বিশ্বকাপ ২০২৬: স্পেন বনাম আর্জেন্টিনা
ফাইনালের ভাগ্য নির্ধারণে ৬ ফ্যাক্ট

বিশ্বকাপ ২০২৬: স্পেন বনাম আর্জেন্টিনা
স্পেন ও আর্জেন্টিনা—বিশ্ব ফুটবলের দুই পরাশক্তি মুখোমুখি হতে যাচ্ছে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের ফাইনালে। নিউইয়র্ক–নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই ফাইনাল শুধু শিরোপা নির্ধারণী ম্যাচই না। বরং কৌশল, তারকাদের দ্বৈরথ এবং ইতিহাস গড়ার এক অনন্য মঞ্চ।
দুই দলই ভিন্ন ভিন্ন পথ পেরিয়ে পৌঁছেছে ফাইনালে। সেমিফাইনালে স্পেন দুর্দান্ত নৈপুণ্য ও ফর্মে থাকা অন্যতম ফেভারিট ফ্রান্সকে ২-০ গোলে পরাজিত করে। অন্যদিকে আর্জেন্টিনা শেষ মুহূর্তের অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তনে ইংল্যান্ডকে ২-১ গোলে হারিয়ে টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনালে জায়গা করে নেয়।
রবিবারের ফাইনালে মুখোমুখি হবে দুই ভিন্ন ফুটবল দর্শন। একদিকে বলের দখল, নিখুঁত পাসিং ও সংগঠিত ফুটবলে বিশ্বাসী স্পেন; অন্যদিকে লিওনেল মেসির নেতৃত্বে সুযোগ তৈরি ও মুহূর্তকে কাজে লাগাতে ওস্তাদ আর্জেন্টিনা। ম্যাচজুড়ে থাকবে একাধিক ব্যক্তিগত লড়াই, একাদশ নির্বাচন নিয়ে দুই কোচের কঠিন সিদ্ধান্ত এবং কৌশলগত নানা চমক।
২০২৬ বিশ্বকাপের এই শেষ ম্যাচটিকে বিশেষ করে তুলতে পারে এমন ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়েই লেখাটি।

১। মেসির জাদু কি স্পেনের দুর্ভেদ্য রক্ষণ ভাঙতে পারবে?
২০২৬ বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত লিওনেল মেসি যেমন দুর্দান্ত ছন্দে আছেন, তেমনি স্পেনও গড়ে তুলেছে টুর্নামেন্টের সবচেয়ে শক্তিশালী রক্ষণভাগ। তাই রবিবারের ফাইনালে এই দুই শক্তির সংঘর্ষই হতে পারে ম্যাচের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ।
সেমিফাইনালে স্পেন যেভাবে কিলিয়ান এমবাপ্পে, উসমান দেম্বেলে এবং মাইকেল ওলিসেকে নিয়ে গড়া ফ্রান্সের তারকাখচিত আক্রমণকে প্রায় নিষ্ক্রিয় করে দেয়, তা ছিল অসাধারণ। পুরো ম্যাচে ফ্রান্সের প্রত্যাশিত গোল (xG) ছিল মাত্র ০.৩১—১৯৯৪ সালের পর বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে কোনো দলের বিপক্ষে এত কম xG আর দেখা যায়নি।
ফ্রান্সকে গোলশূন্য রাখার মাধ্যমে গোলরক্ষক উনাই সিমন ও তার রক্ষণভাগ টুর্নামেন্টে নিজেদের ষষ্ঠ ক্লিন শিট তুলে নেয়। এক আসরে ছয়টি ক্লিন শিট রাখা প্রথম দলও হয়ে যায় স্পেন। এর আগে কোয়ার্টার ফাইনালে বেলজিয়ামের শার্ল দে কেটেলারের গোল খাওয়ার আগে টানা ৬৪৯ মিনিট বিশ্বকাপে কোনো গোল হজম করেননি উনাই সিমন। তবে স্পেনের এই দুর্ভেদ্য রক্ষণভাগের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন সম্ভবত টুর্নামেন্টের সেরা ফুটবলার—লিওনেল মেসি।
