অমরত্বের গৌরব লিওনেল মেসি
লিওনেল আন্দ্রেস মেসিকে পেয়ে অমরত্বই গর্বিত, রেকর্ড বইয়ের প্রাণ থাকলে হয়ত বলতো 'আমি ধন্য হয়েছি, ধন্য!' অন্যদের জন্য যা যা কল্পনা করাও কঠিন, মেসি সেসব অনায়াসেই করতে পারেন বলেই তিনি সর্বকালের সেরা।

আরেকটি বিশ্বকাপ ফাইনাল নিশ্চিতের পর সতীর্থদের কাঁধে চড়ে গর্বিত মেসি
অমরত্ব কথা বলে না। কিন্তু কেউ কেউ অমরত্বের হয়ে কথা বলে। লিওনেল আন্দ্রেস মেসি সম্ভবত সেই একজন, যার হয়ে চিরকাল ফুটবল অমরত্ব কথা বলবে। অমরত্ব শব্দটার যদি জবান থাকতো আর ওকে কেউ প্রশ্ন করতো, কে কাকে মহিমান্বিত করেছে—অমরত্ব মেসিকে, নাকি মেসি অমরত্বকে? এক মুহূর্ত না ভেবে অমরত্ব উত্তর দিতো, 'মেসিকে পেয়ে অমরত্ব বর্তে গেছে!'
ফুটবল মাঠে গোল বলটা নিয়ে কী করেননি এই ক্ষুদে জাদুকর! কতভাবে বলকে কথা বলানো যায়, রূপকথার গল্প লেখানো যায় তা তিনি অবিশ্বাস্যভাবে করে দেখিয়েছেন। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে সেসব রূপকথা বেঁচে থাকার মতো একের পর এক মুহূর্ত তৈরি করা লিওনেল মেসিকে ছাড়া আর কে করতে পেরেছে! ক্যারিয়ারের একমাত্র আফসোস 'বিশ্বকাপ' ট্রফি তো চার বছর আগেই জেতা হয়ে গেছে; গত চার বছর ধরে যা যা করছেন সবই যেন বোনাস। কিন্তু মেসির মনে ছিলো অন্য কিছু।
২০২২-এ তিনি নির্বাণ লাভ করেছেন ঠিকই, সাফল্যের ক্ষুধা মরে যায়নি। মনে মনে তিনি নিজেকে ২০২৬-এর জন্য ঠিকই প্রস্তুত করেছিলেন। সে কারণেই বিশ্বকাপের স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্রের মেজর লিগ সকারের দল ইন্টার মায়ামিতে খেলতে গেছেন। সাথে আর্জেন্টিনা দলে তাঁর ভ্যানগার্ড রদ্রিগো ডি পলকেও নিয়ে গেছেন। মনের গোপন ইচ্ছা বা স্বপ্ন যাই বলেন, তা পূরণ করতে তিনি সতীর্থসহ নিজেকে প্রস্তুত করেছেন। নির্বাণ লাভ করার পরে মানুষ নির্ভার হয়। মেসিও হয়েছেন। আর নির্ভার মেসিকে গত চার বছরে আর্জেন্টিনা দলের জার্সিতে দুনিয়া অদম্যরূপে দেখেছে; দেখছে এবারের বিশ্বকাপেও। কাতার বিশ্বকাপ জেতার পরে অবসর নিয়ে নিলে কোনো ক্ষতি ছিলো না তাঁর, ক্ষতিটা হতো দুনিয়ার কোটি কোটি ফুটবল দর্শকের। বয়স মেসিকে, মেসির প্রতিভাকে একটুও ম্লান করতে পারেনি। বরং আর্জেন্টিনার জার্সিতে তিনি আরও দুর্বার। তিনি সারা মাঠে হেঁটে বেড়াচ্ছেন আর সতীর্থরা তাঁর জন্য জান বাজি রেখে লড়ছে। যখনই তাঁর পায়ে বল, তখনই বলটাকে পায়ের সাথে চুম্বকের মতো আটকে প্রতিপক্ষকে তছনছ করে দিচ্ছেন। কাতার বিশ্বকাপ-পরবর্তী সময়ে, বয়স ৩৫ থেকে ৩৯ হওয়ার মধ্যবর্তী সময়ে তিনি আর্জেন্টিনার জার্সিতে ২৩টি ম্যাচ খেলে ২৬টি গোলে অবদান রেখেছেন। এর মধ্যে গোলই ১৬টি! এসব গোল আর অ্যাসিস্টের বেশিরভাগই চোখ জুড়ানো, মন মাতানো। লিওনেল আন্দ্রেস মেসি বলেই এমন কিছু করা সম্ভব।

ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার জয়সূচক গোলের পর মেসি
কাতার বিশ্বকাপ জেতার পরে দলকে কোপা আমেরিকা জিতিয়েছেন। এরপর লাতিন আমেরিকান অঞ্চলে বিশ্বকাপ বাছাইয়ে এক নম্বরে থেকে দলকে দ্য গ্রেটেস্ট শো অন আর্থের টিকিট পাইয়ে দিয়েছেন। ৩৯ বছর বয়সে বিশ্বকাপে খেলে যা যা করছেন, এসব অন্যরা কেবল কল্পনায় করতে পারতো। অবশ্য কল্পনাতেও এই বয়সে প্রতি ম্যাচে প্রতিটি মিনিট (এ পর্যন্ত ৬২০ মিনিট) খেলা, ৭ ম্যাচে ৮টি গোলের সঙ্গে ৪টি অ্যাসিস্ট করা প্রায় অসম্ভব। অন্যদের জন্য যা যা কল্পনা করাও কঠিন, মেসি সেসব অনায়াসেই করতে পারেন বলেই তিনি সর্বকালের সেরা।
পরিসংখ্যান সবসময় একজন খেলোয়াড়ের অবদান তুলে ধরতে পারে না, তবে সাক্ষী দিতে পারে ঠিকই। এই বিশ্বকাপে মেসির ১৩টি গোলে অবদান আর্জেন্টিনা দলের ওপর তাঁর অবদান কত তার সাক্ষী ঠিকই দিচ্ছে। এই বিশ্বকাপে মেসি গড়ে ৪৭ মিনিট হেঁটে মাঠে দূরত্ব কভার করছেন। ফুটবল ইতিহাসে এমন হাঁটুরে ফুটবলার আর দেখা যায়নি। হেঁটে হেঁটে মাঠ কাঁপিয়ে, বল পায়ে এলে যদি প্রতিপক্ষকে গুড়িয়ে দেওয়া যায়, তাহলে হাঁটাই ভালো! মেসিকে অবশ্য অনেক ভাগ্যবানও বলতে হবে। তিনি অসাধারণ সব সতীর্থ পেয়েছেন, যারা তাঁকে দেবতার মতো মান্য করেন, তাঁর জন্য জান-প্রাণ উজাড় করে দেন। যে কারণে আর্জেন্টিনার টিম স্পিরিট অসামান্য, হেরে যাওয়ার আগে তারা হার মানে না, বারবার শেষ মুহূর্তে ফিরে এসে ম্যাচ জিতে মাঠ ছাড়তে পারে। তাতে খেলোয়াড় হিসাবে মেসির মনে রাখার মতো অবদান থাকে।

