বিশ্বকাপ ফুটবল বিশেষ
লুমুম্বার দাঁড়িয়ে থাকার রক্তক্ষয়ী ইতিহাস
২০১৩ সাল থেকে কঙ্গোর প্রতিটি ম্যাচে এভাবে দাঁড়িয়ে থেকে দলকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছেন তিনি। কিন্তু কেন এই দাঁড়িয়ে থাকা? তা জানতে যেতে হবে অনেক পেছনে, রাজনীতি ও দেশপ্রেমের অনেক গভীরে।

কঙ্গোর সুপারফ্যান লুমুম্বা ভিয়ার দাঁড়িয়ে খেলা দেখার পেছনে রয়েছে রক্তাক্ত ইতিহাস
কেন দাঁড়িয়ে থাকেন লুমুম্বা বা?
মাইকেল এনকুকা এম্বোলাদিঙ্গা লোকটার প্রকৃত নাম। কিন্তু এই নামটি বলতে গেলে হারিয়েই গেছে। দুনিয়ার মানুষ লিকলিকে এই লোকটিকে চেনে 'লুমুম্বা ভিয়া' নামে। লুমুম্বা ভিয়া গণপ্রজাতন্ত্রী কঙ্গো জাতীয় ফুটবল দলের সুপার ফ্যান। যারা বিশ্বকাপ ফুটবল দেখছেন, তারা খেয়াল করেছেন নিশ্চয়ই, কঙ্গোর ম্যাচ চলাকালে পুরো সময়টাতেই গ্যালারিতে একটা টুল রেখে তার উপর চুপচাপ ঠায় দাঁড়িয়ে থাকেন লুমুম্বা। ২০১৩ সাল থেকে কঙ্গোর প্রতিটি ম্যাচে এভাবে দাঁড়িয়ে থেকে দলকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছেন তিনি। কিন্তু কেন এই দাঁড়িয়ে থাকা? তা জানতে যেতে হবে অনেক পেছনে, রাজনীতি ও দেশপ্রেমের অনেক গভীরে।
কঙ্গো ছিলো বেলজিয়ামের কলোনি। বেলজিয়ামের রাজা দ্বিতীয় লিওপাল্ড ১৮৮৫ থেকে ১৯০৯ সাল পর্যন্ত মাত্র ২৪ বছরে ১০ মিলিয়ন বা ১ কোটি কঙ্গোলিজকে হত্যা করেছিল। এই গণহত্যাকে বলা হয় 'রেড রাবার মাসাকার'। প্রতিটি গ্রামে রাবার উৎপাদনের জন্য নির্দিষ্ট লক্ষ্য দিয়ে দেওয়া হতো। সেই লক্ষ্য পূরণ না করতে পারলে নানারকম অত্যাচার ও প্রাণ হারানো ছিলো কঙ্গোলিজদের অনিবার্য নিয়তি। জোর করে বন্য রাবার সংগ্রহ করার কাজ করতে গিয়ে লাখ লাখ কঙ্গোলিজ প্রাণ হারিয়েছে। শুধু যে হত্যা করা হতো তা না, পুড়িয়ে দেওয়া হতো পুরো গ্রাম।

লক্ষ্য পূরণ না করতে পারলে কঙ্গোলিজদের হাত কেটে নেওয়া হতো
বাড়ি বাড়ি গিয়ে গ্রামের ছেলে-বুড়ো, নারী, শিশুদের তুলে নিয়ে আটকে রাখা হতো। আর পুরুষদের ছেড়ে দেওয়া হতো জঙ্গলে রাবার উৎপাদন, হাতির দাঁত সংগ্রহ আর খনিজ পদার্থ খুঁজে বের করার জন্য। কোনো খাবার-পানি দেওয়া হতো না। কাজ করতে করতে না খেতে পেয়ে, ক্লান্তিতে মরেছে লাখো কঙ্গোলিজ। ধর্ষিত হয়েছে অগণিত মা-বোন। শিশুদের জন্মই হয়েছিল যেন অনাদর-অত্যাচারে মরার জন্য।

১৯০৭ সালে ব্রাসেলসের একটি চিড়িয়াখানায় প্রদর্শনের জন্য রাখা কঙ্গোলিজ
যারা প্রাণে বেঁচে যেতো, তাদের হাতের কব্জি কেটে নেওয়া হতো! কঙ্গোর অর্ধেক ছেলে শিশুকে অপহরণ করে নিয়ে একটা 'শিশু কলোনি' করেছিল বেলজিয়াম, যেখানে সেই শিশুদের সামরিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো। অপহৃত সেই শিশুদের অর্ধেকই মরেছিল সেই শিশু কলোনিতে। এমনকি কঙ্গোলিজদের ধরে এনে বেলজিয়ামের চিড়িয়াখানায় জংলি জীব-জন্তুদের সাথে প্রদর্শনের জন্য রাখা হতো!
