খেলারদেশ

বাংলাদেশ ক্রিকেটের ভিত্তি গড়ার কারিগর বারলো

বাংলাদেশ ক্রিকেট ভিত গড়ে দেওয়ার অন্যতম নায়ক সাবেক এই প্রোটিয়া অলরাউন্ডার

বাংলাদেশ ক্রিকেটের ভিত্তি গড়ার কারিগর বারলো
ক্রিকেট প্রতিবেদক
By ক্রিকেট প্রতিবেদক

বিদেশিদের কোচদের মধ্যে ডেভ হোয়াটমোর ও এডি বারলো এখনও আছেন বাংলাদেশের মানুষের মনিকোঠায়। হোয়াটমোর পরিচিত সাকিব আল হাসান-তামিম ইকবালদের গুরু হিসেবে। আর বারলো দেশের ক্রিকেটের গতিপথ বদলে দিয়ে।

ক্রিকেটের গতিপথ বদলে দিতে এসে পড়েছিলেন বাংলাদেশের প্রেমে। হুইল চেয়ারে বসেও বারবার শুনতে চাইতেন বাংলাদেশের কথা, এ দেশের ক্রিকেটের কথা। বারবার বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশ প্রেমের সেই কথাগুলো বলেছেন এই প্রোটিয়া।

তার স্ত্রী কেলিও বারবার বাংলাদেশের প্রতি থাকা তাদের ভালোবাসার কথা বলেছেন। ১৯৯৯ সালের শেষভাগে যখন তিনি বাংলাদেশের হেড কোচের দায়িত্ব নেন, তখন টাইগার ক্রিকেট দাঁড়িয়ে এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে— ঘরোয়া ক্রিকেটের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের শক্ত অবস্থান তৈরির আপ্রাণ চেষ্টায় মত্ত।

কোচ হিসেবে বাংলাদেশে পা রাখার আগে তার সুপরিচিতি ছিল বিশ্ব ক্রিকেটের এক অপ্রতিরোধ্য ক্রিকেটার হিসেবে। ১৯৬০ ও ৭০-এর দশকে চশমা পরে আগ্রাসী ব্যাটিং ও নির্ভরযোগ্য বোলিং দিয়ে মাতান পুরো বিশ্ব। সতীর্থ-প্রতিপক্ষর কাছে তার পরিচয় ছিল ‘দ্য বুল’ হিসেবে, কারণ মাঠে তার মধ্যে থাকত অদম্য জয়ের ক্ষুধা।

এরপরেও তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার থেমেছে মাত্র ৩০ টেস্টে! এ সময়ে ৪৫.৭৪ গড়ে ছয় সেঞ্চুরিতে করেন ২ হাজার ৫১৬ রান। এর মধ্যে ছিল এক ডাবল সেঞ্চুরি। আর বোলিংয়ে নেন ৪০ উইকেট। এমন ছন্দে থাকার সময় প্রোটিয়া ক্রিকেটে নেমে আসে আধার। ১৯৭০ সালে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে নির্বাসিত হয় দেশটি, থমকে যায় তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার।

তবে থেমে থাকেনি তার ক্রিকেটীয় লড়াই। সিডনিতে বিশ্ব একাদশের হয়ে ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে নজর কাড়েন। ১৯৭১ সালে সিডনিতে এক ওভারেই নেন ৫ উইকেট! এছাড়া কাউন্টি ক্রিকেটে অধিনায়ক হিসেবে ডার্বিশায়ারকে ১৯৭৮ সালে জেতান বহুল কাঙ্ক্ষিত বেনসন অ্যান্ড হেজেস কাপ।

খেলোয়াড়ি জীবনের সুবিশাল অভিজ্ঞতাকে সঙ্গী করে বাংলাদেশে পা রাখেন এডি বারলো। দায়িত্ব নিয়ে বোঝেন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে লড়তে হলে কেবল প্রতিভাই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন ফিটনেস ও পেশাদার মানসিকতা।

