সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ
সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের নাম এতবার পরিবর্তন কেন?
সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের মূল নামে এত পরিবর্তন কেন, ‘টেকনো' প্রসঙ্গ ও অন্যান্য

সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের নাম এতবার পরিবর্তন কেন?
দক্ষিণ এশিয়ান ফুটবল ফেডারেশন চ্যাম্পিয়নশিপ বা সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ—মানুষের মুখে প্রচলিত এই নাম তো সবারই জানা। কিন্তু এই আসরের পূর্বনাম কী ছিল? ২০০৩ সালে বাংলাদেশ প্রথম ও শেষবার যখন এই ট্রফি জেতে তখনকার নাম মনে আছে? নামটি এই পর্যন্ত কতবার বদলানো হয়েছে?
“সাফ গোল্ড কাপ” নামেই চিনত ২০০৩ সালে অনুষ্ঠিত এই সাফ টুর্নামেন্টকে। কারণ, ১৯৯৭ সাল থেকে এটাই ছিল দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বড় আসরটির নাম। যারও আদিনাম রয়েছে, “সার্ক গোল্ড কাপ”—১৯৯৩ সালে আত্মপ্রকাশ করে দক্ষিণ এশীয় ফুটবলে শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের মঞ্চ। যদিও বাংলাদেশ সেই আসরে অংশ নেয়নি। আর দুইদফা নাম পরিবর্তনের পর ২০০৮ সালে তৃতীয়বারের মতো ‘সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ’ নামে স্থায়ী হলেও—আগের-পরের আসরগুলোর শিরোপার মর্যাদা কিন্তু একটুও কমে যায় না। কিন্তু ফুটবল আসরটির মূল নাম কেন তিনবার পরিবর্তন করা হলো?
এর পেছনে মূলত টুর্নামেন্টের পরিচয় ও আয়োজক সংস্থার পরিবর্তন কাজ করেছে। বিস্তারিত বললে—
- সার্ক গোল্ড কাপ: ১৯৯৩ থেকে ১৯৯৫ পর্যন্ত এই নাম ছিল। নামের কারণ, এই প্রতিযোগিতায় শুধু সার্কভুক্ত দেশগুলো অংশ নিতো। ফলে টুর্নামেন্টটি শুরুই হয় দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক জোট সার্কের (SAARC) নাম ব্যবহার করে।
- সাফ গোল্ড কাপ (১৯৯৭–২০০৫): ততদিনে দক্ষিণ এশিয়ার ফুটবলের জন্য আলাদা সংস্থা হিসেবে সাউথ এশিয়ান ফুটবল ফেডারেশন (SAFF) গঠিত হয়ে গেছে। ফলে টুর্নামেন্টটি সার্কের পরিবর্তে সাফের অধীনে চলে আসে। নামের পরিবর্তন তারই প্রথম ধাপ।
- সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ (২০০৮–বর্তমান): ২০০৮ সালে ‘গোল্ড কাপ’ শব্দটি বাদ দিয়ে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ নাম গ্রহণ করে। উদ্দেশ্য, টুর্নামেন্টকে আরও আধুনিক ও আন্তর্জাতিক মানের ব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। এবং অন্যান্য মহাদেশীয় প্রতিযোগিতা, যেমন—এএফসি এশিয়ান কাপ, আসিয়ান (ASEAN) চ্যাম্পিয়নশিপ, পশ্চিম এশীয় ফুটবল ফেডারেশন চ্যাম্পিয়নশিপ, দক্ষিণ আমেরিকা ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপ (কোপা আমেরিকা), ওএফসি পুরুষ নেশন্স কাপ চ্যাম্পিয়নশিপ, উয়েফা ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপের নামকরণের সঙ্গে সামঞ্জস্য আনা।

