খেলারদেশ

বিশ্বকাপ ফুটবল ২০২৬

হাইতি: যেখানে বিশ্বকাপ জীবনের সমান

হাইতি বিশ্বকাপ খেলছে ১৯৭৪ সালের পর। এবারের বিশ্বকাপ ক্যারিবিয়ান দ্বীপদেশটিতে এসেছে জীবনের বার্তা নিয়ে, গুলির শব্দ থামাতে।

হাইতি: যেখানে বিশ্বকাপ জীবনের সমান

হাইতি জাতীয় ফুটবল দল

রুহুল মাহফুজ জয়
By রুহুল মাহফুজ জয়

বাংলাদেশের ঘরোয়া ফুটবলের খবরাখবর যারা রাখেন, সনি নর্দে আর ওয়েডসন নামের দুজন ফুটবলারের নাম জানা থাকার কথা। যারা দেশের ফুটবল নিয়মিত দেখেন, অনেকের মতেই বাংলদেশের ঘরোয়া ফুটবল খেলতে আসা সেরা বিদেশি ফুটবলারটির নাম সনি নর্দে। ২০১২-১৩ সালে ঢাকার মাঠে বল পায়ে এমন সব কারিকুরি দেখিয়েছেন যে, এক বাক্যে সবাই মেনে নিতেন সনি নর্দে বিশ্বকাপ খেলার মতোই ফুটবলার। সনির হাত ধরেই শেখ জামাল ধানমণ্ডি ক্লাবে খেলতে এসেছিলেন তারই স্বদেশি স্ট্রাইকার ওয়েডসন। বাংলাদেশ লিগে গোলের পর গোল করেছেন এই দুজন। সনি নর্দে আর ওয়েডসনের দেশ হাইতি ১৯৭৪ সালের পর বিশ্বকাপ ফুটবলে জায়গা করে নিয়েছে। দুটি ম্যাচও খেলে ফেলেছে, দুটিতেই হার। স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচে এত গতিময়, জান-প্রাণ বাজি রেখে হৃদয় নিংড়ানো ফুটবল খেলেছে হাইতির ফুটবলাররা, যারা খেলা দেখেছেন, মন ভরে গেছে। যদিও দুর্ভাগ্যজনক একটা গোল হজম করে ম্যাচটা ১-০ গোলে হেরেছে, ওরা প্রমাণ করেছে দেশের মানুষকে আনন্দ দিতে কসুর করবে না। ব্রাজিল ম্যাচেও লড়েছে, যদিও হেরেছে ৩-০ গোলে।

এই বিশ্বকাপটা কালো মানুষের দেশ, ক্যারিবিয় দ্বীপপুঞ্জের ছোট্ট রাষ্ট্র হাইতির জন্য কেবল ফুটবল খেলা দেখার আনন্দ, দেশকে সমর্থন দেওয়ার উত্তেজনা নিয়ে আসেনি, এসেছে প্রতিদিন গুলির শব্দ আর হানাহানি থামাতে। বহু বছর ধরে এই দেশের মানুষেরা বিভিন্ন মাফিয়া গ্রুপের হাতে জিম্মি, গৃহযুদ্ধ চলছে। মড়ার ওপর খাড়ার ঘা ২০১০ সালে হওয়া পৃথিবীর ইতিহাসে অন্যতম ধ্বংসাত্মক ভূমিকম্প তছনছ করে দিয়েছিল দেশটিকে; প্রাণ হারিয়েছিল এক লাখের বেশি হাইতিয়ান। কালো মানুষের দেশগুলির মধ্যে প্রথম স্বাধীনতার স্বাদ পাওয়া হাইতির গত কয়েক প্রজন্মের কিশোর-তরুণদের কাছে ফুটবল খেলাটা বেঁচে থাকার অবলম্বন, সামান্য বিনোদন ও আশার আলো। এবারের বিশ্বকাপে হাইতির প্রতিটি ম্যাচ তাই ফুটবল খেলার চেয়ে অনেক বেশি কিছু, অনেকটা জীবন-মরণের সীমানা ছাড়ানো ব্যাপার।

