খেলারদেশ

বিশ্বকাপ

বিশ্বকাপ ২০২৬: সেরা ১০ অঘটন

বিশ্বকাপ ২০২৬ এর সেরা ১০ অঘটন—মাঠ ও মাঠের বাইরের ঘটনাই, যা অনেকের কাছে অঘটন হিসেবে আখ্যায়িত। কেননা ফিফা বিশ্বকাপের এবারের আসর ছিল ঘটন, অঘটন, বিতর্ক, ব্যাপক আলোচনা ও তুমুল সমালোচনায় ভরপুর।

বিশ্বকাপ ২০২৬: সেরা ১০ অঘটন

বিশ্বকাপ ২০২৬ এর সেরা ১০ অঘটন

রনক জামান
By রনক জামান

যদিও বিশ্বকাপ শেষ। তবে একটা জিনিস স্পষ্ট, মেসির মতোই লা মাসিয়ার লামিন ইয়ামাল এবং পাও কুবার্সি—তাদের ক্লাব লিজেন্ড মেসিকে হারিয়েই ফুটবলের নতুন অধ্যায় ও আলোচনার সূচনা করেছে।

এর উপর, এবারের বিশ্বকাপে অঘটনের সর্বশেষ উদাহরণ হিসেবে দুই পিটিশনের প্রসঙ্গ তুলতেই হয়। ‘আর্জেন্টিনা আউট’ ও ‘ফাইনাল রিপ্লে’। এছাড়া—লাগিগা প্রেসিডেন্টের কড়া ভাষায় ফিফা প্রেসিডেন্টের পদত্যাগের দাবি, ফিফার সমালোচনা করে উয়েফার অবস্থান, বালোগুনের লাল কার্ড ইস্যু, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের গুঞ্জন, ইরান দলের প্রতি বৈষম্য ও হেনস্থার অভিযোগ, ডোনাল্ড ট্রাম্প ও জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর সম্পর্কের সমালোচনা, সোমালিয়ার রেফারি ওমর আরতানের ঘটনা, এম্বোলোর বিতর্কিত লাল কার্ড, ৪৮ দলের সিদ্ধান্ত, হোটেল ও টিকিটের মূল্য, গ্যালারিতে আসন বাড়াতে পা রাখার জায়গার সঙ্কোচন এবং যাতায়াতের অব্যবস্থাপনার তুমুল অভিযোগ।

মাঠে ব্রাজিল, জার্মানি, নেদারল্যান্ডসের হতাশাজনক পারফরম্যান্স ও রেফারির সিদ্ধান্তের সমালোচনা ও পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ। প্রশংসায় ছিল ৫০০ বছর পর্তুগালের উপনিবেশ থাকা দেশ ‘কেপ ভার্দে’র ১৮ দিনে গড়া ইতিহাস। মজার আলোচনায় ছিল, বিশ্বকাপ ঘিরে মেক্সিকোতে দর্শকদের মাঝে ৭০ লাখ কনডম বিতরণের ঘটনা। এক কথায়, ঘটন, অঘটন বা বিতর্ক—কী ঘটেনি এবার?

এবারের বিশ্বকাপের এই সমস্ত ঘটনা মিলিয়ে, গুরুত্ব অনুসারে, বিশ্বকাপ চলাকালীন মাঠ ও মাঠের বাইরের বিতর্ক থেকে সেরা ১০টি অঘটনের (বা ঘটন) তালিকা করা হলো :

১. অবিশ্বাস্য ও অবিস্মরণীয় কেপ ভার্দে

Image

নিঃসন্দেহে, এই তালিকার শীর্ষস্থান দাবি করে কেপ ভার্দে। এবং ২০২৬ বিশ্বকাপে তাদের অবিশ্বাস্য অভিষেকের কথা ও ইতিহাস গড়ার গল্প।

মনে আছে ঐ দৃশ্যটি? নকআউট পর্বের শেষ-৩২ ম্যাচে, কেপ ভার্দের কোচ পেদ্রো লেইতাঁউ ব্রিতু যখন পৃথিবীর মানচিত্র হাতে এগিয়ে যান লিওনেল স্কালোনির দিকে—আর কেপ ভার্দে নাম্নী নিজ দেশটি মানচিত্রের কোথায় অবস্থিত তা দেখিয়ে দিচ্ছিলেন বিশ্বকাপজয়ী কোচকে? বিশ্বকাপের আগে এটাই ছিল বাস্তবতা, স্বাভাবিক। কেননা বিশ্বকাপের আগে এই নামে কোনো দেশের অস্তিত্ব সম্পর্কে ফুটবলপ্রেমীদের কয়জন জানতেন? মানচিত্রে কোথায় অবস্থিত কয়জন জানতেন? পৃথিবীর কোটি কোটি ফুটবলভক্তের কয়জন জানতেন এই সদ্য চেনা, বিশ্বকাপ খেলতে আসা দেশটির জনসংখ্যা মাত্র ৫ লাখ? অথচ বাংলাদেশের সবচেয়ে কম জনসংখ্যার জেলা বান্দরবান, বসবাসের জন্য প্রতিকূল পরিবেশেও জনসংখ্যা ৪ লাখ ৮১ হাজারের উপর।

যাই হোক, ফিরে যাই কেপ ভার্দেতে। পর্তুগিজ ভাষায়, কাবো ভার্দে। বাংলায় যার অর্থ, ‘সবুজ অন্তরীপ’। ৫০০ বছর পর্তুগালের উপনিবেশ থাকা দেশ—মাত্র ১৮ দিনেই বিশ্বকে জাত চিনিয়ে দিয়েছে। আর বদলে গেছে অনেককিছু—কেপ ভার্দের বিশ্বখ্যাতি, ভোজিনিয়ার তারকাখ্যাতির গল্পে আগের সেই সরল জীবন-যাপনের আমূল পরিবর্তন, আর তাকে দলে ভেড়ানোর গুঞ্জনে মেসির ইন্টার মায়ামি। কাগজের শিরোনামে কেপ ভার্দে, বিস্তারিততে খুঁটিনাটি। অতীতের অচেনা নাম ও ভূখণ্ডকে এখন সবাই এক নামে চেনেন। মানচিত্রে খুঁজে পাওয়া দুষ্কর আফ্রিকার দ্বীপরাষ্ট্রটিকে এখন যে কেউ তর্জনী ঠুকে দেখিয়ে দিতে পারে। আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ম্যাচে সমতায় ফেরানো সেই সিডনি লোপেজ ক্যাব্রালের অবিশ্বাস্য গোল—তিনি নিজেই বিশ্বাস করতে না পেরে নিজেরই মাথায় দুহাত রেখে ছুটছিলেন, সেই গোল এবারের বিশ্বকাপের সেরা গোল কিনা, তা নিয়ে এখনো কথা হয়। আড্ডায় দলটিকে নিয়ে, ভোজিনিয়ার দুর্দান্ত পারফর্ম্যান্স নিয়ে প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়।