২০০৩ সাফ ফুটবল চ্যাম্পিয়ন বাংলাদেশ
মূলত যে প্রসঙ্গে যেতে চাইছি। বর্তমানে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ হিসেবে বিখ্যত হলেও কাগজে কলমে এবারের আসরের নাম, ‘২০২৬ টেকনো সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ’।
২০২৬ ‘টেকনো’ সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ কেন?
বস্তুত, ‘২০২৬ টেকনো সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ’ নামটি ব্যবহার করার কারণ, এই আসরটির টাইটেল স্পন্সর ‘টেকনো মোবাইল’। টুর্নামেন্টের স্বত্ব কিনে নেবার মাধ্যমে নিজের বাণিজ্যিক প্রচারণার অংশ হিসেবে সারাবিশ্বেই নিজ কোম্পানি ব্র্যান্ডের নাম জুড়ে দেয়া হয়। তা হোক টুর্নামেন্ট, স্টেডিয়াম, ফুটবল ক্লাব ও যেখানেই সম্ভব।
যেমন, বার্সেলোনার স্টেডিয়াম ‘ক্যাম্প ন্যু’—একনামে সবাই জানেন। অথচ ২০২২ সাল থেকে এই স্টেডিয়ামের আস্ত নাম ‘স্পটিফাই ক্যাম্প ন্যু’। স্পন্সরশিপ চুক্তিতে একইভাবে ২০২৬ সাফ আসরের নামেও ‘টেকনো’ থাকবে।
অতীতেও সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে বিভিন্ন স্পন্সর কাগজে কলমে টুর্নামেন্টের নামের সঙ্গে যুক্ত ছিল। যেমন- ব্রিস্টল সার্ক গোল্ড কাপ (১৯৯৫), সাফ কোকা-কোলা কাপ (১৯৯৯), কারবন সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ (২০১১), সুজুকি সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ (২০১৫–২০১৮), ওরেডু সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ (২০২১), বঙ্গবন্ধু সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ (২০২৩)।

ফিফার পার্টনার (স্পন্সর) না হয়েও কি সাফের স্পন্সর হতে পারে ‘টেকনো’?
টেকনো সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের টাইটেল স্পন্সর বিষয়ে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ফিফার নেই। সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে টেকনো টাইটেল স্পন্সর হওয়ার সিদ্ধান্ত মূলত সাফের বাণিজ্যিক অধিকার। কিন্তু যদি কোনো স্পন্সরশিপ চুক্তি ফিফার গঠনতন্ত্র, নৈতিকতা বিধিমালা, বাণিজ্যিক বিধি বা আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়, তাহলে ফিফা সাফকে তা পরিবর্তন বা বাতিলের নির্দেশ দিতে পারে। অর্থাৎ টেকনো স্পন্সর থাকবে কি না, সেটা সাধারণ অবস্থায় সাফের সিদ্ধান্ত; তবে ফিফার নিয়ম লঙ্ঘিত হলে ফিফা হস্তক্ষেপ করার ক্ষমতা রাখে।
এক কথায়, ফিফা বা এএফসি কাপের স্পন্সর নিয়ে ফিফার এখতিয়ার থাকলেও, সাফ যেহেতু আঞ্চলিক প্রতিযোগিতা, তাই স্পন্সর সম্পর্কিত সিদ্ধান্তের সম্পূর্ণ অধিকার সাফের।
টাইটেল স্পন্সর হিসেবে টেকনোর ভূমিকা মূলত অর্থায়ন, ব্র্যান্ডিং, বিজ্ঞাপন এবং চুক্তিতে নির্ধারিত বাণিজ্যিক সুবিধার মধ্যে সীমাবদ্ধ। অন্যদিকে, টুর্নামেন্টের সূচি, অংশগ্রহণকারী দল, ফরম্যাট, শৃঙ্খলা ও অন্যান্য পরিচালনাগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সম্পূর্ণ ক্ষমতা থাকে সাফ-এর হাতে।
স্পন্সরশিপে পাওয়া টাকা কোথায় কোথায় ব্যয় হবে?
তার আগে প্রশ্ন, ‘টেকনো মোবাইল’ টাইটেল স্পন্সর কত টাকা দিচ্ছে? এর উত্তর এখনো জানা যায়নি। টাকার অঙ্ক সাফ অথবা বাফুফে প্রকাশ করেনি।
সাধারণত এ ধরনের টাইটেল স্পন্সরশিপের অর্থ টুর্নামেন্ট পরিচালনা ও উন্নয়নের বিভিন্ন খাতে ব্যয় করা হয়। সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের বিপণন ও বাণিজ্যিক স্বত্বও বর্তমানে স্পোর্টফাইভ পরিচালনা করছে। স্পোর্টফাইভের কাজ হচ্ছে স্পন্সর সংগ্রহ করে টুর্নামেন্টের আয় বাড়ানো। সাধারণত এই অর্থ ব্যয় হয় প্রাইজমানি হিসেবে। চ্যাম্পিয়ন ও রানার্স-আপের পুরস্কার, প্লেয়ার অব দ্যা ম্যাচ বা প্লেয়ার অব দ্যা টুর্নামেন্টের পুরস্কার হিসেবে। এছাড়া টুর্নামেন্ট আয়োজনের খরচের বড় উৎসই স্পন্সরের টাকা। স্টেডিয়ামের উন্নয়ন, নিরাপত্তা, ম্যাচ পরিচালনার খরচ, ম্যাচ কর্মকর্তা ও রেফারিদের পারিশ্রমিক; সম্প্রচার, বিপণন, প্রচারণা আর প্রযুক্তির উন্নয়নে ব্যয় হয়। প্রযুক্তির মধ্যে বলের সেন্সর, রেফারিদের ইলেকট্রনিক ডিভাইস, উঁচুমানের ক্যামেরাসমূহ এবং বর্তমানে আলোচিত ভিডিও অ্যাসিস্টেন্ট রেফারি (VAR) প্রযুক্তির উন্নয়ন।
এছাড়াও আসরের প্রথম রাউন্ডে পয়েন্টশূন্য হয়ে, বিশাল ব্যবধানে পরাজিত হয়ে বাদ পড়লেও, অংশগ্রহণকারী দল হিসেবে প্রতিটি দল এই টাকার একটা অংশ পাবে। এই অংশের ভেতরে পড়বে—তাদের সবরকম যাতায়াত, থাকা-খাওয়া, নিরাপত্তা ও লজিস্টিক সহায়তা। অর্থাৎ খেলোয়াড়দের মাঠে নামার আগে এবং ম্যাচ শেষে যাতে কোনো সাংগঠনিক সমস্যা না হয়, সেটা আগাগোড়া নিশ্চিত করার পেছনের যাবতীয় খরচ। এবারের বিশ্বকাপে ইরানের অভিযোগের কারণে অনেকেই ‘লজিস্টিক সহায়তা’ কথাটি শুনে থাকবেন। এই সহায়তার মধ্যে একটা দলের অনুশীলন সরঞ্জাম, মাঠ, চিকিৎসা, নিরাপত্তা ও প্রটোকল ব্যবস্থা। দলের খেলোয়াড়দের বাইরেও কোচিং স্টাফ, কর্মকর্তা, এমনকি বাবুর্চির জন্য টুর্নামেন্ট চলাকালে প্রয়োজনীয় জিনিসের নিশ্চয়তা প্রদান করা। এছাড়া ভাষাগত সমস্যা সমাধানে দ্বিভাষী বা অনুবাদক, মিডিয়া, ইন্টারনেট ও নিজ দেশে যোগাযোগ সংক্রান্ত যত সহায়তা—তা প্রদান করা।
তবে প্রতিটি টুর্নামেন্টে সব খরচ আয়োজক বহন করে না। কিছু খরচ দলগুলোকেই বহন করতে হয়। আন্তর্জাতিক বিমান ভাড়া যেমন। এই খরচ সচরাচর নিজ দেশের ফুটবল ফেডারেশনের বহন করে থাকে। আরো যা যা খরচ তার কতটা আয়োজক বহন করবে তা প্রতিযোগিতার নিয়ম ও চুক্তির ওপর নির্ভর করে। উল্লেখ্য যে ফিফা, উয়েফা বা এএফসির মতোই, সাফের প্রশাসনিক কার্যক্রম হিসেবে দক্ষিণ এশিয়ার ফুটবলের ভবিষ্যতের উন্নয়নের জন্য বিনিয়োগ হিসেবে এই টাকার একটা অংশ বরাদ্দ হবে।

