদাইন তালবির ক্রসে মাথা ছুঁইয়ে ইসা ডিওপ ডাচদের জানান দিলেন যেন, 'আপাতত থামো, বন্ধু! এরপর চলো আরও ত্রিশ মিনিট লড়ে দেখি।'

৯১ মিনিটে ইসা ডিওপের গোল

৯১ মিনিটে ইসা ডিওপের গোল

৯১ মিনিটে ইসা ডিওপের সমতা ফেরানো গোলের পর উদযাপন

৯১ মিনিটে ইসা ডিওপের সমতা ফেরানো গোলের পর উদযাপন

শেষতক জালের সন্ধান পেতে, ম্যাচ গড়ালো এক শ্বাসরুদ্ধকর টাইব্রেকারের দিকে। আর তাতে ৩-২ ব্যবধানে জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে অ্যাটলাস লায়নরা।

পেনাল্টি শুটআউটে ইসমাইল সাইবারি শেষ গোল করে জয় এনে দেন মরক্কোকে

পেনাল্টি শুটআউটে ইসমাইল সাইবারি শেষ গোল করে জয় এনে দেন মরক্কোকে

Image

নকআউট পর্বে ড্র'র পরে পেনাল্টি শুটআউটই জয়-পরাজয় নির্ধারণের শেষ উপায়। এ আর নতুন তথ্য কী! কিন্তু বছর দশেক আগেও কোনো ইউরোপীয় পরাশক্তির চোখে চোখ রেখে লড়াইয়ের সামর্থ্য ছিল মরোক্কোর? কোনো আফ্রিকানদের? এই এক প্রশ্নের উত্তরে লুকিয়ে আছে হাকিমিদের এই ডাচ-বধের মাহাত্ম্য।

মরোক্কোর শেষ-৩২ পর্ব উতরে যাওয়াটা স্রেফ একটা ম্যাচের জয় নয়। এ এক উত্থানপর্বের গল্প। যার শুরু হয়েছিল গত আসরেই। আর এই উত্থানপর্বের ইঙ্গিত হিসেবে আমরা বুঝতে শিখি, ভবিষ্যতের ফুটবল কোনদিকে যাচ্ছে, পরাশক্তি হিসেবে নতুন কারও উত্থান হচ্ছে কিনা; এই বিষয় বুঝতে, সে দলের ক্রমোন্নতির দিকে চোখ রাখা জরুরি।

কেননা মরক্কো—আফ্রিকান এই জাতি শূন্য থেকে উদয় হয়ে দুর্দান্ত ফুটবল খেলতে শুরু করেনি নিশ্চয়ই। এই মরক্কো এগিয়েছে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা অনুসারে সময় নিয়ে। এতকাল ইউরোপীয় কোনো দলের মুখোমুখি হলে আফ্রিকান দলগুলোর গায়ের জোরে খেলার প্রবণতা এবং কৌশলগত দুর্বলতা সবার আগে চোখে পড়তো। কিন্তু হাল আমলের মরক্কো এখানেই ব্যতিক্রম হয়ে উঠতে পেরেছে। যার প্রমাণ বিশ্বকাপের শেষ-৩২ পর্বের ম্যাচে ফ্র্যাংকি ডি ইয়ং, কোডি গ্যাকপোদের বিপক্ষে 'ছোট দলের স্বভাব মতো' লো ব্লক ডিফেন্স না করা।

৭২তম মিনিটে গ্যাকপোর গোলে পিছিয়ে পড়েও হাল ছাড়েননি ব্রাহিম, সাইবারি, হাকিমিরা। ম্যাচের শেষ মুহূর্তে গোল খেয়েও চিড় ধরেনি অ্যাটলাস লায়ন্সের মনোবলে। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়ে যাওয়ার সে অদম্য মনোবল হঠাৎ করেই আসেনি। এই সাফল্য বহুদিনের সুনিপুণ পরিকল্পনার ফসল। যে কারণেই ইসা ডিওপ ৯১তম মিনিটে গোল করে দলকে ম্যাচে ফেরাতে পেরেছেন। এ কারণেই ৫ বারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের জিততে দেননি। কারণ এখন তারা প্রতিপক্ষের জার্সি দেখে ঘাবড়ান না। তারা জানেন আধুনিক ফুটবলীয় দক্ষতা, কৌশল ও মানসিকতা কী করে অর্জন করতে হয়। আর সেই বিবেচনা-সাপেক্ষে তারাও এখন বিশ্বমানের। তারাও এখন ফুটবল পরাশক্তি।