বিশ্বকাপের শুরু থেকেই দুর্দান্ত ফর্মে আছেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। প্রথম ম্যাচে হ্যাটট্রিক করার পর দ্বিতীয় ম্যাচে করেন জোড়া গোল। সেই সঙ্গে বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকায় ভেঙে দেন মিরোস্লাভ ক্লোসের দীর্ঘদিনের রেকর্ড। নকআউট পর্বে মেসি শুধু গোলদাতা নন, হয়ে উঠেছেন দলের প্রধান সৃষ্টিশীল শক্তিও। শেষ ষোলোতে মিশরের বিপক্ষে দুর্দান্ত ক্রসে ক্রিস্তিয়ান রোমেরোর গোলের পথ তৈরি করার পাশাপাশি নিজেও গোল করেন। এরপর কোয়ার্টার ফাইনালে সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারের গোলেও অ্যাসিস্ট করেন। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেমিফাইনালে মেসি তৈরি করেন চারটি গোলের সুযোগ এবং আর্জেন্টিনার দুটি গোলেই অ্যাসিস্ট করেন। ফলে বিশ্বকাপ ইতিহাসে সর্বোচ্চ ১২টি অ্যাসিস্ট নিয়ে এখন তিনি এককভাবে শীর্ষে।
স্পেনের দুর্ভেদ্য রক্ষণ ভাঙতে বিশেষ কিছু লাগবেই। আর ফুটবলের সেই বিশেষ মুহূর্ত তৈরি করার অসাধারণ ক্ষমতা যে এখনও লিওনেল মেসির আছে, তা তিনি এই বিশ্বকাপেই বারবার প্রমাণ করেছেন। রবিবারের ফাইনালে তাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—স্পেনের অদম্য রক্ষণ জিতবে, নাকি মেসির জাদু?

২। কারিগরি নৈপুণ্য বনাম লড়াকু মানসিকতা: ফাইনালের মাঝমাঠ কার দখলে থাকবে?
বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেন ও আর্জেন্টিনার লড়াইয়ের ভাগ্য অনেকটাই নির্ধারিত হতে পারে মাঝমাঠের দ্বৈরথে। একদিকে স্পেনের নিখুঁত পাসিং ও বল দখলের ফুটবল, অন্যদিকে আর্জেন্টিনার শক্তি, আগ্রাসন ও লড়াকু মানসিকতা—এই দুই ভিন্ন দর্শনের সংঘর্ষই হতে যাচ্ছে নিউইয়র্ক–নিউ জার্সিতে।
স্পেনের প্রাণভোমরা রদ্রি এই বিশ্বকাপে আবারও ফিরেছেন নিজের সেরা ছন্দে। রবিবার স্পেন শিরোপা জিততে পারলে গোল্ডেন বল জয়ের অন্যতম দাবিদারও তিনি। ২০২২ সালে নিজের গড়া রেকর্ড ভেঙে এবার তিনি এক বিশ্বকাপে ৬৫৫টি সফল পাস দিয়ে (১৯৬৬ সালের পরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী) নতুন ইতিহাস গড়েছেন।
শুধু বল ধরে রাখাই নয়, রক্ষণেও সমান কার্যকর রদ্রি। টুর্নামেন্টে তিনি ৩৪ বার প্রতিপক্ষের কাছ থেকে বল পুনরুদ্ধার করেছেন, যা সব খেলোয়াড়ের মধ্যে পঞ্চম সর্বোচ্চ।
তবে স্পেনের মাঝমাঠ শুধু রদ্রিনির্ভর নয়। কোয়ার্টার ফাইনালে বেলজিয়ামের বিপক্ষে গোল করা ফাবিয়ান রুইজ আর্জেন্টিনার শারীরিকভাবে শক্তিশালী মিডফিল্ডের বিপক্ষে বাড়তি দৃঢ়তা যোগ করতে পারেন। অন্যদিকে পেদ্রি এই বিশ্বকাপে শেষ তৃতীয়াংশে ১২২টি সফল পাস দিয়েছেন—যা টুর্নামেন্টের যেকোনো মিডফিল্ডারের মধ্যে সর্বোচ্চ।