সেদিকে মনযোগী হয়ে বাংলাদেশ দলের ক্রিকেটারদের আনেন কঠোর শৃঙ্খলার মধ্যে। পাশাপাশি খেলোয়াড়দের ফিটনেস নিয়েও কাজ শুরু করেন।

এর পাশাপাশি খেলোয়াড়দের টেকনিক্যাল বিষয় নিয়ে নিয়মিত কাজ তো করতেনই। ব্যাকফুটে খেলা ও শট সিলেকশনের সঙ্গে তাদের মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন জয়ের অদম্য মানসিকতা। তার শিখিয়ে দেওয়া মন্ত্রে উজ্জীবিত হয়ে নিজেদের অভিষেক টেস্ট খেলতে নামে বাংলাদেশ।

লাল বলের ক্রিকেটে লম্বা সময় উইকেটে থাকতে আমিনুল ইসলাম বুলবুল, আকরাম খান, হাবিবুল বাশারদের মতো অভিজ্ঞদের পাশাপাশি তরুণদের প্রস্তুত করেন মানসিকভাবে। ক্রিকেটারদের বিশ্বাস করাতে পেরেছিলেন আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের সম্ভাবনা আছে বিশ্বসেরাদের সমকক্ষ হওয়ার।

সেই বিশ্বাসে ভর করে এখনও এগিয়ে চলছে বাংলাদেশ ক্রিকেট।

ক্রিকেটারদের মধ্যে বিশ্বাস ঢুকিয়ে দেওয়া বারলোর বাংলাদেশ অধ্যায় হয়নি দীর্ঘ। ২০০০ সালের এপ্রিলে ঢাকায় স্ট্রোকে আক্রান্ত হন। এই অসুস্থতায় প্রাণে বেঁচে গেলেও তার শরীরের একাংশ হয়ে পড়ে অবশ। ফলে মাঠের এই মানুষটির ঠিকানা হয় হুইলচেয়ার। সঙ্গে শেষ হয় তার বাংলাদেশ অধ্যায়ের। এই শারীরিক প্রতিবন্ধকতার সঙ্গে লড়াই করে ২০০৫ সালে ৬৫ বছর বয়সে ওপারে পাড়ি জমান বারলো।

ভাগ্যের পরিহাসে বাংলাদেশে তার অধ্যায় ছোট হলেও ক্রিকেট ক্যারিয়ারের লম্বা অভিজ্ঞতা দিয়ে তৈরি করে দিয়েছেন সঠিক ভিত্তি। তার ওপর দাঁড়িয়ে একের পর এক সাফল্য ধরা দিচ্ছে বাংলাদেশ ক্রিকেটে।

বাংলাদেশে থাকতে প্রচন্ড ভালোবাসা আর সম্মান অর্জন করে নিয়েছিলেন এই অলরাউন্ডার। সঙ্গে এই দেশকে প্রচন্ড ভালোবাসতেন। প্রতিটা মুহূর্তে ইন্টারনেটের মাধ্যমে খোঁজ রাখতেন বাংলাদেশের ক্রিকেটের। ২০০৫ সালে বাংলাদেশ দলের ইংল্যান্ড সফরে শেষবার গ্যালারি থেকে খেলা দেখেছিলেন বারলো। তখন বাংলাদেশে অন্তত একবার আসার ইচ্ছার কথা জানিয়েছিলেন। তার সেই ইচ্ছে আর পূরণ হয়নি, সে বছরই পরপারে পাড়ি জমান।

ক্রিকেট প্রতিবেদক

ক্রিকেট প্রতিবেদক

খেলাধুলার সব খবর ও বিশ্লেষণ সবার আগে পেতে চোখ রাখুন খেলারদেশে।

সম্পর্কিত আরও খবর

এই বিভাগের সব খবর →

মন্তব্যসমূহ (0)

মন্তব্য করতে এবং আলোচনায় অংশ নিতে আপনার গুগল অ্যাকাউন্ট দিয়ে লগইন করুন।