গ্রুপ এইচের এই নবাগত দলটি একের পর এক চমক দেখাতে থাকে শুরু থেকেই। প্রথম ম্যাচেই এই আসরের বিশ্বকাপজয়ী স্পেনকে গোলশূন্যভাবে আটকে দিয়ে প্রথম পয়েন্ট অর্জন করে। কিন্তু একে অঘটন বললেও পরবর্তীতে ‘অঘটন’ শব্দটিকে তুলে নিতে হয়। দ্বিতীয় ম্যাচে, ফেদেরিকো ভালভার্দের উরুগুয়েকেও ২-২ গোলে আটকে দেয় দলটি। গ্রুপপর্বের শেষ ম্যাচেও একই ঘটনা ঘটায়। সৌদি আরবের সঙ্গে ০-০ ড্র। গ্রুপপর্বের তিন ম্যাচে ড্র করে গ্রুপের রানারআপ হিসেবে নকআউটে ওঠে আসে দলটি। আর বিশ্বকাপে ক্ষুদ্রতম দেশ হিসেবে নকআউট পর্বে জায়গা করে নিয়ে ইতিহাস গড়ে আফ্রিকার ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্রটি। তবে তাদের ইতিহাসের পাতা বা আসরে চমক দেখানো শেষ হয়নি তখনো। রাউন্ড অফ ৩২-এ মেসির আর্জেন্টিনাকেও ৯০ মিনিটে জিততে দেয়নি তারা। ২-২ গোলে ৯০ মিনিট শেষ করে। আর ফুটবল তারকাদের নামগুলো ম্লান করে দিয়ে সবার কাছে রাতারাতি বিখ্যাত হয়ে ওঠেন কেপ ভার্দের গোলরক্ষক, ৪০ বছর বয়সী ভোজিনিয়া। তার অসাধারণ নৈপূণ্যে আর্জেন্টিনার আক্রমণ দিশেহারা হয়ে পড়ে। আটটির বেশি গোল সেভ করেন বাজপাখির মতো। বহুকাল সেই দৃশ্যগুলো চোখে লেগে থাকবে দর্শকদের। যদিও অতিরিক্ত সময়ে কেপ ভার্দেরই আত্মঘাতী গোলে জয় পায় আর্জেন্টিনা। ১২০ মিনিট শেষে ফলাফল ৩-২। হেরে গিয়েও জিতে যায় কোটি কোটি মানুষের হৃদয়। অবিশ্বাস্য কেপ ভার্দে সিক্ত হয় ফুটবল অনুরাগীদের ভালোবাসায়। ৯০ মিনিটে দুইবার পিছিয়ে থেকেও সমতায় ফেরানো লড়াই—ম্যাচ শেষে জিতেও মেসির চোখে-মুখে ছিল কোনোমতে জান বাঁচানোর অভিব্যক্তি।

রাউন্ড অব ৩২-এ আর্জেন্টিনার বিপক্ষে হারলেও সাংবাদিকরা এগিয়ে যাচ্ছিলেন কেপ ভার্দে সমর্থকদের দিকে। কেপ ভার্দের রেপ্লিকা জার্সি পরে পরিবারসহ মাথা উঁচিয়ে মিয়ামি স্টেডিয়াম ত্যাগ করতে থাকা ৬৫ বছর বয়সী প্রিয়েতো ফার্নান্দেস নাম্নী এক সমর্থককে পান সাংবাদিকরা। ফার্নান্দেজ জানান, তিনি ৪৫ বছর আগে আমেরিকায় এসেছিলেন। তখন তার দেশকে কেউ চিনত না। কেউ জানত না কোন মহাদেশে বা মানচিত্রে কোথায় তার দেশ। এতগুলো বছর অপেক্ষার পর নিজ দেশের সুনাম সবার মুখে মুখে দেখে তিনি আবেগে ভাসছিলেন। নিজেও যেন বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। তবে আত্মপরিচয়ের গর্ব তার চেহারায় স্পষ্ট ছিল। কারণ পাশ দিয়ে যাওয়া অন্যান্যরা তাকে অভিনন্দন জানাচ্ছিলেন আর করমর্দন করছিলেন। তার মুখে সন্তুষ্ট হাসি আর দুই চোখে তারার ঝিলিক নিয়ে নিজ দেশটির পর্তুগিজ নাম ব্যবহার করে বলেন, “এখন সারা বিশ্ব কাবো ভার্দে সম্পর্কে জানে—দেশটির নামের উচ্চারণ এটাই, কেপ ভের্দে না।” স্টেডিয়াম থেকে ফার্নান্দেজ ও তার পরিবার এভাবেই মাথা উঁচু করে বেরিয়ে আসেন—করমর্দন আর অভিনন্দনে আপ্লুত হয়ে। “এই মুহূর্তটা যে কত বিশাল, তা আমি ভাষায় প্রকাশ করতে পারব না,” পাশ থেকে মাথা নেড়ে বললেন ফার্নান্দেসের স্ত্রী, ৬০ বছর বয়সী এলিজাবেথ ফার্নান্দেস।

এই আসরে কেপ ভার্দে অভূতপূর্ব কিছু রেকর্ড গড়ে। যেমন, বিশ্বকাপ না জিতেও ৯০ মিনিটে অপরাজিত থাকা দল হিসেবে নাম লেখায় ৩ বারের ফাইনালিস্ট নেদারল্যান্ডসের পাশে। ২০১০ বিশ্বকাপের স্লোভাকিয়ার পর প্রথম অভিষেককারী দল হিসেবে গ্রুপ থেকে নকআউট পর্বে ওঠে। এবং ২০১০ বিশ্বকাপের নিউজিল্যান্ডের পর, প্রথম দল হিসেবে গ্রুপপর্বে তিন ম্যাচ ড্র করে নকআউটে ওঠার বিরল রেকর্ড গড়ে।

২. ভাইরাল পিটিশন

পিটিশন দুটোর কথা উল্লেখ না করলেই নয়। প্রথমত, ‘আর্জেন্টিনা আউট’। এরপর ‘ফাইনালের রিপ্লে’। এর প্রভাবও ভক্তদের মাঝে ব্যাপকভাবে পড়ছে। যে কোনো গুজব বা কন্সপিরেসি থিওরি ব্যাপক বিক্রি হচ্ছে। এমনকি পাশের বাসার আর্জেন্টিনাভক্ত ৮/৯ বছর বয়সী ছেলেটাও সোল্লাসে গতদিন বলছিল, “আব্বু, ফাইনাল আবার হবে, ফেসবুকে দেখছি, তুমিও তাড়াতাড়ি ভোট দাও, এইবার জিতব।”

কাতার বিশ্বকাপ জয়ের পর থেকে পেনাল্টি নিয়ে সমালোচনা ঝড় শুরু হয়। যার চরম পরিণতি দেখা যায় ২০২৬ বিশ্বকাপে। গত আসরের চ্যাম্পিয়ন যে দলটি কোটি কোটি নতুন সমর্থকের ভালোবাসা পেয়েছিল, তারাই এবার সবচেয়ে ঘৃণিত দলে পরিণত হবে—এ তো অঘটনেরও উর্ধ্বে, কল্পনাতীত! বিশ্বকাপ শেষ হয়, বিষয়টি রয়ে যায় আলোচনার কেন্দ্রে। প্রসঙ্গ—আর্জেন্টিনার বিপক্ষে খেলা দলগুলোর অভিযোগ, দলটির প্রতি ফিফার পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ, আর্জেন্টিনার ফাউলের সংখ্যার বিপরীতে রেফারি ও ভিএআর-এর একচোখা নীতির অভিযোগ ও পরিসংখ্যান। এমনকি ফাইনালে স্পেনের প্রতি ফিফার পক্ষপাতিত্বের পালটা অভিযোগও ওঠে। আর আর্জেন্টিনার গোলপোস্টে শূন্য শটের রেকর্ড—কে ভেবেছিল?

