খেলারদেশ

ক্রিকেট ইতিহাসে বর্ণবৈষম্য

যে হাসির কারণে নির্বাসন

যখন স্যার গারফিল্ড সোবার্সের হাসি ভেঙে দিয়েছিল শেতাঙ্গদের নীরবতা

যে হাসির কারণে নির্বাসন

স্যার গারফিল্ড সোবার্স

রনক জামান
By রনক জামান

১৯৭০ সালের সালিসবারি। আজকের হারারে। তখনও শহরটির নাম ছিল সালিসবারি, আর সালিসবারি স্পোর্টস ক্লাব ছিল শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যের প্রতীক। সেই সময় শ্বেতাঙ্গদের এলাকায় কৃষ্ণাঙ্গদের উচ্চস্বরে হাসার সাহসও ছিল না। যদি না কোনো শ্বেতাঙ্গের কৌতুকে বাধ্য হয়ে হাসতে হতো। আইন করে দক্ষিণ আফ্রিকার মতো বর্ণভিত্তিক ক্রীড়া নিষিদ্ধ না হলেও, রোডেশিয়ায় বিভাজন ছিল কঠোর। বিশেষ করে ক্রিকেটে, যেটিকে শ্বেতাঙ্গদের নিজস্ব খেলা বলে মনে করা হতো।

দেশজুড়ে তখন চলছিল গৃহযুদ্ধ। শ্বেতাঙ্গ শাসকগোষ্ঠী ও কৃষ্ণাঙ্গ মুক্তিযোদ্ধাদের সংঘাত ছয় বছরে গড়িয়েছে। স্বাধীনতা তখনও বহু দূরের স্বপ্ন। এমন এক সময়, ১৯৭০ সালের ১২ সেপ্টেম্বর, এক কৃষ্ণাঙ্গ মানুষ সালিসবারি স্পোর্টস ক্লাবের মাঠে দাঁড়িয়ে মাথা পেছনে হেলিয়ে প্রাণ খুলে হেসেছিলেন। তিনি ছিলেন স্যার গারফিল্ড সোবার্স। মিড-অন পজিশনে দাঁড়িয়ে তিনি হাসছিলেন আলি বাখারের বোলিং দেখে। এমন বোলিং, যা দেখে হাসি চেপে রাখা তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়নি।

বাখার নিজেই পরে স্মৃতিচারণায় বলেন, "আমাকে নেটে বল করতে দেখলে সবাই বলত, আমি আমার নাতিকেও আউট করতে পারব না। সত্যি বলতে, আমি বলই করতে পারতাম না।" তাঁর একটি ধীরগতির লেগ-স্পিন আকাশে ভেসে আসতেই সোবার্স হো হো করে হেসে ওঠেন। বাখার বলেন, "পেছন থেকে হঠাৎ জোরে হাসির শব্দ পেলাম। ফিরে দেখি, গ্যারি সোবার্স হাসতে হাসতে কুঁকড়ে যাচ্ছেন।"

সোবার্সের সেই সফর অবশ্য শুধু হাসির গল্প হয়ে থাকেনি। সে সময় বর্ণবৈষম্যের কারণে দক্ষিণ আফ্রিকা আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে নির্বাসিত ছিল। কৃষ্ণাঙ্গ একজন কিংবদন্তি ক্রিকেটারের রোডেশিয়া সফর অনেকের কাছে ছিল বিস্ময়কর। পরিস্থিতি আরও বিতর্কিত হয়ে ওঠে, যখন জানা যায় সোবার্স দেশটির শ্বেতাঙ্গ প্রধানমন্ত্রী ইয়ান স্মিথের সঙ্গে নৈশভোজও করেছেন। পরে স্মিথকে তিনি "কথা বলার জন্য অসাধারণ মানুষ" বলেও মন্তব্য করেন।

এরপর শুরু হয় তীব্র সমালোচনা। ক্যারিবীয় সংবাদমাধ্যম তাঁকে "সাদা কৃষ্ণাঙ্গ" বলে আখ্যা দেয়। গায়ানার প্রধানমন্ত্রী হুমকি দেন, ক্ষমা না চাইলে সেখানে খেলতে দেওয়া হবে না। জামাইকায় তাঁর নেতৃত্ব নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। এমনকি ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীও ইঙ্গিত দেন, সোবার্স দলে থাকলে ওয়েস্ট ইন্ডিজের ভারত সফর ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

চাপ বাড়তে থাকায় শেষ পর্যন্ত সোবার্স লিখিতভাবে ক্ষমা চান। তিনি লেখেন, রোডেশিয়ায় যাওয়ার সময় তিনি শুধু ক্রিকেটের কথাই ভেবেছিলেন। বিষয়টির আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক গুরুত্ব সম্পর্কে তাঁর ধারণা ছিল না। আগে জানলে তিনি কখনোই সেখানে যেতেন না, ভবিষ্যতেও যাবেন না। এই ক্ষমাপ্রার্থনার পর পরিস্থিতি শান্ত হয়।

বিতর্কের মাঝেও আলি বাখারের সঙ্গে সোবার্সের বন্ধুত্ব অটুট ছিল। দুই জাতীয় দলের অধিনায়ক হিসেবে তারা একসঙ্গে একটি ডাবল-উইকেট প্রতিযোগিতায় খেলেছিলেন। বাখারের স্মৃতিতে সবচেয়ে উজ্জ্বল হয়ে আছে সেই দিনই।

"গ্যারি পরে আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু হয়ে ওঠেন। লন্ডনে গেলে প্রায়ই দেখা হতো। তিনি ছিলেন একেবারে মাটির মানুষ। ক্রিকেটকে ভালোবাসতেন, আর দক্ষিণ আফ্রিকার মানুষকেও ভালোবাসতেন," বলেন বাখার।

১৯৯১ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রিকেটে বর্ণভিত্তিক বিভাজনের অবসান উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানের বিশেষ অতিথি ছিলেন সোবার্স। সেদিন সুনীল গাভাস্কারের সঙ্গে সোয়েটোর একটি মাঠে নেটে ব্যাট-বল করেছিলেন তিনি। সেই দৃশ্য ছড়িয়ে পড়েছিল বিশ্বজুড়ে। বাখারের ভাষায়, "ওই মুহূর্তটাই নতুন দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রিকেট এবং আমাদের দেশের নতুন সূচনার প্রতীক হয়ে উঠেছিল।"

একুশ বছর আগে যে সোবার্সের রোডেশিয়া সফর তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল, বদলে যাওয়া সময়ে তাঁর উপস্থিতিই হয়ে উঠেছিল ঐক্য, পরিবর্তন ও আশার প্রতীক।

রনক জামান

রনক জামান

খেলাধুলার সব খবর ও বিশ্লেষণ সবার আগে পেতে চোখ রাখুন খেলারদেশে।

মন্তব্যসমূহ (0)

মন্তব্য করতে এবং আলোচনায় অংশ নিতে আপনার গুগল অ্যাকাউন্ট দিয়ে লগইন করুন।