পুরস্কারের অর্থমূল্য কত?
২০২৬ সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের আনুষ্ঠানিক পুরস্কারের অর্থ এখনো ঘোষণা করা হয়নি। পুরুষদের টুর্নামেন্টের পূর্ববর্তী সংস্করণগুলোর উপর ভিত্তি করে, প্রত্যাশিত প্রাথমিক পুরস্কারের মোট পরিমাণ ৭৫,০০০ মার্কিন ডলার। যার মধ্যে চ্যাম্পিয়নদের জন্য ৫০,০০০ মার্কিন ডলার এবং রানার্-আপদের জন্য ২৫,০০০ মার্কিন ডলার বরাদ্দ রয়েছে।

খেলার দেশ ডেস্ক
খেলাধুলার সব খবর ও বিশ্লেষণ সবার আগে পেতে চোখ রাখুন খেলারদেশে।
সম্পর্কিত আরও খবর
ফুটবলমেসির গোলেও রক্ষা হচ্ছে না মায়ামির
ফুটবলডর্টমুন্ডকে হারিয়ে জার্মান সুপার কাপ জিতলো বায়ার্ন
ফুটবলঘাম ঝরানো জয়ে লিগ শুরু করলো রিয়াল মাদ্রিদ
ফুটবলএস্পানিওল গ্যালারিতে ২১তম মিনিটে করতালির রহস্য
ফুটবলশৈশবের ক্লাবে কুকুরেয়া, এবার রিয়ালের জার্সিতে
ফুটবল
মন্তব্যসমূহ (0)
মন্তব্য করতে এবং আলোচনায় অংশ নিতে আপনার গুগল অ্যাকাউন্ট দিয়ে লগইন করুন।