ফিফা বিশ্বকাপ-২০২৬ শুরু হয় ১১ জুন ২০২৬, শেষ হয় ১৯ জুলাই ২০২৬। ১০৪টি ম্যাচ। এক মাসের বেশি সময় ও শতাধিক ম্যাচ শেষে বদলে গেছে অনেককিছু। ফিফা র‍্যাংকে দল, আর পরিসংখ্যানে ও জনপ্রিয়তায় খেলোয়াড়দের উত্থান-পতন। এবারের আসরের অন্যতম ফেবারিট দল স্পেন তুলে ধরে বিশ্বকাপ শিরোপা। আর্জেন্টিনাকে অতিরিক্ত সময়ে (১০৬ মিনিটে নিকো উইলিয়ামসের এসিস্টে) ফেরান তোরেসের গোলে ১-০ তে পরাজিত করে। আর দ্বিতীয়বারের মতো চ্যাম্পিয়ন হয় স্প্যানিশরা। তার আগে ১২০ মিনিট। স্পেনের পাস ও পাস—ফাইনালকে কিছুটা বোরিং করে তুললেও—সমালোচনার জন্ম দিয়ে আর্জেন্টিনা সেই উত্তেজনা পুষিয়ে দিয়েছে। তবে নেতিবাচকভাবে। ঘটনাবহুল দীর্ঘ একটা দিন;—রেফারির ঘড়িতে ৯০+৩’, এনজো ফার্নান্দেজের দ্বিতীয় হলুদ কার্ড পরিণত হলো লালকার্ডে। আর্জেন্টিনা পরিণত হলো বাকি সময়ের জন্য ১০ জন। খেলার পরিণতি হলো শেষ বাঁশি—স্পেন ১-০ আর্জেন্টিনা। কিন্তু আর্জেন্টিনার লাল কার্ড দেখা শেষ হলো না। লিয়ান্দ্রো পারেদেস ম্যাচের পর স্পেনের খেলোয়াড়দের প্রতি মেজাজ হারিয়ে সহিংস আচরণ করলে, তিনিও লাল কার্ড দেখেন। সেই লাল কার্ড পরবর্তীতে ফিফা ডেটাবেজ থেকে মুছেও ফেলা হয়। অর্থাৎ ‘তথ্যগত ভুল ছিল’ ব্যাখ্যা দিয়ে পারেদেসের লালকার্ড তুলে নেয়া হয়। এতে বিতর্কের তালিকা শুধু দীর্ঘই হলো।

তবে এর অনেক আগেই বিশ্বকাপ থেকে চিরকালের জন্য ‘আর্জেন্টিনা আউট’ পিটিশনের ঝড় ওঠে গেছে। ফাইনালের পর ভোটের বন্যা শুরু হয়। বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ থেকে আর্জেন্টিনাকে ব্যান করতে চায় ২৩ মিলিয়ন মানুষ। বাংলায় সহজ করলে—২ কোটি ৩০ লাখ স্বাক্ষর। এই কাতারে কাতারে মানুষের পিটিশনে স্বাক্ষর করার উদ্দেশ্য একটাই, আর্জেন্টিনা নামক দলটিকে চিরতরে বহিষ্কার করা। ১৭০টি দেশ থেকে এতে সমর্থনের সংখ্যাও প্রায় গিনেজ বিশ্বরেকর্ড ছুঁয়ে ফেলছিল। আর দশ লাখ ভোট হলেই গিনেজ বিশ্বরেকর্ড।

ফিফা ও রেফারিদের পক্ষ থেকে আর্জেন্টিনাকে ও লিওনেল মেসিকে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ তুলেছিলেন পিটিশনের আয়োজকরা। স্পেনের কাছে ফাইনাল হারের পর তারা “ফিফা আমাদের কথা রাখেনি, কিন্তু স্পেন আমাদের কথা রেখেছে। ধন্যবাদ, স্পেন!”—বার্তা দিয়ে পিটিশনটি বন্ধ করে দেয়।

যদিও এই ধরনের কোনো পিটিশনের কারণে ফিফা সিদ্ধান্ত বদলায় না বা নেয় না, এক কথায় বিবেচনাই করে না, অন্তত কখনো করেনি। তবু পালটা পিটিশন। ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনাল ম্যাচটি পুনরায় খেলানোর দাবিতে এবার আর্জেন্টিনার ফুটবল সমর্থকরা পাল্টা অনলাইন পিটিশন চালু করেছেন, নাম ‘ফাইনাল রিপ্লে’। বিশ্বজুড়ে ফুটবলপ্রেমীদের চালানো ‘আর্জেন্টিনা আউট’ পিটিশনটির জবাবে আর্জেন্টাইন এক সমর্থক জনপ্রিয় মাধ্যম ‘চেঞ্জ ডট অর্গ’-এ এই পিটিশন চালু করেন। এই পিটিশনও ভাইরাল হয়। এখনো চলছে। ইতোমধ্যে প্রায় ১ লাখ ভোট পড়েছে।

‘ফাইনাল রিপ্লে’ পিটিশনের অভিযোগ, ফাইনালে দায়িত্বরত রেফারি স্লাভকো ভিনচিকের সিদ্ধান্তগুলো বিতর্কিত ও দুর্নীতিগ্রস্ত। আর্জেন্টাইন সমর্থকরা মনে করেন, রেফারির পক্ষপাতিত্বের কারণে আর্জেন্টিনা স্পেনের কাছে হেরেছে। এছাড়া, ম্যাচের অতিরিক্ত সময়ে আর্জেন্টিনার মিডফিল্ডার এনজো ফার্নান্দেজকে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড (লাল কার্ড) এবং ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি সংক্রান্ত কিছু সিদ্ধান্তকে তারা অন্যায় বলে দাবি করছেন। মজার ব্যাপার হলো, এই ভোটগুলো মাত্র ৩টি দেশ থেকে পড়ছে—যার ৮০-৮৫% পড়ছে স্বয়ং আর্জেন্টিনা থেকে। বাকি ১৫-২০ হাজার ভোট পড়েছে বাংলাদেশ এবং ভারত থেকে।