অন্যদিকে আর্জেন্টিনার মাঝমাঠও কম শক্তিশালী নয়। অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার, এনসো ফার্নান্দেস, লিয়ান্দ্রো পারেদেস ও রদ্রিগো দে পলের সমন্বয়ে গড়া মিডফিল্ড পুরো টুর্নামেন্টেই ভারসাম্য ও লড়াকু মানসিকতার পরিচয় দিয়েছে।
এর মধ্যে ম্যাক অ্যালিস্টার সবচেয়ে ধারাবাহিক। লিভারপুলের এই মিডফিল্ডার ৩৩টি দ্বৈরথে জয় পেয়েছেন—যা বিশ্বকাপে মাত্র পাঁচজন খেলোয়াড়ের চেয়ে কম। এছাড়া তার ১০টি ইন্টারসেপশন রয়েছে, যেখানে শুধু প্যারাগুয়ের আন্দ্রেস কুবাস তার চেয়ে এগিয়ে।
সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে নিজের সেরা খেলাটি খেলেন এনজো ফার্নান্দেজ। গোল করার পাশাপাশি ম্যাচে সর্বোচ্চ ১০৪ বার বল স্পর্শ, ৮২টি সফল পাস এবং শেষ তৃতীয়াংশে ৩৮টি সফল পাস ছিল তার নামের পাশে।
ফলে ফাইনালে মাঝমাঠের এই লড়াই হবে কেবল কৌশলের নয়, আধিপত্যেরও। স্পেন যদি পাসিং ও বল দখলের খেলায় সফল হয়, ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে থাকবে। কিন্তু আর্জেন্টিনা যদি নিজেদের আগ্রাসী প্রেসিং, শারীরিক শক্তি ও দ্রুত ট্রানজিশনের মাধ্যমে সেই ছন্দ ভেঙে দিতে পারে, তাহলে শিরোপার পাল্লা হেলে যেতে পারে লিওনেল মেসিদের দিকেই।

ফাবিয়ান রুইজ
৩। একাদশ-ধাঁধা: কারা থাকছেন শুরুর একাদশে?
সফল দলগুলো সাধারণত একটি স্থির একাদশের ওপর নির্ভর করে। তবে ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালের আগে স্পেনের কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে এবং আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনিকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন করতে হবে, যা ম্যাচের ফলেও বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
স্পেনের সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্তটি মাঝমাঠে। ফাবিয়ান রুইজ নাকি পেদ্রি—শুরুর একাদশে কাকে বেছে নেবেন, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। বেলজিয়ামের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে ফাবিয়ান রুইজকে শুরুর একাদশে দেখে অনেকেই অবাক হয়েছিলেন। কিন্তু সেই আস্থার প্রতিদান তিনি দেন ম্যাচের প্রথম গোল করে। ফ্রান্সের বিপক্ষেও তিনি ছিলেন দুর্দান্ত। স্পেনের হয়ে সর্বোচ্চ ৭ বার বল পুনরুদ্ধার করেন এবং পুরো ম্যাচে সবচেয়ে বেশি ৮ বার শেষ তৃতীয়াংশে বল নিয়ে প্রবেশ করেন।

পেদ্রি
অন্যদিকে পেদ্রিও পুরো টুর্নামেন্টে অসাধারণ ধারাবাহিকতা দেখিয়েছেন। তিনি প্রতিপক্ষের শেষ তৃতীয়াংশে ১০ বার বল পুনরুদ্ধার করেছেন, যা বিশ্বকাপে যেকোনো খেলোয়াড়ের মধ্যে সর্বোচ্চ। এছাড়া স্পেনের অন্য যে কোনো খেলোয়াড়ের তুলনায় তার প্রত্যাশিত অ্যাসিস্ট (xA) ১.৬৮, যা দলের আক্রমণ গঠনে তার গুরুত্ব স্পষ্ট করে।

হুলিয়ান আলভারেজ