জাতীয় দলের কোচ সেবাস্তিয়ান মাইন কখনোই হাইতিতে পা রাখেননি। হাইতি তাদের বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের সব হোম ম্যাচ খেলেছে নিরপেক্ষ ভেন্যুতে। এমনকি দলের মাত্র একজন ফুটবলার হাইতিতে থাকেন, সেখানের ঘরোয়া ফুটবল খেলেন। বাকি সবাই বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকা অভিবাসী বাবা-মায়ের সন্তান। এই খেলোয়াড়দের অনেকে কোনোদিনই হাইতির মাটিতে পা দেননি। তবু রক্তের টানে জান বাজি রেখে খেলেন। ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার উডেনস্কি পিয়ের হাইতির ঘরোয়া লিগে খেলা বিশ্বকাপ স্কোয়াডে থাকা একমাত্র ফুটবলার। সিটি সোলেলির একটি বস্তিতে বড় হওয়া উডেনস্কি হাইতির অন্যতম বড় ক্লাব ভায়োলেট এসির হয়ে খেলেন। এই ক্লাবের হোম গ্রাউন্ড ছিল স্তাদে সিলভিও কাতর। দুই বছর আগে এই স্টেডিয়াম দখল করে নিয়েছে একদল গ্যাঙ। সেখানে আর ফুটবল হয় না। বিশ্বকাপের মাসখানেক আগে ভায়োলেট এসি দেশটির লিগ চ্যাম্পিয়ন হয়েছে, শিরোপা নির্ধারণী ম্যাচটি ব্যাপক গোলাগুলির জন্য অনেক দেরিতে শুরু হয়েছিল! গ্যাঙদের রাজত্ব, সন্ত্রাস, অর্থনৈতিক দারিদ্র, ধ্বংসাত্মক ভূমিকম্প থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াই ভুলে থাকতে হাইতিয়ানরা অন্তত বিশ্বকাপের সময়টুকু পাবেন। প্রতি ম্যাচের আগে তাই হাইতি জাতীয় দলের হয়ে সর্বোচ্চ গোলদাতা ডাকেন্স নাজন খেলোয়াড়দের মনে করিয়ে দেন দেশের কী অবস্থা, মানুষ বিনোদনের জন্য কীভাবে ফুটবল দলের দিকে তাকিয়ে থাকেন!

এবারের বিশ্বকাপটা হাইতির জন্য আরো একটি কারণে বিশেষ। তারা ব্রাজিলের সাথে একই গ্রুপে পড়েছে। হাইতিতে ব্রাজিলের সমর্থক সবচেয়ে বেশি। তাছাড়া দেশটির অভ্যন্তরীন শান্তি রক্ষায়, মানবহিতৈষী কাজে ও দেশটির পুনর্গঠনে ব্রাজিল দীর্ঘদিন ধরে অবদান রাখছে। সে কারণে ব্রাজিলের প্রতি হাইতিয়ানদের বিশেষ দুর্বলতা আছে। দেশটিতে খানিক শান্তি দিতে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী মিশন ২০০৪ সালে ব্রাজিল জাতীয় দলকে আমন্ত্রণ জানায়। রোনালদো নাজারিও, রোনালদিনিয়ো, রবার্তো কার্লোস, কাকাদের দেখতে হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে এসেছিল, পরনে ছিল হলুদ জার্সি আর হাতে ব্রাজিলের পতাকা। হাইতি সেই ম্যাচে ৬-০ গোলে হেরেছিল ঠিকই, কিন্তু দুই দিনের জন্য দেশটিতে গ্যাঙদের মধ্যে চলা যুদ্ধবিগ্রহ থেমে গিয়েছিল! ফুটবল খেলাটার এমনই মহত্ত্ব, যুদ্ধ পর্যন্ত থামিয়ে দিতে পারে।

থ্রি চিয়ার্স ফর হাইতি ফুটবল দল!

রুহুল মাহফুজ জয়

রুহুল মাহফুজ জয়

খেলাধুলার সব খবর ও বিশ্লেষণ সবার আগে পেতে চোখ রাখুন খেলারদেশে।

মন্তব্যসমূহ (0)

মন্তব্য করতে এবং আলোচনায় অংশ নিতে আপনার গুগল অ্যাকাউন্ট দিয়ে লগইন করুন।