৩. প্যারাগুয়ের কাছে বিধ্বস্ত চারবারের বিশ্বজয়ী জার্মানি

Image

কেবল গ্রুপ পর্ব শেষ, রাউন্ড অব-৩২ ম্যাচ। আগের সেই দ্বিতীয় রাউন্ডও না। এবার যার নাম রাউন্ড অব সিক্সটিন। জার্মানি বনাম প্যারাগুয়ে। ৪২ মিনিটে হেডে প্যারাগুয়ের হয়ে লিড এনে দেন জুলিও এনসিসো। জার্মানি ০-১ প্যারাগুয়ে স্কোরবোর্ডে প্রথমার্ধ শেষ হয়। দ্বিতীয়ার্ধ শুরু হলে জার্মানির হয়ে ম্যাচে সমতা ফেরাতে দেরি করেননি কাই হাভার্টজ। ৫৪তম মিনিটে তিনিও হেডের বদলে হেডে গোল করে স্কোরবোর্ডে ব্যালেন্স আনেন। বাকি সময়ে আর জালের দেখা না মিললে, নির্ধারিত নব্বই মিনিট শেষে ১-১ গোলে সমতা বজায় থাকে। যে সমতা অতিরিক্ত ৩০ মিনিটেও ভাঙতে পারেনি কোনো দলই। তাই জার্মানি ১-১ প্যারাগুয়ের স্কোরবোর্ডে সমতা ভাঙতে, ম্যাচের ভাগ্য গড়ায় টাইব্রেকারে। পেনাল্টি শুটআউটে জার্মানি ৩-৪ প্যারাগুয়ে।

ফিফা র‍্যাংকে থাকা ৪১তম দল প্যারাগুয়ে—চারবারের বিশ্বকাপজয়ী জার্মানিকে বিশ্বকাপ থেকে শুধু বিদায়ই করে না, এই ম্যাচ জিতে তারা ফিফা র‍্যাংকে এক লাফে ৭ ধাপ এগিয়ে যায় (৩৪তম বর্তমানে।) অবাক করা বিষয় হলো, দক্ষিণ আমেরিকার বাছাইপর্বে সরাসরি বিশ্বকাপের টিকিট পাওয়া ৬ দলের মধ্যে প্যারাগুয়ে ছিল টেবিলের সর্বশেষ—অর্থাৎ ৬ নম্বর দল। অন্যদিকে ইউরোপীয় বাছাইপর্বের নিয়ম অনুযায়ী, প্রত্যেক গ্রুপ-চ্যাম্পিয়ন সরাসরি বিশ্বকাপের টিকিট পাবে। নাগলসম্যানের জার্মানি গ্রুপ ‘এ’-র টেবিলে—৬ ম্যাচের ৫ জয় ও ১ হারে ১৫ পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপচ্যাম্পিয়ন হয়। অর্থাৎ সরাসরি বিশ্বকাপের টিকিট পায় তারা।

যদিও বাছাইপর্বে জার্মানি প্রথম ম্যাচেই হোঁচট খায় স্লোভাকিয়ার কাছে; ২-০ গোলে হেরে বসে জার্মানি। আর ১১৭ বছরের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো জার্মানরা কোনো প্রতিযোগিতামূলক আসরের ম্যাচে টানা ৩ ম্যাচ হারের রেকর্ড গড়ে বসে। বাকি দুই হার ছিল উয়েফা নেশন্স লিগ-২০২৫—সেমিফাইনালে ১-২ গোলে পর্তুগালের কাছে হারে। এরপর ৩য় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে ০-২ গোলে ফ্রান্সের কাছে হারে।) যাই হোক, বিশ্বকাপ-২০২৬ বাছাইপর্বে প্রথম ম্যাচের প্রভাব আর পড়েনি। বাকি ৫ ম্যাচ টানা জিতে নেয়। শুধু তাই না, ফিরতি ম্যাচে স্লোভাকিয়াকে ৬-০ গোলে হারিয়ে প্রথম ম্যাচের শোধ সুদাসলে তুলে নেয়। এই হচ্ছে বিশ্বকাপে আসার আগে দুই দলের ফর্ম। অথচ বিশ্বকাপে, ১২০ মিনিট শেষে ফলাফল ১-১। যদিও টাইব্রেকার অংশটি ছিল বেশ নাটকীয়। প্রথম ৫ শট শেষে দুই দল ৩-৩ সমতায় থাকে। গ্যালারিতে ন্যয়ারের সেভে জার্মানদের বেদনার ছায়া উল্লাসে পরিণত হয়। তবে অল্প সময়ের জন্যই।

ম্যাচের নায়ক প্যারাগুয়ের গোলরক্ষক অরল্যান্ডো গিল টাইব্রেকারে ২টি দুর্দান্ত সেভ করেন। প্রথম শটেই জার্মানির একমাত্র গোলদাতা কাই হাভার্টজকেই ফিরিয়ে দেন। আরেকটি সেভ করেন নিক ভোল্টমেডের শটটি। তখন স্কোর ৩-২। অর্থাৎ প্যারাগুয়ে পরের পেনাল্টিতে গোল করলে তখনই জিতে যেত ৪-২ ব্যবধানে। কিন্তু নাটকীয়তার শুরু হয় তখন, যখন আন্তোনিও সানাব্রিয়ার শটে বল চলে যায় গোলপোস্টের বাইরে। জার্মানদের উল্লাস একটু করে শুরু হয়, যার পুরো উল্লাস গ্যালারিতে প্রতিধ্বনিত হয় যখন নাটকীয়তার পরের অংশে ৪০ বছর বয়সী ‘সুইপার-কিপার’—বায়ার্ন মিউনিখ ও জার্মান কিংবদন্দি গোলরক্ষক ‘ম্যানুয়েল পিটার ন্যয়ার’ ৫ম পেনাল্টি নিতে আসা ফ্যাবিয়ান বালবুয়েনার শট ঠেকিয়ে দেন। কিন্তু এই রক্ষা শেষরক্ষা হতে পারেনি। সাডেন ডেথে পেনাল্টি নিতে আসেন জোনাথন টাহ। বল পাঠিয়ে দেন গোলপোস্টের অনেক উপর দিয়ে। প্যারাগুয়ের হয়ে যে ভুলটা করেননি হোসে কানালে। ঠাণ্ডা মাথায় ন্যয়ারকে পরাস্ত করেন। স্তব্ধ করে দেন গ্যালারির জার্মান উল্লাস।

প্যারাগুয়ের এই শ্বাসরুদ্ধকর জয় এবারের আসরের অন্যতম অঘটন বলে বিবেচিত। জার্মানির জন্য বিশ্বকাপ ইতিহাসে প্রথম পেনাল্টি শুটআউটে বিদায়। স্পষ্ট করে বললে, এই হারের মাধ্যমে বিশ্বকাপে জার্মানির দীর্ঘ ৫০ বছরের অপরাজিত পেনাল্টি শুটআউটের রেকর্ডের অবসান ঘটল। ১৯৭৬ সালের পর এই প্রথম জার্মানি কোনো বড় টুর্নামেন্টে টাইব্রেকারে হারল। যদিও জার্মানি ২০১৮ ও ২০২২ সালে হতাশাজনকভাবে প্রথম রাউন্ডে বিদায় নিলেও, এই আসরে ইতিহাস ও সম্মান ফিরে পাবার চেষ্টায় বড় স্বপ্ন নিয়েই এসেছিল। দলে তারকা খেলোয়াড়ও ছিল যারা ম্যাচের ভাগ্য বদলাতে পারেন, ক্লাবে ভালো সিজন কাটিয়ে এসেছেন। তাই শেষ ৩২ এর ম্যাচে চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা ফিফা র‍্যাংকের ৪১তম দলের কাছে হেরে বিদায় নেবে—ফুটবল সমর্থকরা ভাবেননি নিশ্চয়ই।

