ফিফা আসিয়ান কাপ
ফিফা আসিয়ান কাপে বাংলাদেশ?
ভারতের সরে দাঁড়ানোয় বাংলাদেশের সামনে ফিফা আসিয়ান কাপ-এর দরজা কি খুলবে? এখনই বাফুফের উদ্যোগ নেওয়ার সময়।

ভারতের সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্তে প্রথমবারের মতো আয়োজিত ফিফা আসিয়ান কাপ (ASEAN Cup) ২০২৬-এর সমীকরণে তৈরি হয়েছে নতুন পরিস্থিতি। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাইরে থেকে আমন্ত্রিত দল হিসেবে ভারতের অংশগ্রহণকে ঘিরে যে টুর্নামেন্টের কাঠামো তৈরি হয়েছিল, সেই জায়গা এখন শূন্য। বাংলাদেশের জন্য এটা সরাসরি ‘নিশ্চিত আমন্ত্রণ’ নয় অবশ্য, কিন্তু ফিফা ও আয়োজকদের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে আবেদন করার মতো গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ বটে। আর সেই সুযোগ কাজে লাগাতে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনকে দ্রুত নড়েচড়ে বসার পরামর্শ দিচ্ছেন ফুটবলসংশ্লিষ্টরা।

ভারতীয় ফুটবল ফেডারেশন ১৩ আগস্ট ২০২৬ আনুষ্ঠানিকভাবে ফিফাকে জানিয়েছে যে তারা প্রথম ফিফা আসিয়ান কাপে অংশ নিচ্ছে না। ভারতের সিদ্ধান্তের মূল কারণ ৩ অক্টোবর ব্রাজিলের বিপক্ষে কলকাতায় নির্ধারিত বহুল আলোচিত প্রীতি ম্যাচ। একই আন্তর্জাতিক উইন্ডোর মধ্যে আসিয়ান কাপ ও ব্রাজিল ম্যাচের সূচি সামলানো নিয়ে জটিলতা তৈরি হওয়ায় ভারত টুর্নামেন্ট থেকে সরে দাঁড়িয়েছে।
ভারতের জায়গাটি কেন গুরুত্বপূর্ণ? ফিফা আসিয়ান কাপ সাধারণ আসিয়ান চ্যাম্পিয়নশীপ না। ফিফা ও আসিয়ানেরর অংশীদারত্বের অধীনে নতুন এই প্রতিযোগিতার আয়োজনের ঘোষণা আসে ২০২৫ সালের অক্টোবরে। ফিফা জানিয়েছিল, টুর্নামেন্টটির লক্ষ্য দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ফুটবলের উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার সুযোগ বাড়ানো।