কঙ্গোর মানুষদের মুক্তি দিতেই যেন জন্মেছিলেন প্যাট্রিস লুলুম্বা। এই কবি, বিপ্লবী, শিক্ষাবিদ ও রাজনীতিবিদ মুভমেন্ট ন্যাশনাল কঙ্গোলিসের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। এই রাজনৈতিক সংগঠনের মাধ্যমেই কঙ্গোর স্বাধীনতা আন্দোলন করেছেন লুলুম্বা। কঙ্গোর স্বাধীনতার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে ব্রাসেলসে ১৯৬০ সালের ২৬ জানুয়ারি হওয়া কনফারেন্সে ও ৩০ জুন স্বাধীনতা অনুষ্ঠানের বক্তব্যে লুমুম্বা বারবার কঙ্গোতে, আফ্রিকায় কলোনিয়াল শাসকদের অত্যাচার-অনাচারের কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন। আফ্রিকার ঐক্যের কথা বলেছেন।
প্যাট্রিস লুলুম্বা গণতান্ত্রিকভাবে কঙ্গোর প্রথম নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। স্বাধীনতা ও নির্বাচিত সরকার পেলেও কঙ্গোতে বেলজিয়ামের শাসক আর সৈন্য ঠিকই থেকে গিয়েছিল। সাথে কঙ্গোতে থাকা তাদের দোসরদের দিয়ে অস্থিরতা জিইয়ে রেখে রাষ্ট্র গঠনের কাজে নানারকম বাধা দিচ্ছিলো। রাষ্ট্রপতি জোসেফ কাসা-ভুবু ও সেনাবাহিনী প্রধান কর্নেল মোবুতুর সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী লুমুম্বুর দূরত্বও ক্রমশ বাড়ছিল।
কাতাঙ্গা প্রদেশ ছিলো বেলজিয়ান সৈন্য ও বিদ্রোহীদের দখলে। স্বাধীনতার পরপরই যুক্তরাষ্ট্র সফরে যান লুলুম্বা। ঠিক সেসময়েই কাতাঙ্গায় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ শুরু হয়। লুমুম্বা রাষ্ট্র গঠনে সহায়তার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে সামরিক বিষয়েও সহায়তা চান। যুক্তরাষ্ট্র সাফ জানিয়ে দেয় তাদের দেশে সামরিক সাহায্য করতে পারে কেবল জাতিসংঘ। জাতিসংঘও সহায়তার হাত বাড়ায়নি। যুক্তরাষ্ট্র থেকে এক দিনের জন্য ওটয়া সফরে গিয়ে কানাডা ও সোভিয়েত ইউনিয়নের সাহায্য চান। সোভিয়েত সহায়তা চাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে আর শুরুর মতো আপ্যায়ন পাননি লুমুম্বা।
যুক্তরাষ্ট্র থেকে সরাসরি কঙ্গোতে না ফিরে লুমুম্বা আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে সফর করেন এবং আফ্রিকার রাষ্ট্রগুলি নিয়ে একটি রাষ্ট্রসংঘ প্রতিষ্ঠা করার কথা বলতে থাকেন। ঘানাসহ বেশ কয়েকটি দেশ বৃহত্তর আফ্রিকান ঐক্য ও কলোনিয়াল দাসত্ব থেকে চিরতরে মুক্তির পক্ষে লুমুম্বার সাথে কাজ করার জন্য একমত হয়।

কঙ্গোর স্বাধীনতার নায়ক ও প্রথম নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী প্যাট্রিস লুমুম্বা
ওদিকে বেলজিয়াম প্রচার করতে থাকে যে প্যাট্রিস লুমুম্বা শাদাদের বিরোধী তো বটেই, পশ্চিমাবিরোধী ও কমিউনিস্ট পাপেট। তাতে অনেক পশ্চিমা দেশই লুমুম্বার বিপক্ষে চলে যায়। সাথে কাসা-ভুবুর সঙ্গে ক্ষমতার ঠান্ডা লড়াই লুমুম্বার জন্য দেশ পরিচালনা করা অনেক কঠিন হয়ে যায়।