৪. যুক্তরাষ্ট্র–ইরান যুদ্ধের ছায়ায় বিশ্বকাপ

Image

২০২৬ বিশ্বকাপ শুধু মাঠের লড়াইয়ের জন্য নয়, মাঠের বাইরের নানা রাজনৈতিক, সামাজিক ও প্রশাসনিক ঘটনার কারণেও ইতিহাসের অন্যতম বিতর্কিত টুর্নামেন্টে পরিণত হয়। টুর্নামেন্টজুড়ে যুদ্ধ, ভিসা সংকট, পরিবেশগত উদ্বেগ এবং ফাইনালের পর সহিংসতার মতো ঘটনাগুলো বিশ্বজুড়ে আলোচনার জন্ম দেয়।

বিশ্বকাপ চলাকালীন স্বাগতিক দেশ যুক্তরাষ্ট্র এবং অংশগ্রহণকারী দেশ ইরানের মধ্যে সামরিক সংঘাত শুরু হয়। বিশ্বকাপের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো স্বাগতিক দেশ টুর্নামেন্ট চলাকালীন অংশগ্রহণকারী আরেকটি দেশের সঙ্গে সরাসরি সামরিক উত্তেজনায় জড়িয়ে পড়ে। এর ফলে ইরান দলের নিরাপত্তা, সমর্থকদের যাতায়াত এবং ম্যাচ আয়োজন নিয়ে ব্যাপক উদ্বেগ তৈরি হয়। ফিফা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে বিশেষ সংকট ব্যবস্থাপনা সেল গঠন করলেও যুদ্ধের প্রভাব পুরো টুর্নামেন্টজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল।

যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর ভিসা ও ইমিগ্রেশন নীতিও বিশ্বকাপে বড় বিতর্কের জন্ম দেয়। দীর্ঘসূত্রতা, অতিরিক্ত নিরাপত্তা যাচাই এবং বিপুলসংখ্যক আবেদন প্রত্যাখ্যানের কারণে হাজার হাজার বিদেশি সমর্থক সময়মতো যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করতে পারেননি। যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা ও ভ্রমণ-সংক্রান্ত বিধিনিষেধের কারণে ইরানের দল পুরো টুর্নামেন্টজুড়ে মেক্সিকোকে বেস ক্যাম্প হিসেবে ব্যবহার করে। যুক্তরাষ্ট্রে ম্যাচ খেলতে তারা চার্টার ফ্লাইটে যেত এবং ম্যাচ শেষ হওয়ার পর আবার মেক্সিকোতে ফিরে আসত। এতে অন্যান্য দলের তুলনায় তাদের প্রস্তুতি ও বিশ্রাম ব্যাহত হওয়ার অভিযোগ ওঠে। ইরানের খেলোয়াড় ও প্রয়োজনীয় কোচিং স্টাফ ভিসা পেলেও, কয়েকজন কর্মকর্তা ও সাপোর্ট স্টাফ ভিসা পাননি।

যুক্তরাষ্ট্রে দীর্ঘ সময় অবস্থানের অনুমতি না থাকায়, ম্যাচ শেষে দলকে আবার মেক্সিকোতে ফিরে যেতে হতো, এরপর পরবর্তী ম্যাচের আগে আবার যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করতে হতো। এই ব্যবস্থাকে ইরান ফুটবল ফেডারেশন বৈষম্যমূলক বলে অভিযোগ করে এবং ফিফার কাছে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ করে।

৫. হালান্ডের কাছে অসহায় পাঁচবারের বিশ্বজয়ী ব্রাজিল

Image

জার্মানি রাউন্ড অব ৩২ ম্যাচে হেরে চূড়ান্ত হতাশ করে আসছে জার্মানভক্তদের। বিশেষ করে যারা ২০১৪ সালের জার্মানির খেলা দেখে মুগ্ধ হয়েছিল। কিন্তু এরপর বিশ্বকাপ যেন তাদের জন্য অপমানের ঋতু হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রথম রাউন্ডে বাদ না হলেও ব্রাজিলের অবস্থাও অনেকটা একইরকম। কারণ, এরাই একমাত্র দল, যাদের কাছে সর্বনিম্ন প্রত্যাশা বলতেও—আসরের ট্রফি।

যদিও এবার সেলেসাওরা ফেবারিট হিসেবে আসেনি। তবু ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের অন্যতম বড় অঘটন হিসেবেই বিবেচিত হবে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের অকাল-বিদায়। ব্রাজিলকে ২-১ গোলে হারিয়ে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠে নরওয়ে। ম্যাচের শুরু থেকেই ব্রাজিল আক্রমণাত্মক ফুটবল খেললেও সুযোগ কাজে লাগাতে ব্যর্থ হয়। প্রথমার্ধে ব্রুনো গিমারায়েস একটি পেনাল্টি নষ্ট করেন, যা ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার অন্যতম মুহূর্ত হয়ে দাঁড়ায়। দ্বিতীয়ার্ধে নরওয়ের কোচ স্তোলে সলবাক্কেনের কৌশলগত পরিবর্তন ম্যাচের চিত্র বদলে দেয়। বদলি খেলোয়াড় আন্দ্রেয়াস শেলদেরুপ নেমে দুইবারই নিখুঁত অ্যাসিস্ট করেন, আর সেই সুযোগে হাল্যান্ড ৭৯তম ও ৯০তম মিনিটে দুটি গোল করে ব্রাজিলকে স্তব্ধ করে দেন। প্রথমটি ছিল শক্তিশালী হেড, আর দ্বিতীয়টি দূরপাল্লার দুর্দান্ত শট। যোগ করা সময়ে নেইমার পেনাল্টি থেকে একটি গোল শোধ করলেও ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। শেষ বাঁশি বাজতেই নরওয়ের খেলোয়াড় ও সমর্থকদের উল্লাসে মুখর হয়ে ওঠে স্টেডিয়াম।

এই জয়ের মাধ্যমে নরওয়ে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে জায়গা নিশ্চিত করে। একই সঙ্গে টুর্নামেন্টে হাল্যান্ডের গোলসংখ্যা আরও বাড়ে এবং তিনি গোল্ডেন বুটের দৌড়ে শীর্ষে উঠে আসেন। অন্যদিকে, ব্রাজিলের জন্য এটি ছিল আরেকটি তিক্ত নকআউট বিদায়। ২০০২ সালের পরও বিশ্বকাপ শিরোপার অপেক্ষা দীর্ঘায়িত হলো। আর ধারাবাহিকভাবে নকআউট পর্বে হতাশাজনক বিদায়ের তালিকায় যুক্ত হলো আরও এক অধ্যায়।