প্রথম আসরে ফিফা বিশেষ আমন্ত্রণে আসিয়ান-এর বাইরের কিছু দলকে যুক্ত করেছে। মে মাসে সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট জানায়, ভারত ও চীনকে ডিভিশন ১-এ আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল এবং ভারত ফিফার অংশগ্রহণ চুক্তিতে স্বাক্ষরও করেছিল। পরে চীনও টুর্নামেন্ট থেকে সরে যায়।
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পাকিস্তানও এই প্রতিযোগিতায় জায়গা করে নিয়েছে। এক প্রতিবেদনে জানা যায়, ফিফা আসিয়ান কাপ-এর প্রিমিয়ার ডিভিশনে ভারত ও পাকিস্তানকে দক্ষিণ এশিয়ার আমন্ত্রিত দল হিসেবে রাখা হয়েছিল। একই প্রতিবেদনে বলা হয়, পাকিস্তান বাংলাদেশের চেয়ে অনেক পিছিয়ে থাকা ফিফা র্যাংকিং সত্ত্বেও এই সুযোগ পেয়েছে। অর্থাৎ বাংলাদেশের প্রশ্ন এখন আরও যৌক্তিক: ভারত যখন নেই, তখন সেই শূন্যস্থান পূরণে বাংলাদেশকে কেন বিবেচনা করা হবে না?
বাফুফে কি ইতোমধ্যে বিষয়টা ধরতে পেরেছে? হ্যাঁ। এখানেই বিষয়টা আরও তাৎপর্যপূর্ণ। ৩০ জুলাই বাফুফের জাতীয় দল কমিটির সভায় ফিফা আসিয়ান কাপ নিয়ে আলোচনা হয়। বাফুফে সভাপতি তাবিথ আউয়াল বিষয়টি খোঁজ নিতে সাধারণ সম্পাদক ইমরান হোসেন তুষারকে নির্দেশ দেন। প্রয়োজনে আসিয়ান কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেওয়ার কথাও বলা হয়। কমিটির সদস্যদের বক্তব্য ছিল, সুযোগ পাওয়া গেলে বাংলাদেশ এই টুর্নামেন্টে খেলতে আগ্রহী। সুতরাং ভারতের প্রত্যাহারের পর বাফুফের সামনে এখন দ্বিতীয়বার ভাবার সময় নেই। বরং আগের সিদ্ধান্তকে বাস্তব কূটনৈতিক উদ্যোগে পরিণত করার সময়।
তবে বাংলাদেশ কি সরাসরি ভারতের জায়গা নিতে পারবে? না, সরাসরি পারবে না। এখানেই বাস্তব পরিস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ। ফিফা আসিয়ান কাপ-এর অংশগ্রহণকারী দলগুলো নির্ধারণ করা হয়েছে আমন্ত্রণ ও আয়োজকদের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে। ভারতও আসিয়ান-এর সদস্য নয়; বিশেষ আমন্ত্রণেই জায়গা পেয়েছিল। ফলে ভারত সরে যাওয়ায় বাংলাদেশ ‘পরবর্তী দল’ হিসেবে নিজে থেকেই ঢুকে যাবে, এমন কোনো নিয়ম নেই।
বরং বাফুফেকে ফিফা, আসিয়ান এবং সংশ্লিষ্ট আয়োজকদের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে আবেদন করতে হবে। টুর্নামেন্টের কাঠামো, গ্রুপের ভারসাম্য, ভেন্যু, সম্প্রচার, ম্যাচ সূচি এবং অংশগ্রহণকারী দলের চুক্তি—সবকিছু বিবেচনা করে ফিফাকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। ৩০ জুলাই পর্যন্ত বাফুফের অবস্থানও ছিল এমনই, সুযোগ থাকলে খেলার জন্য চিঠি দেওয়া হবে।
যদিও হাতে সময়ও খুব বেশি নেই। ফিফা আসিয়ান কাপ-এর প্রথম আসর সেপ্টেম্বর-অক্টোবরের আন্তর্জাতিক উইন্ডোতে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। ভারতের গ্রুপে ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরের নাম উল্লেখ করা হয়েছিল এবং টুর্নামেন্টটি ২৪ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হওয়ার কথা। ফিফা আসিয়ান কাপ-এর উইন্ডোটি ২১ সেপ্টেম্বর থেকে ৬ অক্টোবর পর্যন্ত হওয়ার কথা বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসেছে। প্রতিযোগিতাটি দুই ডিভিশনে হবে এবং অংশগ্রহণকারী দলগুলোর জন্য আর্থিক প্রণোদনাও রয়েছে। ডিভিশন ১-এর চ্যাম্পিয়ন পাবে ১০ লাখ মার্কিন ডলার, ডিভিশন-এর চ্যাম্পিয়ন ৩ লাখ ডলার এবং অংশগ্রহণকারী দলগুলোর জন্যও অর্থ বরাদ্দ রয়েছে।
এ ধরনের টুর্নামেন্টে মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে নতুন দল ঢোকানো সহজ না। কিন্তু ভারত এখন আনুষ্ঠানিকভাবে সরে যাওয়ায় বাফুফের উচিত অন্তত ‘আমরা প্রস্তুত, সুযোগ দিলে খেলব’ এই অবস্থানের কথা ফিফার সামনে স্পষ্টভাবে তুলে ধরা।
বাংলাদেশের জন্য লাভটা কোথায়? সবচেয়ে বড় লাভ হবে প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচ। ফিফার সর্বশেষ ২০ জুলাই ২০২৬ র্যাংকিংয়ে বাংলাদেশ ১৮১তম অবস্থানে রয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ নিয়মিত খেললেও শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে ধারাবাহিক আন্তর্জাতিক ম্যাচ পাওয়ার সুযোগ সীমিত। অন্যদিকে ফিফা আসিয়ান কাপ-এর সম্ভাব্য প্রতিপক্ষগুলোর মধ্যে রয়েছে ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ফিলিপাইন ও সিঙ্গাপুরের মতো দল। এগুলোর কয়েকটি দল এশিয়ার আন্তর্জাতিক ফুটবলে বাংলাদেশের তুলনায় অনেক বেশি প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশে খেলছে।

সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের আগে এমন প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ম্যাচ খেলা জাতীয় দলের জন্য ভালো প্রস্তুতি হতে পারে। ২০২৬ সালের নভেম্বর উইন্ডোতে বাংলাদেশে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের আয়োজনের পরিকল্পনার কথাও আগেই প্রকাশ্যে এসেছে। ভারত আসিয়ান কাপে থাকায় সাফ আসরের সূচিও বদলাতে হয়েছিল।
বাংলাদেশের জন্য ভালো মানের আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচ অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু নির্দিষ্ট প্রতিযোগিতার চাপ, পয়েন্টের হিসাব, টুর্নামেন্টের পরিবেশ এবং ধারাবাহিক ম্যাচ, এসবের অভিজ্ঞতা আলাদা। ফিফা আসিয়ান কাপের মতো প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের সামনে তুলনামূলকভাবে উচ্চমানের আন্তর্জাতিক ফুটবলের পরিবেশ তৈরি হতে পারে।
বিশেষ করে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক দলগঠনে বিদেশে জন্ম নেওয়া বা বিদেশি লিগে বেড়ে ওঠা খেলোয়াড়দের অন্তর্ভুক্তির কারণে জাতীয় দলের মান ও প্রত্যাশা আগের তুলনায় বেড়েছে। সেই দলকে যদি নিয়মিতভাবে অপেক্ষাকৃত শক্তিশালী এশীয় প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে খেলানো যায়, তাহলে ২০২৭ সালের পরবর্তী এএফসি ও ফিফা প্রতিযোগিতাগুলোর প্রস্তুতিতেও তার প্রভাব পড়তে পারে।
কিন্তু বাফুফের সামনে কঠিন প্রশ্নও আছে। বাংলাদেশকে আমন্ত্রণ না দেওয়ার পেছনে ফিফার মূল যুক্তি কী ছিল তাও জানতে হবে। প্রথম আসরে ফিফা কেন ভারত ও পাকিস্তানকে বিশেষভাবে বেছে নিয়েছিল, কেন বাংলাদেশকে নেয়নি, এমন প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে বাফুফেকে। কারণ শুধু ভারত সরে গেছে বলেই বাংলাদেশকে অন্তর্ভুক্ত করা হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
ঋতুপর্ণা চাকমার অ্যাসিস্টে বড় জয়

