শেষ জাদু দেখিয়েই বিদায় মেসির

একটা বিদায় কতটা সুন্দর হতে পারে? কতটা আবেগে ভেসে যেতে পারে একটি রাত? লিওনেল মেসির জন্য আর্জেন্টিনার জার্সিতে শেষ রাতটি যেন সেই প্রশ্নেরই উত্তর হয়ে থাকল। যে জার্সি গায়ে চাপিয়ে দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি কোটি কোটি মানুষকে আনন্দ দিয়েছেন, কাঁদিয়েছেন, স্বপ্ন দেখিয়েছেন, সেই জার্সিতে শেষবারের মতো মাঠে নামলেন ৩৯ বছরের মেসি। আর বিদায়ী সেই রাতে তাঁর পায়ের জাদুতে ভাসল পুরো মনুমেন্তাল। বেনিনকে ৩-০ গোলে হারিয়ে শেষ করল আর্জেন্টিনা। কিন্তু স্কোরলাইন যেন এই রাতের আসল গল্প নয়। আসল গল্প একজন কিংবদন্তির বিদায়, একজন মানুষের অশ্রু আর একটি দেশের ভালোবাসা।
৮৫ হাজারের বেশি দর্শকে কানায় কানায় পূর্ণ ছিল বুয়েনস এইরেসের এল মনুমেন্তাল। গ্যালারিতে পতাকা, হাতে ব্যানার, চারদিকে নীল-সাদা রঙের ঢেউ। মাঠের বাইরে শহরের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোও সেজেছিল আর্জেন্টিনার রঙে। আতশবাজি, গান আর উচ্ছ্বাসে যেন পুরো দেশ অপেক্ষা করছিল তার প্রিয় নম্বর ১০-এর শেষ দৃশ্যটির জন্য।
ম্যাচ শুরুর আগেই অবশ্য আবেগের স্রোত বয়ে গিয়েছিল। রোজারিওতে বিশাল ১০ নম্বর জার্সিতে লেখা হয়েছিল ‘Gracias’। হাজারো মানুষ রাস্তার দুই পাশে দাঁড়িয়ে বিদায় জানিয়েছে তাদের শহরের ছেলেকে। দলের বাসে যাওয়ার পথে মেসিও চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি। এত মানুষের ভালোবাসার সামনে একজন কিংবদন্তিও যে শেষ পর্যন্ত শুধুই একজন মানুষ, সেই দৃশ্যটিই হয়তো সবচেয়ে বেশি নাড়া দিয়েছে।
মাঠে অবশ্য শুরুটা ছিল মেসির মতোই। প্রথমার্ধে গোল এল না, কিন্তু মেসি বারবার সুযোগ তৈরি করেছেন। তাঁর কয়েকটি শট আটকে দেন বেনিনের গোলরক্ষক। মনে হচ্ছিল, শেষ রাতটাও বুঝি তাঁকে অপেক্ষায় রাখছে।
অবশেষে ৪৮ মিনিটে এলো সেই মুহূর্ত। কর্নার থেকে মেসির নিখুঁত ক্রসে ভলিতে বল জালে পাঠালেন নিকোলাস ওতামেন্দি। গোলের পর সতীর্থের সঙ্গে মেসির উদ্যাপনেও ছিল অন্যরকম আবেগ। ১৭ বছর ধরে একই জাতীয় দলের ড্রেসিংরুম ভাগ করে নেওয়া ওতামেন্দির সঙ্গে এটিও ছিল এক বিশেষ মুহূর্ত। চারটি বিশ্বকাপের সঙ্গী সেই সতীর্থও জাতীয় দলের জার্সিতে শেষ অধ্যায় লিখছিলেন। মেসির গল্প অবশ্য তখনো শেষ হয়নি।
৬১ মিনিটে আবারও তাঁর পায়ের জাদু। বক্সের বাইরে থেকে নেওয়া শটে বল জালে পাঠালেন নিকো পাজ। আর গোলটির পেছনেও মেসি। তাঁর পাসে তরুণ সতীর্থের গোল যেন এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মের হাতে আর্জেন্টিনার ১০ নম্বরের গল্প তুলে দেওয়ার প্রতীক হয়ে থাকল। এরপর এল সেই মুহূর্ত, যার অপেক্ষায় ছিল পুরো মনুমেন্তাল।