৬. ডোনাল্ড ট্রাম্পের “ফিফা পিস প্রাইজ”

Image

২০২৬ বিশ্বকাপ শুরুর আগেই ফুটবলের বাইরে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি ছিল “FIFA Peace Prize – Football Unites the World” পুরস্কার প্রদান। ২০২৫ সালের ৫ ডিসেম্বর বিশ্বকাপের ড্র অনুষ্ঠানে ফিফা সভাপতি জিয়ানি ইনফান্তিনো প্রথমবারের মতো এই বিশেষ সম্মাননা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হাতে তুলে দেন।

ফিফার ভাষ্য ছিল, বিশ্বকাপ আয়োজন, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং ফুটবলের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের মধ্যে সংলাপ ও ঐক্য জোরদারে ভূমিকা রাখার স্বীকৃতিস্বরূপ এই পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। তবে পুরস্কার ঘোষণার পরই বিতর্কের ঝড় ওঠে। সমালোচকদের অভিযোগ, এই সম্মাননা ফিফা কাউন্সিলের আনুষ্ঠানিক ভোট বা অনুমোদন ছাড়াই ইনফান্তিনোর একক সিদ্ধান্তে দেওয়া হয়েছে। ফলে ফিফার প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন দেখা দেয়।

ইউরোপের কয়েকজন আইনপ্রণেতা এবং ক্রীড়া প্রশাসন বিশেষজ্ঞ এ ঘটনার স্বাধীন তদন্তের দাবি জানান। তাদের মতে, এত গুরুত্বপূর্ণ একটি আন্তর্জাতিক সম্মাননা যদি নির্ধারিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে দেওয়া হয়ে থাকে, তবে সেটি ফিফার সুশাসন ও জবাবদিহির নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এ ঘটনায় ফুটবল মহলেও মতভেদ তৈরি হয়। একপক্ষের দাবি ছিল, বিশ্বকাপ আয়োজনের মতো বৈশ্বিক উদ্যোগে রাজনৈতিক নেতৃত্বের ইতিবাচক ভূমিকা স্বীকৃতি পেতে পারে। অন্যদিকে সমালোচকদের মতে, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে এমন সম্মাননা প্রদান করলে ফিফার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে এবং ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক ফুটবল প্রশাসনে রাজনৈতিক প্রভাব আরও বাড়তে পারে।

৭. বালোগুনের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার: রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের নজিরবিহীন বিতর্ক

Image

২০২৬ বিশ্বকাপের সবচেয়ে বিতর্কিত ঘটনাগুলোর একটি ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্রাইকার ফোলারিন বালোগুনের রেড কার্ডের শাস্তি প্রত্যাহার। ঘটনাটি শুধু ফুটবল নয়, আন্তর্জাতিক ক্রীড়া প্রশাসন ও রাজনীতির সম্পর্ক নিয়েও তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি করে।

রাউন্ড অব ৩২-এ বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার বিপক্ষে ম্যাচে বালোগুন সরাসরি লাল কার্ড দেখেন। ফিফার শৃঙ্খলা বিধি অনুযায়ী, এমন রেড কার্ডের শাস্তি হিসেবে তিনি স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরবর্তী এক ম্যাচের জন্য নিষিদ্ধ হন। সে অনুযায়ী রাউন্ড অব ১৬-তে বেলজিয়ামের বিপক্ষে তার খেলার কথা ছিল না।

কিন্তু ম্যাচের আগে নাটকীয় মোড় নেয় পরিস্থিতি। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরাসরি হস্তক্ষেপ ও ফোনালাপের পর ফিফা শৃঙ্খলা কমিটি বালোগুনের এক ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে। ফলে তিনি বেলজিয়ামের বিপক্ষে মাঠে নামার অনুমতি পান। এই সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে বিশ্ব ফুটবলে ব্যাপক বিতর্ক শুরু হয়। সমালোচকদের অভিযোগ, রাজনৈতিক চাপের মুখে ফিফা নিজেদের নিয়ম থেকে সরে এসেছে এবং একই ধরনের ঘটনায় অন্য দেশগুলোর খেলোয়াড়দের ক্ষেত্রে যে মানদণ্ড প্রয়োগ করা হয়, এখানে তা অনুসরণ করা হয়নি। যদিও বালোগুন খেলতে পেরেছিলেন, তাতে যুক্তরাষ্ট্রের ভাগ্য বদলায়নি। রাউন্ড অব ১৬-এ বেলজিয়ামের কাছে ৪-১ গোলে হেরে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নেয় স্বাগতিকদের অন্যতম দল।

ঘটনার পর নরওয়ে ফুটবল ফেডারেশনসহ কয়েকটি জাতীয় ফুটবল সংস্থা আনুষ্ঠানিকভাবে নৈতিক ও প্রশাসনিক প্রশ্ন তোলে। তাদের বক্তব্য ছিল, কোনো রাজনৈতিক নেতার হস্তক্ষেপে যদি শাস্তির সিদ্ধান্ত পরিবর্তন হয়, তাহলে ফুটবলের শৃঙ্খলা ব্যবস্থা ও প্রতিযোগিতার নিরপেক্ষতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

উয়েফা আরও কঠোর ভাষায় প্রতিক্রিয়া জানায়। ইউরোপীয় ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি ঘটনাটিকে "লাল রেখা অতিক্রম" (crossing a red line) বলে আখ্যা দেয়। উয়েফার মতে, আন্তর্জাতিক ফুটবলের বিশ্বাসযোগ্যতা রক্ষা করতে হলে শৃঙ্খলাজনিত সিদ্ধান্তকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখা অপরিহার্য। বিশ্লেষকদের মতে, বালোগুনের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের ঘটনাটি ২০২৬ বিশ্বকাপের অন্যতম বড় প্রশাসনিক বিতর্ক হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছে। এটি ভবিষ্যতে ফিফার স্বাধীনতা, শৃঙ্খলা কমিটির স্বচ্ছতা এবং রাজনৈতিক প্রভাব থেকে আন্তর্জাতিক ক্রীড়া সংস্থাগুলোকে মুক্ত রাখার প্রশ্নে নতুন করে আলোচনা ও সংস্কারের দাবি জোরালো করে।

৮. ডিআর কঙ্গোর সামনে পর্তুগালের হোঁচট

Image

২০২৬ বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের সবচেয়ে আলোচিত ম্যাচগুলোর একটি ছিল পর্তুগাল বনাম ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো (ডিআর কঙ্গো)। কাগজে-কলমে শক্তির বিচারে পর্তুগাল ছিল স্পষ্ট ফেভারিট। একদিকে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো, রাফায়েল লেয়াও, ব্রুনো ফার্নান্দেজ, ভিটিনহা ও রুবেন দিয়াসদের তারকাখচিত দল, অন্যদিকে প্রথমবার বিশ্বকাপে আলোচনায় আসা ডিআর কঙ্গো। কিন্তু মাঠের লড়াই ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।

