খেলারদেশ

সিটিকে দোষী সাব্যস্ত করেছে প্রিমিয়ার লিগ, কী শাস্তি সামনে?

ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে ম্যানচেস্টার সিটির বিরুদ্ধে আনা আর্থিক অনিয়মের ১১৫টি অভিযোগের মধ্যে ১১৪টিতেই ক্লাবটিকে দায়ী করেছে স্বাধীন কমিশন। মঙ্গলবার প্রিমিয়ার লিগ আনুষ্ঠানিকভাবে কমিশনের সিদ্ধান্ত নিশ্চিত করেছে। তবে রায় এলেই বিষয়টির শেষ হচ্ছে না। এখন শাস্তি নির্ধারণ এবং সিটির সম্ভাব্য আপিল, দুই ধাপই সামনে। ম্যানচেস্টার সিটি জানিয়েছে, তারা সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাবে।

সিটিকে দোষী সাব্যস্ত করেছে প্রিমিয়ার লিগ, কী শাস্তি সামনে?
খেলার দেশ ডেস্ক
By খেলার দেশ ডেস্ক

ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে ম্যানচেস্টার সিটির বিরুদ্ধে আনা আর্থিক অনিয়মের ১১৫টি অভিযোগের মধ্যে ১১৪টিতেই ক্লাবটিকে দায়ী করেছে স্বাধীন কমিশন। মঙ্গলবার প্রিমিয়ার লিগ আনুষ্ঠানিকভাবে কমিশনের সিদ্ধান্ত নিশ্চিত করেছে। অভিযোগগুলোর সময়কাল ২০০৯-১০ থেকে ২০১৭-১৮ মৌসুম পর্যন্ত। কমিশনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সিটি বাণিজ্যিক চুক্তির প্রকৃত ধরন গোপন করে আয় কৃত্রিমভাবে বাড়ানো, হিসাবের তথ্য ভুলভাবে উপস্থাপন এবং আর্থিক নিয়ম মেনে চলার বিষয়ে নিয়ন্ত্রকদের বিভ্রান্ত করার মতো কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিল।

তবে রায় এলেই বিষয়টির শেষ হচ্ছে না। এখন শাস্তি নির্ধারণ এবং সিটির সম্ভাব্য আপিল, দুই ধাপই সামনে। ম্যানচেস্টার সিটি জানিয়েছে, তারা সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাবে।

‘ফুটবলের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় অফ-ফিল্ড কেলেঙ্কারি’

পরিস্থিতির গুরুত্ব বোঝাতে ইউনিভার্সিটি অব লিভারপুলের ফুটবল অর্থনীতি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক কিরান ম্যাগুয়ার বলেছেন, এটি ফুটবলের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় অফ-ফিল্ড কেলেঙ্কারি।

তাঁর মতে, সিটিকে সরাসরি প্রিমিয়ার লিগ থেকে নামিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও নতুন জটিলতা তৈরি হবে। কারণ প্রিমিয়ার লিগ ও ইংলিশ ফুটবল লিগ আলাদা আইনি সংস্থা। ফলে সিটিকে কোথায় নামানো হবে, সেটিও আলাদা প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াবে। ম্যাগুয়ারের মতে, সেটি চ্যাম্পিয়নশিপ, লিগ ওয়ান বা লিগ টু হতে পারে, এমনকি ইএফএল সিটিকে গ্রহণ করবে কি না, সেটিও তাত্ত্বিকভাবে আলোচনায় আসতে পারে।

তবে তিনি মনে করেন, সিটিকে গ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত ইএফএল-এর জন্যও জটিলতা তৈরি করবে। তখন ন্যাশনাল লিগ পর্যন্ত বিষয়টি গড়ানোর সম্ভাবনাও সামনে আসতে পারে।

এ মুহূর্তে অবশ্য এগুলো সম্ভাব্য পরিস্থিতি, কোনো সিদ্ধান্ত নয়। শাস্তি এখনো ঘোষণা করা হয়নি। প্রিমিয়ার লিগ জানিয়েছে, কমিশনের সিদ্ধান্তের পরবর্তী ধাপে শাস্তি নির্ধারণের বিষয়টি আসবে।