আর্জেন্টিনার ক্ষেত্রেও স্কালোনির সামনে রয়েছে কয়েকটি কঠিন সিদ্ধান্ত। প্রতিপক্ষ অনুযায়ী দল সাজানোর কৌশল অনুসরণ করে তিনি মাঝমাঠে রদ্রিগো দে পল কিংবা থিয়াগো আলমাদাকে জুলিয়ানো সিমিওনের চেয়ে এগিয়ে রাখতে পারেন। তবে সবচেয়ে কঠিন সিদ্ধান্তটি সম্ভবত আক্রমণভাগে। সেখানে পরিশ্রমী হুলিয়ান আলভারেজ এবং দুর্দান্ত ফিনিশার লাউতারো মার্তিনেজ—দুজনের মধ্যেই একজনকে বেছে নিতে হবে।

লাউতারো মার্তিনেজ
শেষ ষোলো থেকে শুরুর একাদশের বাইরে থাকলেও বদলি হিসেবে নেমে লাউতারো মার্তিনেজ দারুণ প্রভাব ফেলেছেন। টানা তিনটি নকআউট ম্যাচেই তিনি গোল করেছেন বা করিয়েছেন। অন্যদিকে হুলিয়ান আলভারেজ পুরো টুর্নামেন্টে সাত ম্যাচে মাত্র একটি গোল করেছেন, যদিও সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালের সেই গোলটি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তাই স্কালোনির সামনে বড় প্রশ্ন—দলের রক্ষণাত্মক ভারসাম্য ও অফ-দ্য-বল পরিশ্রমের জন্য আলভারেজকে রাখবেন, নাকি গোলের সামনে বেশি কার্যকর লাউতারো মার্তিনেজের ওপর ভরসা করবেন? ফাইনালের আগে আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় নির্বাচন-দ্বিধা সম্ভবত এটিই।

দে লা ফুয়েন্তে এবং লিওনেল স্কালোনি
৪। ডাগআউটে দুই বিশেষজ্ঞ: বিশ্বকাপে আবারও অটুট থাকবে এক ঐতিহ্য
২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালের পর একটি পরিসংখ্যান নিশ্চিতভাবেই অক্ষুণ্ণ থাকবে। কারণ স্পেনের লুইস দে লা ফুয়েন্তে এবং আর্জেন্টিনার লিওনেল স্কালোনি—দুজনই নিজ নিজ দেশের নাগরিক। অর্থাৎ এবারও বিশ্বকাপ জিতবে এমন এক দল, যার কোচ সেই দেশেরই মানুষ। বিশ্বকাপের ইতিহাসে এখন পর্যন্ত কোনো বিদেশি কোচের অধীনে কোনো দেশ শিরোপা জিততে পারেনি। ফাইনালের ফল যাই হোক, এই রেকর্ডও বহাল থাকবে।
আধুনিক ফুটবলে অনেক দেশই বিদেশি কোচের ওপর ভরসা করে। এবারের বিশ্বকাপেই ইংল্যান্ডের দায়িত্বে ছিলেন জার্মান কোচ টমাস টুখেল, ব্রাজিলের কোচ ছিলেন ইতালির কার্লো আনচেলত্তি এবং যুক্তরাষ্ট্রের দায়িত্বে ছিলেন আর্জেন্টিনার মাউরিসিও পোচেত্তিনো। এই তিন কোচই ক্লাব ফুটবলে নিজেদের সময়ের সেরা কৌশলবিদদের একজন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু আন্তর্জাতিক ফুটবলের বাস্তবতা যে ভিন্ন, সেটি আবারও স্পষ্ট হয়েছে। ক্লাব পর্যায়ের সাফল্য জাতীয় দলের মঞ্চে সবসময় সমানভাবে কাজে লাগে না।
অন্যদিকে দে লা ফুয়েন্তে ও স্কালোনির ক্যারিয়ারই গড়ে উঠেছে আন্তর্জাতিক ফুটবলকে ঘিরে। দে লা ফুয়েন্তে স্পেনের নিম্নস্তরের ক্লাব ফুটবলে কোচিং শুরু করলেও বড় সাফল্য পাননি। পরে স্পেনের বিভিন্ন বয়সভিত্তিক জাতীয় দলের দায়িত্ব নিয়ে ধাপে ধাপে নিজেকে প্রমাণ করেন এবং ২০২২ সালে সিনিয়র দলের কোচ হন।