৬৮ মিনিটে পেনাল্টি পেল আর্জেন্টিনা। তিন মিনিট পর বল হাতে নিলেন মেসি। এত বছর ধরে অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে যেভাবে তিনি বলের সামনে দাঁড়িয়েছেন, সেদিনও তার ব্যতিক্রম হলো না। গোলরক্ষককে ভুল পথে পাঠিয়ে ৭১ মিনিটে নিজের শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচে গোল করলেন মেসি। ১২৬তম আন্তর্জাতিক গোল।
আর গ্যালারি তখন যেন আর গ্যালারি নেই, এক বিশাল আবেগের সমুদ্র। সতীর্থরা ছুটে গেলেন তাঁর দিকে। দর্শকের কণ্ঠে একসঙ্গে ধ্বনিত হলো মেসির নাম।
শেষ বাঁশি বাজার পর দৃশ্যটা আরও আবেগঘন হয়ে উঠল। সতীর্থ, প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়, রেফারি সবাই ঘিরে দাঁড়ালেন মেসিকে। ড্রোন শোতে আকাশ ভরে উঠল আলোয়। এরপর আর্জেন্টাইন শিল্পী সোলোদাদ পাস্তোরুত্তি গাইলেন ‘ব্রিন্দিস’। আর মাঠের প্রতিটি মুহূর্ত যেন বলে দিল, এই রাতটি আর কখনো ফিরে আসবে না।
ম্যাচ শেষে কথা বলতে গিয়ে মেসিও আবেগ ধরে রাখতে পারেননি। বাবার কথা মনে পড়ছিল তাঁর। আর্জেন্টিনার জার্সি গায়ে দুই দশকেরও বেশি সময় কাটানোর কথা বলতে গিয়ে গর্বের কথা জানিয়েছেন তিনি। বলেছেন, সারা জীবন এই দলের সঙ্গে থাকতে পারলে ভালো লাগত, কারণ আর্জেন্টিনার হয়ে খেলার চেয়ে সুন্দর আর কিছু নেই।
একসময় যে জাতীয় দলের জার্সিতে মেসির গল্প ছিল হতাশা আর অপূর্ণতার, সেই গল্পই শেষ পর্যন্ত বদলে গেছে বিশ্বকাপ আর কোপা আমেরিকার শিরোপায়। ২০২২ সালে কাতারে বিশ্বকাপ হাতে তুলে নিয়ে পূর্ণ করেছিলেন জীবনের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন। আজ সেই গল্পের শেষ পাতাটিও লেখা হয়ে গেল।
আর্জেন্টিনার হয়ে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলা খেলোয়াড় মেসি। ২০৮ ম্যাচে ১২৬ গোল। সংখ্যাগুলো তাঁর মহত্ত্বের কেবল একটি অংশ। তাঁর আসল উত্তরাধিকার হয়তো থেকে যাবে মানুষের স্মৃতিতে, সেই অসংখ্য রাতের আনন্দে, সেই অশ্রুতে, সেই গোলের উল্লাসে। মেসি বিদায় নিলেন। কিন্তু আর্জেন্টিনার নীল-সাদা জার্সিতে তাঁর গল্প কি সত্যিই শেষ হয়? সম্ভবত না।
কারণ কিংবদন্তিদের বিদায় হয় মাঠ থেকে, মানুষের হৃদয় থেকে নয়। গ্রাসিয়াস, মেসি।

খেলার দেশ ডেস্ক
খেলাধুলার সব খবর ও বিশ্লেষণ সবার আগে পেতে চোখ রাখুন খেলারদেশে।
সম্পর্কিত আরও খবর
ফুটবলপিছিয়ে পড়েও ওলিসে ম্যাজিকে বড় জয় ফ্রান্সের
ফুটবলমেসির বিদায়ী ম্যাচ কেন্দ্র করে বিশেষ বল
ফুটবলবুরকিনা ফাসোকে গোলবন্যায় ভাসাল আর্জেন্টিনা
ফুটবলইয়ামালের গোলে শুরু, মেরিনোর গোলে স্পেনের জয়
ফুটবলদশ জনের চেকিয়ার বিপক্ষে ইংল্যান্ডের জয়
ফুটবল
মন্তব্যসমূহ (0)
মন্তব্য করতে এবং আলোচনায় অংশ নিতে আপনার গুগল অ্যাকাউন্ট দিয়ে লগইন করুন।