আর্থিক ক্ষতি হতে পারে শত কোটি পাউন্ড

ম্যাগুয়ারের হিসাব আরও বড় অঙ্কের আর্থিক ঝুঁকির দিকে ইঙ্গিত করছে। তাঁর হিসাব অনুযায়ী, শেখ মনসুরের মালিকানায় যাওয়ার আগে প্রিমিয়ার লিগে সিটির গড় অবস্থান ছিল ১৪তম। মালিকানা পরিবর্তনের পর গড় অবস্থান হয়েছে দ্বিতীয়।

চ্যাম্পিয়নস লিগে নিয়মিত খেলার সুযোগ, বেশি প্রাইজমানি এবং স্পনসরদের বোনাস মিলিয়ে গত সময়ের বাড়তি আর্থিক সুবিধার পরিমাণ তাঁর হিসাব অনুযায়ী প্রায় ১ থেকে ১.১ বিলিয়ন পাউন্ড।

শাস্তির অঙ্ক নিয়েও বড় প্রশ্ন আছে। ম্যাগুয়ার মনে করেন, আগের কিছু মামলায় তুলনামূলক কম অঙ্কের আর্থিক জরিমানার নজির থাকলেও সিটির ক্ষেত্রে জরিমানার পরিমাণ শত শত মিলিয়ন পাউন্ড পর্যন্ত হতে পারে। তবে এটিও তাঁর ব্যক্তিগত হিসাব ও সম্ভাব্যতা, চূড়ান্ত শাস্তির ঘোষণা নয়।

অন্য ক্লাবগুলোও ক্ষতিপূরণ চাইতে পারে

সিটির বিরুদ্ধে রায়ের আরেকটি বড় প্রভাব পড়তে পারে প্রতিদ্বন্দ্বী ক্লাবগুলোর ওপর। ম্যাগুয়ারের মতে, কোনো ক্লাব যদি প্রমাণ করতে পারে যে সিটির নিয়মভঙ্গের কারণে তারা চ্যাম্পিয়নস লিগে জায়গা হারিয়েছে, তাহলে বড় অঙ্কের ক্ষতিপূরণ দাবির পথ খুলতে পারে।

তাঁর হিসাবে, প্রিমিয়ার লিগে একটি অবস্থান এগিয়ে যাওয়ার মূল্য তুলনামূলক কম হলেও চ্যাম্পিয়নস লিগে জায়গা পাওয়ার আর্থিক পার্থক্য অনেক বেশি। একটি মৌসুমে চ্যাম্পিয়নস লিগে জায়গা পাওয়ার মূল্য কমপক্ষে প্রায় ৫০ মিলিয়ন পাউন্ড, আর সফল একটি ক্লাবের ক্ষেত্রে তা ১৫০ থেকে ২০০ মিলিয়ন পাউন্ড পর্যন্ত হতে পারে।

এ ধরনের দাবি একাধিক মৌসুমকে ঘিরে উঠলে ক্ষতিপূরণের অঙ্ক নয় অঙ্কের পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে বলে মনে করেন তিনি। এ ক্ষেত্রে এভারটন, বার্নলি, ডার্বি কাউন্টি, মিডলসব্রো, ওয়াইকোম্ব ও শেফিল্ড ইউনাইটেড-ওয়েস্ট হ্যাম মামলার মতো আগের আইনি নজিরের কথা উল্লেখ করেছেন ম্যাগুয়ার।

আপিলে সিটির সুযোগ কতটা?