স্কালোনির গল্পও প্রায় একই রকম। সেভিয়ায় সহকারী কোচ হিসেবে সংক্ষিপ্ত সময় কাজ করা ছাড়া তার পুরো কোচিং জীবনই কেটেছে আর্জেন্টিনার জাতীয় দলের সঙ্গে। এই পথ যে সফল, তা তাদের অর্জনই প্রমাণ করে। স্কালোনির নেতৃত্বে আর্জেন্টিনা ২০২২ বিশ্বকাপ জিতেছে। অন্যদিকে দে লা ফুয়েন্তে ২০২৪ সালে স্পেনকে ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপা এনে দেন।
ফলে এবারের বিশ্বকাপের ফাইনাল শুধু দুই ফুটবল শক্তির লড়াই নয়, আন্তর্জাতিক ফুটবলে বেড়ে ওঠা দুই বিশেষজ্ঞ কোচেরও কৌশলগত দ্বৈরথ। তাদের সাফল্য হয়তো ভবিষ্যতে আরও অনেক জাতীয় দলকে নিজ দেশের কোচদের ওপর দীর্ঘমেয়াদে আস্থা রাখার অনুপ্রেরণা দেবে।
৫। শেষ মুহূর্তের নাটকের সম্ভাবনা প্রবল
২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালে যদি শেষ বাঁশি বাজার আগে আরেকটি নাটকীয় অধ্যায় লেখা হয়, তাতে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। কারণ স্পেন ও আর্জেন্টিনা—দুই দলই এই টুর্নামেন্টে বারবার প্রমাণ করেছে, ম্যাচের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তারা হাল ছাড়ে না।
আর্জেন্টিনার ফাইনালে ওঠার পথ মোটেও সহজ ছিল না। নকআউট পর্বের কোনো ম্যাচেই ৯০ মিনিটের আগে তারা নিশ্চিতভাবে এগিয়ে ছিল না। তবু প্রতিবারই তারা ফিরে এসেছে। আর সেই প্রত্যাবর্তনের কেন্দ্রে ছিলেন লিওনেল মেসি। সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ৮৫ মিনিট পর্যন্ত পিছিয়ে ছিল আর্জেন্টিনা। এরপর মাত্র কয়েক মিনিটের ব্যবধানে ম্যাচ ঘুরিয়ে ২-১ ব্যবধানে জিতে ফাইনালে ওঠে স্কালোনির দল। বিশ্বকাপের সেমিফাইনালের ইতিহাসে স্বাভাবিক সময়ে এত দেরিতে পিছিয়ে থেকেও জয়ের নজির আর নেই। এরও আগে শেষ ষোলোতে মিশরের বিপক্ষে ম্যাচে প্রায় বিদায়ের মুখে পড়েছিল বর্তমান চ্যাম্পিয়নরা। ম্যাচ শেষ হতে ১২ মিনিট বাকি থাকতে তারা ২-০ ব্যবধানে পিছিয়ে ছিল। সে সময় অপটার সুপারকম্পিউটার আর্জেন্টিনার স্বাভাবিক সময়ে জয়ের সম্ভাবনা দেখিয়েছিল মাত্র ০.৬ শতাংশ। কিন্তু অবিশ্বাস্যভাবে শেষ দিকে তিনটি গোল করে ৩-২ ব্যবধানে জিতে বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় প্রত্যাবর্তনের গল্প লেখে তারা।
স্পেনের গল্পটাও কিছুটা একই রকম, যদিও এতটা নাটকীয় নয়। সেমিফাইনালে তারা ফ্রান্সকে স্বাচ্ছন্দ্যে হারালেও তার আগে পর্তুগাল ও বেলজিয়ামের বিপক্ষে শেষ দিকে মিকেল মেরিনোর গুরুত্বপূর্ণ গোলই তাদের জয় নিশ্চিত করেছিল। স্পেন সবসময়ই বলের দখল ও পাসিং ফুটবলে আধিপত্য বিস্তার করে। কিন্তু বলের দখল তখনই মূল্য পায়, যখন সেটি গোলে পরিণত হয়। সৌভাগ্যক্রমে তাদের দলে এমন একাধিক খেলোয়াড় আছেন, যারা গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে ম্যাচের ভাগ্য বদলে দিতে পারেন।
৬। ইতিহাসে প্রথম: ইউরোপ ও দক্ষিণ আমেরিকার বর্তমান চ্যাম্পিয়নদের বিশ্বকাপ ফাইনাল