সেপ্টেম্বরে প্রেসিডেন্ট কাসা-ভুবু লুমুম্বার কাছের ছয়জন মন্ত্রীসহ লুমুম্বাকে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে বরখাস্ত করে। লুমুম্বা রেডিও স্টেশনে গিয়ে ঘোষণা দেন কাসা-ভুবু একজন গাদ্দার, তিনিই কঙ্গোর প্রধানমন্ত্রী।
চরম অস্থিরতার মধ্যে ১৯৬১ সালের ১৭ জানুয়ারি কাতাঙ্গায় বিদ্রোহীদের সাথে দেখা করতে গেলে বেলজিয়ান বাহিনী প্যাট্রিস লুমুম্বাকে তিন কাছের মন্ত্রীসহ আটক করার পর ব্রাশফায়ার করে হত্যা করে। তখন তাঁর বয়স হয়েছিল মাত্র ৩৫ বছর। লুমুম্বার সাথে হত্যা করা হয় কঙ্গো ও আফ্রিকার সম্ভাবনাকে, দীর্ঘায়িত করা হয় পশ্চিমাদের কলোনিয়াল শাসন।
স্বাধীনতার মাত্র কয়েক মাসের মাথায় দেশি-বিদেশি শত্রুর হাতে প্রাণ হারান ঐক্যবদ্ধ আর কলোনিমুক্ত আফ্রিকার স্বপ্ন দেখা কঙ্গোর প্রথম নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী লুমুম্বা। এই হত্যাকাণ্ডকে বিংশ শতাব্দীর অন্যতম প্রভাবশালী রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড হিসাবে বিবেচনা করা হয়। কারণ লুমুম্বার হত্যাকাণ্ড শুধু কঙ্গো নয়, সমগ্র আফ্রিকার ভূরাজনীতিতে ধ্বংসাত্মক ও যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছিল।
লুমুম্বার হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে কঙ্গোতে গণতন্ত্রের জন্ম না হতেই মৃত্যু হয়। বেলজিয়ামের মদদে কর্নেল মোবুতু সেসে সেকো ক্ষমতা দখল করে কঙ্গোতে ৩২ বছর সামরিক শাসন জারি রাখেন। কঙ্গোর খনিজ সম্পদ হীরা, তামা, কোবাল্ট ও ইউরেনিয়াম বিভিন্ন পশ্চিমা কোম্পানি নিয়ে যায়, সাথে যায় মোবুতুর পকেটে। অথচ লুমুম্বার স্বপ্ন ছিলো কঙ্গোর খনিজ সম্পদের মালিক হবে কঙ্গোলিজরা। ৩২ বছরের পাপেট সরকারের সময়ে জাতিগত বিভাজন ও গৃহযুদ্ধে কঙ্গো কেবল ক্ষতবিক্ষত হয়েছে।
লুমুম্বার হত্যাকাণ্ডের পর আফ্রিকা মহাদেশে নব্য-ঔপনিবেশিকতা বিস্তার করে। বিভিন্ন আফ্রিকান দেশের রাষ্ট্রপ্রধানরা ভাবতে থাকেন যে পশ্চিমা শক্তির বিপক্ষে গিয়ে নিজের দেশে মানুষের কথা ভাবলে লুমুম্বার মতন পরিণতি হতে পারে। পাশাপাশি আফ্রিকান ঐক্য বা প্যান-আফ্রিকানিজম প্রক্রিয়াকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। সেই সাথে মার্কিন-সোভিয়েত ঠান্ডা যুদ্ধের মূল ভূমিতে পরিণত হয় আফ্রিকা মহাদেশ।
সংক্ষেপে বলতে গেলে, প্যাট্রিস লুমুম্বার হত্যাকাণ্ড কঙ্গো ও আফ্রিকার প্রাকৃতিক সম্পদ নিজেদের উন্নয়নে ব্যবহারের পথ রুদ্ধ করে দেয় এবং এই অঞ্চলকে কয়েক দশকের একনায়কতন্ত্র, গৃহযুদ্ধ ও নব্য-ঔপনিবেশিক শোষণের বেড়াজালে আটকে ফেলে।