সিটির সামনে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পথ আপিল। তবে আইনজীবী ও ক্রীড়া-আইন বিশেষজ্ঞ স্টেফান বোরসনের মতে, আপিলে সফল হওয়ার সম্ভাবনা তুলনামূলক কম।

বোরসনের ব্যাখ্যা, কমিশনের প্রমাণ ও সিদ্ধান্তকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করার পাশাপাশি সিটির পক্ষ থেকে কমিশন গঠনের নিরপেক্ষতা বা প্রক্রিয়াগত ত্রুটির প্রশ্ন তোলা হতে পারে। তবে তাঁর মতে, এমন আপিল সফল হবে কি না, সেটি সহজ নয়।

তিনি আরও বলেন, সিটি মামলার বিভিন্ন তথ্য ও আইনের প্রয়োগ নিয়ে জোরালোভাবে আপত্তি তুলতে পারে। তবে দুই পক্ষেরই শক্তিশালী আইনি দল রয়েছে, ফলে বিষয়টি দ্রুত শেষ হওয়ার সম্ভাবনা কম।

সিটির পক্ষ থেকে শুক্রবারের মধ্যে আপিল করার প্রস্তুতি রয়েছে বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।

রায় চূড়ান্ত হলেও শাস্তি আসতে সময় লাগবে

বোরসনের মতে, আপিলের সিদ্ধান্ত পেতে কয়েক মাস লেগে যেতে পারে এবং বিষয়টি আগামী মৌসুম পর্যন্তও গড়াতে পারে। এরপর যদি শাস্তি নির্ধারণ করা হয়, সেই শাস্তির বিরুদ্ধেও আবার আপিলের সুযোগ থাকতে পারে।

অর্থাৎ, ১১৫টির মধ্যে ১১৪টি অভিযোগে দায়ী সাব্যস্ত হওয়ার পরও সিটির ভবিষ্যৎ নিয়ে এখনই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। রায়, আপিল, শাস্তি এবং শাস্তির বিরুদ্ধে সম্ভাব্য আইনি লড়াই, পুরো প্রক্রিয়াটিই আরও দীর্ঘ হতে পারে।

তাহলে সিটির কী হতে পারে?

এই মুহূর্তে নিশ্চিতভাবে বলা যায়, শাস্তি এখনো নির্ধারিত হয়নি। সম্ভাব্য ব্যবস্থার মধ্যে রয়েছে বড় অঙ্কের জরিমানা, পয়েন্ট কাটা, ইউরোপীয় প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণে প্রভাব পড়া কিংবা প্রিমিয়ার লিগ থেকে অবনমন বা বহিষ্কারের মতো কঠোর ব্যবস্থা। তবে কোনটি কার্যকর হবে, সেটি কমিশনের পরবর্তী সিদ্ধান্ত ও আপিল প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করবে।

প্রিমিয়ার লিগের আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, কমিশন সিটির বিরুদ্ধে ২০০৯-১০ থেকে ২০১৭-১৮ মৌসুম পর্যন্ত আর্থিক নিয়মভঙ্গের অভিযোগগুলোতে দায় পেয়েছে এবং ক্লাবটি তদন্তে সহযোগিতার ক্ষেত্রেও চারটি অভিযোগের তিনটিতে দায়ী হয়েছে।

ফলে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন শুধু সিটির কত পয়েন্ট কাটা হবে বা জরিমানা কত হবে, তা নয়। এই রায়ের পর সিটির অতীত সাফল্য, প্রতিদ্বন্দ্বী ক্লাবগুলোর সম্ভাব্য ক্ষতিপূরণ দাবি এবং ইংলিশ ফুটবলের আর্থিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ওপরও বড় ধরনের আইনি প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য অনুযায়ী, সেই উত্তর পেতে আরও কয়েক মাসের আইনি লড়াই দেখা যেতে পারে।

খেলার দেশ ডেস্ক

খেলার দেশ ডেস্ক

খেলাধুলার সব খবর ও বিশ্লেষণ সবার আগে পেতে চোখ রাখুন খেলারদেশে।

সম্পর্কিত আরও খবর

এই বিভাগের সব খবর →

মন্তব্যসমূহ (0)

মন্তব্য করতে এবং আলোচনায় অংশ নিতে আপনার গুগল অ্যাকাউন্ট দিয়ে লগইন করুন।