আরেকটি বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠা মেসির কাছে অনেক আবেগের
এই ৩৯ বছর বয়সী হাঁটাবাবা মেসিকেও হাইপ্রেস করে আটকানো যায় না। অস্ট্রিয়া চেষ্টা করেছিলো, পারেনি। ইংল্যান্ডও পারেনি। অতি উত্তপ্ত এক সেমিফাইনালে মেসি কী কী করেছেন, এবার তা বলা যাক। ম্যাচে ইংল্যান্ড এগিয়ে যাওয়ার পরে মেসি রুদ্রমূর্তি ধারণ করেন। শরীরীভাষায় দেখা যায় 'জেতো নাহয় মরো'-এর অনুবাদ। যে ভাষা ছড়িয়ে পড়ে আর্জেন্টিনা দলের প্রতিটি খেলোয়াড়ের শরীরে। দুর্মুখেরা বলবে, গোল করার পর ইংল্যান্ড অতিরিক্ত রক্ষণাত্মক কৌশলে চলে যায় বলেই না মেসি আর আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়রা এত বেশি বল পায়ে রাখতে পেরেছে, তাতে সুযোগ তৈরি করে ম্যাচ জিতে নিয়েছে। হ্যাঁ, ইংল্যান্ড দলের ভুল কৌশল আর্জেন্টিনাকে সুযোগ করে দিয়েছে। কিন্তু সবাই নিজেদের পক্ষে আসা সুযোগ কাজে লাগাতে পারে না। পাসিং একুরেসি, গতি আর ড্রিবলিংয়ের সাথে নিখুঁত নিশানায় গোল করার দক্ষতা লাগে। মাঠে লিওনেল মেসি নামক জাদুকরের নেতৃত্বে আর্জেন্টিনা সেই দক্ষতা প্রমাণ করেই ফাইনালে উঠেছে। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার দুটি গোলেরই যোগানদাতা মেসি। সতীর্থিদের ৫১টি সফল পাস দিয়েছেন। ম্যাচে তাঁর পারফরম্যান্স রেটিং ১০-এ ৮.৮; যা অতিমানবীয় পারফরম্যান্সের স্বীকৃতি। ম্যাচ শেষে আবেগে শিশুর মতো কেঁদে ফেলা মেসিকে দেখতে কতই না সুন্দর লাগে! মনে হয়, এই তো ফুটবলের রক্ত-মাংসের ঈশ্বর, যিনি প্রাপ্তির আনন্দে নিজেকে চোখের জলে সিক্ত করতে পারেন। এই কান্না তো এটাও বোঝায় যে, আবার বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠা তাঁর জন্য কতটা বড়ো বিষয়, আর্জেন্টিনা দলটা তাঁর কাছে ভালোবাসার, তিনি থাকতে থাকতেই আর্জেন্টিনার জার্সিতে আরেকটি তারকা যুক্ত হোক তা তিনি কতটা চান!
রেকর্ড মেসির পায়ের কাছে এসে লুটোপুটি খাবে, এটাই স্বাভাবিক। হচ্ছেও তাই। বিশ্বকাপের প্রায় সব রেকর্ডই এখন মেসির দখলে। সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলা, সবচেয়ে বেশি গোল করা, গোলে অবদান মেসিরই। আলাদা ছয়টি বিশ্বকাপে গোল ও অ্যাসিস্ট করা একমাত্র ফুটবলারের নাম যে লিওনেল আন্দ্রেস মেসি, তাতেও অবাক হবার কিছু নেই। এবার এখন পর্যন্ত গোলের জন্য সরাসরি ২০ টি পাস দিয়েছেন। ১৯৬৬ আসরের পর মেসিই প্রথম ফুটবলার যিনি তিনটি আলাদা বিশ্বকাপে এই কৃতিত্ব দেখিয়েছেন। এখনও ফাইনাল বাকি! ১৯ জুলাই নিউজার্সিতে যে দলই চ্যাম্পিয়ন হোক, টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার গোল্ডেন বল মেসির হাতে ওঠা নিশ্চিত হয়ে গেছে। ৮ গোলের সঙ্গে ৫ অ্যাসিস্ট পরিসংখ্যানের বিচার, এর বাইরে টুর্নামেন্টে ও আর্জেন্টিনা দলের ওপর মেসির প্রভাব বিচার করলে অন্য কোনো খেলোয়াড় তাঁর সঙ্গে এই পুরস্কারে প্রতিদ্বন্দ্বিতাও করতে পারবে না। বিশ্বকাপ ইতিহাসে প্রথম কোনো খেলোয়াড় তিনটি গোল্ডেন বল জেতার রেকর্ড মেসিরই হবে, এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। মেসি ছাড়া এই পুরস্কারের রেকর্ড অন্য কারো নামের পাশে শোভাও পায় না। কারণ মেসি মানেই তো ফুটবল!

রুহুল মাহফুজ জয়
খেলাধুলার সব খবর ও বিশ্লেষণ সবার আগে পেতে চোখ রাখুন খেলারদেশে।

মন্তব্যসমূহ (0)
মন্তব্য করতে এবং আলোচনায় অংশ নিতে আপনার গুগল অ্যাকাউন্ট দিয়ে লগইন করুন।