লুমুম্বার হত্যাকাণ্ডে কঙ্গো ও আফ্রিকার দেশগুলির যে কেবল ক্ষতি হয়েছে, তা নয়। এই ঘটনা আফ্রিকাজুড়ে (এমনকি কঙ্গোর ভেতরেও) তরুণ ও ছাত্র সমাজকে চরমভাবে আন্দোলিত করে। তাঁরা বুঝতে পারেন যে শুধু রাজনৈতিক ক্ষমতাবদলই যথেষ্ট নয়, সম্পূর্ণ অর্থনৈতিক ও মানসিক মুক্তি প্রয়োজন। লুমুম্বা বিশ্বজুড়ে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী লড়াইয়ের এক চিরন্তন 'শহীদ' ও 'প্রতীক'-এ পরিণত হন।
এখনকার গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র কঙ্গোর তরুণ-তরুণীদের কাছে প্যাট্রিস লুমুম্বাই রাজনৈতিক আইডল ও দেশনায়ক। সেই তরুণদেরই একজন মাইকেল এনকুকু এম্বোলাদিঙ্গা ওরফে লুমুম্বা ভিয়া। Lumumba Vea-এর ভিয়া মানে বেঁচে থাকা, মাইকেলের 'লুমুম্বা ভিয়া' নামটি বেছে নেওয়ার মানে 'লুমুম্বা বেঁচে আছে'।
ঠিক তাই, প্যাট্রিস লুমুম্বাকে শারীরিকভাবে হত্যা করে হয়েছে ঠিকই, বেঁচে আছে তাঁর চেতনা ও দেশাত্মবোধ, জাতিবোধ। যা ছড়িয়ে পড়েছে কঙ্গো থেকে পুরো আফ্রিকা জুড়ে।
প্যাট্রিস লুমুম্বাকে, লুমুম্বার হার না মানা দৃঢ়তাকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিতে মাইকেল বেছে নিয়েছেন ফুটবল খেলাকে; ২০১৩ থেকে যেখানেই কঙ্গো জাতীয় ফুটবল দল খেলতে যায় তিনি সেখানেই যান। পরেন কঙ্গোর পতাকার আদলে বানানো স্যুট-প্যান্ট। আর পুরো ম্যাচ জুড়ে দাঁড়িয়ে থেকে জানিয়ে দেন লুমুম্বার দৃঢ়তা, প্যাট্রিস লুমুম্বা যে এভাবেই দাঁড়াতেন। খেলার পুরোটা সময় তিনি কিছুই খান না (এমনকি পানিও না), ফোন ব্যবহার করেন না। খেলার সম্পূর্ণ ৯০+ মিনিট তিনি তাঁর দেশের স্বাধীনতার নায়ককে স্মরণ করেন। আর গ্যালারিতে তাঁকে দেখে মাঠে অনুপ্রেরণা নেয় কঙ্গো ফুটবল দল, গ্যালারির অন্য কঙ্গোলিজ সমর্থকরা। এভাবে লুমুম্বা ভিয়া হয়ে উঠেছেন কঙ্গোর প্রতীক। এবার বিশ্বকাপে এই সুপার সমর্থক এসেছেন কঙ্গো দলের ডেলিগেট হয়ে, সেদেশের সরকার এই ব্যবস্থা করেছে। লুমুম্বা ভিয়ার রাজনৈতিক দর্শনের কারণে যুক্তরাষ্ট্র ভিসা আটকে দেওয়ার শঙ্কা ছিলো বলেই এই ব্যবস্থা।
কে বলে, খেলার সাথে রাজনীতি মেশাতে নেই? খেলার সাথেও রাজনীতি তীব্রভাবে থাকে। আর থাকে বলেই ফিফা হাইতির বিশ্বকাপ জার্সি নিষিদ্ধ করে, লুমুম্বা ভিয়া কঙ্গো ও আফ্রিকার রক্তাক্ত ইতিহাস নিয়ে গ্যালারিতে মূর্তির মতো ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতে পারেন।

রুহুল মাহফুজ জয়
খেলাধুলার সব খবর ও বিশ্লেষণ সবার আগে পেতে চোখ রাখুন খেলারদেশে।

মন্তব্যসমূহ (0)
মন্তব্য করতে এবং আলোচনায় অংশ নিতে আপনার গুগল অ্যাকাউন্ট দিয়ে লগইন করুন।