ডিআর কঙ্গো শুরু থেকেই নির্ভীক ফুটবল খেলে পর্তুগালকে চাপে ফেলে। তাদের উচ্চ-গতির প্রেসিং, দ্রুত পাল্টা আক্রমণ এবং শারীরিক সক্ষমতা পর্তুগিজ ডিফেন্সকে বারবার সমস্যায় ফেলে। ম্যাচের প্রথমার্ধে কয়েকটি পরিষ্কার গোলের সুযোগও তৈরি করে আফ্রিকার প্রতিনিধিরা।

পর্তুগাল অবশ্য বলের দখলে এগিয়ে ছিল, কিন্তু আক্রমণে ছিল অস্বাভাবিক অগোছালো। মাঝমাঠে ব্রুনো ফার্নান্দেজ ও ভিটিনহা নিজেদের স্বাভাবিক ছন্দে খেলতে পারেননি। রোনালদোকে একাধিকবার কঠোর মার্কিংয়ের মুখে পড়তে হয়, ফলে তিনি খুব বেশি প্রভাব ফেলতে পারেননি।

দ্বিতীয়ার্ধে ম্যাচের গতি আরও বাড়ে। ডিআর কঙ্গো সমতায় ফেরার কিংবা এগিয়ে যাওয়ার কয়েকটি দুর্দান্ত সুযোগ তৈরি করলেও শেষ মুহূর্তে ফিনিশিংয়ের অভাব এবং পর্তুগিজ গোলরক্ষকের গুরুত্বপূর্ণ সেভ তাদের হতাশ করে। শেষ পর্যন্ত পর্তুগাল ২-১ গোলের কঠিন জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে, কিন্তু স্কোরলাইন ম্যাচের প্রকৃত চিত্র পুরোপুরি তুলে ধরতে পারেনি। এই ম্যাচটি প্রমাণ করে, বিশ্বকাপের মতো মঞ্চে শুধু তারকাসমৃদ্ধ স্কোয়াড থাকলেই জয় নিশ্চিত হয় না। ডিআর কঙ্গো তাদের সাহসী ও সংগঠিত পারফরম্যান্স দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে র‌্যাঙ্কিংয়ের ব্যবধান মাঠে সবসময় প্রতিফলিত হয় না। যদিও তারা শেষ পর্যন্ত হেরে যায়, তবুও তাদের লড়াকু ফুটবল সমর্থক ও বিশ্লেষকদের প্রশংসা কুড়ায়।

পর্তুগালের জন্যও এই ম্যাচ ছিল একটি সতর্কবার্তা। গ্রুপ পর্বে জয় পেলেও তাদের রক্ষণভাগের দুর্বলতা ও সুযোগ নষ্ট করার প্রবণতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। পরে রাউন্ড অব ১৬-এ স্পেনের কাছে ১-০ গোলে হেরে বিদায় নেওয়ার পেছনে এই দুর্বলতাগুলোও বড় কারণ হিসেবে দেখা হয়।

৯. ভিএআর, রেফারি ও নতুন নিয়মের বিতর্ক

Image

২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপজুড়ে মাঠের খেলার পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি আলোচিত বিষয়গুলোর একটি ছিল ভিএআর, রেফারিং এবং ফিফার নতুন কিছু নিয়ম। একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে রেফারিদের সিদ্ধান্ত নিয়ে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়, যা খেলোয়াড়, কোচ, সমর্থক এবং ফুটবল বিশ্লেষকদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনার জন্ম দেয়।

টুর্নামেন্টের বেশ কয়েকটি ম্যাচে ভিএআরের হস্তক্ষেপ বা হস্তক্ষেপ না করা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। আর্জেন্টিনা বনাম মিশর ম্যাচে সম্ভাব্য পেনাল্টি ও অফসাইড সিদ্ধান্ত নিয়ে মিশরীয় শিবির ক্ষোভ প্রকাশ করে। তাদের অভিযোগ ছিল, একই ধরনের ঘটনায় ভিএআর ভিন্ন মানদণ্ড প্রয়োগ করেছে। পর্তুগাল বনাম ক্রোয়েশিয়া ম্যাচে একটি গোলের আগে সম্ভাব্য ফাউল এবং পেনাল্টির দাবি উপেক্ষা করা নিয়ে তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি হয়। ম্যাচ শেষে উভয় দলের খেলোয়াড় ও কোচরা রেফারিং নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। জার্মানি বনাম প্যারাগুয়ে ম্যাচেও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত—বিশেষ করে পেনাল্টি শুটআউটের আগে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো—নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনা হয়। ফলে অনেক সাবেক রেফারি ও ফুটবল বিশেষজ্ঞ প্রশ্ন তোলেন, ভিএআর প্রযুক্তি থাকা সত্ত্বেও কেন একই ধরনের ঘটনায় ভিন্ন ভিন্ন সিদ্ধান্ত দেখা যাচ্ছে।

খেলোয়াড়দের আচরণ নিয়ন্ত্রণে বিশ্বকাপে ফিফা একটি নতুন নিয়ম কঠোরভাবে প্রয়োগ করে। কোনো খেলোয়াড় যদি রেফারির সঙ্গে কথা বলার সময় জার্সি, হাত বা অন্য কোনোভাবে নিজের মুখ ঢেকে যোগাযোগ করেন, তাহলে সেটিকে অসদাচরণ হিসেবে গণ্য করা হয় এবং সরাসরি লাল কার্ড দেখানোর বিধান কার্যকর করা হয়। এই নিয়মে প্রথম শাস্তি পাওয়া খেলোয়াড় ছিলেন প্যারাগুয়ের মিগেল আলমিরন। একটি ম্যাচে রেফারির সঙ্গে মুখ ঢেকে কথা বলার কারণে তিনি সরাসরি লাল কার্ড দেখেন। ঘটনাটি বিশ্বজুড়ে আলোচনার জন্ম দেয়। ফিফার ব্যাখ্যা ছিল, মুখ ঢেকে কথা বললে রেফারির সঙ্গে কথোপকথনের স্বচ্ছতা নষ্ট হয় এবং গোপন বা অপমানজনক মন্তব্যের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে সমালোচকদের মতে, নিয়মটি অত্যন্ত কঠোর এবং অনেক ক্ষেত্রে পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনা না করেই প্রয়োগ করা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর গ্রীষ্মকালীন তীব্র তাপদাহের কারণে বেশ কয়েকটি ম্যাচে খেলোয়াড়দের নিরাপত্তার স্বার্থে হাইড্রেশন ব্রেক চালু রাখা হয়। নির্দিষ্ট সময় পর খেলা থামিয়ে খেলোয়াড়দের পানি পান ও শরীর ঠান্ডা করার সুযোগ দেওয়া হয়। কিন্তু এই বিরতিগুলো সম্প্রচারকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপন প্রচারের জন্য ব্যবহার করতে শুরু করলে নতুন বিতর্কের সৃষ্টি হয়। অনেক সমর্থকের অভিযোগ ছিল, খেলোয়াড়দের স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য দেওয়া বিরতিকে অতিরিক্ত বিজ্ঞাপন দেখানোর সুযোগে পরিণত করা হয়েছে। স্টেডিয়ামে উপস্থিত দর্শকেরা একাধিক ম্যাচে এ নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও অনেক ফুটবলপ্রেমী অভিযোগ করেন, এতে ম্যাচের গতি ও আবেগ নষ্ট হচ্ছে এবং খেলার চেয়ে বাণিজ্যিক স্বার্থকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