ফলে বাফুফের আবেদন হতে হবে কৌশলগত। আসিয়ান-এর সদস্য না হয়েও ফিফার বৈশ্বিক উন্নয়ন ও আন্তঃআঞ্চলিক ফুটবল কাঠামোর অংশ হিসেবে আমন্ত্রণ পাওয়া অন্য দক্ষিণ এশীয় দলের সমমানের বিকল্প দল হিসেবে ব্যাখ্যাসহ জোড়ালোভাবে উল্লেখ করে আবেদন করা যেতে পারে। বাংলাদেশের ফিফা র্যাংকিং পাকিস্তানের চেয়ে এগিয়ে। পাকিস্তান যখন ডিভিশন ১-এ সুযোগ পেয়েছে, বাংলাদেশ অন্তত বিকল্প হিসেবে বিবেচিত হওয়ার যুক্তি উপস্থাপন করতে পারে।
সেক্ষেত্রে দ্রুতই ফিফা ও আসিয়ান-এর কাছে আনুষ্ঠানিক আগ্রহপত্র পাঠানো উচিত। দ্বিতীয়ত, শুধু ‘ভারতের জায়গা চাই’ বলা যথেষ্ট নয়। বাফুফেকে জানাতে হবে, বাংলাদেশ নির্ধারিত আন্তর্জাতিক উইন্ডোতে দল পাঠাতে প্রস্তুত, ভ্রমণ ও লজিস্টিক বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারবে এবং প্রয়োজনে আয়োজকদের নির্ধারিত সূচি মেনে খেলতে পারবে। তৃতীয়ত, ইন্দোনেশিয়া ফুটবল এসোসিয়েশন, আসিয়ান ও ফিফার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করতে হবে। চতুর্থত, ফিফার কাছে জানতে হবে, ভারতের শূন্যস্থান পূরণে নতুন দল নেওয়ার সুযোগ আছে কি না। যদি ডিভিশন ১-এর গ্রুপ কাঠামো অপরিবর্তিত রাখা সম্ভব না হয়, তাহলে ডিভিশন ২ কিংবা বিশেষ কোনো বিকল্প কাঠামোতে বাংলাদেশকে যুক্ত করার সম্ভাবনাও জানতে হবে।
সবশেষে, বাফুফেকে নিজেদের সিদ্ধান্তের গতি বাড়াতে হবে। ৩০ জুলাই যখন বিষয়টি নিয়ে বাফুফের জাতীয় দল কমিটিতে আলোচনা হয়েছে, তখনও ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাহার করেনি। এখন সেই প্রত্যাহার বাস্তবতা।
ভারতের সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত তাদের নিজস্ব কৌশল। কিন্তু বাংলাদেশের জন্য তা অন্য অর্থ বহন করে। একটা জায়গা খালি হয়েছে আসরটাতে। সেই জায়গাটি বাংলাদেশ পাবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। ফিফা বা আসিয়ান-এর পক্ষ থেকেও বাংলাদেশকে আমন্ত্রণের কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। কিন্তু বাফুফের হাতে অন্তত সুযোগ তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ যদি শেষ পর্যন্ত টুর্নামেন্টে ঢুকতে নাও পারে, তবু বাফুফের উচিত উদ্যোগ নেওয়া। কারণ জাতীয় দলের উন্নতির জন্য শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে চারটি অর্থবহ ম্যাচ অনেক সময় চারটি সাধারণ প্রীতি ম্যাচের চেয়ে বেশি মূল্যবান।
আর যদি ফিফা আসিয়ান কাপ-এর দরজা শেষ মুহূর্তে বাংলাদেশের জন্য খুলে যায়, তবে তা শুধু টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণ হবে না, হবে দক্ষিণ এশিয়ার গণ্ডি পেরিয়ে বাংলাদেশের জাতীয় ফুটবলকে আরও প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশে নেওয়ার গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

খেলার দেশ ডেস্ক
খেলাধুলার সব খবর ও বিশ্লেষণ সবার আগে পেতে চোখ রাখুন খেলারদেশে।
সম্পর্কিত আরও খবর
দেশের ফুটবলকঠিন গ্রুপে ফর্টিস এফসি
দেশের ফুটবলবাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-২০ দলে রোনান সুলিভান কেন নেই?
দেশের ফুটবলনিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের ধাপে বসুন্ধরা কিংস
দেশের ফুটবলঢাকার মাঠে কিছুক্ষণ ক্লদিও ক্যানেজিয়া
দেশের ফুটবলআবাহনীর তৃতীয় নিষেধাজ্ঞাও প্রত্যাহার করেছে ফিফা
দেশের ফুটবল

মন্তব্যসমূহ (0)
মন্তব্য করতে এবং আলোচনায় অংশ নিতে আপনার গুগল অ্যাকাউন্ট দিয়ে লগইন করুন।