অকুতোভয় এই স্কোয়াডকে বুঝতে হলে একটু পেছনে ফিরে তাকাতে হয়। মূলত কাতার বিশ্বকাপের সাফল্যই মরোক্কান ফুটবলকে খোলনলচে বদলে যাওয়ার সাহস যুগিয়েছিল। সেই আসরে তারা একে একে বেলজিয়াম, স্পেন ও পর্তুগালের মতো দলকে হারিয়ে প্রথম আফ্রিকান দেশ হিসেবে ফিফা বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে পৌঁছেছিল।

কানাডার বিপক্ষে মরক্কোর ৩-০ তে জয় লাভ, রাউন্ড অব ৮ নিশ্চিত

কানাডার বিপক্ষে মরক্কোর ৩-০ তে জয় লাভ, রাউন্ড অব ৮ নিশ্চিত

ফুটবল পরাশক্তির কথা বললে এতকাল ল্যাটিন আমেরিকা আর ইউরোপীয় দেশগুলোকেই চিনতো মানুষ। কাতার বিশ্বকাপে মরক্কো সেই বৈশ্বিক ধারণায় চিড় ধরাতে সক্ষম হয়েছে। মরক্কো সেবার সেমিফাইনালে যাওয়ার খুশিতে সন্তুষ্ট না থেকে নিজেদের আরও শক্তিশালী করার কাজ চালিয়ে গেছে। কয়েকটা ম্যাচ বা এক টুর্নামেন্টে ঝলক দেখিয়ে হারিয়ে যেতে নারাজ মরক্কো।

আজও বহু দেশের ফুটবল ফেডারেশন একেকটি টুর্নামেন্ট ঘিরে পরিকল্পনা করে। কিন্তু মরোক্কান ফুটবল ফেডারেশনের চিন্তা সুদূরপ্রসারী। সুচিন্তিত মহাপরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে তারা। যার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠান মোহাম্মদ ফাইভ ফুটবল অ্যাকাডেমি। ২০১০ সালে যাত্রা শুরু করা এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্য দেশের মাটিতেই দক্ষ ও সুকৌশলী খেলোয়াড় তৈরি করা। আধুনিক ক্রীড়া বিজ্ঞান ও স্কাউটিংয়ের সফল প্রয়োগ, ইউরোপীয় প্রবাসী খেলোয়াড়দের সঠিক ব্যবহার এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের মাধ্যমে তারা এগিয়ে যাচ্ছে লক্ষ্যের দিকে।

আন্তঃরাষ্ট্রীয় যোগাযোগের সুফলকেও কাজে লাগিয়েছে মরোক্কান ফুটবল। দেশটির বহু মানুষ ইউরোপের বিভিন্ন দেশের নাগরিক। এই দ্বৈত নাগরিকদের অনেকে সন্তানকে ইউরোপীয় ফুটবল অ্যাকাডেমিগুলোতে ভর্তি করেন। ফলে তারা ফুটবলের সর্বাধুনিক সুবিধাগুলো পেয়ে পরিণত হয়ে ওঠেন। মেধা ও দক্ষতায় জায়গা করে নেন শীর্ষস্থানীয় ইউরোপীয় ক্লাবগুলোতে। যার সবচেয়ে ভালো উদাহরণ ব্রাহিম দিয়াজ ও আশরাফ হাকিমি। যথাক্রমে স্পেন ও ফ্রান্সের জাতীয় দলে উপেক্ষিত এই দুই দুর্দান্ত ঘরের ছেলেকে ঘরে ফিরিয়ে আনে মরক্কো। এটা ছিল মরক্কোর ফুটবল বিপ্লব, যার শুরু ২০০৯ সালে। সিদ্ধান্ত ছিল—ইউরোপীয় মানের একাডেমি তৈরি করবে, যুব ফুটবলে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ করবে, জাতীয় দলের জন্য একই ধরনের খেলার দর্শন গড়ে তুলবে, বিদেশে জন্ম নেওয়া মরক্কান বংশোদ্ভূত খেলোয়াড়দের দলে আনার পরিকল্পনা করবে।