সব মিলিয়ে, ২০২৬ বিশ্বকাপে ভিএআর বিতর্ক, রেফারিং নিয়ে প্রশ্ন, নতুন আচরণবিধির কঠোর প্রয়োগ এবং হাইড্রেশন ব্রেককে কেন্দ্র করে বাণিজ্যিক ব্যবহার—এসব বিষয় মাঠের পারফরম্যান্সের বাইরে টুর্নামেন্টের অন্যতম আলোচিত ইস্যু হয়ে ওঠে।

১০. টিকিটের আকাশছোঁয়া দাম ও খালি আসন

Image

২০২৫ সালের ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপের সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি ছিল টিকিটের অস্বাভাবিক মূল্য। ফিফা ও তাদের টিকিট বিক্রয় অংশীদার ডায়নামিক প্রাইসিং পদ্ধতি ব্যবহার করায় চাহিদা অনুযায়ী টিকিটের দাম বারবার পরিবর্তিত হয়। ফলে ফাইনালের কিছু প্রিমিয়াম আসনের মূল্য প্রায় ১১,০০০ মার্কিন ডলার পর্যন্ত পৌঁছে যায়, যা সাধারণ ফুটবল সমর্থকদের নাগালের অনেক বাইরে ছিল।

অন্যদিকে, চাহিদা কম থাকলে অনেক ম্যাচের টিকিটের দাম ম্যাচের দিন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে নাটকীয়ভাবে কমিয়ে দেওয়া হয়। এতে যারা আগে বেশি দামে টিকিট কিনেছিলেন, তারা ক্ষোভ প্রকাশ করেন। অনেক সমর্থকের অভিযোগ ছিল, একই ধরনের আসনের জন্য কেউ কয়েকশ ডলার বেশি দিয়েছেন, আবার কেউ শেষ মুহূর্তে অনেক কম দামে একই টিকিট পেয়েছেন। এই মূল্যনীতির প্রভাব মাঠেও স্পষ্টভাবে দেখা যায়। গ্রুপ পর্ব ও নকআউটের বেশ কয়েকটি ম্যাচে গ্যালারির উল্লেখযোগ্য অংশ ফাঁকা ছিল। বিশেষ করে বড় ক্লাব না থাকা ম্যাচগুলোতে হাজার হাজার আসন খালি পড়ে থাকতে দেখা যায়, যা টেলিভিশন সম্প্রচারেও স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে। সমালোচকদের মতে, অতিরিক্ত মূল্য নির্ধারণই দর্শকসংখ্যা কমে যাওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ।

বিতর্ক এতটাই বাড়ে যে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক, নিউ জার্সি, ক্যালিফোর্নিয়া এবং টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের অ্যাটর্নি জেনারেলরা টিকিট বিক্রির পদ্ধতি, মূল্য নির্ধারণ এবং ভোক্তাদের সঙ্গে সম্ভাব্য অন্যায্য আচরণের অভিযোগ খতিয়ে দেখতে তদন্ত শুরু করেন। তদন্তে বিশেষভাবে ডায়নামিক প্রাইসিংয়ের স্বচ্ছতা এবং ক্রেতাদের যথাযথ তথ্য দেওয়া হয়েছিল কি না, তা গুরুত্ব পায়। এমনকি তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও প্রকাশ্যে টিকিটের মূল্য নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, ফুটবলকে আরও জনপ্রিয় করতে চাইলে সাধারণ দর্শকদের জন্য টিকিটের দাম যুক্তিসংগত রাখতে হবে। তাঁর মন্তব্যের পর বিষয়টি আরও বেশি রাজনৈতিক ও জনআলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে।

বিশ্লেষকদের মতে, ক্লাব বিশ্বকাপের মতো বৈশ্বিক আসরে সর্বোচ্চ মুনাফার লক্ষ্য নিয়ে অতিরিক্ত মূল্য নির্ধারণ করলে স্বল্পমেয়াদে আয় বাড়তে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে দর্শকদের আগ্রহ, স্টেডিয়ামের পরিবেশ এবং টুর্নামেন্টের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই ভবিষ্যতের বড় টুর্নামেন্ট—বিশেষ করে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ—সামনে রেখে টিকিট মূল্য নির্ধারণে আরও ভারসাম্যপূর্ণ ও স্বচ্ছ নীতি গ্রহণের দাবি জোরালো হয়েছে।

অন্যান্য উল্লেখযোগ্য অঘটন বা ঘটন

নিউজিল্যান্ড ২-২ ইরান (গ্রুপ): সবচেয়ে নিম্ন র‍্যাঙ্কের দল ইরানের সঙ্গে ড্র । অস্ট্রেলিয়া ২-০ তুরস্ক (গ্রুপ): নেস্টরি ইরাঙ্কুন্ডা ও কনার মেটকাল্ফের গোলে তুরস্কের ২৪ বছর পর ফেরার ম্যাচ নষ্ট। ঘানা গ্রুপ থেকে নকআউটে ওঠে (নিম্ন র‍্যাঙ্ক সত্ত্বেও)। আর্জেন্টিনার মিশরের বিপক্ষে নাটকীয় কামব্যাক। রাউন্ড অফ ১৬: আর্জেন্টিনা ৩-২ মিশর। মিশর ২-০ এগিয়ে যায় (ইয়াসের ইব্রাহিম ও মোস্তাফা জিকো)। মেসির পেনাল্টি মিস। পরে রোমেরো, মেসি ও এনজো ফার্নান্দেজের গোলে ৩-২ জয়।

বিশ্বকাপ শেষ হয়। উঠে আসে সদ্য রিয়াল মাদ্রিদে যোগ দেয়া লেফট-ব্যাক মার্ক কুকুরেয়ার আবেগপ্রবণ গল্প। বার্সেলোনার গাভি ও পিএসজির ফাবিয়ান রুইজকে সম্মানস্বরূপ সমান-ওজনের টমেটো উপহার দেয়ার গল্প। রদ্রির রিয়াল মাদ্রিদে যাবার গুঞ্জন, মার্কেট ভ্যালু ও ইঞ্জুরির অস্ত্রোপচার আর ২য় ব্যালন ডি’অর জেতার সম্ভাবনার গুঞ্জনও।

রনক জামান

রনক জামান

খেলাধুলার সব খবর ও বিশ্লেষণ সবার আগে পেতে চোখ রাখুন খেলারদেশে।

মন্তব্যসমূহ (0)

মন্তব্য করতে এবং আলোচনায় অংশ নিতে আপনার গুগল অ্যাকাউন্ট দিয়ে লগইন করুন।