এই দুই ফাইনালিস্ট শুধু দক্ষ নয়, মানসিক দৃঢ়তার দিক থেকেও অসাধারণ। নিজেদের সেরা খেলাটা না খেলেও কীভাবে ম্যাচ জিততে হয়, তা তারা একাধিকবার দেখিয়েছে। তাই নিউইয়র্ক–নিউ জার্সির ফাইনালেও শেষ বাঁশি বাজার আগ পর্যন্ত কোনো ফলই নিশ্চিত ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। আরেকটি রোমাঞ্চকর শেষ মুহূর্তের নাটক অপেক্ষা করতেই পারে।
২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনাল শুধু স্পেন ও আর্জেন্টিনার শিরোপার লড়াই নয়, এটি ফুটবল ইতিহাসেও এক নতুন অধ্যায়। এই প্রথমবারের মতো বর্তমান ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন এবং বর্তমান কোপা আমেরিকা চ্যাম্পিয়ন বিশ্বকাপের ফাইনালে মুখোমুখি হচ্ছে।
এ কারণে ম্যাচটি শুধু দুই দেশের জন্য নয়, বিশ্ব ফুটবলের দুই সবচেয়ে সফল মহাদেশ—ইউরোপ ও দক্ষিণ আমেরিকার শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে। চলতি বছরের শুরুতে পুনরায় চালু হওয়া ফিনালিসিমার দ্বিতীয় আসর বাতিল হয়ে যাওয়ায়, এই ফাইনাল যেন সেই অপূর্ণ লড়াইয়েরই বিকল্প মঞ্চ হয়ে উঠেছে।
দীর্ঘদিন ধরেই ইউরোপ ও দক্ষিণ আমেরিকা বিশ্ব ফুটবলের দুই প্রধান শক্তি। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্বকাপে ইউরোপের আধিপত্যই বেশি দেখা গেছে। ২০২৬ সালের আগে শেষ ১০টি বিশ্বকাপ ফাইনালের মধ্যে আটটিতেই ছিল ইউরোপীয় দল। এছাড়া শেষ পাঁচটি বিশ্বকাপের চারটিই জিতেছে ইউরোপের দেশগুলো।
এই ধারার ব্যতিক্রম একমাত্র আর্জেন্টিনা। ২০০৬ সালের পর বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠা একমাত্র দক্ষিণ আমেরিকান দল তারা। ২০২২ সালে শিরোপা জিতে সেই অপেক্ষার অবসান ঘটিয়েছিল লিওনেল স্কালোনির দল। এবারও যদি তারা জয় পায়, তবে দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলোর বিশ্বকাপ শিরোপা সংখ্যা হবে ১১, যা ইউরোপের মোট শিরোপার চেয়ে মাত্র একটি কম হবে।
আরও একটি বিষয় আর্জেন্টিনার আত্মবিশ্বাস বাড়াতে পারে। ২০২৪ সালের কোপা আমেরিকার ফাইনালও অনুষ্ঠিত হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রেই। মিয়ামির হার্ড রক স্টেডিয়ামে কলম্বিয়াকে অতিরিক্ত সময়ের ১১২তম মিনিটের গোলে হারিয়ে শিরোপা জিতেছিল আর্জেন্টিনা। ফলে উত্তর আমেরিকার মাটিতে বড় ট্রফি জয়ের সুখস্মৃতি এখনও টাটকা লা আলবিসেলেস্তেদের।
সব মিলিয়ে, এবারের ফাইনাল শুধু একটি বিশ্বকাপ নির্ধারণ করবে না; এটি ইউরোপ ও দক্ষিণ আমেরিকার আধিপত্যের লড়াইয়েও নতুন এক অধ্যায় লিখতে পারে।

রনক জামান
খেলাধুলার সব খবর ও বিশ্লেষণ সবার আগে পেতে চোখ রাখুন খেলারদেশে।

মন্তব্যসমূহ (0)
মন্তব্য করতে এবং আলোচনায় অংশ নিতে আপনার গুগল অ্যাকাউন্ট দিয়ে লগইন করুন।