এতসব পরিকল্পনা আর প্রচেষ্টার ফলাফল মাঠে দেখিয়েছেন দেশটির ফুটবলাররা। দিশেহারা, ছন্নছাড়া ফুটবলের বদলে তাদের কৌশলগত খেলা যেমন চোখ ধাঁধানো তেমনই কার্যকর। রক্ষণভাগে তারা কম্প্যাক্ট মিডব্লকে খেলে, মাঝমাঠের খেলোয়াড়রা সাজান আগ্রাসী আক্রমণ আর আশরাফ হাকিমির মতো আক্রমণাত্মক ফুলব্যাকদের সহায়তায় হঠাৎ আক্রমণ চালিয়ে প্রতিপক্ষকে রীতিমতো তিতিব্যস্ত করে তোলে ফরোয়ার্ডরা। অর্থাৎ, তাদের বিপক্ষে সামান্যতম ভুলের বড় মাশুল গুণতে হয় যে-কোনো দলকে। নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে এভাবেই খেলে সফল হয়েছে অ্যাটলাস লায়নরা। ডাচ স্ট্রাইকার ব্রায়ান ববির কাছে বলই পৌঁছাতে দেয়নি মরোক্কোর মাঝমাঠ। আবার প্রতিপক্ষের পায়ে বল গেলে তৎক্ষণাৎ রক্ষণব্যুহ গড়ে তোলেন ডিফেন্ডাররা। একই সঙ্গে তারা খুঁজতে থাকেন আক্রমণে ওঠার পথ। প্রতিপক্ষ মারাত্মক প্রেস করলেও ব্রাহিম দিয়াজদের মতো সৃজনশীল খেলোয়াড়রা ঠিকই পরিত্রাণের উপায় খুঁজে বের করেন। ম্যাচের গতিবিধি বুঝে দলটি খেলতে থাকে তাদের নিজস্ব ধারার ফুটবল। এই পরিপক্বতা এক দিনে আসেনি।

মাঠে ভালো বোঝাপড়ার জন্য ড্রেসিংরুমের পরিবেশ হওয়া চাই ইতিবাচক। সফলভাবে সেই কাজটি করতে পেরেছে মরোক্কান ফেডারেশন। লা লিগার ট্যাকটিক্স, ফরাসি লিগ ওয়ানের মারদাঙ্গা পরিবেশ কিংবা ঘরোয়া লিগের ভিন্ন ধাঁচে বেড়ে ওঠা ফুটবলাররা মরোক্কান লকার রুমে মিলেমিশে একাকার। এখানে ব্রাহিম আর হাকিমিরা একে অপরের অভিজ্ঞতায় হয়ে ওঠেন আরও সমৃদ্ধ। জাতীয় দলে খেলার সময় দেশের পরিচয়ই তাদের কাছে মুখ্য। এই বোঝাপড়ার সুফল আসে মাঠে।

ইতোমধ্যে ২০২৬ বিশ্বকাপের রাউন্ড অব ৮-এ পা রেখেছে মরোক্কো। যেনতেনভাবে নয়, তারা খেলেছেন নিজস্ব ভঙ্গিতে। বীরদর্পে। বুঝিয়ে দিচ্ছেন, এতদিন ধরে পরাশক্তির যে সংজ্ঞা মানুষ জানত, তা ধীরে ধীরে বদলাতে শুরু করেছে। এই পরিবর্তনের পাঞ্জেরির নাম মরোক্কো। আগামী দুই বা তিন দশকে আফ্রিকানদের হয়ত আর ভগ্ন হৃদয়ে ফিরতে হবে না। তাদের জার্সিতেও বসবে গৌরবের তারকা।

অতিথি কলামে লিখেছেন কলামিস্ট, ক্রীড়া-বিশ্লেষক ও সাবেক গণমাধ্যমকর্মী আহমেদ সার্জিন শরীফ

আহমেদ সার্জিন শরীফ

আহমেদ সার্জিন শরীফ

খেলাধুলার সব খবর ও বিশ্লেষণ সবার আগে পেতে চোখ রাখুন খেলারদেশে।

মন্তব্যসমূহ (0)

মন্তব্য করতে এবং আলোচনায় অংশ নিতে আপনার গুগল অ্যাকাউন্ট দিয়ে লগইন করুন।